ad

জন্মদিনে স্মরণ/কবিতার জন্য চাকরি ছেড়েছিলেন যে কবি

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

চাকরি মানুষকে নিরাপত্তা দেয়, কবিতা দেয় অস্থিরতা—অনেকেই এরকম ভাবেন। কিন্তু জীবনে ভালো চাকরি, অর্থ, প্রতিষ্ঠা সবকিছু নিশ্চিত জেনেও কেউ কেউ বেছে নেয় সেই অস্থিরতাকে। গণিত ও বিজ্ঞানের সঙ্গে যার সখ্য, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে যার মেশিন নকশা, যন্ত্র আর প্রকৌশলের হিসাব করার কথা ছিল, সেখানে তিনি কলম হাতে বেছে নিয়েছিলেন অনিশ্চয়তার পথ। তিনি বিনয় মজুমদার।

‘কাব্যোন্মাদ’

পঞ্চাশের দশকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিদের একজন। যাকে তাঁর সময়ের সাধারণ মানুষ ‘পাগল কবি’ বা ‘কাব্যোন্মাদ’ বলে অভিহিত করলেও সাহিত্যিক ও সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন একজন ‘গণিতবিদ কবি’ বা খাঁটি কবিতার সাধক। প্রেমের টান, কবিতার নেশা আর নিজের ভেতরের এক অদ্ভুত জগত তাঁকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়েছিল সংসারী জীবনের বাইরে। যেখানে বাস্তবের মানুষ ধীরে ধীরে কখনো হয়ে উঠত ‘ঈশ্বরী’,কখনো ‘গায়ত্রী’, কখনো বা ‘চাকা’। তাঁর চাকরি ছাড়ার গল্প, মানসিক অসুস্থতার দীর্ঘ ছায়া এবং গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে ঘিরে একতরফা প্রেম সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়কর জীবন।

প্রকৌশলী থেকে কবি

১৯৩৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বার্মায় জন্ম বিনয় মজুমদারের। পরে পরিবার চলে আসে বাংলায়। ছাত্রজীবন থেকেই গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনার পর শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। তাঁর পরিচয় শুধু কবি হিসেবে শুরু হয়নি। বিজ্ঞান, গণিত, প্রকৌশল এসবও ছিল তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চাকরিও করেছিলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, ত্রিপুরা সরকারের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছেন। দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টেও কাজ করার তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু বিনয়ের কাছে চাকরিই জীবনের শেষ গন্তব্য ছিল না। তিনি বারবার চাকরি ছেড়েছেন। শেষ পর্যন্ত কবিতাকেই বেছে নিয়েছেন জীবনের প্রধান কাজ হিসেবে।

কলকাতার কবি প্রবাল কুমার বসুর হাতে এসেছিল বিনয় মজুমদারের ব্যক্তিগত ডায়েরি ও চিঠিপত্র। সেসব নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে প্রবাল কুমার লিখেছেন, বিনয় তখন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে দুর্গাপুরে স্টিল প্রোজেক্টে ট্রেনি হিসেবে যোগ দিয়েছেন। থাকেন ট্রেনিদের হস্টেলে, রুম নম্বর চারে। সরকারি চাকরি, সকাল আটটার মধ্যে পৌঁছতে হয়, খাওয়াদাওয়ার অসুবিধা। চাকরিতে মন বসছে না। মাইনেটাও বেশ কম, কলকাতার কবিতার জগৎ থেকে দূরে, ফলে প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি খুঁজছেন যাতে কলকাতা চলে আসতে পারেন। চাকরির দরখাস্ত দিয়েছেন সেই সময়ের বিখ্যাত তেলের কোম্পানি ‘এসো’-তে (Esso), আবার পড়ানোর কাজ চেয়ে জ্ঞান ঘোষ পলিটেকনিকেও। কিন্তু বাবা-দাদাদের ইচ্ছে নয় যে বিনয় সরকারি চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসুন। প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি যে আরও কত কষ্টের ও অনিশ্চিতির, সেই কথা জানিয়ে চিঠি দিচ্ছেন তাঁরা। বাবা লিখছেন, ‘সরকারি চাকরিতে শান্তি আছে, পেনশন আছে, ভবিষ্যৎ আছে। আমার ইচ্ছে তোর ট্রেনিং শেষ হলেই তোকে বিয়ে দেব। ঐখানেই ৩২৫ টাকা পাবি, ওই টাকাতে তোর চলে যাবে। তখন শান্তিতে থাকতে পারবি।’ চিঠির তারিখ ৯ জুন ১৯৬২। তার ক’দিন পরেই, ১৪ জুন বিনয়ের দাদা তাঁকে লিখছেন, ‘চাকরি করতে হলে যতটা তেল মারার ক্ষমতা ও পরিশ্রম করার ক্ষমতা দরকার, তা তোর নেই। উড়ু উড়ু মন নিয়ে সেটা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। মাইনের লোভে প্রাইভেট ফার্মে না যাওয়াই ভালো।’ এমনকি বিনয় কয়েকদিনের জন্য কলকাতায় আসতে চাইলে দাদা লিখছেন, ‘এখানে বৌদি থাকবে, তাই তোমার এখানে থাকা সম্ভব হবে না।’

শেষ পর্যন্ত কোনো চাকরিতেই থিতু হতে পারেননি বিনয়।

কবিতা ও প্রেম

১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নক্ষত্রের আলোয়’। পরে ‘ফিরে এসো, চাকা’ তাঁকে বাংলা কবিতায় আলাদা করে পরিচিত করে তোলে। এই বইয়ের ভাষা, বিষয় ও নির্মাণ ছিল প্রচলিত প্রেমের কবিতার চেয়ে একেবারেই আলাদা। বিনয়ের কবিতায় প্রেম এসেছে, কিন্তু সেই প্রেমের সঙ্গে মিশে গেছে গণিত, বিজ্ঞান, প্রকৃতি, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি। বিনয়ের কবিমানস গড়ে উঠেছিল বস্তুজগৎ ও মনোজগতের পারস্পরিক টানাপোড়েনে, প্রেম ও প্রকৃতির পাশাপাশি বিজ্ঞান ও গণিতও তাঁর কবিতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তারপর তাঁর জীবনে এলেন গায়ত্রী।

বিনয়ের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় গায়ত্রী চক্রবর্তী। প্রেসিডেন্সি কলেজের মেধাবী ছাত্রী গায়ত্রী চক্রবর্তী পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত চিন্তাবিদ ও সাহিত্যতাত্ত্বিক হন। তরুণ বয়সে বিনয় তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন। সেই প্রেম ছিল মূলত একতরফা এমনটাই বিভিন্ন জীবনী ও স্মৃতিচর্চায় উঠে এসেছে। কিন্তু বিনয়ের কাছে এই প্রেম কোনো সাধারণ প্রেম ছিল না। গায়ত্রী ধীরে ধীরে তাঁর কবিতার কেন্দ্র হয়ে উঠলেন।

১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় ‘গায়ত্রীকে’ মাত্র ১৪টি কবিতার একটি বই। পরে সেটিই বিস্তৃত হয়ে ‘ফিরে এসো, চাকা’য় রূপ নেয়, যেখানে ছিল ৭৭টি কবিতা। বইটি গায়ত্রীকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। ‘চাকা’ শব্দটি নিয়েও তৈরি হয়েছিল দীর্ঘ আলোচনা। সাহিত্যিক মহলে অনেকে এটিকে ‘চক্রবর্তী’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। গায়ত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলে, বিনয়ের জীবনে তখন এক ধরনের ভাঙন শুরু হয়।

১৯৬১ সালে তিনি প্রায় ছয় মাস মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে হাসপাতালে ছিলেন। তবে প্রেমে ব্যর্থতায় যে বিনয়ের মানসিক অসুস্থতার এক মাত্র কারণ এমন নয়। তাঁর জীবনে ছিল অসুস্থতা, নিঃসঙ্গতা, দারিদ্র্য ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার এক দীর্ঘ ইতিহাস। পরবর্তী সময়ের অধিকাংশ সময় তাকে চিকিৎসার মধ্যে দিয়েই যেতে হয়েছিল এবং জীবনের শেষ দিকে তিনি ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। তাই ‘প্রেমে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন’ এটিই লোকমুখে বেশি প্রচলিত ছিল।

বিনয় মজুমদার। সংগৃহীত ছবি
বিনয় মজুমদার। সংগৃহীত ছবি

বিনয় প্রচলিত জীবনযাপন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। চাকরি তাঁর কাছে স্থায়ী হয়নি। সংসারও করেননি কখনো। একসময় অর্থকষ্ট, অসুস্থতা ও একাকিত্ব তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ঠাকুরনগরে নিজের বাড়িতে দীর্ঘ সময় একা থেকেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যে মানুষটিকে সমাজ ‘অস্বাভাবিক’ বলে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, তাঁর কবিতাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাংলা সাহিত্যের মূল স্রোতে ফিরিয়ে এনেছিল। জীবনের শেষদিকে তাঁর পরিচিতি অনেকটাই ম্লান হয়ে গেলেও সাহিত্যজগতে তাঁর গুরুত্ব হারায়নি। ২০০৫ সালে তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান।

তিনি ছিলেন এমন এক কবি, যিনি নিজের জীবনকেই প্রায় পরীক্ষাগারের মতো ব্যবহার করেছিলেন। ব্যর্থ প্রেম, নিঃসঙ্গতা, বিজ্ঞান, প্রকৃতি, শরীর, গণিত সবকিছুকে মিশিয়ে তৈরি করেছিলেন নিজের আলাদা কাব্যভাষা। ২০০৬ সালের ১১ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তাঁর জীবন তাই শেষ পর্যন্ত একটি অদ্ভুত সমীকরণ হয়ে থাকে। যিনি স্বাভাবিক জীবনের হিসাব মেলাতে পারেননি, কিন্তু কবিতার হিসাবটাকে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী করে গেছেন। হয়তো বিনয় মজুমদারের সবচেয়ে বড় ‘পাগলামি’ ছিল এটাই জীবন তাঁকে যতবার যান্ত্রিক গতির দিকে টেনে নিয়েছে, তিনি ততবার কবিতার দিকে ফিরে গেছেন। আর শেষ পর্যন্ত জীবন তাঁকে ভুলে গেলেও, তাঁর কবিতা তাঁকে ভুলতে পারেনি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত