ad
ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং অ্যানিমেল ডে

যুদ্ধ, বাণিজ্য ও কৃষি: প্রাণীরা যেভাবে বদলে দিয়েছে পৃথিবী

ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং অ্যানিমেল ডে

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬, ১৮: ৩৩
প্রাণীরা যেভাবে বদলে দিয়েছে পৃথিবী। স্ট্রিম গ্রাফিক

সভ্যতার চাকা সচল রাখতে মানুষের পাশে সবসময় ছিল বিভিন্ন প্রাণী। মানুষ যখন যাযাবর জীবন ছেড়ে চাষবাস শুরু করল, তখন থেকেই প্রাণীদের ব্যবহার বাড়তে থাকে। জমি চাষ থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, এমনকি দুর্গম পথে যোগাযোগ রক্ষায় প্রাণীরা ছিল মানুষের প্রধান ভরসা।

ইতিহাসবিদ জ্যারেড ডায়মন্ড তাঁর বিখ্যাত বই ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিল’-এ দেখিয়েছেন, যেসব অঞ্চলে গৃহপালিত প্রাণী ছিল, সেই সভ্যতাগুলো অনেক দ্রুত এগিয়েছে। যেমন ইউরেশিয়া অঞ্চলে ঘোড়া ও গরুর ব্যবহার কৃষিকাজ ও যাতায়াত ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল।

মানব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাম্রাজ্য বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যোগাযোগের জন্য মানুষ নির্ভর করত প্রাণীদের ওপর। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দ থেকেই মেসোপটেমিয়া ও প্রাচীন মিশরে গাধার ব্যবহার শুরু হয়। ভারী পাথর ও মাটির পাত্র বহনের জন্য গাধা ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পশু। পরে মানব সভ্যতায় বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে ঘোড়া। প্রথম দিকে ঘোড়াকে রথের সঙ্গে বেঁধে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো। পারস্য ও বিভিন্ন যাযাবর সাম্রাজ্যে ঘোড়া ছিল সামরিক শক্তির প্রধান ভিত্তি, আর গ্রিক ও রোমান বাহিনীতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। মধ্য এশিয়ার যাযাবর জাতি মঙ্গোলরা তো ঘোড়ার পিঠে চড়েই পৃথিবীর এক বিশাল অংশ জয় করে নিয়েছিল।

মধ্য এশিয়ার যাযাবর জাতি মঙ্গোলরা ঘোড়ার পিঠে চড়েই পৃথিবীর এক বিশাল অংশ জয় করে নিয়েছিল। । সংগৃহীত ছবি
মধ্য এশিয়ার যাযাবর জাতি মঙ্গোলরা ঘোড়ার পিঠে চড়েই পৃথিবীর এক বিশাল অংশ জয় করে নিয়েছিল। । সংগৃহীত ছবি

ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তাঁর ‘মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে লিখেছেন, যাযাবর জাতিগুলোর শক্তির মূল উৎস ছিল তাদের ঘোড়া এবং উটের গতিশীলতা। উটকে বলা হতো ‘মরুভূমির জাহাজ’। সাহারা মরুভূমি পার হয়ে লবণের বাণিজ্য কিংবা সিল্ক রোডের সিল্ক ও মশলা পরিবহনে উট ছিল অন্যতম প্রধান পরিবহন মাধ্যম।

কৃষিক্ষেত্রে মধ্যযুগে ইউরোপে ‘হেভি প্লাউ’ বা ভারী লাঙলের আবিষ্কার হয়। এই ভারী লাঙল টানার জন্য বলদের চেয়ে ঘোড়ার ব্যবহার বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ ঘোড়া বলদের চেয়ে দ্রুত হাঁটতে পারত। এতে ইউরোপে শস্য উৎপাদন বেড়ে গিয়েছিল। সাম্রাজ্য জয় এবং সীমান্ত রক্ষার কাজেও প্রাণীরা ছিল অপরিহার্য। প্রাচীন মিসরীয়, রোমান এবং পারস্য সভ্যতায় ঘোড়া ছিল শক্তির প্রতীক।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোড়ার পাশাপাশি হাতির ব্যবহারও কম নয়। যেমন কার্থেজের সেনাপতি হ্যানিবালের যুদ্ধযাত্রা। রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তিনি আল্পস পর্বতের বরফ ঢাকা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছিলেন হাতি নিয়ে। রোমান ঐতিহাসিক পলিবিউসের লেখায় এই দুঃসাহসিক অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। বরফের মধ্যে হাতির সেই লড়াই আজও ইতিহাস হয়ে আছে।

কবুতরের মতো পাখিও সভ্যতার ইতিহাসে ভূমিকা রেখেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন সব যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, তখন বার্তা পাঠাতে ব্যবহার করা হতো ‘হোমিং পিজন’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বিখ্যাত বার্তাবাহক কবুতর ছিল ‘চের অমি’। শত্রুর গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পরও সে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়ে ‘লস্ট ব্যাটালিয়ন’-এর ১৯৪ জন মার্কিন সেনার প্রাণরক্ষায় ভূমিকা রাখে। এই অসাধারণ সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে চের অমি ফ্রান্সের সম্মানজনক পদকে ভূষিত হয়েছিল।

সাহারা মরুভূমি পার হয়ে লবণের বাণিজ্য কিংবা সিল্ক রোডের সিল্ক ও মশলা পরিবহনে উট ছিল অন্যতম প্রধান পরিবহন মাধ্যম। সংগৃহীত ছবি
সাহারা মরুভূমি পার হয়ে লবণের বাণিজ্য কিংবা সিল্ক রোডের সিল্ক ও মশলা পরিবহনে উট ছিল অন্যতম প্রধান পরিবহন মাধ্যম। সংগৃহীত ছবি

আধুনিক যুগেও গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীতে প্রাণীদের ব্যবহার কমেনি। ডগ স্কোয়াডের ইউনিট এখন বিশ্বজুড়ে অপরাধী ধরতে এবং বিস্ফোরক উদ্ধার করতে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কুকুরের ঘ্রাণশক্তির নিখুঁত ক্ষমতাকে ব্যবহার করে মানুষ জটিল অপরাধের কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে। শতাব্দী ধরে চলা এই প্রথা ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করে। ১৮ শতকের শেষভাগে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে প্রাণীর ওপর মানুষের নির্ভরতা কমতে থাকে।

জেমস ওয়াটের উন্নত বাষ্পীয় ইঞ্জিনের পর কলকারখানায় প্রথম কয়লা ও পানির শক্তির ব্যবহার শুরু হয়। এর আগে টেক্সটাইল মিল বা ময়দা কলের চাকা ঘোরানোর জন্য গাধা বা ঘোড়াকে বৃত্তাকারে হাঁটানো হতো। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের ফলে এই চাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘুরতে শুরু করে। এরপর ১৯ শতকের শুরুতে এল রেলগাড়ি। যে পণ্য বহনের জন্য আগে শত শত ঘোড়া বা উটের কাফেলা লাগত, তার বদলে ব্যবহৃত হয় ট্রেন। যাতায়াতের এই গতি মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনে।

১৮ শতকের শেষে কয়লা খনিগুলোতে এক অদ্ভুত প্রথার জন্ম হয়েছিল, যাকে বলা হতো ‘পিট পনি’। খনির সরু সুড়ঙ্গ থেকে কয়লার ঝুড়ি টানার জন্য ছোট জাতের ঘোড়াদের মাটির নিচে নামিয়ে দেওয়া হতো। সেই ঘোড়াগুলো আর কখনো দিনের আলো দেখতে পেত না। এরপর খনিতে বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হলে এই প্রথাটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০ শতকের শুরুতে হেনরি ফোর্ডের হাত ধরে অটোমোবাইল বা গাড়ির গণ-উৎপাদন শুরু হয়। শহরের রাস্তা থেকে ঘোড়ার গাড়ির জায়গা দখল করে নেয় পেট্রোল চালিত গাড়ি। মজার ব্যাপার হলো, গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষমতা মাপতে আমরা আজও ‘হর্সপাওয়ার’ বা অশ্বশক্তি শব্দটি ব্যবহার করি।

খনির সরু সুড়ঙ্গ থেকে কয়লার ঝুড়ি টানার জন্য ছোট ঘোড়াদের মাটির নিচে নামিয়ে দেওয়া হতো। সংগৃহীত ছবি
খনির সরু সুড়ঙ্গ থেকে কয়লার ঝুড়ি টানার জন্য ছোট ঘোড়াদের মাটির নিচে নামিয়ে দেওয়া হতো। সংগৃহীত ছবি

কৃষিক্ষেত্রেও একই পরিবর্তন আসে। ১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে যখন ট্র্যাক্টর এবং কম্বাইন হারভেস্টারের মতো আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে, তখন লাঙল-জোয়াল থেকে গরু ও মহিষ মুক্তি পেতে শুরু করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ আকাশ ছুঁয়েছে। কিন্তু এই যুগেও কিছু কিছু কাজে আজও প্রাণীর বিকল্প নেই।

রাজস্থানের থর মরুভূমি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বালুকাময় পথে উটের ব্যবহার আজও বিকল্পহীন। সীমান্তরক্ষী বাহিনী আজও মরুভূমির সীমান্ত পাহারা দিতে উটের ওপর নির্ভর করে। ঠিক তেমনি, হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় পণ্য বহনের জন্য খচ্চর ও গাধার ব্যবহার হয়। থেরাপি বা মানসিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রাণীদের ভূমিকা আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘অ্যানিম্যাল-অ্যাসিস্টেড থেরাপি’। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু এবং অটিজমে আক্রান্ত মানুষের একাকীত্ব ও মানসিক চাপ দূর করতে এখন কুকুরের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া দৃষ্টিহীন মানুষের পথ চলার সঙ্গী হিসেবে ‘গাইড ডগ’ বা পথপ্রদর্শক কুকুরের ব্যবহার উন্নত বিশ্বে জনপ্রিয়। পাহাড়ি এলাকায় তুষারধস বা ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে বেঁচে থাকা মানুষের সন্ধান পেতে আজও প্রশিক্ষিত স্নিফার ডগের ওপরই ভরসা করতে হয় উদ্ধারকারীদের।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত