
খাতা-কলমে ইলিশ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। তাহলে জেলের জাল কেন প্রায়ই খালি ফেরে, আর বাজারে ইলিশ কেন সোনার দরে বিকোয়? ইলিশের গল্প বাংলাদেশের নদী, মানুষ ও সংস্কৃতির গল্প। জেলের জালে রুপালি ঝিলিক উঠলে শুধু একটি মাছ ধরা পড়ে না—হাসি ফোটে জেলে পরিবারে, প্রাণ ফিরে পায় ঘাট ও আড়ত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চেনা দৃশ্যটি বদলে যাচ্ছে। ভরা মৌসুমেও জেলেরা ফিরছেন প্রায় খালি নৌকা নিয়ে; বড় ইলিশ ক্রমেই দুর্লভ; বাজারে ইলিশের দাম চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
অথচ দুই দশকের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন গল্প। ২০০২–০৩ অর্থবছরের প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার টন থেকে ২০২২–২৩ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে, অর্থাৎ প্রায় ১৮৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এই সংখ্যা বহু বছর ধরে ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জাটকা সংরক্ষণ, মা-ইলিশ রক্ষা, অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা ও জেলেদের সহায়তা কর্মসূচি যে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক দ্রুত পতন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—আমরা কি ইলিশের প্রকৃত মজুত বৃদ্ধি পরিমাপ করেছি, নাকি বেড়ে যাওয়া আহরণের একটি আনুমানিক হিসাবকেই সম্পদের উন্নতি বলে ধরে নিয়েছি?
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে দুই দশকের চিত্রে তিনটি পৃথক অধ্যায় স্পষ্ট। প্রথমত ২০০২–০৩ থেকে ২০১৫–১৬—ধীর কিন্তু ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত ২০১৬–১৭ সাল থেকে, যখন এক বছরেই আহরণ প্রায় এক লাখ টন বেড়ে যায়। তৃতীয়ত ২০২০–২১-এর পর—প্রথমে স্থবিরতা, এরপর দ্রুত পতন।
২০১৬–১৭ সালের উল্লম্ফন: ব্যাখ্যা প্রয়োজন
২০১৫–১৬ সালে আহরণ ছিল ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৯৫১ টন। পরের বছরই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৭ টনে। এক বছরে প্রায় ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি। অনুকূল বৃষ্টিপাত, সফল প্রজনন কিংবা সংরক্ষণ ব্যবস্থার সম্মিলিত সুফলে এমন বছর আসতেই পারে, কিন্তু এত বড় এক বছরের লাফের আলাদা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দরকার। সেই বছর জাটকার বেঁচে থাকার হার কতটা বেড়েছিল? নৌকা, জালের সংখ্যা বা মাছ ধরার দিন কি বেড়েছিল? নমুনা কাঠামো বা সম্প্রসারণ-গুণকে কোনো পরিবর্তন হয়েছিল কি? এসব প্রশ্নের সদুত্তর ছাড়া এই বৃদ্ধির কতটা প্রকৃত জৈবিক উন্নতি আর কতটা পরিসংখ্যানগত প্রাক্কলনের ফল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। লক্ষণীয়, ২০১৬–১৭ সালের প্রায় ৫ লাখ টনের সঙ্গে ২০২৪–২৫ সালের প্রায় ৫ লাখ টন তুলনা করলে আট বছরে নিট বৃদ্ধি প্রায় শূন্য—অর্থাৎ দুই দশকের ‘সাফল্যরেখা’র বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি বিশেষ বছরের উল্লম্ফনের ওপর।
‘উৎপাদন’ আর ‘আহরণ’ এক নয়
ইলিশ চাষ করা হয় না। এটি নদী ও সাগরের প্রাকৃতিক সম্পদ। তবু সরকারি প্রচারে ‘ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি’ শব্দবন্ধ এমনভাবে ব্যবহৃত হয়, যেন তা পুকুরের মাছ চাষের মতো। প্রাকৃতিক জলাশয়ে মোট আহরণ বাড়ার পেছনে অন্তত তিনটি ভিন্ন কারণ থাকতে পারে—মাছের প্রকৃত মজুত বেড়েছে, নৌকা-জাল-প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বেড়েছে, অথবা তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও আওতা বদলেছে। ধরা যাক, ১০০টি নৌকা যে পরিমাণ ইলিশ ধরত, এখন ২০০টি নৌকা একই পরিমাণ ধরছে। মোট আহরণ অপরিবর্তিত থাকলেও প্রতি নৌকার আহরণ অর্ধেক হয়ে গেছে, যা মজুতের অবনতিরই ইঙ্গিত। তাই মোট আহরণের পাশাপাশি প্রতি ইউনিট আহরণচেষ্টায় প্রাপ্তি, মাছের গড় আকার, প্রজননক্ষম মাছের অনুপাত ও জাটকা সংগ্রহের পরিমাণ নিয়মিত জানা জরুরি। মোট টনের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ সূচক, কিন্তু তা সম্পদের সুস্থতার পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ নয়।
পুরোনো নমুনা কাঠামো, নতুন বাস্তবতা
জাতীয় হিসাব তৈরি হয় নির্বাচিত গ্রাম, মাছ ধরার ইউনিট ও অবতরণকেন্দ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করে, তারপর নির্ধারিত ‘রাইজিং ফ্যাক্টর’ প্রয়োগ করে। এ পদ্ধতি বিশ্বজুড়েই ব্যবহৃত হয় এবং তা দুর্বল নয়। তবে এর নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করে নমুনা কাঠামো হালনাগাদ কি না, তার ওপর। মৎস্য অধিদপ্তরের ২০১৬–১৭ সালের ইয়ারবুকেই উল্লেখ ছিল, ব্যবহৃত ‘স্যাম্পলিং ফ্রেম’ মূলত ১৯৮৫ সালের। চার দশকে নদীর গতিপথ বদলেছে, নতুন চর জেগেছে, নৌকার যান্ত্রিকীকরণ বেড়েছে, নতুন অবতরণকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এত পুরোনো কাঠামো দিয়ে আজকের জটিল মৎস্যব্যবস্থা পরিমাপ করলে প্রাক্কলনে অনিশ্চয়তা থাকা স্বাভাবিক। তাই সরকারি পরিসংখ্যানকে সরাসরি বাতিল করার কারণ নেই। আবার প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়াও বিজ্ঞানসম্মত নয়। প্রয়োজন পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও স্বাধীন যাচাই।
সংখ্যা কি ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়ানো হয়েছিল
প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এর জন্য কাঁচা জরিপ ফরম, হিসাব সংশোধনের ইতিহাস ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন। তবে একটি বাস্তবতা বিবেচ্য: উন্নয়ন প্রশাসনে প্রায়ই কর্মসূচির সাফল্য নির্দিষ্ট সংখ্যাগত লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে অজান্তেই ক্রমবর্ধমান সংখ্যাকে সম্পদের প্রকৃত স্বাস্থ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এটি কারও অসততার প্রশ্ন নয়, বরং সূচক নির্বাচনের সীমাবদ্ধতা। বেশি মাছ ধরা আর বেশি মাছ থাকা সব সময় এক কথা নয়।
পতনের আগেই ছিল স্থবিরতার সংকেত
২০২১–২২ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, ২০২২–২৩ সালে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ বড় পতনের আগে অন্তত দুই বছর সরকারি পরিসংখ্যানেই স্থবিরতার সংকেত ছিল। এরপর ২০২৩–২৪ সালে আহরণ প্রায় ৪২ হাজার টন কমে, এবং পরের অর্থবছরেও পতন অব্যাহত থেকে আহরণ প্রায় ৫ লাখ টনে নামে। দুই বছরে হ্রাস প্রায় ৭০ হাজার টন। বড় ইলিশের স্বল্পতা, প্রতি নৌকায় কম আহরণ, বেশি সময়-জ্বালানি ব্যয় ও নদীতে অনিয়মিত উপস্থিতি একসঙ্গে দেখলে এটি নিছক একটি খারাপ মৌসুম নয়, বরং মজুতের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। নদীতে পর্যাপ্ত পানির অভাব, মোহনায় পলি জমা, অভিপ্রয়াণপথে অতিরিক্ত জাল, জাটকা ও অবৈধ কারেন্ট জাল আহরণ, লবণাক্ততার বিস্তার এবং সাগরে অনিয়ন্ত্রিত আহরণচাপ—এসব একসঙ্গে ইলিশকে নদী থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
নদী থেকে ইলিশ কমছে কেন
ইলিশের জীবনচক্র নদী ও সাগরের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সাগরে বেড়ে ওঠা ইলিশ প্রজননের জন্য মোহনা পেরিয়ে মিঠাপানির নদীতে আসে। নদীর প্রবাহ, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতের সংকেত অনুসরণ করেই এই অভিপ্রয়াণ ঘটে।
এই সূক্ষ্ম চক্রটি এখন একযোগে একাধিক দিক থেকে চাপের মুখে। দূষণ এর মধ্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিল্পকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য, ট্যানারি ও ডায়িং শিল্পের বিষাক্ত নির্গমন, কৃষিজমির সার-কীটনাশক-মিশ্রিত পানি, নৌযান থেকে তেল-গ্যাস নিঃসরণ এবং নগর এলাকার অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো ইলিশের প্রধান প্রজননক্ষেত্রে। পানিতে অক্সিজেন কমে গেলে ইলিশ সেই নদীপথ এড়িয়ে চলে—যেমনটা একসময়ের সমৃদ্ধ ইলিশক্ষেত্র বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় ইতিমধ্যে ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, যা মাছের খাদ্যচক্র ও প্রজননক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষকেরা আশঙ্কা করছেন।
ইলিশ ব্যবস্থাপনার সাফল্য মূল্যায়নে মোট আহরণের পাশাপাশি অন্তত কয়েকটি সূচক নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন: প্রতি নৌকা বা মাছ ধরার দিনে আহরণের পরিমাণ, ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য-ওজন, প্রজননক্ষম ইলিশের অনুপাত, জাটকার সংগ্রহ ও বেঁচে থাকার হার, নদী-সামুদ্রিক আহরণের পৃথক প্রবণতা, এবং আহরণচেষ্টার (নৌকা-জাল-দিন) সামগ্রিক হিসাব। এ ছাড়া প্রয়োজন—নৌকা-জাল-জেলে-অবতরণকেন্দ্রের নতুন জাতীয় শুমারি; প্রতিটি প্রাক্কলনের সঙ্গে নমুনার আকার ও ব্যবধান (কনফিডেন্স ইন্টারভাল) প্রকাশ; গুরুত্বপূর্ণ অবতরণকেন্দ্রে ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা, জিপিএস/ভিএমএস ও ই-লগবুক চালু; এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জেলে প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা।
সংখ্যা নয়, নদীতে ফিরুক ইলিশ
ইলিশের পরিসংখ্যান ভুল ছিল কি না—এর সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কিছু বছরে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সংরক্ষণ কার্যক্রম সুফল দিয়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো তথ্য-কাঠামো, আহরণচেষ্টার অসম্পূর্ণ হিসাব ও এক বছরের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন যৌক্তিক প্রশ্নও তৈরি করেছে। সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, সরকারি সিরিজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি নির্দেশক, কিন্তু একে ইলিশের প্রকৃত মজুতের নির্ভুল পরিমাপ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। অতীতের সাফল্যকে সম্মান করেই এখন পদ্ধতি বদলাতে হবে। লক্ষ্য শুধু ঊর্ধ্বমুখী একটি গ্রাফ নয়; লক্ষ্য নদী, মোহনা ও সাগরে একটি সুস্থ ইলিশসম্পদ ধরে রাখা।
পরিসংখ্যান রাষ্ট্রের আয়না। আয়না স্বচ্ছ হলে অর্জন ও সংকট দুটোই সময়মতো ধরা পড়ে। তাই এখন প্রয়োজন দোষারোপ নয়, হিসাবকে আরও আধুনিক, উন্মুক্ত ও বিজ্ঞানভিত্তিক করা।
- ড. মো. শরীফুল ইসলাম: মৎস্যবিজ্ঞানী; সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা
.png)
-40e58c.jpeg)







