সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘নবাবপাড়া’, রাজীব শাহ ঘিরে রহস্য

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মসজিদ, ধানখেত ও ফুলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। স্ট্রিম ছবি
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মসজিদ, ধানখেত ও ফুলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। স্ট্রিম ছবি

মসজিদ, পাশেই ধানখেত। মসজিদের আঙিনায় জাতীয় পতাকার সঙ্গে উড়ছে বিএনপির পতাকা। সেখানেই খুপড়ি ঘরে বসবাস রাজীব শাহের। খোদ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বুকে তিনি সাম্রাজ্য গড়ে নাম দিয়েছেন ‘নবাবপাড়া’।

সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি ভাইরাল রাজীব শাহের মসজিদ। মসজিদের ভিডিও ও ছবি শেয়ার করে অনেকেই কমেন্ট করছেন। রাজীব শাহকে ঘিরেও বাড়ছে রহস্য। কে তিনি, কেন এসব করছেন– প্রশ্নে রাজীব শাহ স্ট্রিমকে জানান, উদ্যানে টুকিয়ে পাওয়া বোতল বিক্রির টাকায় তিনি মসজিদটি নির্মাণ করেছেন। পরে বিভিন্নজনের সহযোগিতা পেয়েছেন।

শনিবার (২৫ জুলাই) সরেজমিন দেখা যায়, উদ্যানের মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর ও নাট্যশালার মাঝামাঝি স্থানে করা হয়েছে মসজিদ। সেখানে ইট, কার্পেট ও জায়নামাজ বিছানো। উপরে টানানো ত্রিপল। অজুর পানির জন্য বসানো হয়েছে ট্যাঙ্কি। রয়েছে ওয়াশরুমের ব্যবস্থা। মসজিদে কয়েকটি কুরআন, রেহেল, কুরআনের বঙ্গানুবাদ, কয়েকটি ট্রাংক ও রাজীবের থাকার ঘরে রয়েছে একটি চেয়ার।

উদ্যানের টোকাই ও ভ্রাম্যমাণ পানি বিক্রেতারা জানান, কয়েক মাস আগে এখানে থাকা শুরু করেন রাজীব শাহ। পরে তিনি ধান লাগান। বেশ কয়েকটি ফুলগাছ লাগিয়ে শোভা বাড়ান। নিজের থাকার জন্য ছোট্ট খুপড়ি ঘরও করেন। একপর্যায়ে নিজ উদ্যোগে রাজীব মসজিদ নির্মাণ করেন।

সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি ছাড়া গড়ে তোলা মসজিদ। স্ট্রিম ছবি
সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি ছাড়া গড়ে তোলা মসজিদ। স্ট্রিম ছবি

রাজীব শাহ স্ট্রিমকে আরও বলেন, ‘আমি এক দশকের বেশি উদ্যানে রয়েছি। বোতল টুকিয়ে ভাত খাই। আমার তো মসজিদ তৈরি করার কথা ছিল না। আল্লাহ হয়তো আমাকে কবুল করেছেন। এজন্য আমি একটি মসজিদ করেছি।’

প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামে মসজিদের নামকরণের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর প্রয়াত মা খালেদা জিয়াকে আমি পছন্দ করি। এজন্য মসজিদটি খালেদা জিয়ার নামে করতে চাই। আমি এই এলাকার নাম দিয়েছি নবাবপাড়া। এই এলাকার নাম যেন এটিই থাকে।’

কয়েক মাস আগে এখানে থাকা শুরু করেন রাজীব শাহ। পরে তিনি ধান লাগান। বেশ কয়েকটি ফুলগাছ লাগিয়ে শোভা বাড়ান। নিজের থাকার জন্য ছোট্ট খুপড়ি ঘরও করেন। একপর্যায়ে নিজ উদ্যোগে রাজীব মসজিদ নির্মাণ করেন।

নবাবপাড়া নামকরণের বিষয়ে রাজীব বলেন, ‘আমি এখানে নবাবের মতো থাকি। তাই নাম রাখছি নবাবপাড়া।’ মসজিদ নির্মাণে অনুমতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনুমতি নিইনি। উদ্যানের ভেতরে একটি মন্দির আছে। মসজিদ হতে তো সমস্যা নেই। তাই আমি এই উদ্যোগ নিয়েছি।’

মসজিদে আসা মুসল্লিরা বলছেন, উদ্যানে ঘুরতে আসাদের নামাজের জন্য বাইরে যেতে হয়। এখানে মসজিদের কারণে ঠিকমতো নামাজ পড়া যাচ্ছে। মন্দির থাকলে মসজিদ হতে সমস্যা কোথায়, এমন প্রশ্নও রাখছেন মুসল্লিরা।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গড়ে তোলা মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ হুসাইন। স্ট্রিম ছবি
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গড়ে তোলা মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ হুসাইন। স্ট্রিম ছবি

শনিবার উদ্যানের মসজিদে আছরের নামাজ পড়েন মোহাম্মদ লিয়াকত। কামরাঙ্গীর চর থেকে ঘুরতে আসা লিয়াকত স্ট্রিমকে বলেন, ‘উদ্যানে অনেক মানুষ ঘুরতে আসেন। অনেকের নামাজ পড়ার প্রয়োজন হয়। উদ্যানে নামাজের এই পরিবেশের কারণে নামাজিদের সুবিধা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এটি সরকারি জায়গা। সরকার এখানে প্রয়োজন মনে করলে মসজিদ রাখতে পারে। অনুমতি ছাড়া কেউ জোর করে মসজিদ করলে, সেটি ঠিক হয়নি। আগে আল্লাহর কবুল করা লাগবে। তারপর বান্দারা মিলে বাস্তবায়ন করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পানি বিক্রি করেন দয়াল রশিদ। এখন তিনি মসজিদেই রাত কাটান। স্ট্রিমকে এই বৃদ্ধ বলেন, ‘রাজীব আমাকে দুলাভাই ডাকে। অনেক দিন ধরে সে এখানেই থাকে। শুরুর দিকে ও বলতো– দুলাভাই, আমি এখানে ধানচাষ করব। জায়গাটা পরিষ্কার করব। ফুলগাছ লাগাব। দেখলাম কথামতো কাজ করল।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর প্রয়াত মা খালেদা জিয়াকে আমি পছন্দ করি। এজন্য মসজিদটি খালেদা জিয়ার নামে করতে চাই। আমি এই এলাকার নাম দিয়েছি নবাবপাড়া। এই এলাকার নাম যেন এটিই থাকে। রাজীব শাহ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কর্মযজ্ঞের কারিগর

দয়াল রশিদের ভাষ্যে, এখানে আগে অনেক মানুষ প্রস্রাব-পায়খানা করত। পরে পরিষ্কার ও মসজিদ নির্মাণ করে রাজীব। ওই নবাবপাড়া নাম দিয়েছে। এখন আমি ওর সঙ্গেই থাকি। আরও কয়েক টোকাই, পানি বিক্রেতা মসজিদে রাতে থাকে। মসজিদের পাশাপাশি আমাদের একটি থাকার জায়গাও হয়েছে।

কে এই রাজীব শাহ

রাজীব শাহের বিষয়ে উদ্যোনের লোকজন তেমন কিছু জানাতে পারেননি। শুধু দীর্ঘদিন এখানে তিনি থাকছেন জানিয়েছেন। স্ট্রিমের প্রশ্নে রাজীব শাহ জানান, বাবা-মা হিন্দু না মুসলিম তা তিনি জানেন না। তবে যে দম্পতির সংসারে বড় হয়েছেন, সেখানে পালক মা-বাবাকে নামাজ পড়তে দেখেছেন। তাদের কাছ থেকেই নামাজ-কালাম শিখেছেন।

রাজধানীর বুকে ‘নবাবপাড়া’ গড়ে তোলার কারিগর রাজীব শাহ। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর বুকে ‘নবাবপাড়া’ গড়ে তোলার কারিগর রাজীব শাহ। ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, ‘আমার মা-বাবা কেউ নেই। ছোটবেলায় আমি হারিয়ে যাই। পরে রাজধানীর শ্যামলী থেকে আমাকে তুলি নিয়ে যান একটা দম্পতি। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে তাদের কাছেই বড় হয়েছি। এরপর ছয় বছর বয়সে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকি, বোতল টুকিয়ে তা বেঁচে চলি।’

ব্যবস্থা নিচ্ছে মন্ত্রণালয়

সরকারি জায়গা দখল করে মসজিদ নির্মাণকে বেআইনি বলছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্যকর্তারা। তারা বলছেন, সরকারি জায়গা দখল করে মসজিদ, মন্দির বা যে কোনো স্থাপনা তৈরির কোনো সুযোগ নেই। এসব করতে আগে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। অন্যথায় সরকার ব্যবস্থা নেবে।

নাম প্রকাশ না করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের (ঢাকা বিভাগের) এক নির্বাহী প্রকৌশলী স্ট্রিমকে জানান, তাদের নজরে এসেছে রাজীবের মসজিদ। কিছু কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বিষয়টি উসকে দিচ্ছেন। কিন্তু অনুমতি ছাড়া সরকারি জায়গায় এসব স্থাপনা তৈরির কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া সরকারের অর্থায়নে উদ্যানের ভেতরে একটি মসজিদ করা হচ্ছে। ফলে শিগগির রাজীবের এই মসজিদ উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

চলে যাচ্ছেন ইমাম

মসজিদটি আলোচনায় আসার অন্যতম কারণ মোহাম্মদ হুসাইন। কোনো সুবিধা ছাড়াই এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ান তিনি। হুসাইন জানান, আগে মাদারীপুরের একটি মসজিদে ইমামতি করতেন। সেই চাকরি ছেড়ে ঢাকা আসেন। কোনো উপায় না পেয়ে উদ্যানে পানি বিক্রি শুরু করেন। মসজিদের ব্যাপারে জানতে পারেন তিনি।

মসজিদে আসা মুসল্লিদের অজুর জন্য পানির ব্যবস্থা রয়েছে। স্ট্রিম ছবি
মসজিদে আসা মুসল্লিদের অজুর জন্য পানির ব্যবস্থা রয়েছে। স্ট্রিম ছবি

মোহাম্মদ হুসাইন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার নিজের জন্যই এই মসজিদে নামাজ পড়া শুরু করি। এখানে নামাজ পড়ানোর কেউ না থাকায় আমি পড়াতে থাকি। আমি আজ (শনিবার) চলে যাচ্ছি।’ চলে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘১৩ দিন আমি মসজিদে ইমামতি করেছি। অনেক মানুষ এই মসজিদকে পছন্দ করা শুরু করেছেন। তবে অনেকে গালাগালিও করছেন। ইদানিং অনেকে হুমকিধমকি দিচ্ছেন। উদ্যানের মাদকসেবীদের অত্যাচার আর সহ্য করতে পারছি না। তবে আমি চাই মসজিদটি থাকুক। কেউ না কেউ তো ইমামতি করবেন।’

এ ব্যাপারে পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। কোনো ম্যাজিস্ট্রেট উচ্ছেদ অভিযান চালালে, তাঁকে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত