আজম খান কেন ‘ঝাঁকি আর দোলা’ বেছে নিলেন

আজ রকসম্রাট আজম খানের মৃত্যুদিন। বাংলা গানের প্রথা ভাঙা বিপ্লবী আজম খান কেন বেছে নিয়েছিলেন রকের রুক্ষ পথ? সুরের জগতের সেই ‘ঝাঁকি’ আর ‘দোলা’ কি কেবল বিনোদন ছিল, নাকি যুদ্ধফেরত তরুণদের অস্তিত্ব রক্ষার আর্তনাদ?

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১৯: ৫৪
আজম খান। স্ট্রিম গ্রাফিক

একসময় বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতকে ‘অপসংস্কৃতি’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার সামাজিক প্রবণতা ছিল। বিশেষ করে তথাকথিত ‘স্ট্যাবলিশমেন্ট’ ও প্রজন্মগত কর্তৃত্বের চোখে রক ছিল ‘রকারদের’ উচ্ছৃঙ্খলতার নাম। সেই সময়ে আজম খান যে রক-বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, তা ছিল অকল্পনীয়। প্রশ্ন জাগে, কেন তিনি বহু বছরের চেনা সাংস্কৃতিক বলয় ছেড়ে নতুন দিনের বাংলা গানের পথে হাঁটলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই মনে রাখতে হবে, আজম খানের গানের লাইনে আসা ছিল এক প্রকারের ‘অগ্নিস্নানের’ মতো। তাঁর বেড়ে ওঠা ঢাকার আজিমপুর, কমলাপুর আর খিলগাঁওয়ের অলিগলিতে। সেই ঢাকার আকাশ ছিল আজকের মতো অতটা কৃত্রিম ছিল না। শৈশবে আবদুল আলিম, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা শ্যামল মিত্রের গান শুনে বড় হওয়া আজমের জীবনে কোনো প্রথাগত সংগীত শিক্ষা ছিল না। শাস্ত্রীয় তালিম বা সুরতত্ত্বের চর্চা ছাড়াই তিনি সংগীতকে গ্রহণ করেছিলেন জীবন ও বাস্তবতার অভিজ্ঞতা থেকে। পরবর্তী সময়ে এই অপ্রাতিষ্ঠানিকতাই বড় শক্তিতে পরিণত হয়।

ষাটের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা আজম খানের চেতনা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈষম্য ও শোষণ অল্প বয়সেই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে। এই উপলব্ধি থেকেই যুক্ত হন ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’র সঙ্গে এবং গণসংগীত গাইতে শুরু করেন।

মুক্তিযোদ্ধা আজম খান। সংগৃহীত ছবি
মুক্তিযোদ্ধা আজম খান। সংগৃহীত ছবি

এরপর আসে সাল ১৯৭১। আজম খান পরিণত হন গেরিলা যোদ্ধায়। সেকশন কমান্ডার হিসেবে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। আবার ক্যাম্পে ক্যাম্পে গানও গেয়েছেন, উজ্জীবিত করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের।

স্বাধীনতার পর ঢাকায় ফিরে আজম খান যে বাস্তবতার মুখোমুখি হলেন, তা ছিল স্বপ্ন ও বাস্তবতার নির্মম সংঘর্ষ। যুদ্ধজয়ের উচ্ছ্বাসের জায়গায় দ্রুত ভর করতে শুরু করেছিল অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং তরুণ প্রজন্মের হতাশা। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফেরা অসংখ্য তরুণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছিলেন। আজম খান অনুভব করলেন, এই নতুন বাস্তবতার জন্য নতুন ধরনের সংগীত প্রয়োজন। যা ভেতরের জমাটবাঁধা ক্ষোভ, হতাশা আর অদম্য জেদকে নাড়িয়ে দিতে পারে। শুরু করলেন বাংলা রক।

কিন্তু আজম খান কেন এই নতুন ধারার সংগীত বেছে নিলেন? এর পেছনে ছিল সময় ও সমাজ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ। তখন বিশ্বজুড়ে ‘বিটলস’ তরুণ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক কল্পনাকে বদলে দিচ্ছে। আবার পপের হাওয়াও বইতে শুরু করেছে। পাশাপাশি রোলিং স্টোনস, শ্যাডোসসহ বিভিন্ন ব্যান্ড নতুন সংগীত-ভাষা নির্মাণ করছে। তিনি ভাবলেন, ‘বিটলস’-এর মতো একটা ব্যান্ড যদি বাংলাদেশে তৈরি করা যেত! মূলত তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন বিটলসের জর্জ হ্যারিসনকে দেখে। হ্যারিসনের গাওয়া ‘বাংলাদেশ’ গানটি সবসময় গাইতেন। তাঁকে দেখেই চুল বড় রাখতেও শুরু করেছিলেন।

১৯৭৩ সালে প্রকাশিত আজম খানের এলপি। ছবি : মিলু আমানের সৌজন্যে
১৯৭৩ সালে প্রকাশিত আজম খানের এলপি। ছবি : মিলু আমানের সৌজন্যে

অন্যদিকে, স্বাধীনতার আগে ঢাকায় ৯টি ব্যান্ড সক্রিয় ছিল। কিন্তু তারা বাংলা ভাষায় গান গাইত না। শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষার জনপ্রিয় গানগুলি কভার করত। ফলে পশ্চিমা সংগীতের কাঠামো ছিল, কিন্তু বাংলার অভিজ্ঞতা সেখানে অনুপস্থিত। আজম খান এই শূন্যতাটিই ধরতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, পাশ্চাত্য সংগীতের শক্তিশালী সাউন্ডের সঙ্গে যদি বাংলা ভাষা, বাংলা সমাজ এবং বাঙালির জীবনযাপনের গল্প যুক্ত করা যায়, তবে সেটি সম্পূর্ণ নতুন সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতে রূপ নেবে।

আজম খান এই ব্যান্ডগুলোকে শুনেছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের চাম্বেলি রুমে। তখন যারা ব্যান্ডে বাজাতেন, আজম খান সবাইকে চিনতেন। ফলে সহজেই ব্যান্ড তৈরি করতে পেরেছিলেন। এভাবেই তাঁর হাত ধরে ‘বিদেশি ফর্ম’ দিয়ে ‘স্থানীয় বাস্তবতার’ কথা বলা সম্ভব হলো। এই মিশ্রণকেই ‘বাংলা পপ’ ও ‘বাংলা রক’-এর বীজ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

আজম খানের গায়কিতে ছিল অদ্ভুত তেজ। এমন হৃদয় দিয়ে গাইতে পারা আর্টিস্ট খুব কমই আছেন। প্রথাগত গায়কির শুদ্ধতার ধার ধারতেন না। তিনি নিজে বলতেন, ‘আমি আসলে গায়ক না, জেদের বশে এই লাইনে আসা।’ তাঁর এই ‘গায়ক না হওয়াটাই’ তাঁর বড় শক্তি হয়ে দাঁড়াল। প্রথাগত শাস্ত্রীয় বা পরিশীলিত সংগীতে সুরকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তিনি তা করেননি। বরং উচ্চকিত কণ্ঠকে ব্যবহার করেছিলেন সুরের বিধ্বংসী উন্মাদনায়। গিটারের জ্যামিং, ড্রামসের বিট আর কণ্ঠের তীব্রতা মিলে যে সাউন্ড তৈরি করতেন, তাকে তিনি বলতেন ‘ঝাঁকি’ আর ‘দোলা’। মানে বাংলা রক অ্যান্ড রোল।

বাংলা গানে নতুন ‘ভাষা-রীতি’ আনা বাংলা ঝাঁকির (পড়ুন বাংলা রকের) প্রথম স্তর। মানে লিরিকের ঝাঁকি। ‘আলাল ও দুলাল’ গানে পুরান ঢাকার লোকচিত্র, ব্যঙ্গ-রস, পাড়ার কথকতা সব একসঙ্গে দেখা যায়। আবার এক অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি উঠে আসে ‘হাইকোর্টের মাজারে’র মতো গানে, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও সমাজ-সমালোচনা এক ফ্রেমে থাকে।

আজম খান। সংগৃহীত ছবি
আজম খান। সংগৃহীত ছবি

এরপর হলো বিষয়বস্তুর ঝাঁকি। এখানে পৌঁছলেই আজম খানের ‘সিরিয়াস ব্যাপার’ সবচেয়ে তীব্রভাবে ধরা পড়ে। যেমন তাঁর রেল লাইনের ওই বস্তিতে ১৯৭০-এর দশকের দুর্ভিক্ষ, নগরের প্রান্তিক মানুষের মৃত্যুবোধ এবং স্বাধীন দেশের স্বপ্নভঙ্গের এক সংগীত-দলিল।

আজম খানের দ্রুত আইকনে পরিণত হওয়ার আরেকটি বড় কারণ ছিল গায়কির মধ্যে থাকা ‘পূর্ববঙ্গের টান’। দেশভাগের পর কলকাতার সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ফলে ঢাকার শিল্পীরা অনেকটা কলকাতার গায়নভঙ্গিকে অনুকরণ করতে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু আজম খানের কণ্ঠে ছিল অকৃত্রিম ঢাকাইয়া ও দেশজ টান। কোনো পরিশীলনের তোয়াক্কা না করে, অনেকটা ‘গাইতে গাইতে গায়েন’ হয়ে ওঠা আজম খান যখন গাইতেন, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের খুব কাছের একজন মানুষকে খুঁজে পেত।

আজম খানকে তাই ইতিহাসে ‘দুই যুদ্ধের মানুষ’ হিসেবে দেখা যায়। প্রথম যুদ্ধ অস্ত্র হাতে ১৯৭১ সালে, আর দ্বিতীয় যুদ্ধ স্বাধীনতার পর নতুন ধারার সংগীত-ভাষার মুক্তি ঘটানো। তাঁর এই দ্বিতীয় যুদ্ধের নামই ছিল বাংলা রক বা বাংলা ‘ঝাঁকি’।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত