প্রায় চার দশক ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর রাজনীতিকে একটি মাত্র ধারণার ওপর দাঁড় করিয়েছেন। সেটি হচ্ছে, ইরান ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি, এবং কেবল তিনিই সেই হুমকির মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জেরুজালেমে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে তিনি বলেন, ‘যদি আমরা এখনই পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ না করি, তাহলে এটি অপ্রতিরোধ্য হয়ে যাবে।’
যে যুদ্ধের জন্য তিনি প্রায় চার দশক ধরে আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রস্তুতি নিয়েছেন—অবশেষে সেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি।
ধারণা করা হয়েছিল, যুদ্ধটি হবে সংক্ষিপ্ত, সিদ্ধান্তমূলক এবং নেতানিয়াহুর ন্যায্যতা প্রমাণের সময়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইসরায়েল নিজেকে এমন এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে, যা তারা সবসময়ই এড়াতে চেয়েছে। এরকম দীর্ঘস্থায়ী একটি যুদ্ধের বিষয়ে তাকে আগেই সতর্ক করেছিলেন তাঁর জেনারেলরা। একই সঙ্গে ইসরায়েলি জনগণও এই যুদ্ধের প্রতিবাদ করতে শুরু করেছে।
তেহরানের সরকারকে উৎখাত করবে এমন এক রক্তপাতহীন, নিখুঁত সামরিক হামলার কল্পনা কঠিন বাস্তবতার মুখে ভেঙে পড়েছে।
ট্রাম্পের হিসাব: সমঝোতা নাকি সরে দাঁড়ানো
তবে এই ভুল হিসাবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জেরুজালেম ও ওয়াশিংটনের মধ্যে তৈরি হওয়া বিভাজন।
চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষকেরা বরাবরই বলে আসছেন, রাজনীতি কখনোই আদর্শের প্রশ্ন নয়; এটি মূলত ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয়। তারা বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের চেয়ে চুক্তিই বেশি কার্যকর। আমেরিকান স্থলবাহিনী পাঠানো বা মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ট্রাম্পের জন্য লাভজনক হবে না।
তাই ট্রাম্প যদি যুদ্ধ শেষের ঘোষণা দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যেতে চান, তাহলে পুরো দায়ভারই পড়বে নেতানিয়াহুর ওপর। তাঁকে তখন একাই পরিস্থিতি সামলাতে হবে। কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, সামরিকভাবে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে এবং রাজনৈতিকভাবে তিনি ঝুঁকিতে থাকবেন, যা তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টিকে থাকার দক্ষতাকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
ইরানের সামরিক স্থিতিস্থাপকতা
যুদ্ধের সামরিক হিসাব সবসময়ই যুদ্ধের পরিকল্পনাকারীরা যতটা স্বীকার করতে চেয়েছিলেন তার চেয়ে বেশি কঠিন ছিল।
বিশ্বের সামরিক শক্তির তালিকায় ইরানের অবস্থান ১৬তম, ইসরায়েলের ঠিক এক ধাপ নিচে। তবে ইরানের আসল শক্তি অন্য জায়গায়—অসম যুদ্ধ কৌশল, এবং ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে তৈরি করা তাদের বিস্তৃত আঞ্চলিক মিলিশিয়া নেটওয়ার্ক।
এর সঙ্গে রয়েছে তাদের উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি, যা তারা বহু বছর ধরে প্রক্সি যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় উন্নত করেছে।
ইসরায়েলেরও উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে। যেমন আকাশে আধিপত্য, উন্নত গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তারা। কিন্তু এই সুবিধাগুলো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ জেতার জন্য যথেষ্ট নয়।
ইরানের স্থিতিস্থাপকতা ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের সহজ বিজয়ের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও ইরানের শাসনব্যবস্থার ক্ষমতা ও দক্ষতা ইসরায়েলের দ্রুত বিজয়কে অসম্ভব করে তুলেছে।
অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে—এবং তা ধীরে নয়, খুব দ্রুত।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতার কারণে বিশ্লেষকেরা ইতিমধ্যেই মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন।
এই সংখ্যাগুলো যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম, ইউরোপে হিটিং অয়েলের খরচ এবং এমন অনেক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে যাদের এই সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
ট্রাম্পের জন্য এটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কারণ তিনি তাঁর প্রেসিডেন্সির সাফল্য অনেকটাই অর্থনৈতিক অর্জনের ওপর নির্ভর করে দেখাতে চান এবং ইতিমধ্যেই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন জনগণের সমর্থন ধরে রাখতে চান।
নেতানিয়াহুর জন্য এটি এমন একটি পরিণতি যা এড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়।
বাস্তব সময়ে একটি নৈতিক নাটক
অপারেশনাল ব্রিফিংগুলো বাদ দিলে এই ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত দুই নেতার বিশাল অহংকারের গল্প হয়ে দাঁড়ায়—যারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনের কারণে একটি ঐতিহাসিক সংকট তৈরি করেছেন।
নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন ক্ষমতা ধরে রাখতে, তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে, এবং সর্বোপরি নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে। তিনি পদক্ষেপ চেয়েছিলেন—কিন্তু এর ফলাফল হয়েছে স্থবিরতা। বোমা পড়েছে, তেলের দাম বেড়েছে।
তিনি বহুদিন ধরে ইরান সম্পর্কে সতর্কতা জানিয়েছেন, যুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছেন এবং পরিস্থিতিকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছেন।
ট্রাম্প হয়তো বিজয় ঘোষণা করে অন্য কোনো চুক্তির দিকে এগিয়ে যাবেন। আর নেতানিয়াহু হয়তো সেই যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ করবেন, যেটিকে যুদ্ধের শুরুতে তিনি অবজ্ঞা করেছিলেন।
ভেঙে পড়া এক জুয়া
নেতানিয়াহুর সারাজীবনের ইরান-বিরোধী মনোভাব এখন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে এবং ফলাফল সুখকর নয়।
ট্রাম্পের বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা, ইরানের শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থার মতো কঠিন বাস্তবতার সামনে নেতানিয়াহু তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে হুমকির মুখে পড়তে পারেন।
এই সংঘাত হওয়ার কথা ছিল নেতানিয়াহুর জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে এটি হতে পারে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। যারা অবসেশনকে প্রজ্ঞা বলে ভুল করে, ইতিহাস সাধারণত সেই নেতাদের প্রতি সদয় হয় না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা