পঞ্চাশে রোনালদো: বল পায়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘ফেনোমেনন’
আজ ১৮ সেপ্টেম্বর, রোনালদোর জন্মদিন। ১৯৭৬ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বেন্তো রিবেইরোতে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলারের ৫০ বছর পূর্ণ হলো। তবে তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে একটা মজার বিষয় আছে।

সবুজ ঘাসে তাঁর পায়ে বল উঠলেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে চাপ তৈরি হতো। গতি, ড্রিবলিং আর ক্ষিপ্রতায় গোলরক্ষককে পরাস্ত করে ফুটবলকে অনন্য শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। ক্যারিয়ারজুড়ে হাঁটুর চোট বারবার তাঁর পথ আটকে দিয়েছে। ফিনিক্স পাখির মতো সেই বিষাদের অন্ধকার ঠেলে বারবার ফিরে এসেছেন সবুজ গালিচায়।
জিতেছেন জোড়া বিশ্বকাপ, দু-দুটি ব্যালন ডি’অরসহ ব্যক্তিগত ও দলীয় নানা শিরোপা। যদিও এত সাফল্যের পরও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি তাঁর ক্যারিয়ারে অধরাই থেকে গেছে। তিনি ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও, ফুটবলবিশ্বে যিনি পরিচিত ‘দ্য ফেনোমেনন’ নামে। তাঁকে সর্বকালের সেরা ‘নম্বর ৯’ ও সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার মনে করেন কেউ কেউ।
আজ ১৮ সেপ্টেম্বর, রোনালদোর জন্মদিন। ১৯৭৬ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বেন্তো রিবেইরোতে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলারের ৫০ বছর পূর্ণ হলো। তবে তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে একটা মজার বিষয় আছে। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে ২২ সেপ্টেম্বরকে নথিভুক্ত জন্মতারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, আবার ১৮ সেপ্টেম্বরও তাঁর জন্মদিন হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর বাবা কয়েক দিন পরে জন্মনিবন্ধন করায় এই পার্থক্য তৈরি হয়েছিল। তাই পরিবারের কাছে ১৮ সেপ্টেম্বর আর সরকারি নথিতে ২২ সেপ্টেম্বর, দুইটি তারিখের কথাই পাওয়া যায়।
পেশাদার ফুটবলে রোনালদোর পথচলা শুরু হয় ব্রাজিলের ক্রুজেইরোর জার্সিতে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৬-১৭ বছর। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলে ১৭ বছর বয়সে ডাক পেলেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি। এরপর পিএসভি আইন্দহোভেন হয়ে ইউরোপের ফুটবলে নিজের পরিচয় তৈরি করেন। ১৯৯৬ সালে বার্সেলোনায় যোগ দিয়ে মাত্র এক মৌসুমেই ৪৯ ম্যাচে ৪৭ গোল করেন। জেতেন কোপা দেল রে, কাপ উইনার্স কাপ ও স্প্যানিশ সুপার কাপ। একই মৌসুমে পান লা লিগার পিচিচি ও ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু। ২১ বছর বয়সে প্রথম ব্যালন ডি’অরও আসে তাঁর হাতে।

১৯৯৭ সালে ইন্টার মিলানে পাড়ি জমান রোনালদো। ইতালির ক্লাবে কঠিন রক্ষণভাগের বিপক্ষেও গোলের ধার কমেনি তাঁর। সেবার জেতেন উয়েফা কাপ। ফাইনালে লাজিওর বিপক্ষে দারুণ একটি গোলও করেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের ‘পিক টাইমে’ একাধিকবার মারাত্মক চোটের মুখোমুখি হয়ে মাঠের বাইরে কাটাতে হয় তাঁকে। ২০০০ সালে ফেরার পর আবারও হাঁটুর চোটে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার হয়তো এখানেই শেষ।
এর মাঝের কয়েকটা বছর কেটেছিল অপারেশন থিয়েটার, ফিজিওথেরাপি আর পুনর্বাসনের কঠিন লড়াইয়ে। একসময় প্রশ্ন উঠেছিল, রোনালদো কি আর আগের মতো মাঠে ফিরতে পারবেন? ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারের ৪ বছর পর সেইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে দক্ষিণ কোরিয়া-জাপানের ২০০২ বিশ্বকাপে ফিরলেন তিনি।
রোনালদো ফিরেই যেন নিজের পুরোনো গল্পটা নতুন করে লিখলেন। ৮ গোল করে জিতে নিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডেন বুট। ফাইনালে শক্তিশালী জার্মানির বিপক্ষে তাঁর জোড়া গোলেই ব্রাজিল জিতে নিল পঞ্চম বিশ্বকাপ। সেই বছর দ্বিতীয়বারের মতো ব্যালন ডি’অর ও ফিফা বর্ষসেরার স্বীকৃতি পান তিনি।
২০০২ বিশ্বকাপের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের পর রোনালদো যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে। স্পেনের এই ক্লাবে তখন চলছিল ‘গ্যালাকটিকো’ যুগ। এটি ছিল মূলত ক্লাবটির তৎকালীন সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের কৌশল। তিনি বড় বড় তারকা ফুটবলারকে দলে আনার পরিকল্পনা করেছিলেন। রিয়াল মাদ্রিদ-অধ্যায়ে রোনালদো জেতেন লা লিগা ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ। ১৭৭ ম্যাচে করেন ১০৪ গোল। এরপর খেলেছেন এসি মিলান ও ব্রাজিলের করিন্থিয়ান্সে। ২০১১ সালে ঘোষণা করেন অবসরের কথা।
এখন তো প্রশ্ন আসতেই পারে, রোনালদোর ট্রফির ঝুলিতে কী কী আছে, তাই না? উত্তরটা সহজ। ব্রাজিলের হয়ে তাঁর অর্জনের তালিকায় রয়েছে ২টি ফিফা বিশ্বকাপ (১৯৯৪, ২০০২), ২টি কোপা আমেরিকা (১৯৯৭, ১৯৯৯) ও ১৯৯৭ সালের কনফেডারেশন্স কাপ। ক্লাবের হয়েও কম যাননি তিনি। জিতেছেন ১৯৯৭-৯৮ উয়েফা কাপ, ১৯৯৬-৯৭ কাপ উইনার্স কাপ, ১৯৯৬-৯৭ কোপা দেল রে, ২০০২-০৩ লা লিগা ও ২০০২ সালের ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ। ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকাও বেশ সমৃদ্ধ। দুইবার ব্যালন ডি’অর, তিনবার ফিফা বর্ষসেরা, ১৯৯৮ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল, ২০০২ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট, ১৯৯৭ সালের ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু ও লা লিগার পিচিচি ট্রফি রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। সব মিলিয়ে ব্রাজিলের জাতীয় দলের হয়ে ৯৮ ম্যাচে করেছেন ৬২ গোল।
এত ট্রফি আর ব্যক্তিগত স্বীকৃতির পরও চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফিটি অধরাই থেকে গেছে রোনালদোর। বার্সেলোনা, ইন্টার, রিয়াল মাদ্রিদ ও এসি মিলানের হয়ে খেলেও ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত এই ট্রফিটি কখনো ছুঁতে পারেননি তিনি। হয়তো ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা এটাই। তবে বারবার চোটে থেমে গিয়েও যেভাবে ফিরে এসে নিজের সেরা ফুটবল খেলেছেন, সেই গল্পই তাঁকে ফুটবলপ্রেমীদের মনে আলাদা করে রাখবে।
.png)






