হাওরের ধান কাটা নিয়ে দুই সংকটে কৃষক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সুনামগঞ্জ

জলাবদ্ধতা ও কৃষক সংকটে উভয়সংকটে কৃষকরা

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে উজানের ঢলে ‘অকাল বন্যায়’ সুনামগঞ্জের হাওরে এক মহাবিপর্যয় ঘটেছিল। তখন প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে যায়। এর ৯ বছর পর চলতি এপ্রিল মাসে আবারও তেমনই এক সংকটের মুখে হাওরবাসী। একদিকে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে শ্রমিকের অভাব; এই দুই সংকটে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।

আর ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’-এর নেতারা মনে করছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনায় সারা বছর এখানে পানি প্রবাহ ঠিক রাখতে পারলে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব।

সুনামগঞ্জের ১২৩টি হাওরে এখন সোনালি ধানের সমারোহ। দিগন্তজোড়া ফসলের বাম্পার ফলনে কৃষকের মনে আনন্দ থাকার কথা থাকলেও সেখানে জেঁকে বসেছে শোকাবহ পরিবেশ। বৈশাখের এই সময়ে হাওরে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কথা। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস তাঁদের চিন্তায় ফেলেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, সুনামগঞ্জে চলতি বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টোর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে চাষাবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টোর এবং নন হাওরে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টোর। শনিবার (২৫ এপ্রিল) পর্যন্ত হাওর ও নন হাওর নিয়ে জেলায় ধান কর্তন হয়েছে ৬৩ হাজার ৬৬৭ হেক্টোর। যা মোট উৎপাদনের ২৮ দশমিক ৪৮৫ শতাংশ।

এখনও হাওরের বড় অংশের ধান কাটাই বাকি আছে, এর মধ্যে গত তিনদিনের টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন হাওরে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। ফলে জলমগ্ন হাওরে শ্রমিক দিয়ে দ্রুত ধান মাড়াই নিয়ে সংকটে পড়েছেন কৃষকরা।

ধানকাটার এই মহোৎসবের সময় জেলায় শ্রমিক সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে জেলার দুটি বৃহৎ বালু মহাল বন্ধ রেখেছে প্রশাসন। যাতে করে এই মহালের শ্রমিকরা ধান কাটায় অংশ নিতে পারে। তাতেও শ্রমিক সংকট নিরসন হচ্ছে না। অন্যদিকে হাওরে পানি থাকার কারণে হারভেস্টার মেশিন দিয়েও ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। যেসব জমিতে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে, সেখানেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। এর কারণ হলো ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও সংকট।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওর পাড়ের দরিয়াবাজ গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমার জমি পানিতে তলিয়ে আছে। এখন যদি আরও বৃষ্টি হয়, তাহলে আর ধান কাটাই সম্ভব হবে না। এর মধ্যে হারভেস্টার দিয়েও ধান কাটা যাচ্ছে না, পানির কারণে।’

শিয়ালমাড়া হাওর পাড়ের কৃষক করম আলী বলেন, ‘যে ফসল চাষ করেছিলাম, সব এখন পানির নিচে। তারপরও আমার দুই ছেলেকে নিয়ে পানির মধ্যেই ধান কাটছি। আবার বৃষ্টি হলে যা আছে তাও পাবো না।’

একদিকে শ্রমিক সংকট অন্যদিকে নদ-নদীর পানি বাড়ছে; এ নিয়ে উব্দিগ্ন কৃষক। সদর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের সোহেল মিয়ার ভাষ্য, ‘আমরা ধান কাটতে পারলেও বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে পারছি না। আরও অনেকের ধান জমিতেই আছে, শ্রমিকের অভাবে কাটা সম্ভব হচ্ছে না।’

তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক স্ট্রিমকে বলেন, ‘শ্রমিক সংকট কাটিয়ে তোলার জন্য এবং দ্রুত ধান কাটার জন্য জেলার বাইরে থেকে শ্রমিক পর্যায়ক্রমে আসছে এবং বেশিরভাগ জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার কাজে আসছে না।’

জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান জানান, ডিজেলের কোনও সংকট হবে না। যেসব জমির ধান এখনও পানি আসেনি, সেসব জমিতে যাতে দ্রুত সময়ে ধান কাটতে পারে; এজন্য প্রতিটি হারভেস্টারের মালিককে বলা হয়েছে তারা সহজেই ডিজেল নিতে পারবে।

সম্পর্কিত