বেসরকারি খাতে বৈশাখী ভাতা বঞ্চনা অব্যাহত

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ২৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখী ভাতা চালুর এক দশক পেরিয়ে গেলেও বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ কর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের অধীনে চালু এই ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশের সমপরিমাণ, যা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পাচ্ছেন।

সরকারি হিসাবে, এই সুবিধার আওতায় প্রায় ১৪ থেকে ২১ লাখ কর্মী রয়েছেন, যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৫ শতাংশ। বিপরীতে গণমাধ্যমসহ দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ বেসরকারি খাতের কর্মীরা বঞ্চিত।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ বা ২০১৫ সালের বিধিমালায় বেসরকারি খাতে এ ধরনের ভাতার বাধ্যবাধকতা নেই। ২০১৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেসরকারি খাতকে স্বেচ্ছায় এই সুবিধা চালুর আহ্বান জানালেও তা বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই।

২০২৫ সালের এপ্রিলে অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি প্রকল্পে নিয়োজিত আউটসোর্সিং ও সেবা খাতের কর্মীদের জন্য ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা চালু করে, যা ‘বাংলা নববর্ষের উপহার’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমই) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ঈদসহ বিভিন্ন উপলক্ষে এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ বোনাস, কর্মস্থলে উপস্থিতি ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক প্রণোদনা বা ১৩তম ও ১৪তম মাসের বেতন দিয়ে থাকে। তাই নতুন করে বৈশাখী ভাতা চালু তাদের জন্য আর্থিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।’

যদিও বেসরকারি খাতেও সীমিত পর্যায়ে এই ভাতার নজির রয়েছে। ২০১৬-২০১৭ সালে কয়েকটি, বিশেষ করে ইসলামী ধারার বেসরকারি ব্যাংক ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা চালু করে। অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, তৈরি পোশাকশিল্প এবং নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো এই ভাতা দেয় না।

গণমাধ্যমকর্মীদের সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন এই ভাতা দাবি করে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত তা ওয়েজ বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বেশির ভাগ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ২০১৩ সালের অষ্টম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করছে, যাতে বৈশাখী ভাতা নেই। এরপর ২০১৯ সালে নবম ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা করা হলেও তাতে বৈশাখী ভাতা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসস ছাড়া কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করেনি।

২০১৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে হাতেগোনা কয়েকটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বৈশাখী ভাতা চালু করলেও, তা পরে বাদ দিয়েছে। সাংবাদিক সংগঠনগুলো বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কথা বললেও বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।

সাংবাদিক নেতারা মনে করেন, এই বৈষম্য নীতিগতভাবে তৈরি। এতে গণমাধ্যম অবহেলিত। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিএফইউজে ও ডিইউজের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, চতুর্থ ওয়েজ বোর্ড পর্যন্ত সাংবাদিকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় ভালো ছিল। পরে নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আমলারা নিজেদের সুবিধা বাড়ালেও সাংবাদিকরা পিছিয়ে পড়েছেন।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, ‘সাংবাদিকদের বৈশাখী ভাতা না দেওয়া একটি স্পষ্ট বৈষম্য। মালিকরা স্বাভাবিকভাবে দিতে চাইবে না। কিন্তু সরকারের উচিৎ ছিল বিষয়টি আইন করে বাধ্যতামূলক করা।’

সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব জানিয়েছে, বর্তমান আর্থিক কাঠামোতে সরকারি খাতের মতো নানা ধরনের বোনাস বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। নোয়াব সভাপতি মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেছেন, ‘সংগঠনের সম্মিলিত ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বাইরে এই বিষয়ে আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব না।’

সম্পর্কিত