leadT1ad

ইন্টারপোল কী, কীভাবে কাজ করে

স্ট্রিম গ্রাফিক

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে বলে গতকাল রোববার (১৪ জুন) খবর প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে আলোচনায় এসেছে ‘ইন্টারপোল’ শব্দটি।

ইন্টারপোল হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা। এর পুরো নাম ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন। সাধারণত অপরাধী যখন নিজ দেশ থেকে পালিয়ে অন্য দেশে চলে যায়, তখন তাকে আইনের আওতায় আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হয়।

ইন্টারপোল কোনো একক দেশের পুলিশ বাহিনী নয়। এমনকি এর নিজস্ব কোনো গোয়েন্দা বা সশস্ত্র বাহিনী নেই। এটি মূলত একটি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ, সমন্বয় এবং অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বা প্ল্যাটফর্ম। ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই সংস্থার বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৯৬। বাংলাদেশও ইন্টারপোলের সদস্য রাষ্ট্র। এর সদর দপ্তর ফ্রান্সের লিওঁ শহরে অবস্থিত।

ইন্টারপোল কীভাবে কাজ করে

ইন্টারপোলের কাজের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বব্যাপী পুলিশি যোগাযোগ রক্ষা করা। এটি মূলত ৩টি প্রধান উপায়ে কাজ করে। এরমধ্যে আছে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বা এনসিবি। ইন্টারপোলের প্রতিটি সদস্য দেশে একটি করে নিজস্ব কার্যালয় থাকে, যাকে এনসিবি বলা হয়। বাংলাদেশে ঢাকার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ইন্টারপোলের এনসিবি হিসেবে কাজ করে। কোনো দেশের পুলিশ অন্য দেশের কোনো অপরাধীর তথ্য চাইলে তারা ইন্টারপোলের এই এনসিবির মাধ্যমে যোগাযোগ করে।

ইন্টারপোল ‘I-24/7’ গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে ১৯৬টি দেশের পুলিশ ২৪ ঘণ্টা যেকোনো সময় একে অপরের সঙ্গে অপরাধী, চুরি যাওয়া পাসপোর্ট, ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ প্রোফাইলের তথ্য শেয়ার করতে পারে।

এছাড়াও ইন্টারপোলের কাছে বিশ্বের লাখ লাখ অপরাধীর তথ্য, চুরি হওয়া গাড়ির রেকর্ড, জাল নথিপত্র এবং নিখোঁজ মানুষের বিশাল ডেটাবেজ রয়েছে। সদস্য দেশগুলো এই ডেটাবেজ সার্চ করে দ্রুততম সময়ে অপরাধী শনাক্ত করতে পারে।

ইন্টারপোলের নোটিশ

ইন্টারপোল মূলত বিভিন্ন রঙের ‘নোটিশ’ জারির মাধ্যমে অপরাধীদের খুঁজতে বা তথ্য সংগ্রহ করতে সদস্য দেশগুলোকে অ্যালার্ট বা সতর্কবার্তা পাঠায়। ইন্টারপোলের ৮ ধরনের নোটিশ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নোটিশ হলো রেড নোটিশ। কোনো দেশ যদি তাদের পলাতক আসামিকে অন্য দেশ থেকে গ্রেপ্তার করে প্রত্যর্পণ বা ‘এক্সট্রাডিশন’ করতে চায়, তখন ইন্টারপোল এই নোটিশ জারি করে। এটি কোনো আন্তর্জাতিক অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট নয়, বরং বিশ্বজুড়ে পুলিশকে আসামির অবস্থান শনাক্ত ও সাময়িক গ্রেপ্তারের অনুরোধ।

কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা সাক্ষীর পরিচয়, অবস্থান বা কার্যক্রম সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য জারি করা হয় ব্লু নোটিশ। এছাড়াও এমন কোনো অপরাধী যে বারবার অপরাধ করে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে আবার অপরাধ করতে পারে, তার ব্যাপারে অগ্রিম সতর্কবার্তা দিতে ব্যবহৃত হয় গ্রিন নোটিশ। ইয়েলো নোটিশ নিখোঁজ ব্যক্তি বা ভিকটিমদের (বিশেষ করে শিশুদের) খুঁজে বের করতে বা পরিচয়হীন লাশ শনাক্ত করতে এটি জারি করা হয় এবং অজ্ঞাত পরিচয় মৃতদেহের তথ্য ও পরিচয় খোঁজার জন্য ব্ল্যাক নোটিশ দেওয়া হয়।

ইন্টারপোলের মূল কাজের ক্ষেত্র

আন্তঃসীমান্ত বা আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে ইন্টারপোল মূলত চারটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এগুলো হলো বিশ্বজুড়ে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অর্থায়ন ও যাতায়াত অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ; আন্তর্জাতিক জালিয়াতি, হ্যাকিং বা অনলাইনের মাধ্যমে হওয়া বড় অপরাধ তথা সাইবার ক্রাইম; মানব পাচার, মাদক চোরাচালান, বন্যপ্রাণী পাচার এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার মতো সংগঠিত অপরাধ। মানি লন্ডারিং, ব্যাংক জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবাজদের আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতি ধরতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করে ইন্টারপোল।

ইন্টারপোল যা করতে পারে না

ইন্টারপোলের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন ইন্টারপোলের কর্মকর্তারা নিজেদের হাতে কোনো অস্ত্র রাখতে পারেন না এবং তারা কোনো দেশে গিয়ে সরাসরি কাউকে গ্রেপ্তার করার আইনি ক্ষমতা রাখেন না। আসামি গ্রেপ্তার করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ও সার্বভৌম ক্ষমতা সেই নির্দিষ্ট দেশের স্থানীয় পুলিশের। ইন্টারপোল কেবল অনুরোধ এবং তথ্য দিতে পারে।

এছাড়াও ইন্টারপোলের নিজস্ব সংবিধানের আর্টিকেল ৩ এর কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, তারা কোনো রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা বর্ণবাদী বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। অর্থাৎ কোনো দেশ যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো নেতার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করে, ইন্টারপোল তা বাতিল করে দেয়।

গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে যে দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে সেখানে আটক আছেন। রোববার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তাঁকে দ্রুতই দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

আসামি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে মোট চারটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমে, দেশের সংশ্লিষ্ট আদালত পলাতক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এরপর মামলার তদন্তকারী সংস্থা বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর কাছে আসামির যাবতীয় নথি (ফিঙ্গারপ্রিন্ট, পাসপোর্ট নম্বর, ছবি, মামলার বিবরণ) জমা দিয়ে ইন্টারপোলের সাহায্য চায়। এরপর, ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে যা সব সদস্য দেশের কাছে পাঠানো হয়। পরের ধাপে, অপরাধী শনাক্ত হলে সেই দেশের পুলিশ আসামিকে সাময়িকভাবে আটক করে এবং সংশ্লিষ্ট দেশকে জানানো হয়। যেমন বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের আবেদনের পর সম্প্রতি দুবাই পুলিশ তাঁকে আটক করেছে।

সর্বশেষ ধাপে আসামি আটক হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওই দেশের আদালতে আসামির অপরাধের সমস্ত তথ্য ও আইনি নথি পাঠাতে হয়। সেই দেশের আদালত সমস্ত নথি এবং অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে আসামিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চূড়ান্ত রায় দেয়।

রেড নোটিশই শেষ কথা না

তবে শুধু ইন্টারপোলের রেড নোটিশেই আসামি ফিরিয়ে আনা যায় না। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট না হওয়ায় এটি কোনো দেশকে আসামি ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে না।

আসামি সফলভাবে ফিরিয়ে আনা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। একটি হলো প্রত্যর্পণ চুক্তি। বাংলাদেশের সাথে যে দেশের এই চুক্তি রয়েছে (যেমন: ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত), সেখান থেকে চুক্তি অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় আসামি ফেরত আনা অনেক সহজ হয়। এছাড়াও যেসব দেশের সাথে সরাসরি প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই (যেমন: আমেরিকা, কানাডা বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ), সেখানে পারস্পরিক অপরাধ দমন সহযোগিতা বা বিশেষ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে আসামিকে ফেরত আনার চেষ্টা করা হয়।

ইন্টারপোলের কিছু কঠোর নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশ পুলিশ চাইলেই যেকোনো পলাতক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করাতে পারে না। ইন্টারপোলের সংবিধানের আর্টিকেল ৩ অনুযায়ী, তারা রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা বর্ণবাদী চরিত্রের কোনো মামলায় হস্তক্ষেপ করে না।

যেমন—২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এনসিবি রেড নোটিশের আবেদন জানালেও ইন্টারপোল তাদের কঠোর গাইডলাইনের কারণে সব আবেদন গ্রহণ করেনি।

সফলভাবে আসামি ফিরিয়ে আনার বাস্তব উদাহরণ

সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পুলিশ ইন্টারপোলের সহায়তায় অতীতে এবং বর্তমানে বহু দুর্ধর্ষ অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুনুর রশীদ খান হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান আসামি আরিফ সরকারকে দুবাই পুলিশের সহায়তায় ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়াও পুলিশ পরিদর্শক মামুন ইমরান খান হত্যা মামলার আসামি রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানকে ফিরিয়ে আনার জন্যও ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত