leadT1ad

এআই বিজ্ঞানী বনাম মানুষের প্রজ্ঞা: বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ কার দখলে

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ১২: ২৭
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

১৯৮৯ সালে লেখা এক যুগান্তকারী প্রবন্ধে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ম্যাক্স পেরুটজ, ‘মানবজাতির কি বিজ্ঞানের প্রয়োজন আছে?’ অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ আণবিক বিজ্ঞানী হিমোগ্লোবিনের গঠন আবিষ্কারের জন্য ১৯৬২ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কেবল ল্যাবরেটরির গবেষণাই নয়, বিজ্ঞানের দার্শনিক ও মানবিক দিক নিয়েও তাঁর ছিল গভীর বোঝাপড়া।

তৎকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তাঁর করা প্রশ্নের উত্তরটি খুব স্বাভাবিকভাবেই ‘হ্যাঁ’ ছিল। কিন্তু আজ প্রযুক্তির এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা যদি পেরুটজের সেই প্রশ্নটিকে উল্টে দিয়ে জিজ্ঞাসা করি, ‘বিজ্ঞানের কি মানুষের প্রয়োজন আছে?’, তবে তার উত্তর খোঁজা মোটেও সহজ হবে না।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে আমাদের ঠিক এমনই এক গভীর ভাবনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘ন্যাচার’-এর একটি সাম্প্রতিক প্রকাশনা। সাময়িকীটির ২০২৬ সালের মে মাসের সংখ্যায় (ভলিউম ৬৪৫, ইস্যু ৮১১০) এমন দুটি যুগান্তকারী গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, যা বিজ্ঞানচর্চায় মানুষের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তোলে। এর মধ্যে গুগল ডিপমাইন্ড-এর গবেষক দল কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘Generating novel scientific hypotheses with Co-Scientist’। আর এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ফিউচারহাউস'-এর বিজ্ঞানী দলের যৌথ গবেষণায় প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘Iterative wet-lab discovery of novel therapeutics using the Robin multi-agent system’।

এই দুটি গবেষণাপত্রই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে একটি বিষয় প্রমাণ করেছে—ওষুধ আবিষ্কারের মতো জটিল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় মানুষের একক আধিপত্য বা একচ্ছত্র ভূমিকা দিনে দিনে ফুরিয়ে আসছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই রূপান্তরটি ঘটছে আণবিক জীববিজ্ঞানের মতো অত্যন্ত জটিল ক্ষেত্রে, যা কাকতালীয়ভাবে ছিল খোদ নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ম্যাক্স পেরুটজেরই আজীবন গবেষণার মূল চারণভূমি।

বিজ্ঞান কেবল একরাশ যান্ত্রিক তথ্যের সমাহার নয়, বরং তা মানুষের কৌতূহল, আবেগ, সমালোচনাধর্মী চিন্তাভাবনা এবং নৈতিক মূল্যবোধের এক মহৎ বহিঃপ্রকাশ। যেখানে এআই-এর গাণিতিক হিসেব-নিকেশের দৌড় শেষ, সেখান থেকেই মূলত মানুষের সৃজনশীল অন্তর্দৃষ্টির শুরু।

উল্লেখ্য, এই আণবিক জীববিজ্ঞানের জগতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় সাফল্যটি এসেছে গুগল ডিপমাইন্ড-এর হাত ধরে, যার গবেষণা দলের নেতৃত্বে রয়েছেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী জন জাম্পার। প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক জটিল গঠন নিখুঁতভাবে নির্ধারণের জন্য তিনি ‘আলফাফোল্ড’ নামক একটি বিপ্লবী এআই সিস্টেম উদ্ভাবন করেন, যা জীববিজ্ঞানের ৫০ বছর পুরোনো এক মহা-ধাঁধার অবসান ঘটায়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ জন জাম্পার ২০২৪ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বর্তমানে এই আলফাফোল্ড প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হচ্ছে একাধিক স্বায়ত্তশাসিত এআই এজেন্টের সমন্বিত নেটওয়ার্ক বা 'মাল্টি-এজেন্ট সিস্টেম'।

এই যান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলো মানুষের কোনো প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়াই একা একাই লাখ লাখ জটিল বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ও ডেটাবেস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়তে পারে, সুনির্দিষ্ট রোগের জন্য সম্পূর্ণ নতুন অনুমিত সিদ্ধান্ত বা হাইপোথিসিস সাজাতে পারে এবং সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসাটি খুঁজে পেতে নিজেদের ডিজিটাল এজেন্টগুলোর মধ্যে যুক্তি-তর্কেও লিপ্ত হতে পারে।

নতুন এই বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের গভীরতা বুঝতে আমাদের ল্যাবরেটরির বাস্তব কিছু উদাহরণের দিকে তাকাতে হবে। যেমন, সান ফ্রান্সিসকোর অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফিউচারহাউস’-এর তৈরি এআই সিস্টেম ‘রোবিন’-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চোখের একটি অত্যন্ত জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধি (Dry Age-related Macular Degeneration) এর চিকিৎসা খুঁজে বের করার। রোবিন চোখের পলকে বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের মহাসমুদ্র চষে ফেলে সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি চিকিৎসা কৌশল তৈরি করে এবং পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক অণুগুলো চিহ্নিত করে। এরপর মানব গবেষকেরা ল্যাবরেটরিতে বাস্তব পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করে প্রাপ্ত ফলাফল পুনরায় সিস্টেমটিতে ইনপুট দেন; আর রোবিন সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সাজিয়ে নেয় পরবর্তী কর্মপরিকল্পনার নকশা।

বিজ্ঞানীদের করা হিসাব অনুযায়ী, মানুষের চিরচেনা সাধারণ কর্মপদ্ধতির তুলনায় রোবিন এই গবেষণার সময়কে প্রায় ২০০ গুণ কমিয়ে এনেছে! একইভাবে, ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ‘ভিউ’-তে গুগলের গবেষকদের তৈরি এআই সিস্টেম ‘কো-সায়েন্টিস্ট’ রক্ত ক্যান্সার (লিউকেমিয়া) ও লিভার ফাইব্রোসিসের চিকিৎসায় নতুন ড্রাগ টার্গেট খুঁজে বের করতে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। এমনকি মানব বিজ্ঞানীরা যে অণুজীব সংক্রান্ত জটিল ধাঁধার সমাধান প্রায় এক দশক ধরে করতে পারছিলেন না, কো-সায়েন্টিস্ট তার একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও চমৎকার ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে।

এত সব জাদুকরী সাফল্যের পরও যদি আমরা মনে করি বিজ্ঞানচর্চায় মানুষের দিন ফুরিয়ে এসেছে, তবে তা হবে মস্ত বড় ভুল। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত কাজ করে মেশিন লার্নিং এবং বিপুল পরিমাণ ডেটা বা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। এর নিজস্ব কোনো বোধশক্তি বা চেতনা নেই, যার কারণে এআই বস্তুনিষ্ঠ সত্য, মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং ধর্মীয় বা আত্মিক আস্থার মধ্যে স্পষ্ট কোনো পার্থক্য করতে পারে না।

ইন্টারনেট বা ডেটাবেসে থাকা তথ্য যদি কোনো কারণে ভুল, পক্ষপাতদুষ্ট, অন্যায্য বা অসংলগ্ন হয়, তবে এআই তার ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। তাছাড়া এই সিস্টেমগুলোর বড় সীমাবদ্ধতা হলো এদের ‘হ্যালুসিনেশন’ বা মনগড়া তথ্য ও উপাত্ত বানিয়ে ফেলার প্রবৃত্তি। যন্ত্রের তৈরি এমন সূক্ষ্ম কিন্তু মারাত্মক ভুল ব্যাখ্যাগুলো ধরার জন্য মানুষের কড়া নজরদারি ও বিচারবুদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ভাষায় এটি কোনো ত্রুটি বা ‘বাগ’ নয়, বরং মানুষের এই সক্রিয় অংশগ্রহণই এই ব্যবস্থার মূল শক্তি বা ‘ফিচার’। মানুষকে এই বিজ্ঞানচর্চার চক্র থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া অসম্ভব, কারণ একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ল্যাব চালাতে গেলে যে শত শত এআই এজেন্টের পারস্পরিক সমন্বয়ের প্রয়োজন, তা দীর্ঘ ও জটিল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় নিখুঁতভাবে ধরে রাখা যন্ত্রের পক্ষে এখনো সুদূরপরাহত।

আসলে, বিজ্ঞানের জগতে শুধু তথ্য বিশ্লেষণই শেষ কথা নয়। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে হলে যে গভীর সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং মানসিক ও আবেগময় শক্তির প্রয়োজন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তা একেবারেই নেই। এআই-এর কোনো স্বভাবজাত কৌতূহল নেই, নেই বিজ্ঞানের প্রতি কোনো গভীর আবেগ, প্যাশন কিংবা নিজস্ব অনুপ্রেরণা। প্রকৃতির জটিল রহস্যগুলোর জট খুলতে কিংবা সম্পূর্ণ নতুন কোনো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুগান্তকারী কিছু উদ্ভাবন করতে বিজ্ঞানীদের যে মানসিক তাড়না কাজ করে, তা কেবল জীবন্ত মানুষেরই বৈশিষ্ট্য। মানবীয় জ্ঞান কোনো সরলরেখায় চলে না। তা গড়ে ওঠে অতীত ব্যর্থতা, ভুলভ্রান্তি এবং দীর্ঘ পথ পরিক্রমার চড়াই-উতরাই থেকে শেখা পাঠের মাধ্যমে।

ভবিষ্যতের বিজ্ঞানকে একপাক্ষিক যান্ত্রিকতার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে হলে আমাদের এআই-এর অতি-প্রচারণা ও হাইপের মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিজ্ঞানকে মানুষের জন্য কল্যাণকর রাখতে হলে যন্ত্রকে রাখতে হবে সহযোগীর ভূমিকায়, আর প্রগতির লাগাম থাকতে হবে মানুষের হাতেই।

মানুষের স্বভাবজাত খামখেয়ালিপনা এবং খেলার ছলে নতুন কিছু খোঁজার আদিম প্রবণতাই আজ পর্যন্ত সভ্যতার বড় বড় আবিষ্কারের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে। এআই হয়তো গাণিতিক দক্ষতায় নিখুঁত এবং অবিশ্বাস্য রকমের দ্রুতগতির হতে পারে, কিন্তু কাজের এই অধিকতর কার্যদক্ষতা বা ‘এফিশিয়েন্সি’ কখনোই মানুষের গভীর অন্তর্দৃষ্টি বা ‘ইনসাইট’-এর সমার্থক হতে পারে না।

ভবিষ্যতের বিজ্ঞান কোন পথে হাঁটবে, তা নিয়ে বর্তমানে গবেষকদের মধ্যে এক তীব্র দ্বিমুখী টানাপোড়েন চলছে। বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন এআই মানুষের ল্যাবের ক্লান্তিকর দিনগুলোর অবসান ঘটিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে এবং চোখের পলকে নতুন নতুন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আবিষ্কারের এক সোনালী পথ দেখাবে। অন্য অংশটি আবার এক ভয়াবহ আশঙ্কাজনক ভবিষ্যৎ দেখছেন, যেখানে পুরো বৈজ্ঞানিক সাহিত্য কৃত্রিম উপাদানের আবর্জনায় দূষিত হয়ে পড়বে। মানব গবেষকেরা তাদের কাজের সুযোগ ও প্রাসঙ্গিকতা হারাবেন এবং বিজ্ঞান তার সহজাত মানবিক স্পর্শ, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার ভিত্তিটিই হারিয়ে ফেলবে।

পরিশেষে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভূতপূর্ব উত্থান বৈজ্ঞানিক গবেষণার গতিকে ত্বরান্বিত করলেও এটি মানুষের প্রজ্ঞার বিকল্প নয়, বরং তার অনন্য পরিপূরক। গুগল ডিপমাইন্ড ও ফিউচারহাউসের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো প্রমাণ করে যে, এআই জটিল তথ্য বিশ্লেষণ ও ওষুধ আবিষ্কারের সময়কে অবিশ্বাস্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ডেটা এবং অ্যালগরিদমের নিজস্ব কোনো চেতনা নেই। ফলে বস্তুনিষ্ঠ সত্য, বিশ্বাস ও আস্থার সূক্ষ্ম বিভেদরেখা চিহ্নিত করা কিংবা তথ্যের সত্যতা যাচাই করার মতো অপরিহার্য সক্ষমতা এআই-এর নেই।

বিজ্ঞান কেবল একরাশ যান্ত্রিক তথ্যের সমাহার নয়, বরং তা মানুষের কৌতূহল, আবেগ, সমালোচনাধর্মী চিন্তাভাবনা এবং নৈতিক মূল্যবোধের এক মহৎ বহিঃপ্রকাশ। যেখানে এআই-এর গাণিতিক হিসেব-নিকেশের দৌড় শেষ, সেখান থেকেই মূলত মানুষের সৃজনশীল অন্তর্দৃষ্টির শুরু।

ভবিষ্যতের বিজ্ঞানকে একপাক্ষিক যান্ত্রিকতার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে হলে আমাদের এআই-এর অতি-প্রচারণা ও হাইপের মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিজ্ঞানকে মানুষের জন্য কল্যাণকর রাখতে হলে যন্ত্রকে রাখতে হবে সহযোগীর ভূমিকায়, আর প্রগতির লাগাম থাকতে হবে মানুষের হাতেই। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ম্যাক্স পেরুটজের সেই কালজয়ী সংশয়কে সত্যে রূপান্তর করতে হলে আজ আমাদের দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে—বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগেও মানুষের অনিবার্যতা চিরন্তন ও অপরিসীম।

  • অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলাম: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই)
Ad 300x250

সম্পর্কিত