শেখ হামাদ যেভাবে কাতারের সফট পাওয়ারের ভিত্তি গড়ে দেন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি। ছবি : সংগৃহীত

আঞ্চলিক মানচিত্রের এক প্রান্তে থাকা ছোট্ট এক রাষ্ট্র থেকে কাতারকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার পুরো কৃতিত্ব যার, তিনি সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি।

রোববার ৭৪ বছর বয়সে মারা যাওয়া এই নেতা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী দেশ কাতারের সম্পদ, প্রভাব ও কূটনৈতিক শক্তির ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়।

শেখ হামাদের কাছের সঙ্গীদের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, ১৯৯৫ সালে ক্ষমতা নেওয়ার আগেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কাতারের হাতে স্বাভাবিক উপায়ে শক্তিশালী হওয়ার প্রয়োজনীয় উপাদান নেই। তাই সফট পাওয়ারে বিনিয়োগের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন তিনি।

শাসনক্ষমতা নেওয়ার শুরু থেকেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান-গবেষণা ও ক্রীড়া খাতে বড় পরিসরে বিনিয়োগ করেন শেখ হামাদ। জ্বালানি খাতের আয়কে শুধু নিজের দেশের সমৃদ্ধির উৎস না রেখে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব বোঝায় প্রতিষ্ঠা করেন আরব বিশ্বের অন্যতম সফল টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরা। পরবর্তীতে যা একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।

পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে আফ্রিকান হর্ন পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভৌগোলিক পরিসরের জটিল সব সংকট নিরসনে সফল মধ্যস্থতার নজির গড়ে তুলেছে কাতার। ২০০৮ সালে লেবাননের বিবদমান নেতাদের এক টেবিলে এনে দোহায় সম্পন্ন হয় ঐতিহাসিক এক চুক্তি, যা দেশটিকে আরেকটি গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনে। সুদানের দারফুর সংকট নিয়ে ৩০ মাসের দীর্ঘ আলোচনা শেষে ২০১১ সালে দারফুর শান্তি দলিল স্বাক্ষরেও গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে কাতার।

ফিলিস্তিনি বিভাজনের দুই পক্ষ হামাস ও ফাতাহর মধ্যে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক ভূমিকা রেখেছে দোহা। এ ছাড়া ইয়েমেন ও সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং ইরিত্রিয়া-জিবুতি সীমান্ত সংকট নিরসনেও মধ্যস্থতা করেছে কাতার।

শেখ হামাদের শাসনামলেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সময়ে কাছাকাছি দোহায় ঠাঁই দেওয়া হয় হামাসের নেতৃত্বকেও। ২০০৬ সালের ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের পর কাতারি অর্থায়নে পুনর্গঠিত হয় দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা। ২০১০ সালে অঞ্চলটি পরিদর্শনে গেলে স্থানীয়রা তাকে ‘প্রতিরোধের আমির’ বলে আখ্যা দেন।

২০১২ সালের ইসরায়েলি যুদ্ধের পর গাজা সফরকারী প্রথম আরব নেতাও ছিলেন শেখ হামাদ। এ সময় সেখান থেকে ৪০ কোটি ডলারের অনুদানে আবাসন ও পুনর্গঠন প্রকল্প শুরুর ঘোষণা দেন তিনি।

মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে কাতারের অবস্থান কখনো পরিবর্তন হয়নি। তবে সংঘাতের সব পক্ষের সঙ্গে, এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে হয়েছে দেশটিকে। ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনেও সমর্থন দিয়েছিল কাতার।

শেখ হামাদের শাসনামলে কাতারের লক্ষ্য কেবল অর্থনৈতিক আধুনিকায়নে আটকে থাকেনি, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। ২০১৩ সালে নিজের স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখেই দায়িত্ব ছাড়েন তিনি। এরপর ছেলে ও উত্তরসূরি বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির শাসনামলে জ্বালানি ও মধ্যস্থতার শক্তি হিসেবে কাতারের রূপান্তরও নিজ চোখে দেখেছেন শেখ হামাদ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত