ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই সংঘাতের আঁচ তেলের বাজারেও লাগবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়বে। পাম্পে গাড়ির তেল ভরতে গিয়ে হিমশিম খেতে হবে সাধারণ মানুষকে। বিশ্ব অর্থনীতি আবারও মন্দার কবলে পড়তে পারে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘বড় ধরনের সামরিক অভিযান’ শুরু করেছে। এর কিছুক্ষণ আগেই ইসরায়েল তেহরানে হামলা চালিয়েছিল। এই যৌথ হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি কড়া বার্তা দিয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকারগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, কোনো জাহাজকে এই পথ দিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের বাণিজ্য পথ।
ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেয়নি। এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়। এই প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে তেলের বাজারে আগুন লাগবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। শুক্রবার রাতেও যা ছিল ৬৭ ডলার। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক উন্নত দেশের অর্থনীতি সংকটে পড়বে। মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে গিয়ে এমনিতেই তারা হিমশিম খাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে।
হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনি। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। এছাড়া সমুদ্রপথে পরিবাহিত এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশও এই পথেই পরিবহন হয়।
হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ। ছবি: রয়টার্সওমান ও ইরানের মাঝখানে অবস্থিত এই প্রণালী উত্তরে পারস্য উপসাগরকে দক্ষিণে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২০ মাইল বা ৩৩ কিলোমিটার চওড়া। জাহাজ চলাচলের লেনগুলো উভয় দিকে মাত্র ২ মাইল বা ৩ কিলোমিটার চওড়া।
এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই হরমুজ প্রণালী তেলের জন্য একটি ‘চোক পয়েন্ট’ বা শ্বাসরোধী বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ওপেকভুক্ত দেশগুলো থেকে এশিয়ায় তেল সরবরাহের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ এড়িয়ে যাওয়ার বিকল্প খুব সীমিত।
ইরান কি সত্যিই প্রণালী বন্ধ করবে?
তেহরান বছরের পর বছর ধরে হুমকি দিয়ে আসছে। তারা বলেছে, সামরিক আগ্রাসনের জবাবে তারা এই প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। তবে অতীতে তারা কখনোই দীর্ঘ সময়ের জন্য এই বাণিজ্য পথ বন্ধ করেনি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
রাইস্ট্যাড এনার্জির ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রধান হোর্হে লিওন বলেছেন, ইরান এবার অনেক বেশি আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ফলে সংঘাত আর সীমিত বা প্রতীকী হামলার মধ্যে আটকে নেই। কাঠামোগতভাবেই সংঘাতের পরিধি বেড়েছে।
আইসিআইএস-এর জ্বালানি বাজার বিশেষজ্ঞ অজয় পারমার বলেছেন, ‘প্রণালী বন্ধ করা হবে ইরানের শেষ অস্ত্র। আমরা আশা করি যা কেবল সর্বাত্মক যুদ্ধের পরিস্থিতিতেই ঘটবে।’
লিওন আরও বলেন, শক্তি প্রয়োগ করে বন্ধ করা হোক বা ঝুঁকির কারণে বন্ধ হয়ে যাক, প্রবাহের ওপর প্রভাব একই হবে।
ইতিমধ্যেই খবর পাওয়া গেছে অনেক ট্যাংকার এই সরু জলপথে আটকা পড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ মিশন ‘অ্যাসপাইটস’-এর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেনি। তবে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ট্যাংকারগুলোকে সতর্ক করেছে।
এস-আরএম-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক তামসিন হান্ট বলেন, প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করলে ইরানের নিজের অর্থনীতির জন্যও ভয়াবহ খারাপ অবস্থা তৈরি হবে। কারণ এর ফলে তাদের নিজেদের তেল ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানিও বন্ধ হয়ে যাবে।
তাঁর মতে, ইরান সম্ভবত শেষ উপায় হিসেবেই প্রণালী বন্ধ করবে। যদি সরকার মনে করে তাদের অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে, তবেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নেবে।
অজয় পারমার বলেন, ট্রাম্পও চাইবেন সংঘাত যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। কারণ তেলের দাম বাড়লে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন ভোটারদের ওপর চাপ বাড়বে।
তবে পুরোপুরি বন্ধ না করেও ইরান অন্য কৌশল নিতে পারে। হান্ট বলেন, জাহাজের সিগন্যাল জ্যাম করা হতে পারে। জাহাজ ও ক্রুদের আটক করা হতে পারে। সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হতে পারে। এমনকি সাগরে মাইন পুঁতে প্রণালীর কিছু অংশ অচল করে দেওয়া হতে পারে।
হান্টের মতে, সামান্য বাধাও বিশ্ব তেলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলবে। দেরি হওয়া বা পথ পরিবর্তন করা এবং বিমা ও ভাড়ার খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে তেলের দাম বাড়বে।
মার্কিন হামলার প্রভাব কী হবে?
হামলার আগে বাজার পর্যবেক্ষকরা ধারণা করেছিলেন, সীমিত সামরিক পদক্ষেপে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলারের মতো বাড়তে পারে।
এখন পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সোমবার দাম ৯ শতাংশ বেড়ে ৭৩ ডলারে পৌঁছাতে পারে। রাইস্ট্যাড এনার্জি বলেছে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সপ্তাহের শুরুতে ২০ ডলার বেড়ে ৯০ ডলারে উঠে যেতে পারে।
সংঘাতের প্রভাব মোকাবিলায় ওপেক ও রাশিয়ার মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো রোববার বৈঠকে বসতে পারে। তারা উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
রাইস্ট্যাড সতর্ক করে বলেছে, যদি প্রণালী কার্যকরভাবে বন্ধ থাকে বা জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হয়, তবে দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বাধার মুখে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
হান্ট বলেন, এমনকি যদি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্টও হয়, তবুও ইরানের তেল উৎপাদনে আঘাত হানলে সরবরাহ ব্যাহত হবে। এতে চীনের মতো প্রধান ক্রেতারা বিকল্প উৎসের খোঁজে নামবে। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দামও বাড়বে।
কী পরিমাণ তেল আছে ইরানের কাছে?
তেলের প্রমাণিত মজুদের দিক থেকে ইরান বিশ্বে চতুর্থ। তাদের মাটির নিচে প্রায় ১৭ হাজার কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে। যা বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯ শতাংশ। মজুদের দিক থেকে ভেনেজুয়েলা, সৌদি আরব এবং কানাডার পরেই ইরানের অবস্থান।
এর ফলে ইরান ওপেকের চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। তারা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারকও। এ ছাড়া তাদের আছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাসের মজুদ, যা বৈশ্বিক গ্যাসের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ।
তবে দশকের পর দশক ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের উৎপাদন কমেছে। ১৯৭৪ সালে তারা দিনে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। এখন তা কমে ৩৫ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উৎপাদন ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছিল। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তারা উৎপাদন বাড়াতে পেরেছে। বেইজিং ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল আমদানি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারে ইরানের তেলের অংশ মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ হলেও তাদের গুরুত্ব অনেক বেশি।
লিওন বলেন, দেশটির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব তার কৌশলগত অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর তাদের প্রভাব আছে। তাছাড়া তারা গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহন পথ অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।