leadT1ad

কাগজের পোস্টারের বদলে কাপড়ের ব্যানার: নির্বাচনী প্রচার কতটা পরিবেশবান্ধব

প্লাস্টিক বা পিভিসির বদলে প্রার্থীদের কাপড়ের ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহারের নির্দেশনা দেয় নির্বাচন কমিশন। স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাগজের পোস্টার ঘিরে একটি বিশেষ নির্বাচনী আমেজ তৈরি হতো। তবে এবার সেই পরিচিত দৃশ্যপট বদলে গেছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্তে কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় প্রচারণার জায়গা দখল করেছে কাপড়ের ব্যানার।

ইসি বলছে, নির্বাচনী প্রচারণা যতটা সম্ভব পরিবেশবান্ধব করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে কাগজের পোস্টার ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে প্লাস্টিক বা পিভিসি ব্যানার এবং অপচনশীল উপকরণ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে কাপড়ের ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা পরিবেশবান্ধব—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রচারণা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। তবে পরিবেশ রক্ষার নামে নেওয়া সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবে নতুন পরিবেশঝুঁকি তৈরি করে, তবে তা পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। সংশ্লিষ্টদের মতে, কাপড়ের ব্যানার ব্যবহারের পাশাপাশি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে পরিবেশবান্ধব প্রচারণার লক্ষ্য পূরণ হবে না।

পলিয়েস্টার কাপড়ই মূল উপকরণ

টেক্সটাইল ও প্রিন্টিং খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে নির্বাচনী ব্যানার তৈরিতে মূলত পলিয়েস্টার কাপড় ব্যবহার হচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য সাধারণত পচনশীল বা বায়োডিগ্রেডেবল পলিয়েস্টার কাপড় ব্যবহৃত হয় না। এই ধরনের কাপড় মাটিতে মিশে যেতে দীর্ঘ সময় লাগে।

ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, ব্যবহৃত পলিয়েস্টার কাপড় তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে মাটিতে মিশে যায়। তবে টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এই ধরনের পলিয়েস্টার কাপড় পুরোপুরি অবক্ষয় হতে ২০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। শুধু তাই নয়, পচনের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় পলিয়েস্টার কাপড়ের উপাদান মাটিতে থাকা উপকারী পোকামাকড় মেরে ফেলে। অথচ এই অণুজীবগুলো মাটির উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করে।

প্রার্থীদের কাছে সমাদৃত হচ্ছে এই প্রচারণা

প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা ইসির নির্দেশনা মেনেই কাপড়ের ব্যানার ব্যবহার করছেন। অনেকেই দাবি করছেন, পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যেই তাঁরা এই উদ্যোগে অংশ নিচ্ছেন।

ঢাকা-২ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা জহুরুল ইসলাম বলেন, পিভিসি ব্যানার ও কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় তিনি কাপড়ের তৈরি ব্যানার ব্যবহার করছেন। তাঁর ভাষায়, এসব ব্যানার দ্রুত মাটিতে মিশে যায়—এই ধারণা থেকেই তিনি ব্যানার তৈরি করিয়েছেন। তবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “যদি এসব ব্যানার সত্যিকার অর্থে পরিবেশবান্ধব না হয়, তাহলে আগে থেকেই এর মান যাচাই বা অনুমোদনের বিষয়টি দেখা দরকার ছিল। একই সঙ্গে যদি এগুলো পচনশীল না হয়, তবে ব্যবহারের পর কীভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষিত রাখা যাবে—সে বিষয়েও সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।”

অন্যদিকে ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজ বলেন, তিনি চেষ্টা করছেন তাঁর সব নির্বাচনী ব্যানার পরিবেশবান্ধব কাপড়ে তৈরি করতে। তবে বাস্তবে সব ব্যানার নিজের তত্ত্বাবধানে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, “অনেক সমর্থক নিজের উদ্যোগে ব্যানার লাগিয়ে দিচ্ছেন। পরে দেখলে আমি সেগুলো খুলে দিতে বলছি। কিন্তু সবকিছু যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।”

কাপড়ের ব্যানার কতটা পরিবেশবান্ধব—এমন প্রশ্নের জবাবে ববি হাজ্জাজ বলেন, “এখন পর্যন্ত আমাদের যেটা জানানো হয়েছে, তা হলো—এই ব্যানারগুলো কয়েক মাসের মধ্যেই মাটিতে মিশে যায়। আমরা সেই তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। কিন্তু যদি বাস্তবে তা পরিবেশবান্ধব না হয়, তাহলে বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থীদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং নির্বাচন কমিশন থেকেই স্পষ্ট নির্দেশনা ও বিকল্প ব্যবস্থা নির্ধারণ করা উচিত।”

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য

ঢাকার নীলক্ষেতের গাউছুল আজম সুপার মার্কেটে অবস্থিত পর্ণ ডিজিটালের মালিক সুমন দাস বলেন, তাঁরা বর্তমানে পলিয়েস্টার কাপড় দিয়েই ব্যানার তৈরি করছেন এবং ঢাকাসহ সারা দেশে সরবরাহ দিচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, “এই কাপড় শীত ও বর্ষা—দুই মৌসুমেই ভালো থাকে এবং দীর্ঘদিন সার্ভিস দেয়। এ কারণেই এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।”

খরচের তুলনা টেনে তিনি জানান, পিভিসি ব্যানার ব্যবহার করলে প্রতি বর্গফুটে খরচ পড়ে ১২ থেকে ১৬ টাকা। আর কাপড়ে প্রিন্ট করলে খরচ সাধারণত ৬ থেকে সাড়ে ৯ টাকার মধ্যে থাকে। সাভার, কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন প্রিন্টিং প্রেসের মালিকরাও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন।

পুরানা পল্টনের ইউনিটেক ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের স্বত্বাধিকারী তারেক রহমান জানান, বর্তমানে সাবলিমেশন প্রিন্টার প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাপড়ের ব্যানার তৈরি করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, এসব কাপড় সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে ছিঁড়ে মাটির সাথে মিশে যায়।

টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যানার তৈরিতে ব্যবহৃত অধিকাংশ কাপড় পরিবেশবান্ধব নয়। টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞদের মতে, যে দামে বর্তমানে ব্যানার তৈরি করা হচ্ছে, সেই দামে বাণিজ্যিকভাবে সত্যিকারের পরিবেশবান্ধব কাপড় ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

এই প্রতিবেদক কিছু ব্যানার তৈরির কাপড় সংগ্রহ করে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) ফাইবার ও ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষকদের দেখান। তাঁরা তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, এই কাপড় কত দিনে অবক্ষয় হবে বা পরিবেশে কী প্রভাব ফেলবে—তা জানতে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার প্রয়োজন। তবে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে স্বল্পমূল্যে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত কাপড় পরিবেশবান্ধব হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বুটেক্সের সদ্য চালু হওয়া টেক্সটাইল ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. শেখ মোহাম্মদ মামুন কবির বলেন, নীতিনির্ধারণে বিশেষজ্ঞ মতামত উপেক্ষার খেসারত দিয়ে যাচ্ছে দেশ। প্রফেসর শেখ মামুন কবির বলেন, উন্নত দেশগুলোতে কোনো নীতি বা বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে একাধিক বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপে টেকসইতা (sustainability), বাস্তবায়নযোগ্যতা (feasibility) এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা হয়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষিত হয়। আমলাতন্ত্র নিজেরাই নিজেদের বিশেষজ্ঞ মনে করে সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফল ভোগ করতে হয় জনগণকে। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা হলে জনগণ সরাসরি সুফল পাবে।

মেট্রোরেলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বুয়েট থেকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল যে কিছু নির্মাণ পদ্ধতি ও উপকরণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে রাবার প্যাড ব্যবহারের বিষয়ে তাঁদের সুস্পষ্ট আপত্তি ছিল। কিন্তু সেই মতামত গুরুত্ব না দেওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং প্রাণহানিও হয়েছে। ড. মামুন কবির বলেন, “বুয়েট তো এখন বলতেই পারে—আমরা আগেই বলেছিলাম, কিন্তু কেউ শোনেনি। এই ধরনের ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই নিতে হয়।”

পলিয়েস্টারভিত্তিক উপকরণ ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, পলিয়েস্টার একটি নন-বায়োডিগ্রেডেবল বা খুব ধীরগতিতে অবক্ষয়যোগ্য উপাদান। এটি মাটিতে ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত থেকে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে কিছুটা অবক্ষয় হলেও এর রাসায়নিক উপাদান মাটির উর্বরতার জন্য ক্ষতিকর। এতে কেঁচোসহ মাটির উপকারী অণুজীব ও পরজীবী ধ্বংস হয়। এটি সরাসরি কৃষি ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমরা যখন পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করি, তখন পরিবেশও প্রতিক্রিয়া দেখায়। জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও ঘূর্ণিঝড়—সবই এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া। তাই পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।”

প্রিন্টিংয়ে ব্যবহৃত রাসায়নিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে পলিয়েস্টার প্রিন্টিংয়ে মূলত ডিসপার্স ডাই ব্যবহার করা হয়। এটি বায়োডিগ্রেডেবল নয় এবং মানব ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে আধুনিক ডিজিটাল টেক্সটাইল প্রিন্টিং ও সাবলিমেশন প্রযুক্তিতে তুলনামূলক কম পরিমাণ ডাই ব্যবহার করা সম্ভব। এর ফলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে।

তিনি বলেন, “প্রচারণা বন্ধ করা যাবে না—কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রচারণা অপরিহার্য। তবে পরিবেশের ক্ষতি না করে কীভাবে প্রচারণা চালানো যায়, সেই ভারসাম্য খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত বা নীতি বাস্তবায়নের আগে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। অন্যথায় ভবিষ্যতেও এমন ক্ষতি ও বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হবে না।

ইসি বলছে কাপড় মাত্রই পচনশীল

ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের আগে এবার সংস্কারের সময় ইসি অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত এসেছে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের কাছ থেকে। কাগজের পোস্টার না রাখা এমনই একটি সিদ্ধান্ত।

জিজ্ঞেস করা হলে একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনী প্রচারণায় কাপড়ের ব্যানারের কথা বলা হলেও কাপড়টির বর্তমান অবস্থা কী তা পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা ইসির হাতে নেই। তবে তাঁরা বলছেন, যদি একান্তই অভিযোগ আসে তবে তা তদন্তের ব্যবস্থা হয়তো ইসি করতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “পিভিসি ব্যানার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এ কারণেই এবার কাপড়ের ব্যানারকে বিকল্প হিসেবে আনা হয়েছে। কাপড় তো পচনশীল, তাই কাপড়ের ব্যানার বা বিলবোর্ড ব্যবহার করলে পরিবেশগত ক্ষতি তুলনামূলক কম হবে।”

পলিয়েস্টার কাপড় আসলে পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব নয়—এ ব্যাপারে অভিযোগের কথা জানানো হলে তিনি বলেন, ৩০০ আসনের প্রতিটির জন্য গঠিত ইনকোয়ারি এবং জুডিশিয়াল কমিটিতে অভিযোগ করতে হবে। এরপর তাঁরা বিষয়টি তদন্ত করবেন।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত