পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন

হিন্দুভোটের দখলদার কে?

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১০: ৪৫
ছবি: ইনস্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া

একদিকে ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ আর অন্যদিকে ‘মোদি এলে মাছ-ভাত খাওয়া ঘুচে যাবে’— এই দুয়ের মধ্যে বাঙালি হিন্দুরা পড়েছে মহাবিপদে। আর তার চেয়েও বেশি বিপদে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গবাসীর রাজনৈতিক বিশ্লেষক সত্তা, যারা সকালে চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে শুরু করে দুপুরের সেলুনের আড্ডা এবং সন্ধ্যার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় অনুমান করতে ব্যস্ত থাকে— কোন দল কত আসনে জিতবে? কত ব্যবধানে জিতবে? কোন কেন্দ্রে কে জিতবে? ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মোদ্দা কথা হলো, তাঁরা পড়েছেন মহা বিপদে। কিছুতেই বুঝতে পারেন না, কে জিতবে? হিন্দু ভোটের দখলদার কে?

একসময় মনে করা হতো, বিজেপিই বুঝি এই ভোটব্যাংকের আসল মালিক। কিন্তু সিএসডিএস-লোকনীতির পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে, হিন্দু ভোটে একাধিপত্য এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং এটি এখন গভীর ও জটিল এক সমীকরণে বিভক্ত।

​পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই হিন্দু। অন্যদিকে মুসলিম ভোটার প্রায় ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ। গত কয়েকটি নির্বাচনের তথ্য বলছে, মুসলিম ভোটের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ) নিরঙ্কুশভাবে তৃণমূলের দিকে থেকেছে। এই পরিস্থিতিতে জয়ের পাল্লা ভারী করতে হিন্দু ভোটব্যাংকই হয়ে উঠেছে আসল তুরুপের তাস। যে দল এই বড় অংশের মন জিততে পারবে, নবান্নের চাবিকাঠি তার হাতেই থাকবে।

সিডিএস-লোকনীতি সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১৯ থেকে শুরু করে প্রতিটি বড় নির্বাচনে মুসলিম ভোটের ৭০–৭৫ শতাংশ প্রায় নির্দিষ্টভাবে তৃণমূলের পক্ষে থেকে যায়। ফলে রাজনৈতিক লড়াইয়ের মূল যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় হিন্দু ভোটের ওপর—কে হিন্দু ভোটের কতটা অংশ নিজের দিকে রাখতে পারবে, আর কে কতটা টানতে পারবে।

২০১৯ লোকসভা: এই সময় এক অভূতপূর্ব জাতীয় মেরুকরণ ও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা দেখেছিল পশ্চিমবঙ্গ। হিন্দু ভোটের প্রায় ৫৭ শতাংশ একচ্ছত্রভাবে গিয়েছিল বিজেপির ঝুলিতে। তৃণমূল প্রায় ৩৬–৩৮ শতাংশ, বাম/কংগ্রেস প্রায় ৮–১১ শতাংশ।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রায় ৫৭ শতাংশ, ওবিসির প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং তফসিলি জাতির অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৬১ শতাংশ ভোটার ভোট দেয় বিজেপিকে। অর্থাৎ এই তিনটি গোষ্ঠীতেই বিজেপির সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। ফলে প্রায় প্রতিটি হিন্দু জাতিগোষ্ঠীই ২০১৯‑এ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছিল। এই তরঙ্গের জোরে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ১৮টি আসন পায়, মোট ভোট কাস্ট হয় প্রায় ৪০ শতাংশ। এই সময়ে বিজেপি হিন্দু ভোটের আসল দখলদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

২০২১ ও ২০২৪: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা পাল্টাতে শুরু করে। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে বিজেপির হিন্দু ভোট কমে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। আর ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪৫-৫০ শতাংশে। অন্য দিকে, তৃণমূল ক্রমে হিন্দু ভোটের দখল বাড়াতে শুরু করে (৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৯ শতাংশ এবং ২০২৪-এ প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ)।

বাম/কংগ্রেস ও বিকল্প দলগুলো এই তিন নির্বাচনেই প্রায় ৮–১১ শতাংশ হিন্দু ভোট পেয়েছিল।

​বিজেপি এবং তৃণমূল— দুই দলেরই কৌশল কিন্তু পুরোপুরি আলাদা।

​বিজেপি মূলত ধর্মীয় মেরুকরণ এবং উগ্র প্রচারের ওপর ভরসা করে। তাদের দাবি, তারাই হিন্দুদের আসল রক্ষাকর্তা। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী এবং দক্ষিণবঙ্গের মতুয়া বা নমঃশূদ্রদের মতো প্রান্তিক হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিজেপির প্রভাব এখনো যথেষ্ট।

​তৃণমূল এই মেরুকরণকে আটকাতে ‘বাঙালি আবেগ’, ‘স্থানীয় পরিচিতি’ এবং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তারা বোঝাতে চেয়েছে, ধর্মের চেয়েও মানুষের পেটের টান আর আঞ্চলিক পরিচয় বেশি জরুরি।

​তথ্য বলছে, হিন্দু ভোট আসলে জাতি এবং ভৌগোলিক অবস্থানে বিভক্ত। প্রায় ৫৮ শতাংশ ​উচ্চবর্ণ এখনো বিজেপির প্রতি বেশি অনুগত।

​তৃণমূলের তুরুপের তাস হলো পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোটাররা। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ এবং অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের কল্যাণে হিন্দু নারীদের একটি বড় অংশ এখন ঘাসফুল শিবিরের দিকে ঝুঁকেছে। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে তৃণমূল জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করেছে। ওবিসি এবং তফসিলি জাতিগুলোর মধ্যে ২০১৯-এ বিজেপির যে দাপট ছিল, বর্তমানে তৃণমূল সেখানে বেশ খানিকটা ভাগ বসাতে সক্ষম হয়েছে।

​তৃণমূল কংগ্রেস ২০২৪-এ যে ২৯টি আসন পেয়েছে, তার হিসেবটা খুব সহজ। মুসলিম ভোটের সিংহভাগ (৭০-৭৩ শতাংশ) তো তাদের পাশে ছিলই, তার সঙ্গে হিন্দু ভোটের প্রায় ৪২-৪৫ শতাংশ যুক্ত হওয়ায় এমন এক ‘দুর্গ’ তৈরি হয়েছে যা ভাঙা বিজেপির পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু নারীদের সমর্থন প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তৃণমূলের জন্য জয়কে সহজ করে দিয়েছে।

এই সংখ্যাগুলো বলে, ২০১৯‑এ বিজেপি হিন্দু ভোটে এক লাফে এগিয়ে গিয়েছিল; কিন্তু পরের দুটি নির্বাচনে তৃণমূল হিন্দু ভোটের বড় অংশ পুনরুদ্ধার করেছে। ফলে হিন্দু ভোটের ওপর বিজেপির আগের মতো আর একচেটিয়া দখল নেই; তৃণমূলও এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাগ দখল করে বসে রয়েছে। তার মানে হিন্দু ভোটের দখলদার কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তর হবে—একক দল নয়, বরং বিজেপি আর তৃণমূল দুই দলের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছে। একদিকে বিজেপি যেমন হিন্দু ধর্মের আবেগ এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্য দিকে তৃণমূল কংগ্রেস ‘বাঙালি পরিচিতি’ এবং ‘সরকারি সুবিধা’ দিয়ে সেই ভোটব্যাংকে বড়সড় থাবা বসাচ্ছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত