সমুদ্রতলের মানচিত্র আঁকছে চীন, খনিজ অনুসন্ধান নাকি রণকৌশল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

এখন যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে সমুদ্রের কয়েক হাজার ফুট গভীরে। গ্রাফিক: এআই দিয়ে তৈরি।

বিশ্বের বিশাল মহাসাগরগুলোর উপরিভাগ নিয়ে লড়াই দীর্ঘদিনের। কিন্তু এখন যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে সমুদ্রের কয়েক হাজার ফুট গভীরে। নেপথ্যে রয়েছে চীন। কয়েক ডজন গবেষণা জাহাজ ব্যবহার করে বেইজিং এখন বিশ্বের কৌশলগত জলপথগুলোর তলদেশের মানচিত্র তৈরি করছে। রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য ‘সাবমেরিন যুদ্ধে’ আধিপত্য বিস্তার করা।

কেন এই মানচিত্র এত গুরুত্বপূর্ণ?
সহজভাবে বলতে গেলে, সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ যখন সমুদ্রের গভীরে চলাচল করে, তখন সেটি অনেকটা অন্ধের মতো চলে। এর একমাত্র ভরসা হলো ‘সোনার’ বা শব্দের প্রতিধ্বনি। সমুদ্রতলের ভূপ্রকৃতি, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং স্রোতের গতিবেগের ওপর ভিত্তি করে এই শব্দের চলাচলের ধরন বদলে যায়।

চীন যদি আগে থেকেই সমুদ্রতলের বিস্তারিত মানচিত্র এবং পানির রাসায়নিক ও ভৌত অবস্থা সম্পর্কে জানে, তবে তাদের সাবমেরিনগুলো খুব সহজে পাহাড় বা খাদে লুকিয়ে থাকতে পারবে। একইসঙ্গে তারা মার্কিন সাবমেরিনগুলোর অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারবে। কয়েক দশক ধরে সমুদ্রতলের এই জ্ঞানভাণ্ডারে আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, যা এখন চীনের কারণে হুমকির মুখে।

কৌশলগত অঞ্চল: যেখানে চীনের নজর বেশি
চীনের এই ম্যাপিং কার্যক্রম কেবল তাদের উপকূলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। তারা প্রশান্ত, ভারত ও উত্তর মহাসাগরের (আর্কটিক) বিশাল এলাকা চষে বেড়াচ্ছে।

  • ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন: জাপান থেকে শুরু করে তাইওয়ান হয়ে বোর্নিও পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলটি চীনের জন্য একটি প্রাকৃতিক দেয়াল। চীন চায় এই দেয়াল ভেঙে উন্মুক্ত সমুদ্রে সাবমেরিন নিয়ে বেরিয়ে আসতে।
  • গুয়াম ও হাওয়াই: এখানে আমেরিকার শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি ও সাবমেরিন স্টেশন রয়েছে। চীনের ‘দং ফাং হং ৩’-এর মতো জাহাজগুলো এই অঞ্চলের আশেপাশে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ করছে।
  • মালাক্কা প্রণালি: চীনের জ্বালানি আমদানির প্রধান পথ। ভারত মহাসাগরের এই জলপথের তলদেশ খুঁটিয়ে দেখছে বেইজিং, যাতে সংকটের সময় নিজের সরবরাহ নিশ্চিত ও শত্রুকে রুখে দেওয়া যায়।

শানডং প্রদেশের কিংদাও বন্দরে নোঙর করা গবেষণা জাহাজ ‘ডং ফাং হং–৩’। ছবি: রয়টার্স থেকে নেওয়া
শানডং প্রদেশের কিংদাও বন্দরে নোঙর করা গবেষণা জাহাজ ‘ডং ফাং হং–৩’। ছবি: রয়টার্স থেকে নেওয়া

‘স্বচ্ছ সমুদ্র’ বা ট্রান্সপারেন্ট ওশান প্রকল্প
চীনের এই কৌশলের মূলে রয়েছে ‘ট্রান্সপারেন্ট ওশান’ বা স্বচ্ছ সমুদ্র নামক একটি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো সমুদ্রের তলদেশে কয়েকশ সেন্সর, বয়া এবং বিশেষ যন্ত্র স্থাপন করা। এই যন্ত্রগুলো রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিকভাবে পানির তাপমাত্রা এবং শব্দতরঙ্গের তথ্য পাঠাতে পারে। এটি অনেকটা সমুদ্রের তলদেশকে ‘কাঁচের মতো স্বচ্ছ’ করে দেখার মতো একটি প্রযুক্তি, যা সাবমেরিন লুকিয়ে রাখা বা খুঁজে বের করার ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

বিজ্ঞান নাকি যুদ্ধপ্রস্তুতি: অস্পষ্ট সীমারেখা
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে, তাদের এই গবেষণা খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, মৎস্য আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে। তবে বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘সিভিল-মিলিটারি ফিউশন’। অর্থাৎ, তারা বেসামরিক গবেষণা জাহাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করছে, যা সরাসরি সামরিক বাহিনী ব্যবহার করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা বা গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ এড়ানো সহজ হয়। ওশান ইউনিভার্সিটি অব চায়নার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি নৌবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই কাজগুলো করছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রভাব
এই উন্নয়ন বিশ্ব নৌ-শক্তির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। চীন এখন কেবল শক্তিশালী জাহাজ বানাচ্ছে না, বরং আধুনিক নৌ-যুদ্ধের প্রধান রসদ ‘তথ্য’ বা ডেটা সংগ্রহে বিনিয়োগ করছে। আমেরিকার জন্য এটি উদ্বেগের কারণ, কারণ তারা তাদের তথ্যের শ্রেষ্ঠত্ব হারাচ্ছে। ভারত মহাসাগর থেকে আর্কটিক পর্যন্ত চীনের এই উপস্থিতি জানান দিচ্ছে যে, বেইজিং এখন আর কেবল আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং একটি বিশ্বব্যাপী ‘ব্লু-ওয়াটার নেভি’ বা গভীর সমুদ্রের সামরিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়।

সম্পর্কিত