স্ট্রিম প্রতিবেদক

শ্রম আইনে কোনো মামলা ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে তা বছরের পর বছর চলতে থাকে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং শ্রম আদালতে বর্তমানে ২৭ হাজার ৪০৭টি মামলা রয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি মাসে নতুন মামলার হার নিষ্পত্তির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। মার্চ মাসে নতুন করে ৭১৮টি মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪০৯টি।
ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতের চিত্র দেখলেই এই সংকটের গভীরতা বোঝা যায়। ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতেই বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৬ হাজার ৩৯৮টি। এর মধ্যে উচ্চ আদালতের আদেশে প্রায় দেড় হাজার ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা স্থগিত (স্টে) অবস্থায় পড়ে আছে। প্রথম শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪ হাজার ৪ শ ৯৩টি। । অন্যদিকে, তুলনামূলক কম হলেও তৃতীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১ শ ৫৯।
মামলার এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে অবশ্য কিছু ইতিবাচক ব্যক্তিগত উদ্যোগও চোখে পড়ছে। দ্বিতীয় শ্রম আদালতের বর্তমান চেয়ারম্যান (বিচারক) রাজিয়া সুলতানা মামলা জট কমাতে ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন। আদালতের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান চেয়ারম্যান কোনো দীর্ঘ সময় দেন না। মানবিক কারণে সর্বোচ্চ তিনবার সময় আবেদন (টাইম পিটিশন) মঞ্জুর করলেও চতুর্থবার তা সরাসরি নামঞ্জুর করে মামলার পরবর্তী ধাপে চলে যান। এতে কাজের গতিশীলতা বাড়ছে এবং মাসে গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে।
জনবল সংকট: আইনি জটিলতায় নিয়োগ স্থগিত
আদালতের কাজের কাঙ্ক্ষিত গতি না বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে প্রকট জনবল সংকটকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। চারজনের কাজ করতে হচ্ছে মাত্র দুজনকে। ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতের অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও বর্তমান বেঞ্চ সহকারী শেখ নূর ইমামা তাপস জানান, দীর্ঘদিন ধরে বেঞ্চ সহকারী এবং অফিস সহকারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। লোকবল সংকটের কারণে কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ছে এবং তাদের বাধ্য হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।
জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া আইনি জটিলতায় আটকা পড়ে আছে। শ্রম মন্ত্রণালয় নিয়োগপত্র দেওয়ার পরও এক চাকরিপ্রার্থীর রিটের কারণে হাইকোর্ট সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয় বলে জানান এই কর্মকর্তা।
লেবার কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সেলিম আহসান খান জানান, দক্ষ পেশকার না থাকায় অনেক সময় হিসাব-নিকাশে পটু এমন অচেনা মানুষ দিয়ে কোর্ট চালানো হচ্ছে, যা বিচারে যান্ত্রিক ভুল হওয়ার বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি করে। তবে শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সংকট কাটাতে ১০টি শ্রম আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ৪০টি পদে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩২ জন কাজে যোগ দিয়েছেন।
কোর্ট গঠন জটিলতা ও মেম্বারদের রাজনৈতিক ব্যস্ততা
মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে শুধু জনবল নয়, কিছু কাঠামোগত বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন (আইআর) ও অভিযোগ মামলার ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের সঙ্গে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি (মেম্বার) নিয়ে কোর্ট গঠন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই মেম্বাররা প্রায়ই আদালতে অনুপস্থিত থাকেন।
আইনজীবী সেলিম আহসান খান এই সংকটের রাজনৈতিক দিকটি তুলে ধরে বলেন, ‘মেম্বাররা সাধারণত রাজনৈতিক ব্যক্তি হন। অনেক সময় তারা শ্রম আদালতে আসার চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি ব্যস্ত থাকেন। উনারা না থাকলে মামলা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।’
তিনি অভিযোগ করেন, মালিকপক্ষ এই মেম্বারদের অনুপস্থিতির সুযোগটি সুকৌশলে কাজে লাগায়। আইনের ২১৪(১১) ধারায় বলা আছে যে মেম্বার থাকা ম্যান্ডেটরি নয়, কিন্তু মালিকপক্ষ প্রায়ই এই ওজর তুলে সময়ক্ষেপণ করে। শ্রমিক চায় মামলা দ্রুত শেষ হোক, আর মালিক চায় শ্রমিক কতদিন দৌড়াতে পারে তা দেখে নিতে।
কাঠামোগত বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি বিচারকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবকেও দায়ী করে তিনি বলেন, সিনিয়র ডিস্ট্রিক্ট জজরা দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাধারণ আইন নিয়ে কাজ করলেও লেবার ল বা শ্রম আইন নিয়ে তাদের চর্চা কম থাকে। ফলে শ্রম আদালতে পদায়নের আগে তাদের অন্তত ছয় মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি।
ভাড়া বাসায় বিচার: অবকাঠামোগত দৈন্য
অবকাঠামোগত দিক থেকেও শ্রম আদালতগুলোর অবস্থা করুণ। দেশের অধিকাংশ শ্রম আদালতের নিজস্ব কোনো স্থায়ী ভবন নেই। ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতের কার্যক্রম একসময় গণপূর্ত অধিদপ্তরের জরাজীর্ণ ভবনে চলত, যা পরিত্যক্ত ঘোষিত হওয়ায় বর্তমানে রাজধানীর টেপা কমপ্লেক্সে একটি ভাড়া করা ফ্লোরে (চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠতলা) চলছে।
আদালতের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি নিজস্ব ভবনটি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার ভয় ছিল। সেখানে লিফট ছিল না, ছিল না ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসায় শিফট করা হলেও সরকারি স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
মামলার বাদী ডিআইএফইর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ
শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) এবং শ্রম অধিদপ্তরের পরিদর্শকদের ভূমিকা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, একসময় পরিদর্শকরা স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করতেন, কিন্তু এখন অজ্ঞাত কোনো চাপে তারা পরিদর্শন ও মামলার সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আইনজীবী সেলিম আহসান খান একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে জানান, অনেক সময় পরিদর্শকরা আদালতে হাজিরা না দিয়ে অন্য কাজে চলে যান এবং বিবাদী আইনজীবীকে এসে ডেট পেছানোর অনুরোধ করেন। তাদের কোনো দক্ষ লিগ্যাল উইং বা আইনি শাখা নেই যারা শ্রমিকদের আইনি লড়াইয়ে সহযোগী হবে।
বর্তমানে ডিআইএফইর অধীনে বিভিন্ন আদালতে ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আইন সংশোধন বনাম মাঠের বাস্তবতা
গত ৮ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস হয়। কিন্তু বারবার আইন পরিবর্তনের এই সংস্কৃতিকে সমালোচনা করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।
এ প্রসঙ্গে আইনজীবী সেলিম বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত অনেক আইন বড় কোনো সংশোধন ছাড়াই চলেছে, কিন্তু ২০০৬ সালের পর থেকে একের পর এক সংশোধনী আসছে যা প্রায়শই মালিকপক্ষ বা বিশেষ শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করে।
তিনি উদাহরণ দেন, কারখানায় শ্রমিকদের কোনো নোটিশ ছাড়াই মৌখিক টার্মিনেশন বা ছাঁটাই করা হয়। এটি ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ঘটলেও মৌখিক ছাঁটাইকে নতুন আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি।
তিনি আরো বলেন, দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য ২ লাখ টাকা এবং অক্ষম হওয়ার জন্য আড়াই লাখ টাকার ক্ষতিপূরণকে তিনি বর্তমান বাজারের তুলনায় মূল্যহীন।
তবে নতুন আইনের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে যুক্ত হওয়া ৩১৯ক ধারা অনুযায়ী মালিকের বৈরী আচরণের শিকার হলে শ্রমিক সরাসরি আদালতে যেতে পারবেন। ২০২৬ সালের আইনে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ (এডিআর) যুক্ত করা হয়েছে।
বাধ্যবাধকতা না থাকলে আইনটি কার্যকর হবে কি না—এমন প্রসঙ্গে বিচারকের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই জায়গায় পৌঁছাতে গেলে জজ সাহেবের বিশেষ ভূমিকা রাখা দরকার। তাকে মিডিয়টের বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আসতে হবে এবং দুই পক্ষকে অনেকক্ষণ ধরে কনভিন্স করতে হবে। তা না হলে মালিক যখন দেখবে তাকে ১০ টাকা কম্পেনসেশন দিতে হচ্ছে, তখন সে ট্রায়ালে যাওয়ার কথা বলে মামলা প্রলম্বিত করার চেষ্টা করবে।’
বিদ্যমান প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু আশার আলো দেখছেন লেবার কোর্টের আইনজীবী আমেনা আক্তার দেওয়ান। তিনি বলেন, আদালতে মামলার সংখ্যা বাড়ার অর্থ হলো শ্রমজীবী মানুষের বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়ছে। তারা এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে নিজেদের অধিকারের লড়াইয়ে শামিল হচ্ছেন।
মামলার চাপ সামলাতে এবং বিচারকাজ বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে সরকার দেশে শ্রম আদালতের সংখ্যা বাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, দেশব্যাপী মোট ১৪টি শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ৩টি এবং চট্টগ্রামে ২টি। বাকি ৯টি শ্রম আদালত খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে। আগামী অর্থবছরে কিশোরগঞ্জকেও ময়মনসিংহ আদালতের অধিক্ষেত্রের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

শ্রম আইনে কোনো মামলা ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে তা বছরের পর বছর চলতে থাকে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং শ্রম আদালতে বর্তমানে ২৭ হাজার ৪০৭টি মামলা রয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি মাসে নতুন মামলার হার নিষ্পত্তির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। মার্চ মাসে নতুন করে ৭১৮টি মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪০৯টি।
ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতের চিত্র দেখলেই এই সংকটের গভীরতা বোঝা যায়। ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতেই বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৬ হাজার ৩৯৮টি। এর মধ্যে উচ্চ আদালতের আদেশে প্রায় দেড় হাজার ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা স্থগিত (স্টে) অবস্থায় পড়ে আছে। প্রথম শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪ হাজার ৪ শ ৯৩টি। । অন্যদিকে, তুলনামূলক কম হলেও তৃতীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১ শ ৫৯।
মামলার এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে অবশ্য কিছু ইতিবাচক ব্যক্তিগত উদ্যোগও চোখে পড়ছে। দ্বিতীয় শ্রম আদালতের বর্তমান চেয়ারম্যান (বিচারক) রাজিয়া সুলতানা মামলা জট কমাতে ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন। আদালতের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান চেয়ারম্যান কোনো দীর্ঘ সময় দেন না। মানবিক কারণে সর্বোচ্চ তিনবার সময় আবেদন (টাইম পিটিশন) মঞ্জুর করলেও চতুর্থবার তা সরাসরি নামঞ্জুর করে মামলার পরবর্তী ধাপে চলে যান। এতে কাজের গতিশীলতা বাড়ছে এবং মাসে গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে।
জনবল সংকট: আইনি জটিলতায় নিয়োগ স্থগিত
আদালতের কাজের কাঙ্ক্ষিত গতি না বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে প্রকট জনবল সংকটকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। চারজনের কাজ করতে হচ্ছে মাত্র দুজনকে। ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতের অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও বর্তমান বেঞ্চ সহকারী শেখ নূর ইমামা তাপস জানান, দীর্ঘদিন ধরে বেঞ্চ সহকারী এবং অফিস সহকারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। লোকবল সংকটের কারণে কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ছে এবং তাদের বাধ্য হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।
জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া আইনি জটিলতায় আটকা পড়ে আছে। শ্রম মন্ত্রণালয় নিয়োগপত্র দেওয়ার পরও এক চাকরিপ্রার্থীর রিটের কারণে হাইকোর্ট সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয় বলে জানান এই কর্মকর্তা।
লেবার কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সেলিম আহসান খান জানান, দক্ষ পেশকার না থাকায় অনেক সময় হিসাব-নিকাশে পটু এমন অচেনা মানুষ দিয়ে কোর্ট চালানো হচ্ছে, যা বিচারে যান্ত্রিক ভুল হওয়ার বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি করে। তবে শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সংকট কাটাতে ১০টি শ্রম আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ৪০টি পদে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩২ জন কাজে যোগ দিয়েছেন।
কোর্ট গঠন জটিলতা ও মেম্বারদের রাজনৈতিক ব্যস্ততা
মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে শুধু জনবল নয়, কিছু কাঠামোগত বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন (আইআর) ও অভিযোগ মামলার ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের সঙ্গে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি (মেম্বার) নিয়ে কোর্ট গঠন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই মেম্বাররা প্রায়ই আদালতে অনুপস্থিত থাকেন।
আইনজীবী সেলিম আহসান খান এই সংকটের রাজনৈতিক দিকটি তুলে ধরে বলেন, ‘মেম্বাররা সাধারণত রাজনৈতিক ব্যক্তি হন। অনেক সময় তারা শ্রম আদালতে আসার চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি ব্যস্ত থাকেন। উনারা না থাকলে মামলা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।’
তিনি অভিযোগ করেন, মালিকপক্ষ এই মেম্বারদের অনুপস্থিতির সুযোগটি সুকৌশলে কাজে লাগায়। আইনের ২১৪(১১) ধারায় বলা আছে যে মেম্বার থাকা ম্যান্ডেটরি নয়, কিন্তু মালিকপক্ষ প্রায়ই এই ওজর তুলে সময়ক্ষেপণ করে। শ্রমিক চায় মামলা দ্রুত শেষ হোক, আর মালিক চায় শ্রমিক কতদিন দৌড়াতে পারে তা দেখে নিতে।
কাঠামোগত বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি বিচারকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবকেও দায়ী করে তিনি বলেন, সিনিয়র ডিস্ট্রিক্ট জজরা দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাধারণ আইন নিয়ে কাজ করলেও লেবার ল বা শ্রম আইন নিয়ে তাদের চর্চা কম থাকে। ফলে শ্রম আদালতে পদায়নের আগে তাদের অন্তত ছয় মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি।
ভাড়া বাসায় বিচার: অবকাঠামোগত দৈন্য
অবকাঠামোগত দিক থেকেও শ্রম আদালতগুলোর অবস্থা করুণ। দেশের অধিকাংশ শ্রম আদালতের নিজস্ব কোনো স্থায়ী ভবন নেই। ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতের কার্যক্রম একসময় গণপূর্ত অধিদপ্তরের জরাজীর্ণ ভবনে চলত, যা পরিত্যক্ত ঘোষিত হওয়ায় বর্তমানে রাজধানীর টেপা কমপ্লেক্সে একটি ভাড়া করা ফ্লোরে (চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠতলা) চলছে।
আদালতের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি নিজস্ব ভবনটি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার ভয় ছিল। সেখানে লিফট ছিল না, ছিল না ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসায় শিফট করা হলেও সরকারি স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
মামলার বাদী ডিআইএফইর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ
শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) এবং শ্রম অধিদপ্তরের পরিদর্শকদের ভূমিকা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, একসময় পরিদর্শকরা স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করতেন, কিন্তু এখন অজ্ঞাত কোনো চাপে তারা পরিদর্শন ও মামলার সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আইনজীবী সেলিম আহসান খান একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে জানান, অনেক সময় পরিদর্শকরা আদালতে হাজিরা না দিয়ে অন্য কাজে চলে যান এবং বিবাদী আইনজীবীকে এসে ডেট পেছানোর অনুরোধ করেন। তাদের কোনো দক্ষ লিগ্যাল উইং বা আইনি শাখা নেই যারা শ্রমিকদের আইনি লড়াইয়ে সহযোগী হবে।
বর্তমানে ডিআইএফইর অধীনে বিভিন্ন আদালতে ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আইন সংশোধন বনাম মাঠের বাস্তবতা
গত ৮ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস হয়। কিন্তু বারবার আইন পরিবর্তনের এই সংস্কৃতিকে সমালোচনা করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।
এ প্রসঙ্গে আইনজীবী সেলিম বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত অনেক আইন বড় কোনো সংশোধন ছাড়াই চলেছে, কিন্তু ২০০৬ সালের পর থেকে একের পর এক সংশোধনী আসছে যা প্রায়শই মালিকপক্ষ বা বিশেষ শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করে।
তিনি উদাহরণ দেন, কারখানায় শ্রমিকদের কোনো নোটিশ ছাড়াই মৌখিক টার্মিনেশন বা ছাঁটাই করা হয়। এটি ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ঘটলেও মৌখিক ছাঁটাইকে নতুন আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি।
তিনি আরো বলেন, দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য ২ লাখ টাকা এবং অক্ষম হওয়ার জন্য আড়াই লাখ টাকার ক্ষতিপূরণকে তিনি বর্তমান বাজারের তুলনায় মূল্যহীন।
তবে নতুন আইনের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে যুক্ত হওয়া ৩১৯ক ধারা অনুযায়ী মালিকের বৈরী আচরণের শিকার হলে শ্রমিক সরাসরি আদালতে যেতে পারবেন। ২০২৬ সালের আইনে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ (এডিআর) যুক্ত করা হয়েছে।
বাধ্যবাধকতা না থাকলে আইনটি কার্যকর হবে কি না—এমন প্রসঙ্গে বিচারকের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই জায়গায় পৌঁছাতে গেলে জজ সাহেবের বিশেষ ভূমিকা রাখা দরকার। তাকে মিডিয়টের বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আসতে হবে এবং দুই পক্ষকে অনেকক্ষণ ধরে কনভিন্স করতে হবে। তা না হলে মালিক যখন দেখবে তাকে ১০ টাকা কম্পেনসেশন দিতে হচ্ছে, তখন সে ট্রায়ালে যাওয়ার কথা বলে মামলা প্রলম্বিত করার চেষ্টা করবে।’
বিদ্যমান প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু আশার আলো দেখছেন লেবার কোর্টের আইনজীবী আমেনা আক্তার দেওয়ান। তিনি বলেন, আদালতে মামলার সংখ্যা বাড়ার অর্থ হলো শ্রমজীবী মানুষের বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়ছে। তারা এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে নিজেদের অধিকারের লড়াইয়ে শামিল হচ্ছেন।
মামলার চাপ সামলাতে এবং বিচারকাজ বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে সরকার দেশে শ্রম আদালতের সংখ্যা বাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, দেশব্যাপী মোট ১৪টি শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ৩টি এবং চট্টগ্রামে ২টি। বাকি ৯টি শ্রম আদালত খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে। আগামী অর্থবছরে কিশোরগঞ্জকেও ময়মনসিংহ আদালতের অধিক্ষেত্রের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে শ্রমিক দল। শুক্রবার (১ মে) বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে এক সমাবেশে এসব প্রস্তাব দেন সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
১৮ মিনিট আগে
বিএনপি-সমর্থিত নীল প্যানেলের বিরুদ্ধে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে ন্যাশনাল লইয়ার্স অ্যালায়েন্স (এনএলএ)। শুক্রবার (১ মে) এক বিবৃতিতে এই নির্বাচনকে পরিকল্পিত জালিয়াতি ও ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী এই সংগঠন।
৩৬ মিনিট আগে
এসএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্নফাঁসের গুজবসহ বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রচার রোধে নজরদারি জোরদার করার নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ।
১ ঘণ্টা আগে
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অন্যতম কারিগর বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা। নিজের ও পরিবারের ভাগ্য বদলের আশায় তাঁরা পরবাসে পাড়ি জমালেও দিনশেষে তাঁদের ‘পরিচয়’ ও ‘অধিকার’ নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
১ ঘণ্টা আগে