চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। নিকেই এশিয়ার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের ফলে প্রধান সিন্থেটিক ফাইবার ও রাসায়নিকের দাম ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত বেড়েছে। একটি বিশেষ কাঁচামালের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন গুণ।
ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির এই সংকটে বিদেশি ক্রেতারাও পুরনো কার্যাদেশের (অর্ডার) জন্য বাড়তি দাম দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং নাইলন ও পলিয়েস্টারের মতো পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক কাঁচামালের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব ‘ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে’।
উদ্যোক্তারা জানান, আগের কেনা কাঁচামাল দিয়ে এখন উৎপাদন চলছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধের প্রভাব আরও প্রকট হলে সংকট তীব্রতর হবে। মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাভিদুল হক নিকেই এশিয়াকে বলেন, ‘শুধু পলিয়েস্টার বা নাইলন নয়, সব ধরনের সুতা ও কাঁচামালের দাম বাড়ছে।’ অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ জহিরও সিন্থেটিক ফাইবার, সুতা ও কাপড়ের দাম বাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ জানান, পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক কাঁচামালের খরচ ১০-১৫ শতাংশ বাড়লেও কিছু রাসায়নিকের দাম বেড়েছে আকাশচুম্বী। যেমন—কাপড় প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত সালফিউরিক অ্যাসিডের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী লিটার প্রতি ৫০ টাকা থেকে বেড়ে এখন প্রায় ১৫০ টাকায় ঠেকেছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, এই ব্যয় বৃদ্ধির চাপ শুধু পোশাকের কাঁচামালেই সীমাবদ্ধ নেই; কার্টনে ব্যবহৃত কাগজের মতো জ্বালানি-নির্ভর অন্যান্য উপকরণের দামও বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কায় অনেক সরবরাহকারী এখনই দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।’
শামস মাহমুদ আরও উল্লেখ করেন যে, খরচ বাড়লেও আগের অর্ডারের বিপরীতে ক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি দাম আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে স্বল্প মেয়াদে উৎপাদকদের এই লোকসান নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি সতর্ক করেন যে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন না হলে উৎপাদন সময়মতো শেষ করা যাবে না। সেক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হবে।
শিল্প নেতারা বলছেন, এখন পর্যন্ত মূলত খরচ বাড়ার মধ্যেই প্রভাব সীমাবদ্ধ আছে। জাহাজীকরণে বড় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। তবে তেলের দাম বাড়ায় আগামী দিনগুলোতে জাহাজের ভাড়াসহ পরিবহন খরচ বাড়বে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রথম সংঘাত শুরুর পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে। এর ফলে পশ্চিম এশিয়ার দেশটি বিশ্বের তেলের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হওয়ার পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত অবরোধ করে রেখেছে।
বিজিএমইএ-র সহ-সভাপতি শিহাবউদ্দুজা চৌধুরী বলেন, ডিজেল সংকটের কারণে পরিবহন চালকরা জ্বালানি সংগ্রহে দীর্ঘ বা পরোক্ষ পথ ব্যবহার করছেন, যা আমদানি ও রপ্তানি উভয়েরই খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘পরিবহন খরচ বাড়লে ক্রেতারা সেই বোঝা আমাদের ওপর চাপাতে চায়। এটি আমাদের কারও দোষ না হলেও আমাদেরকেই বাড়তি খরচ সইতে বলা হচ্ছে।’
জ্বালানি ঝুঁকিও এখন বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারখানাগুলোতে জেনারেটর চালানোর জন্য সীমিত আকারে ডিজেল সরবরাহের ব্যবস্থা করা হলেও তা অপর্যাপ্ত। সরকারের কাছে এক মাসের জ্বালানি মজুত থাকলেও পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সারি ও রেশনিং ব্যবস্থা সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইতিমধ্যে সরকারি অফিসের সময় কমানো হয়েছে এবং শপিং মলগুলো সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চাহিদার দিক থেকে চিত্রটি মিশ্র। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের মতো প্রধান বাজারগুলোতে এখনো বড় ধরনের অর্ডার বাতিল না হলেও উদ্বেগ বাড়ছে। গত মার্চ মাসে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০% কমেছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের মতো সম্ভাবনাময় নতুন বাজারগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শিহাবউদ্দুজা জানান, গত মাসে সামগ্রিক চাহিদা আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ এখন পোশাকের চেয়ে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
২০২৫ সালের কঠিন সময়ের রেশ কাটতে না কাটতেই এই যুদ্ধ পরিস্থিতি রপ্তানিকারকদের, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। শামস মাহমুদের মতে, ‘বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে কঠিন দিক হলো চরম অনিশ্চয়তা।’