আজ ৪২ বছরে ওয়ারফেজ। ভাঙা-গড়ার খেলায় স্থির থেকে কীভাবে তারা আজও নতুন প্রজন্মের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক? কেন ব্যান্ডটি আলাদা?
গৌতম কে শুভ

বাংলাদেশে ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাসে বেশকিছু জনপ্রিয় ব্যান্ড এসেছে। কেউ শ্রোতাপ্রিয় গান উপহার দিয়েছে, কেউ স্টেজে দর্শকদের মাত করেছে, আবার কেউ নতুন জনরাকে পরিচিত করেছে প্রজন্মের কাছে। কিন্তু ওয়ারফেজের গুরুত্ব বা ওজনটা একেবারে অন্য জায়গায়। দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর ধরে তারা বাংলা রক-মেটালের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে মেটাল, প্রগ্রেসিভ রক কিংবা হার্ড রকের যে বৈচিত্র্যময় চর্চা আমরা দেখছি, তার শক্ত ভিত্তি তৈরিতে ওয়ারফেজের অবদানকে স্বীকার না করার কোনো উপায় নেই। নতুন জনরাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা, স্থায়ী শ্রোতাভিত্তি তৈরি করা আর পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য ব্যান্ডকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে ব্যান্ডটির ভূমিকা প্রায় অগ্রদূতের মতো। আর তাই বাংলাদেশের চেনা সাংস্কৃতিক গণ্ডিকে কিছুটা ধাক্কা দিয়ে চলতি বছরেই ব্যান্ডটি পেয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’।
আশির দশকে দুনিয়াজুড়ে যখন রক ও মেটালের প্রবল ঢেউ, তখন ঢাকায় ‘ওয়েভস’ ব্যান্ডের হাত ধরে ঢাকায় হেভি মেটালের প্রাথমিক পদধ্বনি শোনা যায়। ১৯৮৪ সালের ৬ জুন থেকে যাত্রা শুরু করা ‘ওয়ারফেজ’ও সেই স্রোতেরই অংশ ছিল। শুরুতে ইংরেজি গান কাভার করাটাই ছিল তাদের জগৎ। এসি/ডিসি, ব্ল্যাক সাবাথ কিংবা লেড জেপলিনের গানগুলোই ছিল তাদের প্রাথমিক অনুপ্রেরণা। তবে সেই সময় বাংলা হেভি মেটাল করার ভাবনাটা খুব একটা মাথায় ছিল না।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তৎকালীন বামবার সভাপতি ও ব্যান্ড তারকা মাকসুদুল হকের (ম্যাক হক) আহ্বানে বাংলা গানে থিতু হওয়ার সেই কঠিন চ্যালেঞ্জটি ওয়ারফেজ গ্রহণ করে। নিজস্ব ভাণ্ডারে থাকা গানগুলো নিয়েই ১৯৯১ সালে প্রকাশ করে বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ হেভি মেটাল অ্যালবাম ‘ওয়ারফেজ’। গানগুলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। স্কুল-কলেজের কিশোর-তরুণরা সানন্দে গ্রহণ করে এই নতুন ধারার সংগীতকে, আর সেখান থেকেই বাংলা হার্ড রক ও হেভি মেটাল পায় নতুন ভাষা।
এরপর শুরু হয় ওয়ারফেজের দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল যাত্রা। এ পর্যন্ত ব্যান্ডটি প্রকাশ করেছে আটটি অ্যালবাম। সর্বশেষ স্টুডিও অ্যালবাম ‘সত্য’ বের হয় ২০১২ সালে। এর বাইরে বিভিন্ন সময়ে সিঙ্গেল প্রকাশের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি মিক্সড ও কম্পাইলেশন অ্যালবামেও প্রকাশ পেয়েছে ওয়ারফেজের গান। সর্বশেষ ২০২৪ সালে কোক স্টুডিও বাংলায় নতুন করে প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটির আইকনিক গান ‘অবাক ভালোবাসা’।
এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, ওয়ারফেজ কেন আলাদা? কেউ বলবেন সাউন্ড, কেউ লিরিক, কেউ আবার গিটার ওয়ার্কের কথা বলবেন। আসলে ওয়ারফেজকে অনন্য করে তোলে তাদের মিউজিকের স্থাপত্য। এখানে প্রথম যে বিষয়টি নজর কাড়ে, তা হলো স্তরবিন্যাস। প্রতিটি গানে রিফ, লিড গিটার, বেজ, কীবোর্ড এবং ড্রামস—প্রতিটি ইন্সট্রুমেন্টের আলাদা এবং সুনির্দিষ্ট ভূমিকা থাকে। অনেক ব্যান্ডের গান ভোকালনির্ভর। কিন্তু ওয়ারফেজের গানে ভোকাল গানটির একটি অংশ মাত্র; ইনস্ট্রুমেন্ট সমানভাবে ভাইব্র্যান্ট।
উদাহরণ হিসেবে ‘অবাক ভালোবাসা’ গানটির কথা বলা যায়। প্রায় নয় মিনিট দীর্ঘ এই গানটির প্রতিটি মুহূর্ত প্রয়োজনীয়। গানের শুরুতে দীর্ঘ ইন্সট্রুমেন্টাল অংশ, গিটার সলো এবং ‘নাটকীয়তা’ নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত সাউন্ড ডিজাইন এক বিশেষ আবহে শ্রোতাকে নিয়ে যায়। ওয়ারফেজের মিউজিকের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ডাইনামিক্স বা ওঠানামা। ‘অসামাজিক’, ‘পূর্ণতা’ বা ‘সত্য’-এর মতো গানগুলোতে তা স্পষ্ট। পশ্চিমা প্রগ্রেসিভ রক ও মেটালের এই ড্রামাটিক ক্যারেক্টারকে তারা বাংলা গানে দারুণভাবে প্রয়োগ করেছে।
বাংলাদেশের সমীহজাগানিয়া গিটারিস্ট, ওয়ারফেজের মিউজিকের অন্যতম স্তম্ভ ইব্রাহিম আহমেদ কমলের বাজানোর দিকে তাকালে দেখা যায়, একদিকে সেখানে বিশ্বের কিংবদন্তি সব গিটারিস্টদের প্রভাব, অন্যদিকে বাংলার নিজস্ব মেলোডিক সংবেদনশীলতা। ফলে সাউন্ড হেভি হলেও তা কখনোই আপামর শ্রোতার কাছেও মিউজিক্যালি দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে না।

ব্যান্ডের ড্রামার ও দলনেতা শেখ মনিরুল আলম টিপুর ড্রামিংয়ের কথা আলাদা করে বলতে হয়। ড্রামসকে তিনি বানিয়েছেন মেলোডির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা ব্যান্ড ডাবল বেস ড্রামস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ওয়ারফেজ ছিল পথিকৃৎ। মূলত, ওয়ারফেজে যাঁরা বাজিয়েছেন কিংবা বাজাচ্ছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মিউজিক্যালি সেরাটা দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। সবার নাম আলাদা করে বললাম না। তাঁদের সবার সাউন্ডের এই ‘কমপ্যাক্টনেস’ বা নিরেট বুননই ব্যান্ডের স্বকীয়তার চাবিকাঠি।
তবে ওয়ারফেজের অন্যতম শক্তি তাদের লিরিক। নব্বইয়ের দশকে যখন ব্যান্ডের লিরিক মানেই ছিল অনেকাংশে প্রেম, বিচ্ছেদ ও আবেগের আতিশয্য, তখন ওয়ারফেজ প্রেমের গানেও এনেছিল ভিন্নতা। ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা সমান গুরুত্ব পেয়েছিল সেখানে। ‘একটি ছেলে’ যেমন নিঃসঙ্গতা ও আত্মপরিচয়ের গল্প বলে, তেমনি ‘অসামাজিক’ বা ‘ধূসর মানচিত্র’ সমাজ ও সময়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। লিরিকের প্যাটার্নের কারণে সফট থেকে হেভি—সব ধরণের গানই শ্রোতারা পচ্ছন্দ করেছে।
ওয়ারফেজের লিরিকের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো কাব্যিকতা। এই কাব্যিক বুননই গানকে কনসার্টে গলা মিলিয়ে গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গভীর রাতে একা বসে শোনার মতো নিভৃত সঙ্গী করে তুলেছে। তারা গান বেঁধেছে বিচ্ছেদে ভেঙে পড়া মানুষের জন্য, আবার জীবনের মানে খোঁজা দিশেহারা কিশোর-কিশোরীদের জন্যও। অর্থাৎ সবার জন্যই এখানে কিছু না কিছু আছে।
মিউজিক্যালি এক্সপেরিমেন্ট করা আর ক্রমাগত নিজেদের ভেঙে নতুন কিছু করা তাদের সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ। অনেক ব্যান্ড নিজেদের সাউন্ড খুঁজে পাওয়ার পর সেটিকেই বারবার পুনরাবৃত্তি করে। ওয়ারফেজ তা করেনি। মোটাদাগে তাদের সাউন্ড বদলেছে। তবে মূলটা না বদলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছরের পথচলায় বহু ভাঙা-গড়ার মুখোমুখি হয়েও ব্যান্ডটির টিকে থাকার রেখা ছিল আশ্চর্য রকমের স্থির। এখানে কৃতিত্ব দিতে হয় দলনেতা টিপুকে। ওয়ারফেজ খারাপ সময় মোকাবিলা করতে জানে। যখন তাদের ভোকালিস্ট চলে গেছে, তারা নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের ব্যান্ড-সিনে এমন দৃশ্য বিরল। সঞ্জয়, বাবনা করিম, মিজান, বালাম—এরপর বর্তমান লাইনআপে পলাশ।
প্রথমেই বলেছি, বাংলাদেশে অনেক জনপ্রিয় ব্যান্ড আছে, কিন্তু জনপ্রিয়তা আর প্রভাব এক জিনিস নয়। ওয়ারফেজের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত নতুন জনরাকে বাংলার সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করাকে। আজ বাংলাদেশের মেটাল ও প্রগ্রেসিভ রক অঙ্গনের অসংখ্য ব্যান্ডের সাউন্ড, দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা মিউজিক্যাল জার্নির ভেতরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ওয়ারফেজের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। কয়েক দশক ধরে তাদের ছায়ায় বিকশিত হয়েছে অসংখ্য নতুন ব্যান্ড।
এসব নানাবিধ কারণ মিলেই চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও ওয়ারফেজকে ঘিরে আলোচনা থেমে নেই। নতুন অ্যালবাম প্রকাশের দীর্ঘ বিরতি সত্ত্বেও তাদের গান নতুন শ্রোতা খুঁজে পায়, পুরোনো শ্রোতারা ফিরে যায় নস্টালজিয়ায়। দেশ-বিদেশের কনসার্টে ব্যান্ডটির সরব উপস্থিতি আজও প্রমাণ করে, আজও তারা প্রাসঙ্গিক। সুরের এই মিছিল অনাদিকাল এভাবেই বেজে চলুক, সেটিই নতুন দিনের বাংলা গানের শ্রোতাদের প্রত্যাশা।

বাংলাদেশে ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাসে বেশকিছু জনপ্রিয় ব্যান্ড এসেছে। কেউ শ্রোতাপ্রিয় গান উপহার দিয়েছে, কেউ স্টেজে দর্শকদের মাত করেছে, আবার কেউ নতুন জনরাকে পরিচিত করেছে প্রজন্মের কাছে। কিন্তু ওয়ারফেজের গুরুত্ব বা ওজনটা একেবারে অন্য জায়গায়। দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর ধরে তারা বাংলা রক-মেটালের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে মেটাল, প্রগ্রেসিভ রক কিংবা হার্ড রকের যে বৈচিত্র্যময় চর্চা আমরা দেখছি, তার শক্ত ভিত্তি তৈরিতে ওয়ারফেজের অবদানকে স্বীকার না করার কোনো উপায় নেই। নতুন জনরাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা, স্থায়ী শ্রোতাভিত্তি তৈরি করা আর পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য ব্যান্ডকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে ব্যান্ডটির ভূমিকা প্রায় অগ্রদূতের মতো। আর তাই বাংলাদেশের চেনা সাংস্কৃতিক গণ্ডিকে কিছুটা ধাক্কা দিয়ে চলতি বছরেই ব্যান্ডটি পেয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’।
আশির দশকে দুনিয়াজুড়ে যখন রক ও মেটালের প্রবল ঢেউ, তখন ঢাকায় ‘ওয়েভস’ ব্যান্ডের হাত ধরে ঢাকায় হেভি মেটালের প্রাথমিক পদধ্বনি শোনা যায়। ১৯৮৪ সালের ৬ জুন থেকে যাত্রা শুরু করা ‘ওয়ারফেজ’ও সেই স্রোতেরই অংশ ছিল। শুরুতে ইংরেজি গান কাভার করাটাই ছিল তাদের জগৎ। এসি/ডিসি, ব্ল্যাক সাবাথ কিংবা লেড জেপলিনের গানগুলোই ছিল তাদের প্রাথমিক অনুপ্রেরণা। তবে সেই সময় বাংলা হেভি মেটাল করার ভাবনাটা খুব একটা মাথায় ছিল না।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তৎকালীন বামবার সভাপতি ও ব্যান্ড তারকা মাকসুদুল হকের (ম্যাক হক) আহ্বানে বাংলা গানে থিতু হওয়ার সেই কঠিন চ্যালেঞ্জটি ওয়ারফেজ গ্রহণ করে। নিজস্ব ভাণ্ডারে থাকা গানগুলো নিয়েই ১৯৯১ সালে প্রকাশ করে বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ হেভি মেটাল অ্যালবাম ‘ওয়ারফেজ’। গানগুলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। স্কুল-কলেজের কিশোর-তরুণরা সানন্দে গ্রহণ করে এই নতুন ধারার সংগীতকে, আর সেখান থেকেই বাংলা হার্ড রক ও হেভি মেটাল পায় নতুন ভাষা।
এরপর শুরু হয় ওয়ারফেজের দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল যাত্রা। এ পর্যন্ত ব্যান্ডটি প্রকাশ করেছে আটটি অ্যালবাম। সর্বশেষ স্টুডিও অ্যালবাম ‘সত্য’ বের হয় ২০১২ সালে। এর বাইরে বিভিন্ন সময়ে সিঙ্গেল প্রকাশের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি মিক্সড ও কম্পাইলেশন অ্যালবামেও প্রকাশ পেয়েছে ওয়ারফেজের গান। সর্বশেষ ২০২৪ সালে কোক স্টুডিও বাংলায় নতুন করে প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটির আইকনিক গান ‘অবাক ভালোবাসা’।
এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, ওয়ারফেজ কেন আলাদা? কেউ বলবেন সাউন্ড, কেউ লিরিক, কেউ আবার গিটার ওয়ার্কের কথা বলবেন। আসলে ওয়ারফেজকে অনন্য করে তোলে তাদের মিউজিকের স্থাপত্য। এখানে প্রথম যে বিষয়টি নজর কাড়ে, তা হলো স্তরবিন্যাস। প্রতিটি গানে রিফ, লিড গিটার, বেজ, কীবোর্ড এবং ড্রামস—প্রতিটি ইন্সট্রুমেন্টের আলাদা এবং সুনির্দিষ্ট ভূমিকা থাকে। অনেক ব্যান্ডের গান ভোকালনির্ভর। কিন্তু ওয়ারফেজের গানে ভোকাল গানটির একটি অংশ মাত্র; ইনস্ট্রুমেন্ট সমানভাবে ভাইব্র্যান্ট।
উদাহরণ হিসেবে ‘অবাক ভালোবাসা’ গানটির কথা বলা যায়। প্রায় নয় মিনিট দীর্ঘ এই গানটির প্রতিটি মুহূর্ত প্রয়োজনীয়। গানের শুরুতে দীর্ঘ ইন্সট্রুমেন্টাল অংশ, গিটার সলো এবং ‘নাটকীয়তা’ নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত সাউন্ড ডিজাইন এক বিশেষ আবহে শ্রোতাকে নিয়ে যায়। ওয়ারফেজের মিউজিকের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ডাইনামিক্স বা ওঠানামা। ‘অসামাজিক’, ‘পূর্ণতা’ বা ‘সত্য’-এর মতো গানগুলোতে তা স্পষ্ট। পশ্চিমা প্রগ্রেসিভ রক ও মেটালের এই ড্রামাটিক ক্যারেক্টারকে তারা বাংলা গানে দারুণভাবে প্রয়োগ করেছে।
বাংলাদেশের সমীহজাগানিয়া গিটারিস্ট, ওয়ারফেজের মিউজিকের অন্যতম স্তম্ভ ইব্রাহিম আহমেদ কমলের বাজানোর দিকে তাকালে দেখা যায়, একদিকে সেখানে বিশ্বের কিংবদন্তি সব গিটারিস্টদের প্রভাব, অন্যদিকে বাংলার নিজস্ব মেলোডিক সংবেদনশীলতা। ফলে সাউন্ড হেভি হলেও তা কখনোই আপামর শ্রোতার কাছেও মিউজিক্যালি দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে না।

ব্যান্ডের ড্রামার ও দলনেতা শেখ মনিরুল আলম টিপুর ড্রামিংয়ের কথা আলাদা করে বলতে হয়। ড্রামসকে তিনি বানিয়েছেন মেলোডির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা ব্যান্ড ডাবল বেস ড্রামস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ওয়ারফেজ ছিল পথিকৃৎ। মূলত, ওয়ারফেজে যাঁরা বাজিয়েছেন কিংবা বাজাচ্ছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মিউজিক্যালি সেরাটা দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। সবার নাম আলাদা করে বললাম না। তাঁদের সবার সাউন্ডের এই ‘কমপ্যাক্টনেস’ বা নিরেট বুননই ব্যান্ডের স্বকীয়তার চাবিকাঠি।
তবে ওয়ারফেজের অন্যতম শক্তি তাদের লিরিক। নব্বইয়ের দশকে যখন ব্যান্ডের লিরিক মানেই ছিল অনেকাংশে প্রেম, বিচ্ছেদ ও আবেগের আতিশয্য, তখন ওয়ারফেজ প্রেমের গানেও এনেছিল ভিন্নতা। ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা সমান গুরুত্ব পেয়েছিল সেখানে। ‘একটি ছেলে’ যেমন নিঃসঙ্গতা ও আত্মপরিচয়ের গল্প বলে, তেমনি ‘অসামাজিক’ বা ‘ধূসর মানচিত্র’ সমাজ ও সময়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। লিরিকের প্যাটার্নের কারণে সফট থেকে হেভি—সব ধরণের গানই শ্রোতারা পচ্ছন্দ করেছে।
ওয়ারফেজের লিরিকের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো কাব্যিকতা। এই কাব্যিক বুননই গানকে কনসার্টে গলা মিলিয়ে গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গভীর রাতে একা বসে শোনার মতো নিভৃত সঙ্গী করে তুলেছে। তারা গান বেঁধেছে বিচ্ছেদে ভেঙে পড়া মানুষের জন্য, আবার জীবনের মানে খোঁজা দিশেহারা কিশোর-কিশোরীদের জন্যও। অর্থাৎ সবার জন্যই এখানে কিছু না কিছু আছে।
মিউজিক্যালি এক্সপেরিমেন্ট করা আর ক্রমাগত নিজেদের ভেঙে নতুন কিছু করা তাদের সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ। অনেক ব্যান্ড নিজেদের সাউন্ড খুঁজে পাওয়ার পর সেটিকেই বারবার পুনরাবৃত্তি করে। ওয়ারফেজ তা করেনি। মোটাদাগে তাদের সাউন্ড বদলেছে। তবে মূলটা না বদলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছরের পথচলায় বহু ভাঙা-গড়ার মুখোমুখি হয়েও ব্যান্ডটির টিকে থাকার রেখা ছিল আশ্চর্য রকমের স্থির। এখানে কৃতিত্ব দিতে হয় দলনেতা টিপুকে। ওয়ারফেজ খারাপ সময় মোকাবিলা করতে জানে। যখন তাদের ভোকালিস্ট চলে গেছে, তারা নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের ব্যান্ড-সিনে এমন দৃশ্য বিরল। সঞ্জয়, বাবনা করিম, মিজান, বালাম—এরপর বর্তমান লাইনআপে পলাশ।
প্রথমেই বলেছি, বাংলাদেশে অনেক জনপ্রিয় ব্যান্ড আছে, কিন্তু জনপ্রিয়তা আর প্রভাব এক জিনিস নয়। ওয়ারফেজের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত নতুন জনরাকে বাংলার সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করাকে। আজ বাংলাদেশের মেটাল ও প্রগ্রেসিভ রক অঙ্গনের অসংখ্য ব্যান্ডের সাউন্ড, দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা মিউজিক্যাল জার্নির ভেতরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ওয়ারফেজের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। কয়েক দশক ধরে তাদের ছায়ায় বিকশিত হয়েছে অসংখ্য নতুন ব্যান্ড।
এসব নানাবিধ কারণ মিলেই চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও ওয়ারফেজকে ঘিরে আলোচনা থেমে নেই। নতুন অ্যালবাম প্রকাশের দীর্ঘ বিরতি সত্ত্বেও তাদের গান নতুন শ্রোতা খুঁজে পায়, পুরোনো শ্রোতারা ফিরে যায় নস্টালজিয়ায়। দেশ-বিদেশের কনসার্টে ব্যান্ডটির সরব উপস্থিতি আজও প্রমাণ করে, আজও তারা প্রাসঙ্গিক। সুরের এই মিছিল অনাদিকাল এভাবেই বেজে চলুক, সেটিই নতুন দিনের বাংলা গানের শ্রোতাদের প্রত্যাশা।

বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছিল জটিল, বহুমাত্রিক ও ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়ায়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী এই আধুনিকতার বিস্তার ও বিকাশের মূল ধাপ হিসেবে পরিচিত। আধুনিক বাঙালির মনন ও সামাজিক চেতনার ভিত্তি স্থাপন করে বাংলার নবজাগরণ বা রেনেসাঁস।
৫ ঘণ্টা আগে
২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ভুভুজেলা নিষিদ্ধ করেছে ফিফা। সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন আচরণবিধি অনুযায়ী, শুধু ভুভুজেলা নয়, যেকোনো ধরনের বাঁশি, এয়ার হর্ন বা অতিরিক্ত শব্দ তৈরি করে এমন ডিভাইস স্টেডিয়ামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৬ ঘণ্টা আগে
আজ রকসম্রাট আজম খানের মৃত্যুদিন। বাংলা গানের প্রথা ভাঙা বিপ্লবী আজম খান কেন বেছে নিয়েছিলেন রকের রুক্ষ পথ? সুরের জগতের সেই ‘ঝাঁকি’ আর ‘দোলা’ কি কেবল বিনোদন ছিল, নাকি যুদ্ধফেরত তরুণদের অস্তিত্ব রক্ষার আর্তনাদ?
১ দিন আগে
মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যা
১ দিন আগে