রাবি সিনেট ১০ বছর অচল, মেয়াদ শেষের পথে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের

তাজনিন নিশাত ঋতু
তাজনিন নিশাত ঋতু
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২২: ৫৬
গত বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পাঁচজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হলেও তারা সিনেট অধিবেশনে বসতে পারেননি। স্ট্রিম গ্রাফিক

সর্বশেষ সিনেট অধিবেশন হয়েছে ১০ বছর আগে। এরপর সরকার পতনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে–বাইরে নানা পরিবর্তন ঘটে গেছে। গত বছরের শেষদিকে দীর্ঘ অচলায়তন ভেঙ্গে ছাত্র সংসদের নির্বাচনও হয়েছে। কিন্তু সিনেট অধিবেশন হয়নি, হওয়ার কোন লক্ষণও দেখছেন না রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না তার জবাবদিহি নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নির্বাচন, বার্ষিক বাজেট অনুমোদন, নতুন বিভাগ বা ইনস্টিটিউট খোলা, আইন সংশোধনের মতো নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বও এই ফোরামের। তাই একে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম বলা হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ-১৯৭৩ অনুযায়ী, প্রতি বছর অন্তত একবার সিনেট সভা আহ্বান করার কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের। কিন্তু সর্বশেষ সিনেট অধিবেশন হয়েছে ২০১৬ সালের ১৯ মে। সেটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২তম সিনেট অধিবেশন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র বলছে, সিনেটে মোট ১০৪ জন সদস্য থাকার কথা। উপাচার্য পদাধিকারবলে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে বর্তমানে পদাধিকারবলে দায়িত্ব পালনকারী সদস্য ছাড়া প্রায় সব ক্যাটাগরির সদস্যপদের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। ফলে আইন অনুযায়ী সিনেটের কোরাম পূরণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। কেননা, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সিনেট সভা পরিচালনার জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের উপস্থিতি বা কোরাম নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, প্রায় ৩০ বছর আগে নির্বাচিত অনেক সিনেট সদস্যের নাম এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রকাশনায় সদস্য হিসেবে রয়েছে। এটিকে দীর্ঘদিন ধরে সিনেট অকার্যকর থাকার বাস্তব চিত্র বলে উল্লেখ করছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা কী বলছেন

৩৫ বছর ধরে অচল ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গতিপথ পাল্টে যায়। গত বছরের ১৬ অক্টোবর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয় ছাত্র সংসদ। একইসঙ্গে সিনেটের জন্য পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধিও নির্বাচিত হন।

তবে নির্বাচনের প্রায় এক বছর পেরোলেও নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সিনেট সভায় অংশ নিতে পারেননি। এদিকে রাকসুর মেয়াদও শেষের পথে। ফলে সিনেটে অংশগ্রহণের প্রত্যাশা অপূর্ণ থাকার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি ফাহিম রেজা স্ট্রিমকে বলেন, ‘সিনেট সভা আহবানের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। প্রশাসন সিনেট সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও করেছেন। দেখা গেছে, রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত অনেক সদস্য এখন আর জীবিত নেই বা সভায় অংশগ্রহণের অবস্থায় নেই। দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় এ সংকট আরও জটিল হয়েছে।’

২০০১ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ২০তম সিনেট অধিবেশনের পর টানা ১৪ বছর সভা বন্ধ ছিল। স্ট্রিম গ্রাফিক
২০০১ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ২০তম সিনেট অধিবেশনের পর টানা ১৪ বছর সভা বন্ধ ছিল। স্ট্রিম গ্রাফিক

সিনেট অকার্যকর থাকার পেছনে রাজনৈতিক কারণও রয়েছে বলে দাবি করেন ফাহিম রেজা। তিনি বলেন, ‘রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের মধ্য থেকে নির্বাচিত সিন্ডিকেট সদস্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকায় অতীতে এ বিষয়ে অনীহা ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসন চাইলে শূন্য পদগুলোতে সদস্য মনোনয়ন দিয়ে সিনেট পুনর্গঠন ও কার্যকর করতে পারে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক পরিকল্পনা ও বাজেট অনুমোদনের সর্বোচ্চ ফোরামই হলো সিনেট।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শৈলী মুক্তাদি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী দ্রুত সিনেট অধিবেশন আয়োজন করা হোক এবং নিয়মিত এ ধারা বজায় থাকুক। একটি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যক্তি বা প্রশাসনের ইচ্ছায় নয়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।’

ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক নাফিউল ইসলাম জীবন স্ট্রিমকে বলেন, ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি সিনেট কার্যকর না হয়, তাহলে পুরো নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্বের উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা হতে পারে না। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অবশ্যই সিনেটে শিক্ষার্থীদের কথা বলার কার্যকর সুযোগ দিতে হবে এবং সিনেটকে নিয়মিত অধিবেশনের মাধ্যমে সক্রিয় রাখতে হবে।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে নতুন প্রশাসন দায়িত্বে ছিল, তারা ১৭ মাসেও কেন সিনেট বসানোর উদ্যোগ নেয়নি, সেটিও প্রশ্ন। আমার প্রশাসন মাত্র আড়াই থেকে তিন মাস হয়েছে। আমরা অবশ্যই চিন্তাভাবনা করছি, কীভাবে সিনেটকে কার্যকর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এই ফোরামের মাধ্যমেই নেওয়া যায়। সে লক্ষ্যেই কাজ করছি।’

বারবার অচল হয় সিনেট

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট অচল থাকার ঘটনা নতুন নয়। ২০০১ সালের ২৮ ও ২৯ জুন অনুষ্ঠিত ২০তম সিনেট অধিবেশনের পর টানা ১৪ বছর কোনো সভা হয়নি।

পরে ২০১৫ সালের ১৮ মে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ মিজানউদ্দীনের উদ্যোগে ২১তম সিনেট অধিবেশনের মাধ্যমে সেই অচলাবস্থার অবসান ঘটে। তাঁর সভাপতিত্বে ২০১৬ সালের ১৯ মে ২২তম এবং সর্বশেষ সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘সিনেট কার্যকর করতে হলে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ক্যাটাগরিতে নতুন নির্বাচন দিতে হবে। আগের প্রতিনিধিদের পরিবর্তে নতুন সদস্য নির্বাচিত করতে হবে। নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করছে। বর্তমান উপাচার্য এ বিষয়ে আন্তরিক, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজেও ব্যস্ত আছেন।’

মূলত নব্বইয়ের দশক থেকেই সিনেট কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল আল মামুন। তিনি বলেন, স্বায়ত্তশাসিত বিশেষত ৭৩-এর অধ্যাদেশ কার্যকর থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে জন্যই সিনেটকে অচল করে দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগে রেজিস্ট্রার গ্র্যাজুয়েট একটা বাছাই হয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে সিনেট ডাকতে পারে। কিন্তু তারা ডাকবে না, কারণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো উপাচার্য সিনেট ডাকবে না বলে ধারণা এই অধ্যাপকের।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত