২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করেছিল। সেই হিসেবে আজ এই যুদ্ধের চার বছর পূর্তি। এই যুদ্ধকে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে স্থলভাগে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে ব্যাপক। ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের শহরগুলো প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এত কিছুর পর রাশিয়ার কি কিছু অর্জন করতে পেরেছে?
সংঘাত চার বছরে পা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে, এএফপি যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা এবং দুই দেশের জন্য এর কিছু পরিণতি তুলে ধরেছে।
ধ্বংস
গত চার বছর ধরে ইউক্রেনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের পুরো শহরগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এর মধ্যে বাখমুত, তোরেৎস্ক, ভোভচানস্ক শহরগুলো এই লড়াইয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন ২০২২ সাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা স্থাপনায় ২ হাজার ৮০০টিরও বেশি হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর রুশ হামলায় লাখ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
জাতিসংঘের মাইন অ্যাকশন সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা মাইন বা অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ দিয়েছে দূষিত হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) জানিয়েছে, আগামী এক দশকে ইউক্রেন পুনর্গঠনের প্রায় ৫৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।
মৃত্যু
জাতিসংঘ ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনে ১৫ হাজারেরও বেশি বেসামরিক মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত করেছে। তবে সংস্থাটি বলেছে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। কারণ রুশ দখলে থাকা এলাকাগুলো যেমন বন্দরনগরী মারিউপলে তাদের প্রবেশাধিকার নেই। সেখানে রুশ অবরোধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
রুশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ইউক্রেনের পাল্টা হামলায়ও শত শত মানুষ নিহত হয়েছে।
কিয়েভের হিসাব অনুযায়ী, রুশ-অধিকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২০ হাজার শিশুকে জোরপূর্বক স্থানচ্যুত বা অপহরণ করা হয়েছে।
রুশ আগ্রাসনে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া প্রায় ৫ দশমিক ৯ মিলিয়ন ইউক্রেনীয় শরণার্থী দেশের বাইরে বসবাস করছেন। এছাড়াও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আরও ৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত রয়েছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই মাসের শুরুতে বলেছেন, তাঁর দেশের ৫৫ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে। এটি বাস্তবের চেয়ে অনেক কম বলে মনে করা হয়। এদিকে রাশিয়া ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে সামরিক ক্ষয়ক্ষতির কোনো আনুষ্ঠানিক হালনাগাদ তথ্য দেয়নি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এবং স্বাধীন রুশ ওয়েবসাইট মিডিয়াজোনা অন্তত ১ লাখ ৭৭ হাজার রুশ সৈন্যের মৃত্যুর বিষয়টি যাচাই করেছে যা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম বলে ধারণা করা হয়।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ধারণা করছে, ২০২২ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২৫ হাজার রুশ সৈন্য নিহত হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে তারা ইউক্রেনীয় নিহত সৈন্যের সংখ্যা ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজারের মধ্যে বলে উল্লেখ করেছে।
ফ্রন্টলাইন ও কূটনীতি
ইন্সটিটিউট ফর দ্যা স্টাডি অব ওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত মস্কো ইউক্রেনের প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ এলাকা দখলে রেখেছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ এবং পূর্বাঞ্চলের ডনবাস অঞ্চলের একটি অংশ আগ্রাসনের আগেই দখলে ছিল।
ক্রেমলিন ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং কিয়েভের প্রতি পশ্চিমা সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি জানালেও ইউক্রেন বলছে, এসব দাবিতে নতি স্বীকার করলে ভবিষ্যৎ আক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে। এটি সংবিধানগতভাবে অসম্ভব এবং ইউক্রেনীয় সমাজের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
অর্থনীতি
যুদ্ধ ইউক্রেনের অর্থনীতিকে বিধ্বস্ত করলেও এটি রাশিয়ার অর্থনীতির ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশাল সামরিক ফলে রাশিয়ার অর্থনীতির গতি ধীর হয়েছে। গত বছর প্রবৃদ্ধির হার মাত্র এক শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। তেল ও গ্যাস থেকে রাষ্ট্রের বাজেট আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পাওয়া যায়। গত বছর পাঁচ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনের তেল স্থাপনায় হামলার ফলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ার আগ্রাসনের পরের বছরে ইউক্রেনের অর্থনীতি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সঙ্কুচিত হয়। কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে এখনো তাদের সরকার ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড এবং অন্যান্য বিদেশি ঋণদাতার ওপর নির্ভরশীল।
রাজনীতি ও সমাজ
এই যুদ্ধ দুই দেশের রাজনীতি ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সামরিক আইন জারির কারণে ইউক্রেন নির্বাচন স্থগিত করেছে। তবে সম্প্রতি যুদ্ধবিধ্বস্ত জ্বালানি খাতে দুর্নীতি কেলেঙ্কারির অভিযোগ হয়েছে।
রাশিয়ায় কর্তৃপক্ষ সোভিয়েত যুগের পর থেকে নজিরবিহীনভাবে ভিন্নমত দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
রুশ সংবাদমাধ্যম মিডিয়াজোনা ২০২৪ সালে জানিয়েছে, সশস্ত্র বাহিনীকে সমালোচনা করার অভিযোগে রুশ প্রসিকিউটররা ১০ হাজারের বেশি মামলা দায়ের করেছে।
রাশিয়ায় ফিরে আসা অনেক যুদ্ধফেরত সেনা যারা অনেকেই যুদ্ধের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত সাবেক দণ্ড প্রাপ্ত আসামি, তারা সহিংস অপরাধ বৃদ্ধির জন্য দায়ী বলেও অভিযোগ উঠেছে।
মিত্ররা
ইউক্রেন পশ্চিমা অস্ত্র, গোয়েন্দা সহায়তা ও অর্থায়নের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জার্মানির কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে ইউরোপ ইউক্রেনকে ২০১ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র মোট ১১৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। তবে ট্রাম্প আংশিকভাবে অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করেছেন এবং ইউরোপকে আরও বেশি ব্যয় বহনের আহ্বান জানাচ্ছেন।
উত্তর কোরিয়া হাজার হাজার সৈন্য রুশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য পাঠিয়েছে এবং মস্কোকে কয়েক লাখ আর্টিলারি শেল পাঠানোর খবরও ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
ইরান মস্কোকে ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। এছাড়াও চীন রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা