যেভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল শায়খ ও বাংলা ভাইয়ের

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৩: ১৫
বাংলা ভাই ও শায়খ আবদুর রহমান। ছবি: বিবিসি বাংলা থেকে নেওয়া

২০০৭ সালের ২৯ মার্চ রাত। দেশের ছয়টি কারাগারে তখন কড়া নিরাপত্তা। কারাগারের বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন। ভেতরে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ফাঁসির মঞ্চ। তবে ঠিক কখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে, তা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় জঙ্গির মধ্যে ছিলেন নিষিদ্ধঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান এবং সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, খালেদ সাইফুল্লাহ ও ইফতেখার হাসান আল মামুন।

সে রাতেই দেশের ছয়টি কারাগারে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন নথিতে কার্যকরের তারিখ ২৯ মার্চ রাত এবং ৩০ মার্চ—দুইভাবেই এসেছে। মূলত এটি ২৯ মার্চ গভীর রাতে শুরু হয়ে ৩০ মার্চের প্রথম প্রহরে শেষ হওয়া একটি ধারাবাহিক কার্যক্রম।

এটি ছিল বাংলাদেশের জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবির বিরুদ্ধে যে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছিল, তার সবচেয়ে আলোচিত পরিণতিগুলোর একটি ছিল সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বের এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর।

যে মামলায় ফাঁসির রায়

শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ সাত জেএমবি সদস্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলাটি ছিল ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলা।

সেদিন ঝালকাঠির সিনিয়র সহকারী জজ সোহেল আহম্মেদ ও জগন্নাথ পাঁড়ে আদালতে যাওয়ার পথে তাঁদের বহনকারী গাড়িতে বোমা হামলা চালানো হয়। দুজন বিচারক নিহত হন।

এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের পর জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০০৬ সালের ২৯ মে ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হাসান মামুন, খালেদ সাইফুল্লাহ ও আসাদুল ইসলাম আরিফকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

আসামিদের মধ্যে আরিফ তখন পলাতক ছিলেন। বাকি ছয়জন কারাগারে ছিলেন এবং তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া এগোতে থাকে।

উচ্চ আদালতেও বহাল থাকে সাজা

মৃত্যুদণ্ডের মামলায় নিয়ম অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০০৬ সালের ৩১ আগস্ট হাইকোর্ট ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। এরপর আপিল বিভাগে তাঁদের আবেদনও যায়। ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ তাঁদের জেল আপিল খারিজ করে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।

এরপর আসামিরা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। সেটিও নাকচ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকাস্থ দূতাবাসের তৎকালীন একটি কূটনৈতিক নথিতে বলা হয়, ছয়জনের আপিল ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার পর তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়।

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সময় গোপন

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় ও স্থান নিয়ে সরকার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। এমনকি ২০০৭ সালের মার্চের শেষ দিকে গণমাধ্যমে যখন তাঁদের ফাঁসি কার্যকরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল, তখনও কারা কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট সময় প্রকাশ করেনি।

এর পেছনে ছিল নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক সতর্কতা। জেএমবির শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কারাগার ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। ছয় আসামিকে এক কারাগারে না রেখে পৃথক কারাগারে রাখা হয়েছিল। মার্কিন কূটনৈতিক নথিতেও বলা হয়েছে, সরকার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় ও স্থান গোপন রেখেছিল। পরে নিরাপত্তাবাহিনী তাঁদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ ছয়জনকে দেশের বিভিন্ন কারাগারে রাখা হয়েছিল। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয়জনকে চারটি পৃথক কারাগারে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।

দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে তাঁদের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। পুরো কার্যক্রমই ছিল অত্যন্ত কড়াকড়ি নিরাপত্তার মধ্যে।

শেষ সাক্ষাৎ ও শেষ প্রস্তুতি

কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সঙ্গে স্বজনদের শেষ সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। শায়খ আবদুর রহমান ও অন্যদের ক্ষেত্রেও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা কারাগারে গিয়ে দেখা করেন।

কারাগার সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কারা কর্তৃপক্ষ শেষ মুহূর্তের ধর্মীয় ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতাও সম্পন্ন করে। তবে শেষ সাক্ষাতে কী কথা হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য নথিতে পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নেই।

২৯ মার্চ রাত: শেষ মুহূর্তের অভিযান

২৯ মার্চ রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছয় কারাগারেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের মতো বহুল আলোচিত দুই নেতাকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় কারাগারগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এরপর রাতের কোনো এক সময়ে ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাটি এতটাই গোপন রাখা হয়েছিল যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছে দিলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে আসে।

ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫ সালের বোমা হামলার পর ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়েছিল এবং ২০০৭ সালের মার্চে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ ছয় জেএমবি সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

জেএমবির এই দুই শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বাংলাদেশের জঙ্গিবাদবিরোধী ইতিহাসে একটি বিশেষ মুহূর্ত হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র: উইকিলিকস, ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম ও আরব নিউজ

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

যেভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল শায়খ ও বাংলা ভাইয়ের