ফারাক্কার প্রভাবে বিপন্ন সুন্দরবন, পদ্মা ব্যারাজে ফিরবে প্রাণ

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৬, ২২: ১২
স্ট্রিম গ্রাফিক

উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ। এর প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠাপানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। বিপরীতে পানির অব্যাহত লবণাক্ততা বৃদ্ধিতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন এখন বিপন্ন। ইকোসিস্টেমও ঝুঁকিতে।

এমন বিপর্যয় থেকে সুন্দরবন রক্ষায় বিএনপি সরকার ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেগা এই প্রকল্প শুধু কৃষির জন্য নয়, মৃতপ্রায় সুন্দরবনের প্রাণসঞ্চারে ‘সঞ্জীবনী সুধা’ হিসেবে কাজ করবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গঙ্গা–পদ্মা অববাহিকায় উজানে ভারত এখন পর্যন্ত ৯৪২টি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো করেছে। এর মধ্যে ড্যাম ৭৮৪; ব্যারেজ ৬৬টি। এসব অবকাঠামোর কারণে শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) বাংলাদেশ মোট পানির মাত্র ১৫ শতাংশ পায়। শুধু ফারাক্কা বাঁধের কারণে এই সময়ে প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার হয়।

পানির এই চরম সংকটের কারণে গড়াই, হিসনা, মাথাভাঙ্গার মতো শাখা নদী পদ্মা থেকে এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে, সমুদ্রের লোনা পানি প্রবল বেগে প্রবেশ করছে। এতে সুন্দরবনসহ পদ্মা বিধৌত এলাকার ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন এবং প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) প্রতিবেদনে সুন্দরবন রক্ষার একটি পথরেখা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে বিপুল পরিমাণ পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পরে সেই পানি গড়াই, মধুমতিসহ অন্যান্য শাখা নদীর মাধ্যমে ভাটির দিকে প্রবাহিত করা হবে। এর সরাসরি ফল হিসেবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানির প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হবে। মিঠাপানির এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ সুন্দরবনের মৃতপ্রায় ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে।

সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচাতে পদ্মা ব্যারাজ বড় ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, সুন্দরবনের মোহনায় লবণাক্ত ও মিঠাপানি মিশে যায়। এই মিশ্রণ অঞ্চলেই মোহনার সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য সব সময় কার্যকর থাকে। এখন উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি না এলে শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি খুবই খারাপ হয়।

ইতোমধ্যে মধুমতি নদী পর্যন্ত লবণাক্ততা পৌঁছে গেছে জানিয়ে মোহাম্মদ এজাজ বলেন, খুলনা ওয়াসা মধুমতি নদীর পানি ধরে নাগরিকদের মধ্যে সরবরাহ করে। এজন্য লবণাক্ততা পরিশোধন করতে হচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে। আর সেটি সম্ভব কেবল পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়নে।

এই নদী বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘ইছামতি–মাথাভাঙ্গা, গড়াই–মধুমতি, বড়াল, চন্দনার নদীব্যবস্থায় প্রায় ৭৯৯ কিউবিক মিটার পানি প্রবাহের মাধ্যমে পুনরায় সংযোজন করা হবে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে। ফলে শেষ পর্যন্ত পুরো সুন্দরবনের লবণাক্ততা কমে যাবে এবং জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। সুরক্ষিত হবে এই অঞ্চলের প্রায় ৭ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা।’

সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা পেলে তা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখবে বলে প্রকল্পের ডিপিপিতেও উল্লেখ রয়েছে। প্রকল্পের আয়-ব্যয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে সুন্দরবন থেকে বছরে ৩ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার কাঠ বা বনজ সম্পদ পাওয়া যায়। পদ্মা ব্যারাজ চালু এবং মিঠাপানির প্রবাহ বাড়লে এই উৎপাদন বেড়ে দাঁড়াবে ৪ লাখ ১৩ হাজার ঘনমিটারে। অর্থাৎ, বছরে বাড়তি ৯৩ হাজার ঘনমিটার বনজ সম্পদ মিলবে। আর্থিক মূল্যে হিসাব করলে, সুন্দরবন কেন্দ্রিক বনসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আয় সৃজন কার্যক্রম থেকে প্রতি বছর ১ হাজার ৭৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকার বেশি নিট সুফল উঠবে বাংলাদেশের ঘরে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আবদুল্লাহ আল-হারুন চৌধুরী বলেন, ‘এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– ব্যারাজটির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা। কারণ, পলি (সেডিমেন্ট) শুধু সমুদ্র থেকে নয়, উজান থেকেও বিপুল পরিমাণ আসে। এই পলি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যারাজটি যথাযথভাবে পরিচালনা করা গেলে কাঙ্ক্ষিত উপকার পাওয়া যাবে।’

যদি সেটি না হয়ে ব্যারাজের উজানে পলি জমা হয়ে কিছু জায়গা ভরাট হয়। তাহলে আবার আরেক ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় ব্যারাজের উজানের দিকে তৈরি হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। আবদুল্লাহ আল-হারুন চৌধুরীর ভাষ্যে, বর্ষা মৌসুমে যে পানি স্বাভাবিকভাবে আসে, তা জমা না হয়ে নেমে যায়। সেই মিঠা পানিকে আটকে রেখে শুষ্ক মৌসুমে নিচের দিকে স্বাভাবিক প্রবাহে রাখা গেলে সুন্দরবনে লবণ পানি বেশি উপরে উঠতে পারবে না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকার হবে। তবে এসব একদিনে হবে না; ধীরে ধীরে ও ধারাবাহিকভাবে হবে।

সম্পর্কিত