গোসল খাওয়া ঘুম– মেলা থেকে মেলায় জীবিকা যাদের

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
দোহার (ঢাকা)

সাজ-সজ্জার জিনিস নিয়ে গ্রামীণ মেলায় সাহাবুদ্দিনের দোকান। স্ট্রিম ছবি

ঢাকার দোহারের প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো জনপদ করিমগঞ্জের সওদাগর পল্লি। শুরু থেকেই গ্রামীণ মেলা ও গ্রামে ঘুরে হরেক রকম পণ্যের বিক্রিই তাদের প্রধান জীবিকা। এতে বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় কাটে মেলায় মেলায়। শৌখিন পণ্যে মানুষের মন রাঙিয়ে সেখানেই চলে তাদের গোসল, খাওয়া, ঘুম–সবই।

শুরু থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িত বলে তাঁদের বসতি ‘সওদাগর পল্লি’ নামে পরিচিত পায়। পরে দোহারের ঐতিহ্যবাহী তাঁতে বোনানো লুঙ্গি তৈরির যন্ত্রাংশ ‘সানা’ তৈরি করায় পল্লিটি ‘হান্দারপাড়া’ নামেও পরিচিত পায়। মেলায় দোকান ছাড়াও গ্রামে ঘুরে চুড়ি-ফিতা ও মনিহারিসামগ্রী বিক্রি, হাটবাজারে ছাতা মেরামত ও তালার চাবি তৈরি করেন এ এলাকার লোকজন।

পদ্ম নদী অধ্যুষিত দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলায় একশ থেকে পাঁচ শ বছর ধরে চলা বেশ কিছু গ্রামীণ মেলা আছে। এতে লোক সমাগম হয়ও অনেক। এসব মেলায় ব্যবসা করে সচ্ছল আছেন সওদাগর পল্লির অনেক পরিবার।

উপজেলার লটাখোলা-বাহ্রা সড়কের পাশে অবস্থিত গ্রাম করিমগঞ্জ। এই এলাকার বাসিন্দা সওদাগর সম্প্রদায়ের লোকজন। তাঁদের বিশ্বাস ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ বছর আগে সলমত মুন্সী নামে এক ব্যক্তি বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বর্তমান জামালপুর থেকে পানসি নিয়ে করিমগঞ্জে আসেন। ১৭২৯ সালের দিকে তিনিই প্রথম এলাকায় মসজিদ ও কবরস্থান প্রতিষ্ঠান করেন। পানসিতে ঘুরে ঘুরে কাপড়, চুড়ি, ফিতা, মসলা ও মনিহারিসামগ্রী বেচাবিক্রি করতেন তিনি। তার মধ্যদিয়ে এই এলাকায় সওদাগর সম্প্রদায়ের গোড়াপত্তন হয়। পরে তার দেখাদেখি আরও কিছু পরিবার বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে বসতি গড়ে। বর্তমানে করিমগঞ্জ পল্লিতে ১২৬টি সওদাগর পরিবারের বসবাস।

এসব পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নভেম্বর থেকে পরের বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৭ মাস বেচাকেনার জন্য মেলায় মেলায় কাটাতে হয় তাঁদের। কোনো মেলা প্রাঙ্গণে ১৫ দিন, কোথাও ৭ দিন, আবার কোনো কোনো মেলা ১ দিন অবস্থান করেন তাঁরা। এর মধ্যে উপজেলার নুরুল্লাহপুর এলাকার শালাল শাহ্ চিশতির ওরস উপলক্ষে চার শতাধিক বছরের অর্ধমাসব্যাপী মেলায় জাঁকজমক ব্যবসা হয় তাদের।

মেলায় শিশু খেলনার দোকান মো. সুজনের। স্ট্রিম ছবি
মেলায় শিশু খেলনার দোকান মো. সুজনের। স্ট্রিম ছবি

দক্ষিণ শিমুলিয়া বটতলা এলাকায় এক মেলায় মেয়েদের প্রসাধনী বিক্রি করছিলেন করিমগঞ্জের বাসিন্দা সাহাবুদ্দিন। প্রায় ৪০ বছর ধরে মেলায় অস্থায়ী দোকান বসান তিনি। বাবা-মায়ের হাত ধরেই তার এ পেশায় আসা। মেলায় তার সঙ্গী হয়েছে স্ত্রী ও সন্তানেরা। সময় ভাগাভাগি করে মেলায় দোকানদারি করে থাকেন তারা। মেলা শেষ করে রাতে দোকানের ভেতরেই ঘুমানোর ব্যবস্থা আছে।

সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘টানা ৭ মাস আশপাশের ৪টি উপজেলার ১২০টি মেলা করে থাকি। অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটে আমাদের। শীতে মেলা বেশি হয় বলে বেচাবিক্রি ভালো হয়ে থাকে।’

কার্তিকপুরের মেলায় অস্থায়ী দোকানি মো. ফারুক মিয়া বলেন, ‘মেলায় বেচাকেনার ওপর নির্ভর করে চলে আমাদের সংসার। ৭ মাস মেলা করার পর উপার্জিত আয় দিয়েই সারা বছর চলতে হয় আমাদের। রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়েই মেলায় মেলায় ঘুরতে হয়। মেলাকে কেন্দ্র করেই আমাদের জীবন।’

সওদাগর পাড়ার কয়েকজন জানান, বছরের ৭ মাস মেলা শেষে বাড়িতে ফিরে অনেকটা অবকাশ জীবন কাটে তাদের। মেলার আয় দিয়েই চলতে হয়। খুব সচ্ছল বলা যাবে না তাদের। অনেক সময় ঋণ নিয়ে চলতে হয়। মেলা শুরুর পর আয় থেকে ঋণ পরিরোধ করে শুরু হয় নতুন করে পথচলা।

বছরের অধিকাংশ সময় মেলায় কাটলেও এলাকায় নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে বসবাস করছেন তাঁরা। সামাজিক ব্যবস্থা সম্পর্কে সওদাগর পাড়ার বাসিন্দারা জানান, তাদের সমাজের একজন নেতা বা মাতব্বর আছেন। কারো কোনো অভাব-অভিযোগ থাকলে নেতাকে বললে সবাই একসঙ্গে বসে সমাধন করে দেন। নেতার নির্দেশের বাইরে কেউ চলার সাহস দেখায় না। তাঁদের মধ্যে হানাহানি নেই প্রায়।

রিকশায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দোকান তৈরির সরঞ্জাম ও পণ্য। স্ট্রিম ছবি
রিকশায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দোকান তৈরির সরঞ্জাম ও পণ্য। স্ট্রিম ছবি

পেশাগত কারণেই এলাকায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে খুব একটা দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ হয় না সওদাগর পাড়ার বাসিন্দাদের। সেই ঘাটতি দূর করার জন্য গত কয়েক বছর ধরে যৌথ উদ্যোগে বার্ষিক বনভোজনের আয়োজন করছেন তারা। একটি সমিতির মাধ্যমে টাকা জমিয়ে পরিবারের সবাই মিলে দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যান।

এদিকে পাড়ার বড়রা আদি পেশা ধরে রাখলেও এখন শিশুদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। তবে তাদের চাকরির প্রবণতা কম। মাধ্যমিক পাস করার পর জীবিকার টানে কেউ ছোটেন মেলায়, কেউ বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে বিদেশ যান। তবে শিশুদের শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব বাড়ছে এই পল্লির বাসিন্দাদের।

রাইপাড়া শিশু কল্যাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সামিরা আক্তার জানান, করিমগঞ্জের অধিকাংশ মানুষ পেশায় হরেক রকম জিনিসপত্র বিক্রেতা হওয়ায় বছরের অন্তত ৬ মাস তাদের গ্রামীণ মেলায় কাটে। এই সময় স্কুল পড়ুয়া শিশুরা মায়েদের সঙ্গে মেলায় থাকায় বিদ্যালয়ে উপস্থিতি একেবারেরই কম থাকে। জুন থেকে উপস্থিতি বাড়তে থাকে।

সামিরা আক্তার বলেন, ‘আমরা শিশুদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করে থাকি। শিশুদের মায়েদের আগ্রহ থাকার পরও পেশাগত কারণে শিশুরা মায়েদের সাথে মেলায় মেলায় কাটে।’

দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাঈদুল ইসলাম জানান, শিশুদের লেখাপড়ার জন্য সবার আগে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনেতা তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে স্কুলের পক্ষ থেকে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করতে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি করিমগঞ্জ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব সেবার সুবিধা রয়েছে, তা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হবে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত