বাগেরহাটের মোংলার সুন্দরবন ইউনিয়নের বাসিন্দা সলিম শেখ। সবার কাছে তিনি হরিণ শিকারি নামে পরিচিত। বন্যপ্রাণী শিকার ও মাংস কেনাবেচার অভিযোগে গ্রেপ্তার, এমনকি জেলও খেটেছেন সলিম।
স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপে তিনি বনে কীভাবে চোরাশিকারিরা ফাঁদ বিছান, তার আদ্যোপান্ত জানিয়েছেন। মূলত মাংস বিক্রির জন্য হরিণ ধরতে ফাঁদ পাতলেও, তাতে আটকা পড়ে বাঘ, বন্য শূকরসহ বিভিন্ন প্রাণী। সলিম শেখের ভাষ্যে, হরিণ শিকারে সুন্দরবনে ফাঁদ পাতলে বড় এলাকাজুড়েই করতে হয়। বানর, বন্য শূকর নিয়মিত হলেও কিছু ক্ষেত্রে বাঘ আটকা পড়ে।
গত ৪ জানুয়ারি হরিণ শিকারিদের ফাঁদে আটকা পড়া একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার উদ্ধার করে বন বিভাগ। মোংলার বৈদ্যমারীর সুন্দরবনের শরকির খাল এলাকায় আগের দিন এটি আটকা পড়েছিল। উদ্ধারকর্মীরা জানান, শরকির খাল এলাকায় বাঘটি ‘স্প্রিং ফাঁদে’ আটকা পড়েছিল। নাইলনের সুতা দিয়ে স্প্রিং ফাঁদ দেওয়া হয়। চোরাশিকারিরা নির্দিষ্ট এলাকায় এক রাতেই ফাঁদ দেন; পরের রাতে গিয়ে দেখে আসেন।
হরিণের চলাচলের পথে নাইলনের সুতার ফাঁদ, কলার সঙ্গে বড়শি ঝুলিয়ে মালা ফাঁদ, চেতনানাশক ওষুধ ছাড়াও গুলি করে প্রাণী মারা হয়। তবে শিকারিদের বেশি পছন্দ স্প্রিং ফাঁদ।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, ৪ জানুয়ারি বেলা ৩টার দিকে ট্রানকুইলাইজার গান দিয়ে বাঘটিকে অচেতন করা হয়। পরে ফাঁদ কেটে সেটি উদ্ধার করা হয়। বাঘটি খুলনায় বনবিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেসকিউ সেন্টারে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের ডিএফও রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, চিকিৎসার পাশাপাশি বাঘটি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সুস্থ হলে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হবে।
ভয়ংকর স্প্রিং ফাঁদ
শিকারিরা জানান, স্প্রিং ফাঁদের জন্য প্রথমে পথের দুই পাশের দুটি গাছের শক্ত ডাল বাঁকিয়ে নেন তারা। তার মাথায় শক্ত নাইলনের সুতা বাঁধা হয়। যেখানে জুতসই ডাল থাকে না, সেখানে বাঁশ বা নল বাঁকিয়ে ফাঁদ দেওয়া হয়। ফাঁদে পা দেওয়া মাত্র প্রাণীটি আটকা পড়ে উপরের দিকে উঠে যায়। ফলে কোনোভাবেই সে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না।
স্প্রিং ফাঁদ বড় এলাকার বেশ কিছু স্থানে পাতা হয়। এর ওজন তেমন নয়। তবে মালা ফাঁদের ক্ষেত্রে বড় রশির সঙ্গে শক্ত সুতা দিয়ে ছোট ছোট বৃত্ত তৈরি করে কয়েক কিলোমিটারে ফেলে রাখা হয়। হরিণসহ অন্যান্য প্রাণী এতে হরহামেশা আটকা পড়ে।
ফাঁদ উদ্ধারে গত বছরের মে মাসে জেলে ও মৌয়ালদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগ। ফাঁদের জন্য ব্যবহৃত প্রতিকেজি সরঞ্জামের জন্য দুই হাজার টাকা দিতে চাইলেও, গত আট মাসে কেউই জমা দেননি।
ফাঁদে আটকা বানর। ছবি: সংগৃহীতডিএফও রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, জেলে ও মৌয়ালরা কোনো ফাঁদ জমা দেননি। তবে পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে তাঁরা অনেক তথ্য দিয়েছেন। তারাই জানিয়েছেন– ফাঁদ স্থানীয়রা পাতলেও তাদের পেছনে রয়েছেন রাজনীতিক ও প্রভাবশালীরা। ফলে জেলে ও মৌয়ালরা ফাঁদ তুলতে গেলে তারা বনে টিকতে পারবেন না বলেছেন।
তিনি বলেন, তথ্য দিলে আমরা গিয়ে ফাঁদ তুলে আনি। গত আট মাসে ১০-১৫টি ফাঁদ অপসারণ করেছি। নিরাপত্তার কারণে তথ্যদাতাদের অনানুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
শিকারিদের সহায়তায় প্রভাবশালীরা
অবৈধ শিকারিরা জানান, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার হরিণের মাংস বেশি কেনে। এ জন্য শিকার ধরে কেউ এলাকায় ফিরলে তাঁকে সহায়তা করেন স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতারা। তাদের ভয়ে গ্রামের কেউ কিছু বলতে সাহস করেন না।
সলিম শেখ বলছিলেন, ‘সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতারা আমাদের কাছ থেকে বিনামূল্যে হরিণের মাংস নেন। বিনিময়ে হরিণ শিকার করে লোকালয়ে ফিরলে ভয়ে স্থানীয় গ্রামবাসী আমাদের কিছু বলতে পারেন না।’
সুন্দরবনের হরিণ শিকার ও মাংস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বেশির ভাগ মানুষ বনসংলগ্ন লোকালয়ের বাসিন্দা বলে জানিয়েছেন সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের সভাপতি শেখ ফরিদুল ইসলাম। তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী রক্ষা করা সম্ভব হবে মনে করেন তিনি।
‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবন-সংলগ্ন চরদুয়ানী, জ্ঞানপাড়া, জয়মনি, বৈদ্যমারী, কচুবনিয়া, ধানসাগর, কবরখালী, মানিকখালী, তালপট্টি, কচিখালী, বগি ও চরখালি এলাকায় হরিণ শিকারিদের তৎপরতা বেশি। এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো গেলে বন্যপ্রাণী রক্ষা করা যেত।
হুমকিতে অন্যান্য প্রাণী
হরিণ শিকারে পাতা ফাঁদ এখন বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য ‘মরণ ফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। হরিণের চলাচলের পথে এসব ফাঁদ বসানো হয়। খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো বাঘ এতে আটকে পড়ে মারাত্মক আহত হয়। ফাঁদে বানর, শূকরসহ বিভিন্ন প্রাণী নিয়মিত আটকা পড়ছে। হাতেগোনা কয়েকটি উদ্ধার করা গেলেও, বাকিরা মারা যাচ্ছে।
শেখ ফরিদুল বলেন, ‘সুন্দরবনের বুকে হাজার হাজার ফাঁদ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এসব ফাঁদে বাঘ, হরিণ, শূকরসহ বিভিন্ন প্রাণী আটকা পড়ছে। সুন্দরবন ও এখানকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। র্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও বন বিভাগের গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে হবে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বাগেরহাট জেলা সভাপতি মোহাম্মদ নূর আলম শেখ বলেন, ‘অবৈধ শিকার বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত টহল, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া সুন্দরবনের বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী রক্ষা করা সম্ভব নয়।’
এ ব্যাপারে ডিএফও রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, জনবল সংকট রয়েছে। তারপরও আমরা নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করছি। ফাঁদ উদ্ধারে জেলে এবং মৌয়ালদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সুন্দরবন-সংলগ্ন চরদুয়ানী ও জ্ঞানপাড়া এলাকায় স্থানীয়দের নিয়ে ১০ সদস্যের দুটি কমিটি করা হবে। এই কমিটি বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় রেখে অবৈধ শিকার ও সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপতৎপরতা প্রতিরোধে কাজ করবে।