শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি
হা মীম কেফায়েত

মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে ছোট্ট একটি গ্যাসসমৃদ্ধ রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক কূটনীতি, গণমাধ্যম ও অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। কাতারের আধুনিক রাষ্ট্রপরিচয়ের সঙ্গে যার নাম প্রায় সমার্থক। ৭৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু শুধু একজন সাবেক আমিরের প্রস্থান নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান।
শেখ হামাদের জীবন নিয়ে লিখতে গেলে প্রথমেই আসে ক্ষমতার প্রশ্ন। ১৯৯৫ সালে তিনি রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর বাবা শেখ খলিফা বিন হামাদ আল থানিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে আমির হন। ঘটনাটি তখন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল স্থবির রাষ্ট্রকে নতুন পথে নেওয়ার উদ্যোগ। সমালোচকদের কাছে এটি ছিল রাজপরিবারের ভেতরের ক্ষমতার পালাবদল। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। ২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির হাতে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বংশানুক্রমিক শাসকদের মধ্যে এমন স্বেচ্ছা ক্ষমতা হস্তান্তর অত্যন্ত বিরল।
ক্ষমতা ছাড়ার দিন তিনি বলেছিলেন, নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার সময় এসেছে। কথাটি তিনি শুধু বলেই থেমে থাকেননি। বাস্তবেও তা করে দেখিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যেখানে অনেক নেতা শেষ দিন পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকেন, সেখানে শেখ হামাদের এই সিদ্ধান্ত তাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
১৯৫২ সালে দোহায় জন্ম নেওয়া শেখ হামাদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল সামরিক জীবন দিয়ে। তিনি ব্রিটেনের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট থেকে প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে কাতারের সশস্ত্র বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরে যুবরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পান। দীর্ঘ এই অভিজ্ঞতা তাকে শুধু একজন রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা হিসেবে গড়ে তোলে।
১৯৯৫ সালে তিনি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন কাতার ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে সীমিত প্রভাবের একটি দেশ। শেখ হামাদের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু তেল ও গ্যাস বিক্রি করে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি, গণমাধ্যম, শিক্ষা, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক উপস্থিতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পরবর্তী দুই দশকে কাতারের পরিবর্তন সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
তাঁর শাসনামলে উত্তর গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়ন কাতারের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দেয়। দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারকে পরিণত হয়। বিপুল আয় অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগে ব্যয় করা হয়। একই সময়ে কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে কাতারের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বিস্তৃত করে। ছোট ভৌগোলিক আয়তনের একটি রাষ্ট্র কীভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে, শেখ হামাদের সময় তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তৈরি হয়।
১৯৯৬ সালে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় যাত্রা শুরু করে আল জাজিরা। বিতর্কিত বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে এটি দ্রুত আরব বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমে পরিণত হয়। শেখ হামাদ সংবাদমাধ্যমের ওপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধিনিষেধও শিথিল করেন। তবে সমালোচকেরা এটিও বলেছেন, আল জাজিরা আঞ্চলিক নানা বিষয় নিয়ে স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন করলেও কাতারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে তুলনামূলকভাবে সংযত ছিল।
শেখ হামাদের বৈদেশিক নীতিও ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে। মাত্র সাড়ে ৪ হাজার বর্গমাইলের ছোট একটি রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি কাতারকে আঞ্চলিক সংকটের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। সুদানের দারফুর সংকট, লেবাননের রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং ফিলিস্তিনি বিভিন্ন পক্ষের আলোচনায় দোহা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে সংলাপের পথ তৈরিতেও দোহা একটি গ্রহণযোগ্য ঠিকানায় পরিণত হয়। এতে কাতারের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি দেশটি একাধিক শক্তির সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রাখার কূটনৈতিক সক্ষমতাও দেখিয়েছে।
তবে তাঁর পররাষ্ট্রনীতি বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। কাতার আরব বসন্তের সময় তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া এবং সিরিয়ার বিভিন্ন গণআন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। লিবিয়ায় ন্যাটোর সামরিক অভিযানে সহায়তা করে এবং সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এই নীতিকে কেউ দেখেছেন স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন হিসেবে। আবার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ অভিযোগ তোলে যে কাতার আঞ্চলিক রাজনীতিতে অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ইসলামপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল ভূমিকা নিচ্ছে। পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় কূটনৈতিক সংকটের পেছনেও এই মতপার্থক্য বড় কারণ হয়ে ওঠে। শেখ হামাদের উত্তরাধিকার তাই শুধু প্রশংসায় নয়, বিতর্কেও আলোচিত।
তাঁর উত্তরাধিকারের নানা দিকের মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি তাঁর অবস্থান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ২০১২ সালের অক্টোবরে তিনি গাজা সফর করেন। ২০০৭ সালে হামাসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর অবরুদ্ধ গাজায় তিনিই ছিলেন প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি সেখানে গিয়ে মানুষের পাশে সশরীরে দাঁড়ান। সফরটি প্রতীকী ছিল না। গাজা পুনর্গঠন প্রকল্পে কয়েক শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার ঘোষণা দেয় কাতার। খান ইউনিসে আবাসন প্রকল্প, সড়ক, হাসপাতাল এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে সেই অর্থ ব্যয় হয়। পরবর্তীতে তাঁর নামেই গাজার একটি প্রধান সড়কের নামকরণ করা হয়, যা আজও সেই সফরের স্মৃতি বহন করছে।
গাজা সফরের সময় তিনি শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ঘোষণা দেননি। ফিলিস্তিনি জাতীয় ঐক্যেরও আহ্বান জানিয়েছিলেন। হামাস ও ফাতাহর বিভক্ত রাজনীতিকে এক ছাতার নিচে আনার জন্য দোহায় একাধিক বৈঠকেরও আয়োজন করা হয়েছিল। সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সফল না হলেও কাতার নিজেকে একটি আলোচনার মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এ কারণেই ফিলিস্তিনি রাজনীতির নানা পর্যায়ে দোহার নাম বারবার উচ্চারিত হয়।
২০০৫ সালে শেখ হামাদ ঢাকা সফর করেন। এরপর প্রায় দুই দশক কাতারের কোনো আমির বাংলাদেশ সফর করেননি। ২০২৪ সালে তাঁর ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ঢাকায় এসে সেই ধারাবাহিকতা পুনরায় শুরু করেন। দুই দেশের সম্পর্ক অর্থনীতি, জ্বালানি সহযোগিতা এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
বর্তমানে কাতারে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। নির্মাণ, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল এবং সেবা খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবদান দৃশ্যমান। ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আগে দোহার স্টেডিয়াম, সড়ক, মেট্রোরেল এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই দীর্ঘ কর্মসংস্থানের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল শেখ হামাদের সময়ে কাতারের অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে। সেই সময় থেকেই বাংলাদেশ কাতারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনশক্তির উৎসে পরিণত হয়। একই সঙ্গে কাতার বাংলাদেশে জ্বালানি সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বেও আগ্রহ বাড়ায়।
মানবিক সম্পর্কেরও কিছু স্মরণীয় অধ্যায় রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য কাতার সরকারের পাঠানো এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বাংলাদেশে ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়েছিল। শেখ হামাদের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গন থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুর পর বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়াও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করেছেন। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি সমবেদনা জানিয়ে কাতারের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। ফিলিস্তিনি বিভিন্ন মহল তাকে এমন একজন নেতা হিসেবে স্মরণ করেছে, যিনি কঠিন সময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। শোকবার্তাগুলোর ভাষা ভিন্ন হলেও একটি বিষয় ছিল অভিন্ন। শেখ হামাদ শুধু নিজের দেশের নেতা ছিলেন না। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যাওয়া একজন রাষ্ট্রনায়ক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক শোকবার্তায় বলেন, আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে শেখ হামাদের অবদান দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
তাঁর জীবনের সব সিদ্ধান্ত যে সর্বজনগ্রাহ্য ছিল, এমন দাবি করা যাবে না। ১৯৯৫ সালের পিতার কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ নিয়ে বিতর্ক ছিল। আরব বসন্তে তাঁর নীতি নিয়ে মতভেদ ছিল। আঞ্চলিক রাজনীতিতে কাতারের সক্রিয় ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, তিনি কাতারকে এমন এক রাষ্ট্রে রূপ দিয়েছেন, যার কণ্ঠস্বর ভৌগোলিক আয়তনের চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছে। অর্থনীতি, কূটনীতি, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় কাতারের যে অবস্থান আজ দেখা যায়, তার ভিত্তি অনেকটাই তাঁর আমলে নির্মিত হয়েছে।
তিনি ছিলেন সামরিক প্রশিক্ষণে গড়া একজন শাসক। আবার সংবাদমাধ্যমের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একজন সংস্কারক। ছিলেন বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র গঠনের কারিগর। একই সঙ্গে অবরুদ্ধ গাজায় গিয়ে সংহতি প্রকাশ করা একজন আরব নেতা। তাঁর এই বহুমাত্রিক পরিচয়ই তাকে সমসাময়িক অনেক শাসকের থেকে আলাদা করেছে।
লেখক: সাংবাদিক

মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে ছোট্ট একটি গ্যাসসমৃদ্ধ রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক কূটনীতি, গণমাধ্যম ও অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। কাতারের আধুনিক রাষ্ট্রপরিচয়ের সঙ্গে যার নাম প্রায় সমার্থক। ৭৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু শুধু একজন সাবেক আমিরের প্রস্থান নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান।
শেখ হামাদের জীবন নিয়ে লিখতে গেলে প্রথমেই আসে ক্ষমতার প্রশ্ন। ১৯৯৫ সালে তিনি রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর বাবা শেখ খলিফা বিন হামাদ আল থানিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে আমির হন। ঘটনাটি তখন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল স্থবির রাষ্ট্রকে নতুন পথে নেওয়ার উদ্যোগ। সমালোচকদের কাছে এটি ছিল রাজপরিবারের ভেতরের ক্ষমতার পালাবদল। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। ২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির হাতে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বংশানুক্রমিক শাসকদের মধ্যে এমন স্বেচ্ছা ক্ষমতা হস্তান্তর অত্যন্ত বিরল।
ক্ষমতা ছাড়ার দিন তিনি বলেছিলেন, নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার সময় এসেছে। কথাটি তিনি শুধু বলেই থেমে থাকেননি। বাস্তবেও তা করে দেখিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যেখানে অনেক নেতা শেষ দিন পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকেন, সেখানে শেখ হামাদের এই সিদ্ধান্ত তাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
১৯৫২ সালে দোহায় জন্ম নেওয়া শেখ হামাদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল সামরিক জীবন দিয়ে। তিনি ব্রিটেনের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট থেকে প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে কাতারের সশস্ত্র বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরে যুবরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পান। দীর্ঘ এই অভিজ্ঞতা তাকে শুধু একজন রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা হিসেবে গড়ে তোলে।
১৯৯৫ সালে তিনি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন কাতার ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে সীমিত প্রভাবের একটি দেশ। শেখ হামাদের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু তেল ও গ্যাস বিক্রি করে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি, গণমাধ্যম, শিক্ষা, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক উপস্থিতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পরবর্তী দুই দশকে কাতারের পরিবর্তন সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
তাঁর শাসনামলে উত্তর গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়ন কাতারের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দেয়। দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারকে পরিণত হয়। বিপুল আয় অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগে ব্যয় করা হয়। একই সময়ে কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে কাতারের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বিস্তৃত করে। ছোট ভৌগোলিক আয়তনের একটি রাষ্ট্র কীভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে, শেখ হামাদের সময় তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তৈরি হয়।
১৯৯৬ সালে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় যাত্রা শুরু করে আল জাজিরা। বিতর্কিত বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে এটি দ্রুত আরব বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমে পরিণত হয়। শেখ হামাদ সংবাদমাধ্যমের ওপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধিনিষেধও শিথিল করেন। তবে সমালোচকেরা এটিও বলেছেন, আল জাজিরা আঞ্চলিক নানা বিষয় নিয়ে স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন করলেও কাতারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে তুলনামূলকভাবে সংযত ছিল।
শেখ হামাদের বৈদেশিক নীতিও ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে। মাত্র সাড়ে ৪ হাজার বর্গমাইলের ছোট একটি রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি কাতারকে আঞ্চলিক সংকটের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। সুদানের দারফুর সংকট, লেবাননের রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং ফিলিস্তিনি বিভিন্ন পক্ষের আলোচনায় দোহা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে সংলাপের পথ তৈরিতেও দোহা একটি গ্রহণযোগ্য ঠিকানায় পরিণত হয়। এতে কাতারের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি দেশটি একাধিক শক্তির সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রাখার কূটনৈতিক সক্ষমতাও দেখিয়েছে।
তবে তাঁর পররাষ্ট্রনীতি বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। কাতার আরব বসন্তের সময় তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া এবং সিরিয়ার বিভিন্ন গণআন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। লিবিয়ায় ন্যাটোর সামরিক অভিযানে সহায়তা করে এবং সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এই নীতিকে কেউ দেখেছেন স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন হিসেবে। আবার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ অভিযোগ তোলে যে কাতার আঞ্চলিক রাজনীতিতে অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ইসলামপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল ভূমিকা নিচ্ছে। পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় কূটনৈতিক সংকটের পেছনেও এই মতপার্থক্য বড় কারণ হয়ে ওঠে। শেখ হামাদের উত্তরাধিকার তাই শুধু প্রশংসায় নয়, বিতর্কেও আলোচিত।
তাঁর উত্তরাধিকারের নানা দিকের মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি তাঁর অবস্থান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ২০১২ সালের অক্টোবরে তিনি গাজা সফর করেন। ২০০৭ সালে হামাসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর অবরুদ্ধ গাজায় তিনিই ছিলেন প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি সেখানে গিয়ে মানুষের পাশে সশরীরে দাঁড়ান। সফরটি প্রতীকী ছিল না। গাজা পুনর্গঠন প্রকল্পে কয়েক শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার ঘোষণা দেয় কাতার। খান ইউনিসে আবাসন প্রকল্প, সড়ক, হাসপাতাল এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে সেই অর্থ ব্যয় হয়। পরবর্তীতে তাঁর নামেই গাজার একটি প্রধান সড়কের নামকরণ করা হয়, যা আজও সেই সফরের স্মৃতি বহন করছে।
গাজা সফরের সময় তিনি শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ঘোষণা দেননি। ফিলিস্তিনি জাতীয় ঐক্যেরও আহ্বান জানিয়েছিলেন। হামাস ও ফাতাহর বিভক্ত রাজনীতিকে এক ছাতার নিচে আনার জন্য দোহায় একাধিক বৈঠকেরও আয়োজন করা হয়েছিল। সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সফল না হলেও কাতার নিজেকে একটি আলোচনার মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এ কারণেই ফিলিস্তিনি রাজনীতির নানা পর্যায়ে দোহার নাম বারবার উচ্চারিত হয়।
২০০৫ সালে শেখ হামাদ ঢাকা সফর করেন। এরপর প্রায় দুই দশক কাতারের কোনো আমির বাংলাদেশ সফর করেননি। ২০২৪ সালে তাঁর ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ঢাকায় এসে সেই ধারাবাহিকতা পুনরায় শুরু করেন। দুই দেশের সম্পর্ক অর্থনীতি, জ্বালানি সহযোগিতা এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
বর্তমানে কাতারে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। নির্মাণ, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল এবং সেবা খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবদান দৃশ্যমান। ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আগে দোহার স্টেডিয়াম, সড়ক, মেট্রোরেল এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই দীর্ঘ কর্মসংস্থানের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল শেখ হামাদের সময়ে কাতারের অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে। সেই সময় থেকেই বাংলাদেশ কাতারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনশক্তির উৎসে পরিণত হয়। একই সঙ্গে কাতার বাংলাদেশে জ্বালানি সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বেও আগ্রহ বাড়ায়।
মানবিক সম্পর্কেরও কিছু স্মরণীয় অধ্যায় রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য কাতার সরকারের পাঠানো এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বাংলাদেশে ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়েছিল। শেখ হামাদের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গন থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুর পর বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়াও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করেছেন। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি সমবেদনা জানিয়ে কাতারের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। ফিলিস্তিনি বিভিন্ন মহল তাকে এমন একজন নেতা হিসেবে স্মরণ করেছে, যিনি কঠিন সময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। শোকবার্তাগুলোর ভাষা ভিন্ন হলেও একটি বিষয় ছিল অভিন্ন। শেখ হামাদ শুধু নিজের দেশের নেতা ছিলেন না। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যাওয়া একজন রাষ্ট্রনায়ক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক শোকবার্তায় বলেন, আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে শেখ হামাদের অবদান দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
তাঁর জীবনের সব সিদ্ধান্ত যে সর্বজনগ্রাহ্য ছিল, এমন দাবি করা যাবে না। ১৯৯৫ সালের পিতার কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ নিয়ে বিতর্ক ছিল। আরব বসন্তে তাঁর নীতি নিয়ে মতভেদ ছিল। আঞ্চলিক রাজনীতিতে কাতারের সক্রিয় ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, তিনি কাতারকে এমন এক রাষ্ট্রে রূপ দিয়েছেন, যার কণ্ঠস্বর ভৌগোলিক আয়তনের চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছে। অর্থনীতি, কূটনীতি, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় কাতারের যে অবস্থান আজ দেখা যায়, তার ভিত্তি অনেকটাই তাঁর আমলে নির্মিত হয়েছে।
তিনি ছিলেন সামরিক প্রশিক্ষণে গড়া একজন শাসক। আবার সংবাদমাধ্যমের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একজন সংস্কারক। ছিলেন বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র গঠনের কারিগর। একই সঙ্গে অবরুদ্ধ গাজায় গিয়ে সংহতি প্রকাশ করা একজন আরব নেতা। তাঁর এই বহুমাত্রিক পরিচয়ই তাকে সমসাময়িক অনেক শাসকের থেকে আলাদা করেছে।
লেখক: সাংবাদিক
.png)

ইরান নয়, সুরক্ষার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রই হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায় করবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার (১৩ জুলাই) ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সম্ভবত আমরাই পরিচালনা করব। আমরা এই প্রণালির অভিভাবক (গার্ডিয়ান) হতে যাচ্ছি।’
১৩ মিনিট আগে
নদীকে ঘিরেই মানবসভ্যতার জন্ম। কিন্তু সেই নদীই কখনো কখনো সভ্যতার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে। ইতিহাসে এমন অনেক বন্যা আছে, যেগুলো শুধু কয়েকটি শহর বা গ্রামের ক্ষতি করেনি, বদলে দিয়েছে একটি দেশের অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা, এমনকি রাষ্ট্রের দুর্যোগ মোকাবিলার চিন্তাভাবনাও।
৩ ঘণ্টা আগে
কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি ১৯৯৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত শাসনামলে কাতারকে সফট পাওয়ারের এক অনন্য মডেলে রূপান্তরিত করেন। আল জাজিরা প্রতিষ্ঠা, লেবানন-দারফুর-ফিলিস্তিন সংকটে মধ্যস্থতা এবং আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তার করে দেশটি।
৭ ঘণ্টা আগে
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৬০ জন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
১১ ঘণ্টা আগে