বিশ্বের ভয়াবহ বন্যাগুলো

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

১৯৩১ সালে চীনের ভয়াবহ বন্যার দৃশ্য। ছবি: উইকিপিডিয়া

নদীকে ঘিরেই মানবসভ্যতার জন্ম। কিন্তু সেই নদীই কখনো কখনো সভ্যতার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে। ইতিহাসে এমন অনেক বন্যা আছে, যেগুলো শুধু কয়েকটি শহর বা গ্রামের ক্ষতি করেনি, বদলে দিয়েছে একটি দেশের অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা, এমনকি রাষ্ট্রের দুর্যোগ মোকাবিলার চিন্তাভাবনাও।

কোথাও টানা বর্ষণে নদী বাঁধ ভেঙে জনপদ ভেসে গেছে, কোথাও সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস বাঁধ অতিক্রম করে শহর ডুবিয়েছে, আবার কোথাও ঘূর্ণিঝড়ের পর ভেঙে পড়েছে পুরো বন্যা প্রতিরোধব্যবস্থা। এসব দুর্যোগের পর অনেক দেশ নতুন করে নিজেদের গড়ে তুলেছে। তাই বিশ্বের বড় বন্যাগুলোর ইতিহাস আসলে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাস নয়, মানুষের শেখারও ইতিহাস।

১৯৩১: চীনের তিনটি নদী একসঙ্গে বিপর্যয় ডেকে আনে

বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যাগুলোর কথা উঠলে ১৯৩১ সালে মধ্য চীনের বন্যার নাম সবার আগে আসে।

ইয়াংজি, হোয়াংহো ও হুয়াই—চীনের তিনটি প্রধান নদী একই সময়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। আগের বছরের খরা, শীতের অতিরিক্ত তুষারপাত এবং পরের মৌসুমের অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণ মিলিয়ে নদীগুলোর পানি দ্রুত বেড়ে যায়। কয়েক মাস ধরে বিস্তীর্ণ অঞ্চল পানির নিচে ছিল। শুধু তা-ই নয়, বন্যার পর দুর্ভিক্ষ ও রোগ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। আজও এই বন্যাকে বিশ্বের সবচেয়ে বিধ্বংসী বন্যাগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। বন্যা পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ থেকে ৪০ লাখ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। বন্যার পাশাপাশি পরবর্তী দুর্ভিক্ষ, কলেরা ও অন্যান্য রোগে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয় এবং কয়েক কোটি মানুষ গৃহহীন বা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

হোয়াংহো নদী: ‘চীনের দুঃখ’ নামটি যেভাবে পেল

হোয়াংহো নদীকে বহু শতাব্দী ধরে বলা হতো ‘চীনের দুঃখ’। কারণ নদীটি বারবার গতিপথ বদলেছে, বাঁধ ভেঙেছে এবং বিশাল এলাকা প্লাবিত করেছে।

১৮৮৭ সালের বন্যা সেই দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি। নদীর তলদেশে অতিরিক্ত পলি জমে থাকায় পানি বাঁধ টপকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য গ্রাম ও কৃষিজমি ডুবে যায়। এই ঘটনার পর চীন নদী ব্যবস্থাপনা ও বাঁধ নির্মাণে নতুন করে গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

চীনের হোয়াংহো। এর আরেক নাম হলুদ নদী। ছবি: উইকিপিডিয়া
চীনের হোয়াংহো। এর আরেক নাম হলুদ নদী। ছবি: উইকিপিডিয়া

১৮৮৭ সালের এই বন্যায় প্রায় ৯ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয় এবং হাজার হাজার গ্রাম ও বিপুল কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যায়।

১৯৫৩: এক রাতেই বদলে যায় নেদারল্যান্ডসের ভবিষ্যৎ

১৯৫৩ সালের ৩১ জানুয়ারি উত্তর সাগরে শক্তিশালী ঝড় ও উঁচু জোয়ার একসঙ্গে আঘাত হানে। নেদারল্যান্ডসের বহু প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যায়। সমুদ্রের পানি দ্রুত জনবসতিতে ঢুকে পড়ে। এই বন্যায় নেদারল্যান্ডসে ১,৮৩৬ জন এবং যুক্তরাজ্য, বেলজিয়ামসহ আশপাশের দেশ মিলিয়ে ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। প্রায় ২ লাখ হেক্টর কৃষিজমি লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হয় এবং হাজার হাজার বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই বন্যা শুধু ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়নি, এটি নেদারল্যান্ডসকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এই বিপর্যয়ের পরই নেদারল্যান্ডস বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্প ডেল্টা ওয়ার্কস নির্মাণ শুরু করে। আজ নেদারল্যান্ডসকে বন্যা ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ হিসেবে যে উদাহরণ দেওয়া হয়, তার পেছনে রয়েছে ১৯৫৩ সালের সেই শিক্ষা।

১৯২৭: যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপির সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বন্যাগুলোর একটি ঘটেছিল ১৯২৭ সালে। টানা বৃষ্টিতে মিসিসিপি নদীর পানি এতটাই বেড়ে যায় যে শত শত বাঁধ ভেঙে বিশাল এলাকা প্লাবিত হয়।

এই বন্যা শুধু দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও বসতি ধ্বংস করেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বন্যা নিয়ন্ত্রণ নীতিতেও বড় পরিবর্তন আনে। পরবর্তী সময়ে নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ নির্মাণ এবং ফেডারেল পর্যায়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণে বড় বিনিয়োগ শুরু হয়।

২০২৫: হারিকেন ক্যাটরিনা

২০০৫ সালে হারিকেন ক্যাটরিনা যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে আঘাত হানে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে নিউ অরলিন্সে, যখন শহরকে রক্ষা করা লেভি বা প্রতিরক্ষা বাঁধের একাধিক অংশ ভেঙে পড়ে।

শহরের বড় অংশ পানির নিচে চলে যায়। উদ্ধারকাজ, জরুরি সেবা এবং সরকারি প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, উন্নত প্রযুক্তি ও অবকাঠামো থাকলেই দুর্যোগের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। প্রস্তুতি ও সমন্বয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

২০২২: পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা মাসের পর মাস ছিল পানির নিচে

সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বন্যাগুলোর একটি ঘটে পাকিস্তানে ২০২২ সালে। অস্বাভাবিক মৌসুমি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং তাপপ্রবাহের পর হিমবাহ গলার প্রভাব একসঙ্গে দেশটিকে ভয়াবহ সংকটে ফেলে। বিস্তীর্ণ এলাকা মাসের পর মাস পানির নিচে ছিল। বহু সড়ক, সেতু, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বন্যায় দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। ৩ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন, ২০ লাখের বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৩ হাজার কিলোমিটারের বেশি সড়ক এবং অন্তত ৪০০ সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাতিসংঘ একে পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটি বলে বর্ণনা করে।

২০২২ সালে পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল। ছবি: উইকিপিডিয়া
২০২২ সালে পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল। ছবি: উইকিপিডিয়া

এই বন্যার পর জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করে। পাকিস্তানের বন্যাকে অনেক বিশেষজ্ঞ জলবায়ু সংকটের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

২০২১: যে বন্যা অপ্রস্তুত করেছিল ইউরোপকে

বন্যা মানেই এশিয়া—এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু ২০২১ সালে জার্মানি, বেলজিয়ামসহ পশ্চিম ইউরোপের কয়েকটি দেশ দেখেছে, কয়েক ঘণ্টার অতিবৃষ্টিও কত বড় বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। ছোট ছোট নদী মুহূর্তের মধ্যে ভয়ংকর স্রোতে পরিণত হয়। শত বছরের পুরোনো বসতি, সেতু এবং সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই বন্যায় জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, লুক্সেমবার্গ ও অস্ট্রিয়াসহ কয়েকটি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জার্মানি ও বেলজিয়াম মিলিয়ে ২৪০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং হাজার হাজার ঘরবাড়ি, সড়ক, রেললাইন ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু জার্মানিতেই অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি বলে দেশটির সরকার জানিয়েছিল, যা এটিকে আধুনিক ইউরোপের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটিতে পরিণত করে। এই ঘটনা পুরো ইউরোপকে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

বিশ্বের বড় বন্যাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—প্রতিটি দুর্যোগের পর মানুষ নতুন কিছু শিখেছে। কোথাও আরও উঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু হয়েছে, আবার কোথাও শহর পরিকল্পনার ধরন বদলে গেছে।

তবে আরেকটি বাস্তবতাও সামনে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা এখন আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে শুধু অতীতের অভিজ্ঞতা নয়, ভবিষ্যতের ঝুঁকিও মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।

বন্যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে নতুন নয়। কিন্তু প্রতিটি বড় বন্যা আমাদের একই বার্তা দেয়—প্রকৃতির শক্তিকে থামানো যায় না, তবে সঠিক প্রস্তুতি থাকলে তার ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স ও আল জাজিরা

Ad 300x250

সম্পর্কিত