ad

পদ্মার ভেবে গুজরাটের ইলিশ কিনছেন না তো, চিনবেন যেভাবে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ২৫
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের রপ্তানি নীতি অনুযায়ী, ইলিশ শর্ত সাপেক্ষে রপ্তানিযোগ্য পণ্য। একসময় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে ইলিশ পাঠাত বাংলাদেশ। কিন্তু এই প্রথম ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ রপ্তানির ঘটনা ঘটল। দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া, বড় আকারের ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানির দিকে ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে, ভারতের কিছু এলাকায় তুলনামূলক কম দামে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।

গত দুই মাসে ভারতের গুজরাট থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ এসেছে বলে জানা যাচ্ছে। সামনে আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশের ইলিশের বাজারে এমন পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, পদ্মার ইলিশ আর গুজরাটের ইলিশের মধ্যে পার্থক্য বুঝবেন কী করে?

মাছের প্রজাতি এক হওয়ায় তেমন বৈজ্ঞানিক কোনো বৈশিষ্ট্য নেই যা দিয়ে গুজরাট আর পদ্মার ইলিশকে আলাদা করা যাবে। কিন্তু মাছের উৎপত্তিস্থলের ওপর ভিত্তি করে মাছের রঙ, গড়ন কিংবা স্বাদে পার্থক্য হয়।

কীভাবে পদ্মার ইলিশ আর গুজরাটের ইলিশ আলাদা করবেন

বাজারে ইলিশ উঠলেই শুরু হয় দরদাম। বিক্রেতা হয়তো বলছেন, ‘পদ্মার ইলিশ, একেবারে আসল।’ কিন্তু ক্রেতার মনে তখনও সন্দেহ। কারণ দেখতে প্রায় একই হওয়ায় গুজরাটের ইলিশ আর বাংলাদেশের নদীর ইলিশ আলাদা করা সহজ নয়। তবে মাছের গড়ন ও রং ভালো করে দেখলে কিছুটা ধারণা করা যায়।

পদ্মার ইলিশ সাধারণত লম্বায় তুলনামূলক ছোট, কিন্তু চওড়ায় বেশি হয়ে থাকে। সহজ করে বললে, পদ্মার ইলিশ একটু ‘খাটো-মোটা’ ধরনের দেখায়। তবে পেটের অংশটা বেশ চওড়া হতে পারে। গায়ের রঙও থাকে উজ্জ্বল রুপালি।

মাছের শরীর চাপা ও পুরু হওয়াও ইলিশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তাই শুধু পেট মোটা দেখলেই সেটি পদ্মার—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। তবে পাশাপাশি যদি মাছটি তুলনামূলক খাটো ও চওড়া হয় এবং গায়ের রং উজ্জ্বল রুপালি হয়, তাহলে সেটি নদীর ইলিশ হওয়ার সম্ভাবনার সঙ্গে মিলতে পারে।

আবার গুজরাটের ভারুচের ইলিশ আসে নর্মদা নদী ও তার মোহনা এলাকার দিক থেকে। বাজারে পাওয়া গুজরাটের ইলিশ লম্বাটে ও তুলনামূলক সরু হতে পারে। উপকূলীয় বা সাগরঘেঁষা ইলিশের ক্ষেত্রেও এমন গড়ন দেখা যায়। ফলে খুব লম্বা ও সরু গড়নের মাছকে বিক্রেতা ‘পদ্মার ইলিশ’ বললে সতর্ক হওয়া ভালো।

রঙ দেখে কি যায় চেনা?

পদ্মার ইলিশ বলতে আমরা বুঝি, চকচকে রূপালী ইলিশ। কিন্তু কেবল রং দেখে মাছটি ‘পদ্মার না গুজরাটের’ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

পদ্মার ইলিশ সাধারণত চকচকে রুপালি হওয়ায় এই বৈশিষ্ট্যটি বেশি আলোচিত। অনেকসময় মাছে আলো পড়লে পিঠের দিকে হালকা সোনালি বা বেগুনি আভা দেখা যেতে পারে। মাছের শরীরের মাঝ বরাবর লালচে রেখাও চোখে পড়ে। অন্যদিকে, গুজরাটের ইলিশের গায়েও রুপালি রং থাকে, তবে পিঠের অংশ তুলনামূলক কালচে বা ধূসর দেখাতে পারে। পদ্মার তাজা ইলিশের মতো উজ্জ্বল রুপালি ভাব অনেক সময় এতে দেখা যায় না।

আবার, ইলিশ কেনার সময় চোখের দিকেও খেয়াল রাখা যায়। দেশীয় নদীর তাজা ইলিশের চোখ সাধারণত পরিষ্কার, স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল থাকে। এদিকে, দীর্ঘ সময় বরফে সংরক্ষণ বা দূরপাল্লার পরিবহনের কারণে গুজরাটের ইলিশের চোখ কিছুটা ঘোলা, কালচে বা লালচে দেখাতে পারে।

এখানে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, মাছ কতটা তাজা, বরফে কতক্ষণ ছিল এবং কীভাবে সংরক্ষিত ছিল এর ওপরও মাছের বাহ্যিক চেহারা বদলে যেতে পারে।

ফলে মাছের রং, গড়ন আর পেটের আকার; এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখা ভালো।

গুজরাটের ইলিশের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর ডিম। কলকাতার হাওড়া হোলসেল ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি সৈয়দ আনোয়ার মকসুদের ভাষ্য, গুজরাটের ইলিশে প্রচুর ডিম থাকে। ডিমের আকারও বাংলাদেশের ইলিশের তুলনায় বড় বলে জানিয়েছেন তিনি। ভারতের বাজারে এই কারণে গুজরাটের ইলিশের চাহিদা কম হলেও বাংলাদেশে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেটে, ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা থাকায় মাছটির চাহিদা তৈরি হয়েছে।

ইলিশের স্বাদে নদীর জাদু!

ইলিশ সাগর থেকে নদীর দিকে আসার সময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। নদীর পানিতে থাকার সময় এর শরীরেও পরিবর্তন আসে। এ কারণে নদীর ইলিশের স্বাদ সাগরের ইলিশের তুলনায় আলাদা হতে পারে বলে মৎস্যবিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছেন।

নদীর পানিতে আসা ইলিশের স্বাদ তুলনামূলকভাবে বেশি তেলতেলে ও মোলায়েম মনে হতে পারে। রান্নার সময় এর বিশেষ ঘ্রাণও অনেকের কাছে সহজেই আলাদা বলে মনে হয়। এ কারণেই নদীর ইলিশ, বিশেষ করে পদ্মা-মেঘনা অঞ্চলের ইলিশের স্বাদ নিয়ে এত সুনাম।

অন্যদিকে, সমুদ্র বা মোহনা থেকে ধরা ইলিশের স্বাদ ও গন্ধ কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। সাগরে থাকা অবস্থায় ইলিশ মূলত প্ল্যাঙ্কটন খায়। প্ল্যাঙ্কটন ছাড়াও ওয়াটার ফ্লি এবং প্রচুর বালি ও কাদা গিলে থাকে এই ইলিশ। খাদ্যাভাসের কারণেই ইলিশের দেহে প্রচুর তেল জমে এবং বিশেষ এক গন্ধের সৃষ্টি হয়।

সমুদ্র থেকে ইলিশ যত বেশি নদীর দিকে আগাতে থাকে, ততই তাদের তেল ভাঙতে থাকে। স্যাচুরেটেড এই ফ্যাট ভেঙে পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড বা পুফায় বদলে যায়। মৎস্যবিজ্ঞানীদের মতে, ইলিশের স্বাদের মূল কারণ এই পুফা। সমুদ্রের ইলিশের যত বেশি মেদ থাকবে, তারা তত দ্রুত নদীতে পাড়ি দিতে পারবে। আর তত বেশি ফ্যাট ভেঙে বাড়বে তার স্বাদ।

তবে শুধু রান্না করা মাছের স্বাদ বা ঘ্রাণের ওপর নির্ভর করে সেটি পদ্মার নাকি গুজরাটের—এভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। মাছ কতটা তাজা, এর সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং রান্নার ধরনও স্বাদ আর ঘ্রাণে প্রভাব ফেলে।

দামের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিষয় দেখা যায়। পদ্মা-মেঘনা অঞ্চলের ইলিশের চাহিদা বেশি হওয়ায় মাছের দাম অনেক সময় বেশি থাকে। তাই দোকানি ইলিশের সাধারণ দামের চেয়ে কমে দিতে রাজি হলে ভাবা উচিত নয় যে মাছটি গুজরাটের। শুধু বেশি দাম মানেই পদ্মার ইলিশ, কিংবা কম দাম মানেই গুজরাটের ইলিশ; এমন সরল হিসাব করা ঠিক নয়। তবে অস্বাভাবিক কম দামে ‘পদ্মার ইলিশ’ বলে মাছ বিক্রি করলে একটু সতর্ক হওয়া ভালো।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত