আমার ঢাকা: বছরে ৪৮০ ঘণ্টা হারানোর দায় নেবে কে

স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকা যেন দিন দিন একটি মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে। বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে এই শহর। প্রতিদিনের নাগরিক জীবনের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার নাম এখন যানজট। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, রোগী, ব্যবসায়ী—কেউই এর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

একটি দিনের অভিজ্ঞতাই যদি বলি, তাহলে সমস্যাটির ভয়াবহতা কিছুটা বোঝা যাবে।

রোববার সকালে মিরপুর থেকে অফিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। ঘড়িতে তখন সকাল ৭টা। যাত্রার শুরুতেই বড় বড় বাস রাস্তার মোড়ে এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিল যে পুরো সড়কের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছিল। এখানেই প্রায় ১০ মিনিটের মতো সময় নষ্ট হলো। এরপর অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল তো আছেই।

মিরপুর-১ পার হতে না হতেই আরেক বিপত্তি। চাইনিজ থেকে টেকনিক্যাল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কের প্রায় অর্ধেকজুড়ে বসেছে বাজার। ভোর থেকেই ব্যস্ত সড়কের ওপর এমন বাজার বসানো শুধু যানজটই সৃষ্টি করছে না, আশপাশের পরিবেশও নষ্ট করছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ এবং সাধারণ যাত্রীরা।

প্রশ্ন হলো, ঢাকার মতো একটি মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দিনের ব্যস্ততম সময়ে এভাবে বাজার বসে কীভাবে? এর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই কেন?

এরপর প্রতিদিনের মতোই শুরু হয় যানজটের সঙ্গে সময়ের লড়াই। অফিসে সময়মতো পৌঁছাতে না পারার কারণে কর্মজীবী মানুষকে প্রতিদিনই অতিরিক্ত সময় রাস্তায় কাটাতে হচ্ছে। শিক্ষকদের ক্লাসে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সময় নষ্ট হচ্ছে, অফিসের কর্মীরা হারাচ্ছেন কর্মঘণ্টা। শুধু সময় নয়—ধুলো, ধোঁয়া, অতিরিক্ত শব্দ এবং দীর্ঘ সময় যানজটে বসে থাকার কারণে মানুষের মানসিক চাপও বাড়ছে।

মিরপুর থেকে কল্যাণপুরে আসতেই দেখা যায় বড় গাড়িগুলোর আরেক ধরনের অব্যবস্থাপনা। যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হচ্ছে। পেছনে দীর্ঘ যানজট তৈরি হলেও চালকদের যেন কোনো দায় নেই। মহাসড়ক বা প্রধান সড়কে ধীরগতির যানবাহনের অবাধ চলাচলও যানজটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

একজন কর্মজীবী মানুষের প্রতিদিনের দুই ঘণ্টা শুধু যানজটে নষ্ট হচ্ছে। মাসে যদি ২০ কর্মদিবস হিসাব করি, তাহলে শুধু যানজটের কারণে একজন মানুষ মাসে প্রায় ৪০ ঘণ্টা হারাচ্ছেন। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৪৮০ ঘণ্টা—প্রায় ২০ দিন শুধু রাস্তায় আটকে থাকার পেছনে চলে যাচ্ছে!

কল্যাণপুর পেরিয়ে শ্যামলী ক্রসিং—আবারও নতুন সমস্যা। নিয়ম না মেনে গাড়ি মোড় নেওয়া, যত্রতত্র লেন পরিবর্তন এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণে সামান্য একটি মোড় পার হতেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

এরপর আসাদ গেট, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, কলাবাগান—প্রতিটি জায়গাতেই যেন যানজটের নতুন অধ্যায়।

ফলাফল? যে অফিস শুরু হওয়ার কথা সকাল ৮টায়, সেখানে পৌঁছাতে হচ্ছে সকাল ১০টায়।

একজন কর্মজীবী মানুষের প্রতিদিনের দুই ঘণ্টা শুধু যানজটে নষ্ট হচ্ছে। মাসে যদি ২০ কর্মদিবস হিসাব করি, তাহলে শুধু যানজটের কারণে একজন মানুষ মাসে প্রায় ৪০ ঘণ্টা হারাচ্ছেন। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৪৮০ ঘণ্টা—প্রায় ২০ দিন শুধু রাস্তায় আটকে থাকার পেছনে চলে যাচ্ছে!

এটি শুধু ব্যক্তিগত সময়ের অপচয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জ্বালানি অপচয়, উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, মানসিক চাপ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি।

ঢাকার যানজট শুধু গাড়ির সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে—এমন ধারণা সম্পূর্ণ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে—যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, সড়কের ওপর অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত বাজার, ধীরগতির যানবাহনের অবাধ চলাচল, ট্রাফিক আইন না মানা, একই সড়কে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের বিশৃঙ্খল চলাচল, অপরিকল্পিত রাস্তা ও মোড় ব্যবস্থাপনা, পার্কিংয়ের অনিয়ম, গণপরিবহনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, পথচারীদের অনিয়ন্ত্রিত রাস্তা পারাপার এবং সর্বোপরি, নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি।

সমাধান কি অসম্ভব? না। প্রয়োজন শুধু সমন্বিত পরিকল্পনা এবং কঠোর বাস্তবায়ন।

প্রথমত, প্রধান সড়কের ওপর যেকোনো ধরনের বাজার বসানো বন্ধ করতে হবে। বাজারের জন্য নির্দিষ্ট স্থান তৈরি করে সেখানে ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট বাসস্টপ ছাড়া বড় বাস বা গণপরিবহনকে যাত্রী ওঠানো-নামানোর সুযোগ দেওয়া যাবে না। ট্রাফিক আইন ভাঙলে জরিমানার পাশাপাশি কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

তৃতীয়ত, প্রধান সড়ক ও মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, নির্ভরযোগ্য ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে হবে।

চতুর্থত, গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে শুধু ট্রাফিক পুলিশ দাঁড় করিয়ে রাখলেই হবে না; স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, ক্যামেরা এবং স্বয়ংক্রিয় আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নাগরিকের সময়ের মূল্য দিতে হবে।

একজন মানুষ সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়ে যদি ৮টার অফিসে ১০টায় পৌঁছান, তাহলে তাকে শুধু দেরি করা মানুষ হিসেবে দেখলে হবে না। তার দুই ঘণ্টা সময় কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সেই সময় তার পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষার্থী কিংবা নিজের জন্য ব্যয় করার কথা ছিল।

ঢাকা শুধু একটি শহর নয়। কোটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র এই শহর। তাই প্রশ্নটা এখন শুধু ‘ঢাকায় যানজট কেন?’—এটি নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত— ‘আর কত দিন ঢাকার মানুষকে এভাবে রাস্তায় আটকে থাকতে হবে?’

  • মো. মশিউর রহমান সজীব: সহকারী অধ্যাপক, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, ঢাকা সিটি কলেজ
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত