সরকারি খাতায় ডেঙ্গুর মাঠের ভয়াবহতা ‘গরহাজির’

সরকারি খাতায় ডেঙ্গুর ভয়াবহতা গরহাজির। স্ট্রিম গ্রাফিক
সরকারি খাতায় ডেঙ্গুর ভয়াবহতা গরহাজির। স্ট্রিম গ্রাফিক

সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি নিবন্ধিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার। এর মধ্যে ৬৫০টি নিয়মিত ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য দিচ্ছে। বড় সংখ্যক বাইরে থাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে মশাবাহিত রোগটির সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কখনো সঠিক চিত্র মেলে না। ফলে কোনো রোগে সরকারি নথিতে যে সংখ্যক আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়, বাস্তবে তা কয়েক গুণ বেশি। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। হাতেগোনা কয়েকটি হাসপাতালের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিচ্ছে। এটিকে সারা দেশের চিত্র নয়, বড়জোর নমুনা বলা যেতে পারে। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতার জন্যই সঠিক চিত্র সরকারের তুলে ধরা উচিত বলে মনে করছেন তারা।

সঠিক চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখার পরিচালক ডা. আবু আহাম্মদ আল মামুন। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়মিত পাওয়া গেলেও, ঘাটতি রয়েছে বেসরকারির। নিবন্ধিত প্রায় ১৩ হাজার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাও অধিদপ্তরের বর্তমান জনবল কাঠামোয় কঠিন।

সাভারের ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষার্থী আদনান করিমের। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ১৫ সেপ্টেম্বর টেস্টে আমার প্লাটিলেট ছিল প্রায় ৭৫ হাজার। চিকিৎসক পরামর্শ দিলেও আমি ভর্তি হইনি। শহীদ রফিক-জব্বার হলে থেকেই চিকিৎসা নিই। ১৭ সেপ্টেম্বর পুনরায় টেস্ট করালে প্লাটিলেট বেড়ে ১ লাখ ২৫ হাজার হয়।

ডেঙ্গুর পরেও হাসপাতালে ভর্তি না হওয়ায়, আদনানের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পরিসংখ্যানে যুক্ত হয়নি। এভাবে বহু প্রতিষ্ঠানে একই ঘটনা ঘটেছে। নাম প্রকাশ না করে সাভার ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারের এক কর্মকর্তা স্ট্রিমকে জানান, তাদের এখানে টেস্টে গড়ে দিনে ৩০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। ভর্তির সুযোগ না থাকায় তাদের শুধু টেস্ট ও চিকিৎসকের পরামর্শ দেওয়া হয়। এই তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয় না।

নথি ঘেঁটে দেখা যায়, সাভারের ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু-সংক্রান্ত হাসপাতালের তালিকায় নেই।

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের মনিরুল ইসলাম চলতি মাসের শুরুতে রাজধানীর কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে টেস্ট করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে তিনি রাজধানীর সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে দুদিন সিসিইউতে চিকিৎসার পর কল্যাণপুর ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মনিরুলকে ভর্তি করান স্বজনেরা। আইসিইউ ও লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় গত ৭ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।

মনিরুলের ছেলে সাজ্জাদুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, বাবার চিকিৎসার সময়ে আমিও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হই। তবে হাসপাতালে ভর্তি ছাড়াই সুস্থ হয়ে গেছি।

মনিরুলের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথির মিল পাওয়া যায়নি। ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অধিদপ্তরের নথিতে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে চলতি বছরে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তির রেকর্ড নেই। একই অবস্থা সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের। কল্যাণপুরের ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মনিরুলের মৃত্যু হলেও, অধিদপ্তরের নথিতে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু শূন্য।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও সরকারি পরিসংখ্যানে না আসায় রোগটির প্রকৃত বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে নির্দিষ্ট হাসপাতালের ভর্তি রোগী, মৃত্যু, ছাড়পত্র ও বর্তমানে চিকিৎসাধীন ব্যক্তির সংখ্যা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিদিন বহু রোগী হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে সরকারি হিসাব মূলত হাসপাতালভিত্তিক; সারা দেশের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে, ঢাকা মহানগরে ডেঙ্গুর তথ্য দিচ্ছে মাত্র ৭৭টি হাসপাতাল। এর মধ্যে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত ১৮ এবং বেসরকারি ৫৯টি। অথচ মহানগরে নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রায় ৪৯৪টি। বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ডেঙ্গু রিপোর্টিংয়ের বাইরে রয়েছে। একইভাবে সারা দেশে নিবন্ধিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রায় ১৩ হাজার।

অধিদপ্তরের নথি বলছে, সারা দেশ থেকে শুধু সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গুর তথ্য দিচ্ছে। এর মধ্যে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ৫৫৬ সরকারি হাসপাতাল এবং ঢাকার বাইরের অন্তত ১৭টি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য সংগ্রহ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর সঙ্গে ঢাকা মহানগরে ৭৭টি হাসপাতাল ধরলে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য দিচ্ছে মাত্র ৬৫০টি প্রতিষ্ঠান। বাইরে থাকছে প্রায় ১৩ হাজার প্রতিষ্ঠান।

অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) ডা. আবু আহম্মাদ আল মামুন জানান, ঢাকার বাইরের সরকারি জেলা-উপজেলা হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য নিয়মিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে স্ট্রিমকে তিনি বলেন, নিবন্ধিত সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিককে ডেঙ্গু এবং হামের তথ্য পাঠাতে বলা আছে। অনেকেই পাঠায়। কিন্তু আমাদের সীমাবদ্ধতার কারণে সব কাভার করা হয়ে ওঠে না।

ডা. মামুন বলেন, ‘তুলনামূলক পরিচিত ও বড় বেসরকারি হাসপাতালে রিপোর্টিংয়ের জন্য লোক পাওয়া যায়। কিন্তু ছোট বা অপেক্ষাকৃত কম মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও পাঠানোর জন্য দায়িত্বশীল লোক খুঁজে পাওয়া এবং ধরে রাখা কঠিন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টিং নিশ্চিত করা অধিদপ্তরের জন্য সত্যিই কঠিন। তথ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া গেলে কাজটি আরও সঠিকভাবে করা সম্ভব হবে মনে করেন তিনি।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কখনো সঠিক তথ্য দেয় না। আমরা সব সময় বলে থাকি– বিভিন্ন রোগে বাংলাদেশে যে রোগী মারা যায়, বাস্তবে তা কয়েক গুণ বেশি। ডেঙ্গু নিয়ে যে কয়েকটি হাসপাতালের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেয়, সেটিকে শুধু নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এটিকে কখনো সারা দেশের চিত্র বলা ঠিক হবে না। সত্যিকার অর্থে অধিদপ্তর কখনো সঠিক চিত্র দিতে উদ্যোগী হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সারা দেশের সঠিক চিত্র অধিদপ্তর প্রকাশ করলে মানুষ রোগ সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে। জটিল রোগ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রোগটির বিস্তার রোধে ভূমিকা রাখবে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত