ডেকান হেরাল্ডের বিশ্লেষণ
লেখা:

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক হলেও সম্প্রতি ইতিবাচক এক নতুন গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল বিজয় অর্জন করেছে। এরপর থেকেই দিল্লি ও ঢাকা—দুই পক্ষই দুই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সীমান্ত—এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বলে রাখা প্রয়োজন, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি পর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্ক পুনর্গঠনের এই প্রচেষ্টা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, নির্বাচনে বিজয়ের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিশ্বের প্রথম সারির নেতাদের একজন হিসেবে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। যদিও অতীতে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং এবারের নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি, তবুও দিল্লির এই পদক্ষেপকে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর সদ্য শেষ হয়েছে। সংযত ও পরিমিত বক্তব্যের জন্য পরিচিত এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক দীর্ঘদিন জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন করেছেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনি সর্বশেষ ভারত সফর করেন, যেখানে তিনি কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকে অংশ নেন। সে সময় বাংলাদেশের ভেতরে যখন ভারতবিরোধী বক্তব্য তীব্র হয়ে উঠেছিল, তখন তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন।
রাজনীতিতে সাধারণত পূর্ববর্তী সরকারের কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নতুন নেতৃত্বের অধীনে একই ধরনের উচ্চপদে বহাল রাখা বিরল ঘটনা। তবে খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে, যা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাসেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তারেক রহমানের সঙ্গে এবার সফরে ছিলেন আরও এক জ্যেষ্ঠ নেতা, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। এই দুই নেতা দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, যার মধ্যে বৃহত্তম প্রতিবেশী ভারতও রয়েছে।
সফরটিকে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পরিবর্তে ‘সৌজন্য সফর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। উভয় পক্ষই গণমাধ্যমে সরাসরি কোনো বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে, বরং শুধুমাত্র লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করেছে, যাতে ফলাফল বা কূটনৈতিক ভাষার চাপ ছাড়াই আলোচনার জন্য একটি স্বচ্ছন্দ পরিবেশ তৈরি হয়।
এক জ্যেষ্ঠ বাংলাদেশি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা একে অপরকে বুঝতে চাই। ধীরে হলেও স্থিরভাবে এগিয়ে যেতে চাই।’
ঢাকাভিত্তিক থিংক ট্যাংক বাংলাদেশ শান্তি ও নিরাপত্তা ইন্সটিটিউটের (বিপিএসএস) শাফকাত মুনির বলেছেন, এই সফরটি দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে উভয় পক্ষের আন্তরিক আগ্রহের একটি স্পষ্ট প্রকাশ হিসেবে অনেকেই মনে করছেন। তিনি বলেন, ‘এখনও অনেক কাজ বাকি, তবে এই সফর নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী সূচনা।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্য পারস্পরিক আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে, পৃথক ইস্যুগুলোর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ‘সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক মর্যাদা’ নিশ্চিত করার ওপর।
নির্বাচনী ইশতেহারে তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রতিশ্রুতি দেন, যার মূল স্লোগান ছিল ‘ফ্রেন্ড ইয়েস, মাস্টার নো’। এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেন, ঢাকা কোনো বড় শক্তির হাতের পুতুল হবে না এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
ভারতের দৃষ্টিতে, পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন করে ঘনিষ্ঠতা এবং ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) সঙ্গে যোগাযোগ, পাশাপাশি ৭৮টি আসন নিয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান এসব বিষয় নজরে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই ইস্যুগুলোও আলোচনায় আসে, যখন বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশীদ চৌধুরী, তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই দিল্লি সফর করেন। সেখানে তিনি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংয়েল (র) প্রধান এবং ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ভারতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা উদ্বেগ আগের মতোই রয়ে গেছে। ভারতকে লক্ষ্য করে কোনো সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের সুযোগ না থাকা এবং ভারতবিরোধী উগ্র মতাদর্শের বিস্তারের কোনো জায়গা না থাকা এমনটাই মন্তব্য করেছেন অ্যানান্টা অ্যাসপেনের সিইও ইন্দ্রাণী বাগচি।
ইন্দ্রাণী বলেন, দিল্লি কোনোভাবেই চায় না যে হরকত-উল-জিহাদ আল-ইসলামি (হুজি) বা জামায়াত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর মতো উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠুক। একইসঙ্গে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে অতীতে সংঘটিত অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার পুনরাবৃত্তিও নয়াদিল্লি কোনোভাবেই দেখতে চায় না।
জানা গেছে, বাংলাদেশি নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, ঢাকা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ সম্পর্ক ‘সচেতন’ এবং বিশেষ করে পাকিস্তান-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে দিল্লির স্বার্থ যাতে কোনোভাবেই ‘বাধাগ্রস্ত’ না হয়, তা নিশ্চিত করবে।
এদিকে, তারেক রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক পোস্টে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ঘটনাকে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তৎকালীন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী বাংলাদেশিদের হত্যা করেছিল এবং অপারেশন সার্চলাইটকে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যাগুলোর একটি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তারেক রহমানের এই বার্তাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিএনপি সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চালু রেখেছে। তবে একই সঙ্গে দেশের অতীতের নির্মম ইতিহাস থেকেও সরে যায়নি, এটি সেই বিষয়টিই আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়।
অন্যদিকে, বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কোনো দেশের সঙ্গেই এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বা চীন কাউকে অন্তর্ভুক্ত করে কোনো ধরনের নিরাপত্তা জোট বা অংশীদারিত্বে যাবে না।
ঢাকা জোর দিয়ে বলছে, অতীতের ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয় এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কগুলো ব্যক্তি-নির্ভর না হয়ে জনগণের সঙ্গে জনগণের (পিপল টু পিপল) সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে হবে। ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল—যাদের উভয়কেই ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তাদের উপস্থিতি বর্তমানে একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বিএনপি সরকার একক কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ককে জিম্মি না করে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে। একই সঙ্গে তাঁদের প্রত্যর্পণের দাবি এবং যুব নেতা শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদের হস্তান্তরের বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে, যারা বর্তমানে ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনআইএ) হেফাজতে রয়েছে।
সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তিতে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএ) সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সম্পর্ক সত্যিকারভাবে স্থিতিশীল করতে হলে উভয় পক্ষকেই এমন বিভাজনমূলক অভ্যন্তরীণ বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে।
সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক মো. শফিউর রহমান সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা বাংলাদেশিদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এছাড়া বাংলাদেশে হিন্দুদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে ধর্মীয় নিপীড়ন হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা আস্থাহীনতা আরও বাড়িয়ে তোলে।’
ভারত চিকিৎসা ভিসা সহজ করা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ক্রিকেট সম্পর্ক পুনরায় চালুর বিষয়ে উদ্যোগী হলে ভালো হবে, বিশেষ করে আসামের বিজেপি কর্মী এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রচারকারীদের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা মুসলিম ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে যে তীব্র বক্তব্য উঠেছে, তা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার পর।
ঢাকা বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধজনিত পরিস্থিতিতে ভারতের সাম্প্রতিক ডিজেল সরবরাহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।
তবে ভারতের রাজধানী দিল্লির প্রতি নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে তারেক রহমান কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার মধ্যবয়স মাত্র ২৭ বছর যা দেশটির জনমিতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গি একমাত্র ভিত্তি হিসেবে না ধরে, পরিবর্তিত বাস্তবতা ও নতুন প্রজন্মের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজই দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চিন্তা করা উচিত।
(ডেকান হেরাল্ড থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক হলেও সম্প্রতি ইতিবাচক এক নতুন গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল বিজয় অর্জন করেছে। এরপর থেকেই দিল্লি ও ঢাকা—দুই পক্ষই দুই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সীমান্ত—এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বলে রাখা প্রয়োজন, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি পর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্ক পুনর্গঠনের এই প্রচেষ্টা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, নির্বাচনে বিজয়ের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিশ্বের প্রথম সারির নেতাদের একজন হিসেবে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। যদিও অতীতে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং এবারের নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি, তবুও দিল্লির এই পদক্ষেপকে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর সদ্য শেষ হয়েছে। সংযত ও পরিমিত বক্তব্যের জন্য পরিচিত এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক দীর্ঘদিন জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন করেছেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনি সর্বশেষ ভারত সফর করেন, যেখানে তিনি কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকে অংশ নেন। সে সময় বাংলাদেশের ভেতরে যখন ভারতবিরোধী বক্তব্য তীব্র হয়ে উঠেছিল, তখন তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন।
রাজনীতিতে সাধারণত পূর্ববর্তী সরকারের কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নতুন নেতৃত্বের অধীনে একই ধরনের উচ্চপদে বহাল রাখা বিরল ঘটনা। তবে খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে, যা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাসেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তারেক রহমানের সঙ্গে এবার সফরে ছিলেন আরও এক জ্যেষ্ঠ নেতা, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। এই দুই নেতা দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, যার মধ্যে বৃহত্তম প্রতিবেশী ভারতও রয়েছে।
সফরটিকে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পরিবর্তে ‘সৌজন্য সফর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। উভয় পক্ষই গণমাধ্যমে সরাসরি কোনো বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে, বরং শুধুমাত্র লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করেছে, যাতে ফলাফল বা কূটনৈতিক ভাষার চাপ ছাড়াই আলোচনার জন্য একটি স্বচ্ছন্দ পরিবেশ তৈরি হয়।
এক জ্যেষ্ঠ বাংলাদেশি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা একে অপরকে বুঝতে চাই। ধীরে হলেও স্থিরভাবে এগিয়ে যেতে চাই।’
ঢাকাভিত্তিক থিংক ট্যাংক বাংলাদেশ শান্তি ও নিরাপত্তা ইন্সটিটিউটের (বিপিএসএস) শাফকাত মুনির বলেছেন, এই সফরটি দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে উভয় পক্ষের আন্তরিক আগ্রহের একটি স্পষ্ট প্রকাশ হিসেবে অনেকেই মনে করছেন। তিনি বলেন, ‘এখনও অনেক কাজ বাকি, তবে এই সফর নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী সূচনা।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্য পারস্পরিক আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে, পৃথক ইস্যুগুলোর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ‘সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক মর্যাদা’ নিশ্চিত করার ওপর।
নির্বাচনী ইশতেহারে তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রতিশ্রুতি দেন, যার মূল স্লোগান ছিল ‘ফ্রেন্ড ইয়েস, মাস্টার নো’। এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেন, ঢাকা কোনো বড় শক্তির হাতের পুতুল হবে না এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
ভারতের দৃষ্টিতে, পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন করে ঘনিষ্ঠতা এবং ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) সঙ্গে যোগাযোগ, পাশাপাশি ৭৮টি আসন নিয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান এসব বিষয় নজরে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই ইস্যুগুলোও আলোচনায় আসে, যখন বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশীদ চৌধুরী, তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই দিল্লি সফর করেন। সেখানে তিনি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংয়েল (র) প্রধান এবং ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ভারতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা উদ্বেগ আগের মতোই রয়ে গেছে। ভারতকে লক্ষ্য করে কোনো সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের সুযোগ না থাকা এবং ভারতবিরোধী উগ্র মতাদর্শের বিস্তারের কোনো জায়গা না থাকা এমনটাই মন্তব্য করেছেন অ্যানান্টা অ্যাসপেনের সিইও ইন্দ্রাণী বাগচি।
ইন্দ্রাণী বলেন, দিল্লি কোনোভাবেই চায় না যে হরকত-উল-জিহাদ আল-ইসলামি (হুজি) বা জামায়াত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর মতো উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠুক। একইসঙ্গে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে অতীতে সংঘটিত অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার পুনরাবৃত্তিও নয়াদিল্লি কোনোভাবেই দেখতে চায় না।
জানা গেছে, বাংলাদেশি নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, ঢাকা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ সম্পর্ক ‘সচেতন’ এবং বিশেষ করে পাকিস্তান-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে দিল্লির স্বার্থ যাতে কোনোভাবেই ‘বাধাগ্রস্ত’ না হয়, তা নিশ্চিত করবে।
এদিকে, তারেক রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক পোস্টে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ঘটনাকে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তৎকালীন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী বাংলাদেশিদের হত্যা করেছিল এবং অপারেশন সার্চলাইটকে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যাগুলোর একটি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তারেক রহমানের এই বার্তাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিএনপি সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চালু রেখেছে। তবে একই সঙ্গে দেশের অতীতের নির্মম ইতিহাস থেকেও সরে যায়নি, এটি সেই বিষয়টিই আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়।
অন্যদিকে, বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কোনো দেশের সঙ্গেই এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বা চীন কাউকে অন্তর্ভুক্ত করে কোনো ধরনের নিরাপত্তা জোট বা অংশীদারিত্বে যাবে না।
ঢাকা জোর দিয়ে বলছে, অতীতের ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয় এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কগুলো ব্যক্তি-নির্ভর না হয়ে জনগণের সঙ্গে জনগণের (পিপল টু পিপল) সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে হবে। ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল—যাদের উভয়কেই ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তাদের উপস্থিতি বর্তমানে একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বিএনপি সরকার একক কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ককে জিম্মি না করে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে। একই সঙ্গে তাঁদের প্রত্যর্পণের দাবি এবং যুব নেতা শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদের হস্তান্তরের বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে, যারা বর্তমানে ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনআইএ) হেফাজতে রয়েছে।
সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তিতে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএ) সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সম্পর্ক সত্যিকারভাবে স্থিতিশীল করতে হলে উভয় পক্ষকেই এমন বিভাজনমূলক অভ্যন্তরীণ বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে।
সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক মো. শফিউর রহমান সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা বাংলাদেশিদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এছাড়া বাংলাদেশে হিন্দুদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে ধর্মীয় নিপীড়ন হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা আস্থাহীনতা আরও বাড়িয়ে তোলে।’
ভারত চিকিৎসা ভিসা সহজ করা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ক্রিকেট সম্পর্ক পুনরায় চালুর বিষয়ে উদ্যোগী হলে ভালো হবে, বিশেষ করে আসামের বিজেপি কর্মী এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রচারকারীদের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা মুসলিম ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে যে তীব্র বক্তব্য উঠেছে, তা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার পর।
ঢাকা বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধজনিত পরিস্থিতিতে ভারতের সাম্প্রতিক ডিজেল সরবরাহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।
তবে ভারতের রাজধানী দিল্লির প্রতি নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে তারেক রহমান কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার মধ্যবয়স মাত্র ২৭ বছর যা দেশটির জনমিতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গি একমাত্র ভিত্তি হিসেবে না ধরে, পরিবর্তিত বাস্তবতা ও নতুন প্রজন্মের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজই দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চিন্তা করা উচিত।
(ডেকান হেরাল্ড থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদল ইরানের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি বলেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা আমাদের বিশ্বাস অর্জন করতে চায় কি না।
৪০ মিনিট আগে
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলায় ৬ জন নিহত হয়েছে। রোববার (১২ এপ্রিল) দেশটির জাতীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানায়, দক্ষিণ লেবাননের টায়ার জেলার মারউব শহরে ইসরায়েলি হামলায় ওই ৬ জন প্রাণ হারান। খবর আলজাজিরার।
৩ ঘণ্টা আগে
ভারতীয় সংগীত জগতের কিংবদন্তী শিল্পী আশা ভোসলে মারা গেছেন। রোববার (১২ এপ্রিল) মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে গত শনিবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
৫ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সরাসরি আলোচনায়ও সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক বৈঠকেই ইরানের কাছ থেকে বড় ধরনের ছাড় আদায় করতে পারবেন না এটি আগেই অনুমান করা হচ্ছিল। তবে কূটনৈতিক পথ স্পষ্ট না করেই ইসলামাবাদ আলোচনা শেষ হওয়ায় সামনে এসেছে বড় প্রশ্ন-পর
৫ ঘণ্টা আগে