পাবনায় প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণচেষ্টা, গ্রাম্য সালিসে রফাদফা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
পাবনা

ধর্ষণের প্রতীকী ছবি

পাবনার সাঁথিয়ায় প্রায় ৩০ বছর বয়সী এক বুদ্ধি ও বাক্‌প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। তবে এই ফৌজদারি অপরাধের বিষয়টি পুলিশকে না জানিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের উপস্থিতিতে গ্রাম্য সালিসে ২০টি জুতার বাড়ি দিয়ে রফাদফার চেষ্টা করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (৮ জুলাই) বেলা দুটার দিকে উপজেলার গৌরীগ্রাম ইউনিয়নে হারিয়াকাহন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত মহব্বত আলী খাঁ (৪৫) ওই গ্রামের মৃত তায়জাল খাঁর ছেলে।

ওই দিন প্রতিবন্ধী নারীকে বাড়িতে একা রেখে তাঁর মা পাশেই ছেলের বাড়িতে যান। এই সুযোগে মহব্বত আলী ঘরে ঢুকে তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ সময় প্রতিবন্ধী নারীর মা ও প্রতিবেশীরা ছুটে এলে মহব্বত আলী পালিয়ে যান।

স্থানীয়রা জানান, পুলিশকে না জানিয়ে প্রভাবশালী একটি মহল ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। সর্বশেষ গত রোববার (১২ জুলাই) সন্ধ্যায় হারিয়াকাহন এলাকার ইউপি সদস্য (মেম্বার) মালেকের বাড়ির উঠানে এক গ্রাম্য সালিসের আয়োজন করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, গৌরীগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব, ইউপি সদস্য মিল্টন, আরশেদ আলী ও মালেকসহ স্থানীয় মাতব্বরেরা এই সালিস বৈঠকের নেতৃত্ব দেন। সালিসে অপরাধ স্বীকার করায় অভিযুক্ত মহব্বত আলীকে ২০টি জুতার বাড়ি দেওয়ার রায় দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধর্ষণচেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধকে জুতার বাড়ি দিয়ে মীমাংসা করা দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল। ভুক্তভোগী পরিবারটি সরল ও আইন সম্পর্কে কম বোঝায় জনপ্রতিনিধিরা সালিসের নামে এই নাটক করেছেন। এ ঘটনায় সালিসকারীদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত।

ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী নারীর দুলাভাই বলেন, ‘মহব্বত এর আগেও দুই জায়গায় একই অপরাধ করেছে। আমার শ্যালিকার ঘটনায় শনিবার সালিস বসার কথা থাকলেও আসামি আসেনি। রোববার সালিসের শুরুতে আসামিকে ৭টি জুতার বাড়ি ও জুতার মালা পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে টাকা খেয়ে কয়েকজন মাতব্বরের কথায় শুধু ২০টি জুতার বাড়িতে রফাদফা করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘থানায় যেতে আমাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা কোনো টাকা-পয়সা চাই না, অন্যায়ের সঠিক বিচার চাই। সবার সঙ্গে আলোচনা করে আমরা আইনের দ্বারস্থ হব।’

সালিস বোর্ডে উপস্থিত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে ইউপি সদস্য আরশেদ আলী বলেন, ‘আমি এই আইনটি জানি না। ওটা আমার ওয়ার্ডও না। চেয়ারম্যান সাহেব ডেকেছিলেন, তাই গিয়েছিলাম।’

গৌরীগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব বলেন, ‘ওই ছেলে অপরাধ স্বীকার করেছে। এই অপরাধ সালিসে বিচার করার আইন নেই, তা আমি জানি। কিন্তু দুই পক্ষ বসে সমাধান করতে চেয়েছিল বলেই সালিসটি করা হয়েছে।’

সাঁথিয়া থানার ওসি জানান, বিষয়টি জানার পর তাঁরা ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছেন। অভিযোগ পেলেই দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাঁথিয়া উপজেলা ইউএনও রিজু তামান্না বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের বিচার কোনোভাবেই গ্রাম্য সালিসে করার সুযোগ নেই। আইন অমান্য করে চেয়ারম্যান ও অন্যরা কেন এটি করলেন, তা জানতে চেয়ারম্যানকে ডাকা হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে। এরপর তিনি ওসিকে খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারটি যাতে সঠিক বিচার পায়, তা নিশ্চিত করা হবে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত