স্ট্রিম ডেস্ক

নেপালে আকস্মিক বন্যায় নদীর পানির স্তর মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে ২৯ দশমিক ৫ ফুট বা ৯ মিটার বেড়ে গিয়েছিল। উপগ্রহের ছবি ও ভূ-উপরিতলের তথ্য বিশ্লেষণ করে হিমবাহ ধসের স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমালয় পর্বতমালায়ও এর প্রভাব পড়ছে। ফলে হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। গত বুধবার নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহের একটি বড় অংশ ধস পড়ে নদীতে আকস্মিক ঢল সৃষ্টি করে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছে।
উপগ্রহের ছবি ও ভূ-উপরিতলের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বন্যার কারণ অনুসন্ধান করছেন। নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় এই ঘটনায় শত শত মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও পুণ্যার্থীও রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহের বড় অংশ ধসে পড়ার সময় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পন রেকর্ড হয়। নিকটবর্তী ভূকম্পন পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য, দীর্ঘমেয়াদি ভূকম্পন তরঙ্গ ও উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত অস্ট্রিয়ার গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী জ্যাকব স্টেইনার বলেন, ‘হিমবাহের নিচের অংশটি সত্যিই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্যাটেলাইট ছবি দেখে মনে হচ্ছে যেন বিশাল একটি ছুরি দিয়ে হিমবাহটির পুরো নিচের অংশ কেটে ফেলা হয়েছে এবং তা নিচে গড়িয়ে পড়েছে।’
স্টেইনার বলেন, এত উঁচুতে তুষার ও বরফের বিশাল ভর আছড়ে পড়লে বোমার মতো বিস্ফোরণের অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে নিচের দিকে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত বুধবারের বন্যার সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি সম্পর্ক এখনই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, স্থায়ীভাবে জমাট ভূস্তর বা পারমাফ্রস্টের পরিবর্তন হচ্ছে এবং পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইসিআইএমওডি) দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত স্যান্যাল বলেন, ‘আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং এখনই এগুলো নিয়ে সরাসরি সংযোগ টানা ঠিক হবে না। তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি হিন্দুকুশ-হিমালয় পাবর্ত্যাঞ্চল বদলে দিচ্ছে এবং হিমবাহ গালিয়ে দিচ্ছে।’
হিমালয় অঞ্চলজুড়ে শত শত মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জলবিদ্যুৎ বাঁধ, সড়ক, ভবন ও সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
৩০ মিনিটে ৯ মিটার পানি, হাতে সময় ছিল না কারও
আইসিআইএমওডির গবেষকেরা জানিয়েছেন, উজানে হিমবাহের অংশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় নদীর পানির স্তর ৯ মিটার বা প্রায় ২৯ দশমিক ৫ ফুট পর্যন্ত বেড়ে যায়।
শাশ্বত স্যান্যাল বলেন, ‘এটি ছিল হঠাৎ করে নদী ফুলে ওঠার এক বিশাল ও অস্বাভাবিক তোড়, যা মানুষকে আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ দেয়নি।’
প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লহেন্দে খোলা নদীতে বরফ ও পাথরের বড় একটি ধস নামে। এটি ভোতে কোশি নদীর একটি উপনদী। ধসের ফলে নদীর পানি উপচে পড়ে। বরফ, পাথর ও পলি মিশে নিচের দিকে প্রবল স্রোত তৈরি হয়।
গবেষকেরা এখন খতিয়ে দেখছেন, ধসের কারণে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কি না। এমন হলে জমে থাকা পানি পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে নিচের দিকে নেমে আসতে পারে।
ভূবিজ্ঞানী স্টেইনার জানান, এই এলাকায় আগেও বড় ধরনের পাহাড়ি বিপর্যয় ঘটেছে। ২০২৫ সালে একটি হিমবাহ হ্রদ থেকে একই উপত্যকায় বন্যা হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালেও বরফ ও পাথরের ধস নেমেছিল। ২০১৫ সালের নেপালের বড় ভূমিকম্পের সময় ল্যাংটাং অঞ্চলেও ভয়াবহ তুষারধস হয়েছিল।
হিমালয়ে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিন্দুকুশ হিমালয় পার্বত্য এলাকা দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে হিমবাহ, তুষার আবরণ, চিরহিমায়িত পারমাফ্রস্ট ও পাহাড়ি ঢালের ওপর।
মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তুষার ও বরফের মজুতগুলোর একটি রয়েছে হিমালয়ে। এখানকার হিমবাহগুলো এশিয়ার প্রধান নদীগুলোতে পানি সরবরাহ করে। এসব নদীর ওপর কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জীবিকা নির্ভরশীল।
তবে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহগুলোর বড় অংশই উষ্ণতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্টেইনার বলেন, ‘গত বুধবারে যা ঘটেছে, তা দুর্ভাগ্যের বিষয় হলেও নয়া-স্বাভাবিকতায় রূপ নিয়েছে। এখান থেকে পরিস্থিতি সামনে আরও খারাপের দিকে যাবে।’
রেকর্ড শুরুর পর গত এক দশক ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ সময়। ২০২৪ সাল ছিল এ পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে উষ্ণ বছর। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বের হিমবাহগুলো প্রতিবছর গড়ে ২৬৭ গিগাটন বরফ হারিয়েছে।
জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা গেলেও ২১০০ সালের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ হিমবাহ বিলীন হয়ে যেতে পারে। আর বর্তমান নীতিগুলো অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আইসিআইএমওডির গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের পর হিমালয়ে হিমবাহ গলে যাওয়ার হার বেড়েছে। হিমবাহ গলে পানি জমায় হ্রদগুলো বড় হচ্ছে। এতে হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
হিমবাহ সরে যাওয়ায় আগে বরফে ঢাকা পাথর ও পাহাড়ের ঢাল এখন বৃষ্টি, তাপ ও বরফের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় খাড়া পাহাড়ের পাথর ও ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্টেইনার বলেন, ‘এর ফলে পাহাড় থেকে পাথর ও মাটি নিচে খসে পড়ার আশঙ্কা বহুগুণ বাড়ছে।’
স্যান্যাল বলেন, বুধবারের বন্যার পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ঘটনা ধারাবাহিকভাবে কাজ করে থাকতে পারে। প্রথমে তুষারধস বা হিমবাহ ভাঙন, এরপর পাথর ও কাদার ঢল, নদীর পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরে আকস্মিক বন্যা—এভাবে ঘটনাগুলো একটির পর একটি ঘটতে পারে।
অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও পূর্বাভাসের অভাব বিপর্যয় বাড়িয়েছে
স্টেইনার বলেন, নেপালের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উপত্যকাটিতে অবস্থিত ছিল। বারবার এমন ক্ষতি এড়াতে আগের বন্যার পর নাগরিক ও পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি পর্যটক নেপালে যান। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে আবহাওয়া ও নদীর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার এবং সীমান্তের দুই পাশে তথ্য বিনিময় বাড়ানো দরকার।
হিমালয়ের হাজার হাজার হিমবাহ ও খাড়া নদী উপত্যকা ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে রাখা কঠিন। এর ওপর একাধিক প্রাকৃতিক ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটলে সতর্ক করার সময় আরও কমে যায়।
স্যান্যাল বলেন, ‘আমাদের কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় থাকে না। অনেক সময় প্রস্তুতির জন্য মাত্র কয়েক মিনিট সময় পাওয়া যায়।’
স্টেইনারের মতে, নেপালের কিছু এলাকা জীবনধারণের জন্য ‘রেড লাইন’ বা চরম বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম আগের বিপর্যয়গুলো থেকে সরকার শিক্ষা নেবে, কিন্তু ক্ষতি যত বড়ই হোক না কেন, তাদের ঘুম ভাঙার পক্ষে তা যেন কখনোই যথেষ্ট নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘খুব দ্রুত কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি না। কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা আমাদের সবার আছে। তবে সমাধানে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বয় করে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

উপগ্রহ চিত্রে নদীর বদলে যাওয়া রূপ
কপারনিকাস সেন্টিনেল-২ উপগ্রহচিত্রেও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্পেস প্রোগ্রামের প্রকাশিত তুলনামূলক ছবিতে দেখা যায়, বেত্রাবতী ও গেরখু এলাকায় ১২ আগস্ট নদীটি ঘন গাছপালাপূর্ণ পাহাড়ের মধ্য দিয়ে অপেক্ষাকৃত সরু চ্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছিল, কিন্তু ২৭ আগস্ট নাগাদ নদীর গতিপথ উল্লেখযোগ্যভাবে প্রশস্ত হয়ে যায় এবং উপত্যকার তলায় ব্যাপক পলি জমা দেখা যায়, যা আগের নদীসীমার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বেত্রাবতী ও রাসুয়াগাধী সীমান্ত ক্রসিংয়ের মধ্যবর্তী ৪২ কিলোমিটার সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে, যার একাধিক সেতু ভেসে গেছে।
সূত্র: এপি নিউজ, রয়টার্স

নেপালে আকস্মিক বন্যায় নদীর পানির স্তর মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে ২৯ দশমিক ৫ ফুট বা ৯ মিটার বেড়ে গিয়েছিল। উপগ্রহের ছবি ও ভূ-উপরিতলের তথ্য বিশ্লেষণ করে হিমবাহ ধসের স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমালয় পর্বতমালায়ও এর প্রভাব পড়ছে। ফলে হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। গত বুধবার নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহের একটি বড় অংশ ধস পড়ে নদীতে আকস্মিক ঢল সৃষ্টি করে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছে।
উপগ্রহের ছবি ও ভূ-উপরিতলের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বন্যার কারণ অনুসন্ধান করছেন। নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় এই ঘটনায় শত শত মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও পুণ্যার্থীও রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহের বড় অংশ ধসে পড়ার সময় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পন রেকর্ড হয়। নিকটবর্তী ভূকম্পন পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য, দীর্ঘমেয়াদি ভূকম্পন তরঙ্গ ও উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত অস্ট্রিয়ার গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী জ্যাকব স্টেইনার বলেন, ‘হিমবাহের নিচের অংশটি সত্যিই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্যাটেলাইট ছবি দেখে মনে হচ্ছে যেন বিশাল একটি ছুরি দিয়ে হিমবাহটির পুরো নিচের অংশ কেটে ফেলা হয়েছে এবং তা নিচে গড়িয়ে পড়েছে।’
স্টেইনার বলেন, এত উঁচুতে তুষার ও বরফের বিশাল ভর আছড়ে পড়লে বোমার মতো বিস্ফোরণের অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে নিচের দিকে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত বুধবারের বন্যার সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি সম্পর্ক এখনই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, স্থায়ীভাবে জমাট ভূস্তর বা পারমাফ্রস্টের পরিবর্তন হচ্ছে এবং পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইসিআইএমওডি) দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত স্যান্যাল বলেন, ‘আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং এখনই এগুলো নিয়ে সরাসরি সংযোগ টানা ঠিক হবে না। তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি হিন্দুকুশ-হিমালয় পাবর্ত্যাঞ্চল বদলে দিচ্ছে এবং হিমবাহ গালিয়ে দিচ্ছে।’
হিমালয় অঞ্চলজুড়ে শত শত মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জলবিদ্যুৎ বাঁধ, সড়ক, ভবন ও সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
৩০ মিনিটে ৯ মিটার পানি, হাতে সময় ছিল না কারও
আইসিআইএমওডির গবেষকেরা জানিয়েছেন, উজানে হিমবাহের অংশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় নদীর পানির স্তর ৯ মিটার বা প্রায় ২৯ দশমিক ৫ ফুট পর্যন্ত বেড়ে যায়।
শাশ্বত স্যান্যাল বলেন, ‘এটি ছিল হঠাৎ করে নদী ফুলে ওঠার এক বিশাল ও অস্বাভাবিক তোড়, যা মানুষকে আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ দেয়নি।’
প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লহেন্দে খোলা নদীতে বরফ ও পাথরের বড় একটি ধস নামে। এটি ভোতে কোশি নদীর একটি উপনদী। ধসের ফলে নদীর পানি উপচে পড়ে। বরফ, পাথর ও পলি মিশে নিচের দিকে প্রবল স্রোত তৈরি হয়।
গবেষকেরা এখন খতিয়ে দেখছেন, ধসের কারণে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কি না। এমন হলে জমে থাকা পানি পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে নিচের দিকে নেমে আসতে পারে।
ভূবিজ্ঞানী স্টেইনার জানান, এই এলাকায় আগেও বড় ধরনের পাহাড়ি বিপর্যয় ঘটেছে। ২০২৫ সালে একটি হিমবাহ হ্রদ থেকে একই উপত্যকায় বন্যা হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালেও বরফ ও পাথরের ধস নেমেছিল। ২০১৫ সালের নেপালের বড় ভূমিকম্পের সময় ল্যাংটাং অঞ্চলেও ভয়াবহ তুষারধস হয়েছিল।
হিমালয়ে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিন্দুকুশ হিমালয় পার্বত্য এলাকা দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে হিমবাহ, তুষার আবরণ, চিরহিমায়িত পারমাফ্রস্ট ও পাহাড়ি ঢালের ওপর।
মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তুষার ও বরফের মজুতগুলোর একটি রয়েছে হিমালয়ে। এখানকার হিমবাহগুলো এশিয়ার প্রধান নদীগুলোতে পানি সরবরাহ করে। এসব নদীর ওপর কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জীবিকা নির্ভরশীল।
তবে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহগুলোর বড় অংশই উষ্ণতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্টেইনার বলেন, ‘গত বুধবারে যা ঘটেছে, তা দুর্ভাগ্যের বিষয় হলেও নয়া-স্বাভাবিকতায় রূপ নিয়েছে। এখান থেকে পরিস্থিতি সামনে আরও খারাপের দিকে যাবে।’
রেকর্ড শুরুর পর গত এক দশক ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ সময়। ২০২৪ সাল ছিল এ পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে উষ্ণ বছর। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বের হিমবাহগুলো প্রতিবছর গড়ে ২৬৭ গিগাটন বরফ হারিয়েছে।
জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা গেলেও ২১০০ সালের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ হিমবাহ বিলীন হয়ে যেতে পারে। আর বর্তমান নীতিগুলো অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আইসিআইএমওডির গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের পর হিমালয়ে হিমবাহ গলে যাওয়ার হার বেড়েছে। হিমবাহ গলে পানি জমায় হ্রদগুলো বড় হচ্ছে। এতে হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
হিমবাহ সরে যাওয়ায় আগে বরফে ঢাকা পাথর ও পাহাড়ের ঢাল এখন বৃষ্টি, তাপ ও বরফের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় খাড়া পাহাড়ের পাথর ও ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্টেইনার বলেন, ‘এর ফলে পাহাড় থেকে পাথর ও মাটি নিচে খসে পড়ার আশঙ্কা বহুগুণ বাড়ছে।’
স্যান্যাল বলেন, বুধবারের বন্যার পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ঘটনা ধারাবাহিকভাবে কাজ করে থাকতে পারে। প্রথমে তুষারধস বা হিমবাহ ভাঙন, এরপর পাথর ও কাদার ঢল, নদীর পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরে আকস্মিক বন্যা—এভাবে ঘটনাগুলো একটির পর একটি ঘটতে পারে।
অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও পূর্বাভাসের অভাব বিপর্যয় বাড়িয়েছে
স্টেইনার বলেন, নেপালের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উপত্যকাটিতে অবস্থিত ছিল। বারবার এমন ক্ষতি এড়াতে আগের বন্যার পর নাগরিক ও পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি পর্যটক নেপালে যান। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে আবহাওয়া ও নদীর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার এবং সীমান্তের দুই পাশে তথ্য বিনিময় বাড়ানো দরকার।
হিমালয়ের হাজার হাজার হিমবাহ ও খাড়া নদী উপত্যকা ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে রাখা কঠিন। এর ওপর একাধিক প্রাকৃতিক ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটলে সতর্ক করার সময় আরও কমে যায়।
স্যান্যাল বলেন, ‘আমাদের কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় থাকে না। অনেক সময় প্রস্তুতির জন্য মাত্র কয়েক মিনিট সময় পাওয়া যায়।’
স্টেইনারের মতে, নেপালের কিছু এলাকা জীবনধারণের জন্য ‘রেড লাইন’ বা চরম বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম আগের বিপর্যয়গুলো থেকে সরকার শিক্ষা নেবে, কিন্তু ক্ষতি যত বড়ই হোক না কেন, তাদের ঘুম ভাঙার পক্ষে তা যেন কখনোই যথেষ্ট নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘খুব দ্রুত কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি না। কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা আমাদের সবার আছে। তবে সমাধানে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বয় করে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

উপগ্রহ চিত্রে নদীর বদলে যাওয়া রূপ
কপারনিকাস সেন্টিনেল-২ উপগ্রহচিত্রেও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্পেস প্রোগ্রামের প্রকাশিত তুলনামূলক ছবিতে দেখা যায়, বেত্রাবতী ও গেরখু এলাকায় ১২ আগস্ট নদীটি ঘন গাছপালাপূর্ণ পাহাড়ের মধ্য দিয়ে অপেক্ষাকৃত সরু চ্যানেলে প্রবাহিত হচ্ছিল, কিন্তু ২৭ আগস্ট নাগাদ নদীর গতিপথ উল্লেখযোগ্যভাবে প্রশস্ত হয়ে যায় এবং উপত্যকার তলায় ব্যাপক পলি জমা দেখা যায়, যা আগের নদীসীমার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বেত্রাবতী ও রাসুয়াগাধী সীমান্ত ক্রসিংয়ের মধ্যবর্তী ৪২ কিলোমিটার সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে, যার একাধিক সেতু ভেসে গেছে।
সূত্র: এপি নিউজ, রয়টার্স
.png)

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি সহায়তায় ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহের আবেদন জানিয়েছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)। এর আগে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ বরাদ্দ করেছে তারা।
১ ঘণ্টা আগে
আকস্মিক বন্যায় নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ১০টা পর্যন্ত এ সংখ্যা নিশ্চিত করেছে দেশটির পুলিশ। এছাড়া তিব্বতে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশ মিলিয়ে ১ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
৩ ঘণ্টা আগে
নেপাল ও তিব্বতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯২ জনে দাঁড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, দেশটিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮৯ জনে। অন্যদিকে তিব্বত অঞ্চলে ৩ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে চীনা গণমাধ্যম। নেপাল ও তিব্বতজুড়ে এখনো ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখো
১৪ ঘণ্টা আগে
নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯২ জনে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় দেড় হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে ৭০০ জনই বিদেশি পর্যটক। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৯ জনে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছে নেপাল পুলিশ।
১৪ ঘণ্টা আগে