ফুল ভাসিয়ে পাহাড়ে বর্ষবরণের উৎসব শুরু, নতুন বছরে সুখ-শান্তি কামনা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
থানচি (বান্দরবান) ও রাঙামাটি

ফুল বিজুতে ফুল নিবেদন উৎসব। স্ট্রিম ছবি

সারা দেশে বাংলা নতুন বছরকে বরণে ‘পহেলা বৈশাখ’ উদযাপন করা হয়। তবে পাহাড়ে এই আয়োজন চলে তিন দিনব্যাপী। পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায় এই উৎসবকে বিজু, সাংগ্রাই, বিষু, বৈসু, চাংক্রান ও চাংলান প্রভৃতি নামে সম্বোধন করে থাকে। রোববার (১২ এপ্রিল) ভোর থেকে পার্বত্য তিন জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আয়োজনের প্রথম দিন উদযাপন করা হচ্ছে।

পাহাড়িদের অন্যতম বড় এই উৎসব মূলত বৈসাবি (বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু) নামে পরিচিত। তবে এখন থেকে বৈসাবি নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব নামে ও স্বকীয় রীতিতে উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এ বিষয়ে সম্প্রতি সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেছেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি দেশের জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১১টি সম্প্রদায়ের এ উৎসবের মূল বার্তা শান্তি ও সম্প্রীতি। সরকার চায়, সব সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করুক।‘

ফুল ভাসানো শেষে তরুণ-তরুণীরা আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন। স্ট্রিম ছবি
ফুল ভাসানো শেষে তরুণ-তরুণীরা আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন। স্ট্রিম ছবি

রাঙামাটিতে কাপ্তাই হ্রদে ‘ফুল নিবেদন’ করে উৎসব

জনসংখ্যায় পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম বড় সম্প্রদায় চাকমা জনগোষ্ঠী এই উৎসব উদযাপন করেন ‘বিজু’। তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘ফুল বিজু’।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উৎসবের প্রথম দিনে বন থেকে ফুল আর নিমপাতা সংগ্রহ করে এবং পবিত্র এই ফুল ভাসিয়ে দেয় পানিতে, তাই একে বলা হয় ‘ফুল বিজু’। পানিতে ফুল ভাসিয়ে মঙ্গল কামনায় গঙ্গা দেবী'র নিকট প্রার্থনা করা হয়।

আর আগামীকাল ৩০ চৈত্র বিজু উৎসবের দ্বিতীয়দিন ‘মূল বিজু’। এদিনে বাড়িতে বাড়িতে রান্না করা হয় পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পাজন’। পাজনসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার দিয়ে অতিথিদের পরিবেশন করা হয়। এরপরের উৎসবের তৃতীয় দিন হচ্ছে গজ্যাপজ্যা বিজু বা নববর্ষ উৎসব, এদিনে বিশ্ব শান্তির কামনায় মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করা হয়।

উৎসবমুখর রাঙামাটিতে কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন এলাকা
উৎসবমুখর রাঙামাটিতে কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন এলাকা

ফুল বিজুর দিনে উৎসবে পাহাড়ি নারীরা বাহারি রঙের ‘পিনন-হাদি’, আর ছেলেরা ‘ধুতি-পাঞ্জাবি’ পরিধান করে বিভিন্ন নদী, ছড়া, ঝিরি ও হ্রদের পানিতে ফুল নিবেদন উৎসবে মেতে ওঠেন।

স্ট্রিমের রাঙামাটি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সকালে রাঙামাটি শহরের তবলছড়ির কেরাণী পাহাড় এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কাপ্তাই হ্রদে চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সের লোকজন ঐতিহ্যবাহী পোশাকে কলা পাতায় করে ফুল ভাসিয়েছেন।

এছাড়া রাঙামাটির রাজবন বিহার ঘাট, গর্জনতলী এলাকাসহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় পুরনো বছরের সব দুঃখ, কষ্ট ও গ্লানি দূর করে নতুন বছর যাতে সুখ শান্তিতে কাটানো যায়, সেই উদ্দেশ্যে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ফুল ভাসানো হয়। পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের সব গ্লানি মুছে গিয়ে নতুন বছর বয়ে আনবে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি- এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

কেরাণী পাহাড় এলাকায় ফুল আসাতে অর্জিতা চাকমা বলেন, ‘বিজু আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের প্রধান ঐতিহ্যবাহী উৎসব। আজ হচ্ছে বিজুর প্রথম দিন ফুল বিজু। এই ফুল বিজুতে আমরা পানিতে ফুল ভাসিয়ে মা গঙ্গা দেবীর কাছে আমরা সকলে প্রার্থনা করি পুরনো বছরের সব দুঃখ, কষ্ট ও গ্লানি দূর করে নতুন বছর যাতে সুখ শান্তিতে কাটাতে পারি।’

ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ফুল নিবেদন করতে এসেছেন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের নারীরা
ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ফুল নিবেদন করতে এসেছেন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের নারীরা

মৈত্রী চাকমা নামে আরেকজন বলেন, ‘আজ হচ্ছে আমাদের ফুল বিজু। আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফুল নিয়ে আমাদের চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনন-হাদি পরে পানিতে ফুল ভাসাতে এসেছি। আমি ফুল ভাসিয়ে গঙ্গা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেছি নতুন বছরে আমরা যাতে সবাই সুখে শান্তিতে ভালো থাকতে পারি।’

রাঙামাটির বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংত্রাণ, চাংলান, পাতা, বিহু-২০২৬ উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদার বলেন, ‘বিজু আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। এই উৎসব আমরা যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছি। ফুল বিজুতে পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরানো বছরের সব দুঃখ কষ্টগুলো দূর করে নতুন বছরে যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারি এই কামনা করি।’

ফুল বিজুর দিনে কাপ্তাই হ্রদসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বয়ে চলা চেঙ্গী, মাইনী, কাচালং, কর্ণফুলী নদী, রাইংক্ষ্যংসহ পাহাড় থেকে নেমে আসা নদ-নদী ও ছড়াগুলোতে ফুল ভাসানো হয়।

‘ফুল বিজুর’ দিনে উৎসবমুখর বান্দরবানের থানচি

‘ফুল বিজু’র আয়োজনে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের থানচি। রোববার (১২ এপ্রিল) ভোরে সূর্যোদয়ের আগেই সাংঙ্গু নদীসহ আশপাশের খাল ও ছড়ায় ফুল ভাসিয়ে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে প্রার্থনার মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন তারা। দিনটি উপলক্ষে আজ সকাল থেকেই বিভিন্ন পাড়ায় বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। উপজেলার ভরত পাড়া, রায়মোহন পাড়া, কমলাবাগান পাড়া, জ্ঞানলাল পাড়া ও ব্রহ্মদক্ত পাড়াসহ অন্তত পাঁচটি গ্রামে তরুণ-তরুণীদের উদ্যোগে দিনটি উদযাপন করা হয়।

ফুল ভাসিয়ে বৈসাবি উৎসব শুরু করলেন থানচির পাহাড়িরা
ফুল ভাসিয়ে বৈসাবি উৎসব শুরু করলেন থানচির পাহাড়িরা

চাকমা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী, পুরোনো বছরের দুঃখ, গ্লানি ও পাপাচার থেকে মুক্তি পেতে দেবতার উদ্দেশে ফুল ভাসিয়ে পুরাতন বছরকে বিদায় জানানো হয়। এর মাধ্যমে নতুন বছর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আসে। তাই ফুল বিজুর দিন ভোরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নদী ও খালে গিয়ে প্রার্থনার মাধ্যমে পুরাতন বছরকে বিদায় জানান তারা।

বর্তমানে ফুল বিজু শুধু চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; মারমা, ত্রিপুরা ও স্থানীয় বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। এতে উৎসবটি পেয়েছে সর্বজনীন রূপ।

সম্পর্কিত