জন্মদিনে ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার
ফরহাদ মজহার কবি, দার্শনিক, রাজনীতি বিশ্লেষকসহ বহুবিধ পরিচয়ে পরিচিত। যাপন থেকে শুরু করে চিন্তা ও তৎপরতায় রাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন, কাব্য ও কৃষির উদ্যোগে প্রতিনিয়ত নিজেকেই নিজে অতিক্রম করছেন তিনি। ‘আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে’, ‘অকস্মাৎ রপ্তানিমুখী নারীমেশিন’, ‘এবাদতনামা’ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। পাশাপাশি ‘সংবিধান ও গণতন্ত্র’, ‘ভাবান্দোলন’, ‘মোকাবিলা’, ‘গণ-অভ্যুত্থান ও গঠন’ প্রভৃতি ফরহাদ মজহারের উল্লেখযোগ্য বই।
আজ রোববার (৯ আগস্ট) ফরহাদ মজহারের ৮০তম জন্মদিন। ১৯৪৭ সালে নোয়াখালীতে তাঁর জন্ম। তিনি ঢাকা ও নিউইয়র্কে ওষুধশাস্ত্র (ফার্মাসি) ও অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। জন্মদিনকে সামনে রেখে ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি ও বিবিধ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ইকতিজা আহসান।
আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব।
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম: আপনার ‘নয়া কৃষি’ তো আসলে পৃথিবীকে ‘আমানত’ হিসেবেই গণ্য করে। পৃথিবী যাতে ধ্বংস না হয় এবং এটি যেন একটি নবায়নযোগ্য শক্তি হিসেবে টিকে থাকে—সেটিই নয়া কৃষির মূল দর্শন। কিন্তু সেই জায়গা থেকে আমরা বিচ্যুত হলাম কেন?
ফরহাদ মজহার: আমি মনে করি, যারা এ ধরনের সমালোচনা করেন তারা চরম মূর্খতার পরিচয় দিচ্ছেন। এটি আসলে আলোচনার বিষয়ই হতে পারে না। কেউ কেউ হয়তো বলবেন আমি ‘ইসলামপন্থী’। কিন্তু আমার লেখার মধ্যে তথাকথিত ইসলামপন্থা কোথায়? আমি ইসলামের যে দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছি, তা কি কোনো ইসলামি চিন্তাবিদ বা তাত্ত্বিকের লেখায় আছে? নেই। এই যে ‘আমানত’ শব্দটা, এটি আমি আমার নিজের মতো করে ব্যবহার করেছি এবং নিজের ভাষায় আত্মস্থ করেছি।
আমি মনে করি, সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ এবং সেক্যুলার ফ্যাসিজমের পতনের পর ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উত্থান একটি স্বাভাবিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। আমি নিজেই সেই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করছি, অন্যরা নয়। তারা যদি এটি মোকাবিলা করতে পারত বা গুরুত্বপূর্ণ হতো, তবে ইসলামিস্টরা কেন আমাকে আক্রমণ করার জন্য মরিয়া হয়ে থাকে? আসলে সমাজে তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। আমার কাছে ইসলামের গুরুত্ব অনেক, কারণ ইসলামের একটি গভীর দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে।
ইসলামে ফিলোসফি বা দর্শনকে সব সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। এর কারণ হলো, দর্শন যুক্তির ওপর ভিত্তি করে কথা বলে। কিন্তু ইসলাম মনে করে, শুধু যুক্তির দ্বারা আল্লাহকে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। ইসলামে আল্লাহর কোনো ‘প্রমাণ’ দেওয়া হয় না, বরং সেখানে ‘শাহাদাহ’ বা সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি প্রধান। আপনি আল্লাহ যে আছেন, তার সাক্ষ্য দিতে পারেন।
কিন্তু কীভাবে সাক্ষ্য দেবেন? মানুষের অস্তিত্বই সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ আছেন। এটি অত্যন্ত গভীর একটি দার্শনিক অবস্থান। সাক্ষ্য দেওয়ার সামর্থ্য কেবল মানুষেরই আছে, কারণ মানুষই তা উপলব্ধি করতে পারে। যখন আদমকে সৃষ্টি করা হলো, তখন তার ‘দেহ’ সৃষ্টি করা হলো। এর আগে ফেরেশতারা ছিল ‘পিওর স্পিরিট’ বা বিশুদ্ধ আত্মা। এই দেহ বা শরীর সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো উপলব্ধি করা। উপলব্ধি ছাড়া আল্লাহকে অনুভব করার আর কোনো পথ নেই বলেই সাক্ষ্য দেওয়ার শর্ত বা ‘শাহাদাহ’ তৈরি হয়েছে। এই শাহাদাহর ধারণা একমাত্র ইসলামেই আছে। তাই দর্শন যখন কেবল যুক্তির মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, ইসলাম তখন তাকে সন্দেহ করে। ইমাম গাজ্জালি থেকে শুরু করে খোদ কোরআনেও দার্শনিক ও কবিদের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ তারা অলংকার বা যুক্তিকে সত্য প্রমাণের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
কোরআনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের দিকে লক্ষ করুন। বলা হচ্ছে, যদি আপনি মুমিন বা রাসুলের উম্মত হতে চান, তবে আপনাকে ‘গায়েবে’ ইমান আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, ‘ইমান’ মানে আত্মসমর্পণ, এটি স্রেফ ‘বিশ্বাস’ নয়। ‘বিশ্বাস’ বা ‘ফেইথ’ ধারণাটি মূলত খ্রিষ্টধর্ম থেকে এসেছে। যেমন যিশুকে আল্লাহর পুত্র হিসেবে বিশ্বাস করা। ইসলামে এই অর্থে বিশ্বাসের কথা নেই। আমরা অনুবাদের ভুলে ‘ইমান’কে ‘বিশ্বাস’ বলি। ইসলাম আপনাকে ‘গায়েব’ বা সেই সত্তার প্রতি আত্মসমর্পণের কথা বলে, যিনি নিত্য অনুপস্থিত। আমাদের সিজদা দেওয়াও এক ধরনের আত্মসমর্পণ। এই যে আমরা এক ‘অদৃশ্য’ সত্তার কাছে মাথা নত করছি, তার মানে হলো—আমরা স্বীকার করছি যে আমরা সেই অনন্ত অসীমের চেয়ে বড় নই। মানুষকে কেন সালাত বা নামাজের মাধ্যমে এটি বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়? কারণ মানুষ মরণশীল। একজন মরণশীল মানুষ কখনো ধ্রুব সত্যের দাবিদার হতে পারে না। আমি যদি মরণশীল হই, তবে কীভাবে দাবি করব যে আমিই পরম সত্য জানি? অর্থাৎ ইসলাম মানুষকে নিরঙ্কুশ সত্যের দাবিদার হওয়া থেকে বিরত রাখে।
এটি আমার ব্যাখ্যা, যা শুনতে কেউ বাধ্য নয়। তবে ইসলাম মূলত কী দিচ্ছে? প্রথমত, ইসলামকে বলা হয় ‘এন্ড অফ রিলিজিয়ন’ বা সব ধর্মের পরিসমাপ্তি। কেন? কারণ এরপর ধর্মের নামে অলৌকিক দাবি করার আর কেউ নেই। আমি ফরহাদ মজহার নবী বা রাসুল হওয়ার দাবি করতে পারব না। ইসলাম আমাকে সেই অধিকার দেয় না। এর মাধ্যমে ইসলাম মানুষকে বহিঃস্থ কোনো অলৌকিক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করে দিয়েছে। ইসলাম মানুষকে জন্মগতভাবেই মুক্ত করে দিয়েছে বলে এখানে আলাদা করে ‘মুক্তির’ কোনো ধারণা নেই। আপনি তো মুক্তই, আপনার কাজ হলো সেই স্বাধীনতা বজায় রাখা।
এ কারণেই জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই বা জিহাদ এত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতি কোত্থেকে আসে? দর্শন থেকেই আসে। আমি যে ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করি, সেটি একটি বিপ্লবী প্রস্তাবনা। সাধারণ মানুষ যে ধর্মচর্চা করে, তার অনেকটাই খ্রিষ্টীয় ধর্মের ধারণার মতো। কিন্তু ‘দীন’ বা ‘ধর্ম’ মানে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ‘রিলিজিয়ন’ নয়। যেমন সনাতন ধর্মে আপনি নাস্তিক বা নিরীশ্বরবাদী হয়েও ‘হিন্দু’ থাকতে পারেন। সেখানে আস্তিকতার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক অপরিহার্য নয়, যা পাশ্চাত্যের ধারণায় ভিন্ন।
স্ট্রিম: কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে কি দেব-দেবীর ওপর বিশ্বাসের বিষয়টি নেই? পূজাটা তো একধরনের বিশ্বাস থেকেই….
ফরহাদ মজহার: সেটি বিশ্বাস নয়, সেটি পূজা। বিশ্বাস আর পূজা এক বিষয় নয়। যেমন সরস্বতী পূজা করা একটি সাংস্কৃতিক চর্চা। হিন্দু ধর্মে দেব-দেবী পূজা করা বা না করা—উভয় পথই খোলা আছে। এটি মূলত একটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও আচরণ। অন্যদিকে সেমেটিক ধর্মগুলোর (ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদি ধর্ম) ভিত্তি হলো একটি কিতাব বা ওহি।
ইসলামকে আপনি সাধারণ ধর্মের কিতাব হিসেবে পড়তে পারেন, কিন্তু কোরআন নিজেকে ‘হুদাল্লিল মুত্তাকিন’ বা মুত্তাকিদের জন্য পথনির্দেশ বলছে। এটি কোনো ধরাবাঁধা আইনের বই নয়, বরং এটি একটি পরামর্শের কিতাব। যখন আমি এটি বলি, তখন আলেমরা হয়তো বলেন যে এর মধ্যে তো আইনও আছে। আমি বলি—আইন আছে, কিন্তু সেগুলো প্রয়োগের চেয়ে পরামর্শ হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। যেমন কোরআনে বহু বিয়ের যে বিধানের কথা বলা হয়েছে, সেটি সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থা। এখন ২০২৪ সালে দাঁড়িয়ে আপনি সেই নিয়ম পালন করবেন কি না, সেটি সমাজ ও সময়ের ওপর নির্ভরশীল। কোরআন আপনাকে সেই পরামর্শ ও বিবেক দেয়।

আবার ধরুন, ইসলামে সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানার স্বীকৃতি নেই। সবকিছুর মালিক আল্লাহ। তাহলে আমরা কেন জমি রেজিস্ট্রি করি? অর্থাৎ মার্ক্সবাদ পড়ে আমি যা শিখেছি, তার সঙ্গে ইসলামের কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। সেক্যুলার বা মার্ক্সবাদীরা অনেক সময় বস্তুবাদের ওপর জোর দিতে গিয়ে ‘রুহানিয়াত’ বা আধ্যাত্মিকতা হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু ইসলাম আমাকে একই সঙ্গে মার্ক্সবাদ এবং রুহানিয়াত—দুটোই দেয়। তাহলে আমি ইসলাম ছাড়ব কেন?
স্ট্রিম: মার্ক্সবাদে কি সবসময়ই আধ্যাত্মিকতা হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে?
ফরহাদ মজহার: থাকে, কারণ মার্ক্সবাদ মূলত খ্রিষ্টধর্মের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিকশিত হয়েছে। খ্রিষ্টধর্মে আধ্যাত্মিকতা হলো ইহজগত থেকে আলাদা কিছু। কিন্তু ইসলামে ইহজগত এবং আধ্যাত্মিক জগত আলাদা নয়। আপনার প্রতিটি পার্থিব কাজই আধ্যাত্মিক হতে পারে।
আমি কেন এই ধর্মের বিরোধিতা করব? এটি তো আমাকে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী লড়াইয়ের শক্তি জোগায়। আমি খ্রিষ্টধর্ম বা ইহুদি ধর্মের বিরোধী নই। আমি জায়নবাদ বিরোধী, কিন্তু ইহুদি দর্শনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। আমরা যদি দেরিদা বা লেভিনাস পড়তে পারি, যারা জুইশ ফিলোসফিকে তাদের দর্শনে ধারণ করেছেন, তবে ফরহাদ মজহার কেন একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে কোরআন থেকে বিপ্লবের ভাষা সংগ্রহ করতে পারবে না? আমি তো কোনো অপরাধ করছি না। একই সঙ্গে যারা ইসলামকে স্রেফ ‘পরিচয়বাদী ফ্যাসিজমে’ রূপান্তর করেছে, আমি তাদের বিরুদ্ধেও লড়াই করছি।
স্ট্রিম: আমরা একটু সাম্প্রতিক প্রসঙ্গে আসি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় এক বছর আগে আপনি ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান কি সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছে?
ফরহাদ মজহার: আমি কোথাও এমন দাবি করিনি। তবে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ‘গঠন’ এবং ‘গণঅভ্যুত্থান’—এই শব্দ দুটি আসবেই। আমার বইটি ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমান সময়ে যারা গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল, সেই তরুণদের এবং সাধারণ মানুষের হাতে বইটি পৌঁছে গেছে। এই তরুণদের যে বিস্ফোরণ, তাদের সঙ্গে আমার চিন্তার একটি ঘনিষ্ঠতা হয়তো আছে। তবে ইতিহাস সচেতন মানুষ হিসেবে আমি মনে করি, গণঅভ্যুত্থানের মূল কর্তা হলো জনগণ। সেই জনগণ গঠনে আমার আদৌ কোনো অবদান আছে কি না, তা মহাকাল বিচার করবে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস আলোচনায় আমাকে আপনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না; সেটি অবশ্যই করতে হবে।
স্ট্রিম: ‘রাজকুমারী হাসিনা’ থেকে ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা’— এই যে এক দীর্ঘ যাত্রা, এটি কি কেবল একজন ব্যক্তির পরিবর্তন নাকি আমাদের সমাজ ও রাজনীতিরও কোনো প্রতিফলন?
ফরহাদ মজহার: আমি যখন ‘রাজকুমারী হাসিনা’ লিখেছিলাম, তখন সেই নামকরণের মধ্যে একটি গভীর শ্লেষ ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, আওয়ামী লীগের ‘মূর্খরা’ সেটি তখনো বোঝেনি, এখনো বোঝে না। সেই রচনায় আমি একটি রূপক গল্পের আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেখানে শেখ হাসিনা নিজেকে রাজকুমারী মনে করতেন—যেহেতু তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। আর সেই গল্পে তিনি খালেদা জিয়াকে ‘দাসী’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, যিনি রাজকুমারের মাথা থেকে শেষ সুঁইটি খুলে রাজকুমারকে জয় করেছেন। এই পুরো বিষয়টিই ছিল শ্লেষাত্মক। তবে হ্যাঁ, তখন আমি কিছু ইতিবাচক ও গঠনমূলক সমালোচনাও করেছিলাম। কারণ আমি ভেবেছিলাম, বাংলাদেশের সেক্যুলার ধারাটি হয়তো একটি ইতিবাচক দিকে বিকশিত হবে। আমি আজও সেই প্রকৃত সেক্যুলারিজম বা ইহলৌকিকতার ধারাটিই বহন করছি। এখন যারা নিজেদের সেক্যুলার দাবি করে, তাদের অনেকে আসলে ইসলাম-বিদ্বেষী। অন্যদিকে, আমরা ইসলামকে একটি ইহলৌকিক বা জাগতিক ধর্ম হিসেবে পাঠ করছি, যা প্রকৃত অর্থে সেক্যুলার চেতনারই অংশ। এখানে আমার কোনো অপরাধ বা বিচ্যুতি নেই।
স্ট্রিম: জুলাই গণঅভ্যুত্থান কি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলো? এটি কি একটি ‘বেহাত হওয়া’ বিপ্লব?
ফরহাদ মজহার: জুলাই গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে—এটি স্রেফ আওয়ামী প্রপাগান্ডা।
স্ট্রিম: তবে এই অভ্যুত্থানের প্রকৃত অর্জন কী?
ফরহাদ মজহার: সবচেয়ে বড় অর্জন হলো শেখ হাসিনার পতন। দ্বিতীয়ত, আমরা ‘গঠন’ শব্দটিকে সামনে নিয়ে আসতে পেরেছি। বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে—এই চেতনা এখন সাধারণ মানুষের মগজে ঢুকে গেছে। এটি একটি বিরাট অর্জন।
স্ট্রিম: কিন্তু রাষ্ট্রের তো কাঠামোগত কোনো রূপান্তর এখনো হয়নি।
ফরহাদ মজহার: চেতনা যখন জাগ্রত হয়, তখন রূপান্তর শুরু হয়ে যায়। এই লড়াই এখন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রূপ নিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই উপমহাদেশে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে জনজোয়ার আমরা নেপাল বা শ্রীলঙ্কায় দেখছি, তা কি আগে ভাবা গিয়েছিল? আমরা তো এগিয়ে যাচ্ছি, পিছিয়ে পড়ছি না।
স্ট্রিম: ইতিহাস তো আসলে সামনের দিকেই এগিয়ে যায়।
ফরহাদ মজহার: অবশ্যই। বাংলাদেশে এখন আর কেউ বলবে না যে আমরা ১৯৭১-এর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাই। জুলাইয়ের প্রত্যাশা হয়তো পুরোপুরি এখনো পূরণ হয়নি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তা হবে না। আমরা তো এখনো লড়ছি, আমরা তো ফুরিয়ে যাইনি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে আছি। দেখুন, আমি কবিতা লিখতে লিখতে আজ বাংলাদেশের রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় তাত্ত্বিক জায়গায় চলে এসেছি—এটি কি আমি নিজে কখনো ভেবেছিলাম? না। আমাকে যে একদিন ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ লিখতে হবে, তা আমার ভাবনার অতীত ছিল। কিন্তু ইতিহাস আমাকে দিয়ে এটি লিখিয়ে নিয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই আসলে ইতিহাসের সন্তান।
স্ট্রিম: আপনার বর্তমান অবস্থান নিয়ে আমি একটি প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম...
ফরহাদ মজহার: আমি তো বললামই, আমরা সবাই ইতিহাসের সন্তান। ১৯৭১ আমাদের বদলে দিয়েছে, ১৯৯০ আমাদের নতুন রূপ দিয়েছে এবং ২০২৪-এর জুলাই আমাদের আমূল বদলে দিচ্ছে। আমরা এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছি। আমাদের কোনো ভুলত্রুটি থাকলে পরবর্তী প্রজন্ম তা বিচার করবে এবং এভাবেই ইতিহাস সামনে এগোবে। কিন্তু আমরা যে একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছি, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা শেখ হাসিনাকে হটিয়েছি এবং বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান সংকটটি চিহ্নিত করতে পেরেছি। এই সংকট স্রেফ সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের ‘গঠন’ বা কাঠামোর সংকট। আমাদের নতুন করে বাংলাদেশ গঠন করতে হবে, নতুন সংবিধান বা গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করতে হবে এবং গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যেতে হবে—এই বিষয়গুলো এখন সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
স্ট্রিম: কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে আমরা তো দেখছি যে গণপরিষদ নির্বাচন তো বহুদূর, এমনকি সংবিধান সংস্কার কমিশনের কার্যক্রমও তো সেভাবে বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে না।
ফরহাদ মজহার: কিন্তু এই যে আপনি আজ কথাটি বলতে পারছেন, এটি সম্ভব হয়েছে কারণ ‘গঠন’ ধারণাটি এখন আমাদের রাজনৈতিক চেতনায় আছে। আমি আপনার সঙ্গে একমত যে প্রক্রিয়াটি এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি, তবে আগামীতে এটি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
একটি বিষয় খেয়াল করুন—আমাদের রাজনীতির বা আমার সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মূল লক্ষ্য কী ছিল? আমাদের দাবি ছিল নতুন সংবিধান। আমরা কেবল ‘সরকার বদল’ বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ চাইনি।
রেজিম চেঞ্জ হলো মার্কিনদের প্রেসক্রিপশন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল চেতনা কিন্তু স্রেফ সরকার পরিবর্তন ছিল না। এমনকি নাহিদ ইসলামও বলেছিল ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ’। তাহলে বাংলাদেশে এই ‘রেজিম চেঞ্জে’র রাজনীতিটা কারা করল? তারা হলো বামপন্থীরা। বামপন্থীরা যে মার্কিন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে এটি করেছে তা নয়, বরং তাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা বা বুদ্ধিবৃত্তিক ত্রুটির কারণে এমনটি হয়েছে।
স্ট্রিম: আপনি এর আগে একটি আলোচনায় বলেছিলেন যে, ২ আগস্টের সেই ‘দ্রোহযাত্রা’ ছিল মূলত আনু মুহাম্মদদের এক ধরনের ‘সাবোটাজ’ এবং তড়িঘড়ি এক দফা ঘোষণা করা।
ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, সেই এক দফা ঘোষণা ছিল ছাত্রদের এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে এক ধরনের অন্তর্ঘাত বা সাবোটাজ। আপনারা আন্দোলনের নেতৃত্ব কুক্ষিগত করতে চেয়েছিলেন। এর কারণ হলো—আপনারা ধরে নিয়েছেন যে তোমরাই সমাজের একমাত্র বুদ্ধিজীবী এবং তোমরাই ঠিক করবে ইতিহাস কোন দিকে যাবে। অথচ মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের এই তরুণরা আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তায় আপনাদের চেয়েও অগ্রসর ছিল। তারা সামগ্রিক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ চেয়েছিল।
স্ট্রিম: কিন্তু ২ আগস্ট তারা যে কর্মসূচি দিল, সেটি তো ছাত্রদের আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা ছিল...
ফরহাদ মজহার: না, এটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। তাহলে আপনাদের আলাদা করে নতুন কর্মসূচি দেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? ৩ আগস্ট ছাত্ররা যখন নতুন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলছে, তখন আপনারা এসে বললেন ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ চাই। আমরা তো শুরু থেকেই তর্কের খাতিরে বলছিলাম যে—‘এক দফা এক দাবি, এরশাদ/হাসিনা তুই কবে যাবি’—এই পুরোনো সস্তা রাজনীতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে চাইছিল, তাই তারা এই গাঠনিক মুহূর্তটিকে নস্যাৎ করার জন্য ‘রেজিম চেঞ্জে’র দিকেই ধাবিত হবে—এটাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ ব্যবস্থা একই থাকবে, শুধু ব্যক্তি হাসিনা চলে যাবে। আমি বামদের জিজ্ঞাসা করি, আপনারা কেন এই ফাঁদে পা দিলেন? আপনাদের তো বলা উচিত ছিল যে আমরা নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে চাই। কিন্তু তারা তা বলেনি, কারণ তারা আজও ১৯৭২-এর সংবিধানকে ‘পবিত্র’ মনে করে এবং মনে করে এর মধ্যেই একাত্তরের চেতনা নিহিত। ফলে বামদের এই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মার্কিনদের ‘রেজিম চেঞ্জ’ প্রক্রিয়াকেই সহায়তা করেছে।

স্ট্রিম: এটি কি তাদের অবচেতন মনের প্রতিফলন ছিল?
ফরহাদ মজহার: এটিই তাদের প্রকৃত চরিত্র। বাংলাদেশের বামপন্থীদের চিন্তার ধরনই এমন।
স্ট্রিম: কিন্তু এই বামরাই তো সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলন বা তেল-গ্যাস রক্ষা আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল।
ফরহাদ মজহার: সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। তেল-গ্যাস বা সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনের ইতিবাচক দিকগুলোকে আমি সমর্থন করি। কিন্তু তারা এই আন্দোলনগুলোকে ক্ষুদ্র দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। তারা এই লড়াইয়ে বিএনপি, অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা ইসলামপন্থীদের যুক্ত করেনি। তাদের মধ্যে এক ধরণের ‘ইসলাম-বিদ্বেষ’ কাজ করে। তারা টুপি-দাড়িওয়ালা বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে ব্র্যাকেটবন্দি করে বাইরে রেখেছে। জনগণের সঙ্গে চিন্তার পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তা তো আন্দোলনের ময়দানে মোকাবিলা করতে হবে।
ইসলামকে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, তার ব্যাখ্যা আমি আমার ‘মোকাবিলা’ বইতে দিয়েছি। আমি সবসময়ই নিজের অবস্থানে অটল। যদি ‘মোকাবিলা’ বা ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ বইগুলোর মধ্য দিয়ে আমি সেক্যুলার ও ইসলামের এই কৃত্রিম বিভাজন না ভাঙতাম, তবে এই গণঅভ্যুত্থান সম্ভব হতো না। বামদের প্রতি আমার অভিযোগ হলো—তোমরা কিসের ভিত্তিতে এক দফা দাবি দিলে? তখন তো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও একই দাবি তুলছিল। আমাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল যেন আমরা কেবল ‘এক দফা’র দাবি মেনে নিই।
স্ট্রিম: কিন্তু সেই ‘রেজিম চেঞ্জ’ তো শেষ পর্যন্ত ছাত্রদের আকাঙ্ক্ষার মতোই হয়েছে বলে মনে হয়।
ফরহাদ মজহার: না, বামরা এরই মধ্যে বড় ক্ষতি করে ফেলেছে। তারা যদি ২ আগস্ট ওই অবস্থান না নিত, তবে নাহিদদের ‘ব্যবস্থার বিলোপ’ বা সংবিধান উৎখাতের কথাটি আরও জোরালো হতো। ছাত্ররা চেয়েছিল আন্দোলনে যেন সবাই থাকে এবং কোনো বড় বিভেদ তৈরি না হয়। নাহিদ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে; সে বলেছে আমরা ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার’ বিলোপ চাই। সে শুধু হাসিনার পদত্যাগ চায়নি, আবার বামদের এক দফাকেও পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। সেই ‘দ্রোহযাত্রা’ যদি না হতো, তবে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস আজ ভিন্ন হতো। হয়তো ডক্টর ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হতো না, হয়তো আনু মুহাম্মদ হতো।
স্ট্রিম: কিন্তু ফ্যাসিবাদ বিলোপের দাবি তুলেও ড. ইউনূসের সরকার শেষ পর্যন্ত সেই মার্কিন প্রভাবের মধ্যেই পড়ে গেল কি না?
ফরহাদ মজহার: বিষয়টি এভাবে দেখা ঠিক হবে না। আপনি চুক্তির কথা বলছেন, কিন্তু চুক্তি মানেই মার্কিন দাসে পরিণত হওয়া নয়। আপনার যদি নিজস্ব রাজনৈতিক প্রজ্ঞা না থাকে, তবে ইউনূস সাহেব একাই বা কী করবেন? এখানে ব্যক্তিকে আক্রমণ না করে আমাদের ‘রাষ্ট্র’ নিয়ে ভাবা উচিত।
গণঅভ্যুত্থানের পর একটি ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ তৈরি হয়েছিল। বামপন্থীদের উচিত ছিল তাদের হোমওয়ার্ক ঠিকঠাক করা। তারা তা না করে উল্টো ছাত্রদের ‘মব’ বা ‘ইসলামিস্ট’ বলে গালি দিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা প্রকৃতপক্ষে মার্কিন স্বার্থেরই সেবা করেছে। কারণ পরাশক্তিগুলো চেয়েছিল শেখ হাসিনা চলে যাক এবং ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন না করে নতুন কেউ ক্ষমতায় বসুক। সেই পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বামপন্থীরাই পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। এখন ইউনূস সরকারের সমালোচনা করে লাভ নেই, কারণ এই পরিস্থিতি তৈরিতে তাদেরও ভূমিকা ছিল। ক্ষমতা কেবল ব্যক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির তৎপরতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করে।
স্ট্রিম: সেই প্রেক্ষাপট থেকেই আমার প্রশ্ন—৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর আমরা যা দেখলাম...
ফরহাদ মজহার: ৮ আগস্টের কথা যখন তুললেন, তখন আমি কী বলেছিলাম সেটি একটু খেয়াল করুন। আমি একে বলেছিলাম ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’। তারা সংবিধানকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। কাদের সংবিধান? যে সংবিধানকে বামপন্থীরা ‘পবিত্র’ বলে জ্ঞান করে। বামপন্থীরা এর কী ব্যাখ্যা দেবে? ড. ইউনূস তো আসলে তাদের পক্ষেই কাজ করেছেন। তাহলে তারা আবার কেন ইউনূস সাহেবের ওপর চড়াও হচ্ছে? ইউনূসের সঙ্গে আমাদের বিরোধের জায়গা তো এখানেই—কেন তিনি শেখ হাসিনার সেই পুরোনো সংবিধানকে বহাল রাখলেন? এমনকি তার গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটিতে তো অধিকাংশ বাম ঘরানার ব্যক্তিরাই ছিলেন।
স্ট্রিম: সবাই হয়তো নন, তবে অনেকেই ছিলেন।
ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, অধিকাংশই বাম ব্যাকগ্রাউন্ডের। সেখানে কি আপনারা আমাকে দেখেছেন? দেখেননি। কারণ আমি সেই প্রক্রিয়াটি গ্রহণই করিনি। ততক্ষণে তো সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব ঘটে গেছে। আমি যখন এই প্রতিবিপ্লবের কথা বললাম, তখন কোনো বামপন্থী কি আমার সঙ্গে একমত হয়েছিল? তারা তা না করে ব্যক্তি ইউনূসকে আক্রমণ শুরু করল। বাংলাদেশের বামপন্থীরা এতটাই অসততা ও অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে যে, ড. ইউনূস যে সরকার গঠন করেছেন, তা তো মূলত তাদেরই আদর্শিক পথ অনুসরণ করেছে। ছাত্ররা তো ৭২-এর সংবিধানকে ধারণ করেনি, কিন্তু ড. ইউনূস তো সেটিই বহাল রেখেছেন।
স্ট্রিম: আপনি হাসছেন, কিন্তু এটি ১৭ কোটি মানুষের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
ফরহাদ মজহার: আমি হাসছি তাদের দ্বিমুখী আচরণ দেখে। ড. ইউনূস তো শেষ পর্যন্ত তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পুরোনো সংবিধানই রক্ষা করলেন। সেই হিসেবে তিনি তো তাদেরই নেতা হলেন, আমাদের তো নয়।
স্ট্রিম: কিন্তু ৮ আগস্ট সরকার গঠনের পর সমাজে যে ধরনের ‘মব’ জাস্টিস বা আক্রমণ আমরা দেখলাম—কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানো বা মাজার ভাঙা—এগুলো তো নিশ্চয়ই বামপন্থীরা করেনি।
ফরহাদ মজহার: দয়া করে বামপন্থীদের রক্ষা করার তত্ত্ব দেবেন না। আমরা সবাই এ ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা করি। আমার কথা হচ্ছে—আমরা রাষ্ট্র ও এর গঠন নিয়ে আলোচনা করছি। সমাজ তো আগে থেকেই সেক্যুলার ফ্যাসিবাদের পাশাপাশি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের কবলে ছিল। এখন যারা মাজার আক্রমণ করছে, তারা ভারতীয় এজেন্ট কি না বা অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থার লোক কি না—তা তো আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে বামপন্থীদের নেতৃত্বে কেন একটি বৃহৎ ঐক্য গড়ে উঠল না? তারা সেটি করেনি। আমরা যখন আন্দোলন শুরু করলাম, তারা আমাদের প্ল্যাটফর্মেও এল না।
তারা বরং আন্দোলনকারীদের ‘মব’ বলে গালি দিতে শুরু করল। তাদের ফেসবুক পোস্টগুলো পড়লে দেখবেন—তারা প্রমাণ করতে চাইছে যে এই তরুণ ছাত্ররা সবাই ‘মব’ বা ‘ইসলামিস্ট’। তারা প্রচার করছে যে মাদরাসার ছাত্ররাই মাজার ভাঙছে। তারা মাহফুজ বা নাহিদদের মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
স্ট্রিম: নাহিদ তো মাদরাসা থেকে আসেনি।
ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, কিন্তু প্রোপাগান্ডা তো থামেনি। বামদের এই ‘ইসলামিস্ট’ প্রচারণাই তো দিল্লি লুফে নিয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বামপন্থীরা আগাগোড়া এই গণঅভ্যুত্থান বিরোধী ভূমিকা পালন করেছে। তারা মূলত প্রতিবিপ্লবের পক্ষেই কাজ করেছে। আমি প্রমাণ দিয়ে বলছি—যখন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন এল, আপনারা রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে চাইলেন কেবল হাসিনাকে বাদ দিয়ে।
বামপন্থীদের বোঝা উচিত তাদের রাজনীতি কতটা ন্যক্কারজনক ছিল। এমনকি এখন এনসিপির ওপর যে হামলা হচ্ছে, তার পেছনেও বামদের প্ররোচনা আছে। অথচ এই ছেলেরাই তো হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছে। আমি বলছি না যে এই ছেলেদের সব কাজ নির্ভুল, কিন্তু আমি তাদের ‘কালেক্টিভ পাওয়ার’ বা সম্মিলিত শক্তির কথা বলছি। জনগণ তাদের পেছনেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

স্ট্রিম: এনসিপির বিরুদ্ধে এখন যে আক্রমণগুলো হচ্ছে, এর ভেতরের রাজনীতিটা কী?
ফরহাদ মজহার: শিবিরের সঙ্গে এনসিপির এই বিচ্ছেদকে আমি কৌশলগত ভুল বলে মনে করি। কারণ সেই সময় এই ঐক্যটি জরুরি ছিল। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীকে বাধ্য করা উচিত ছিল তাদের পুরোনো নাম ও রাজনীতি সংস্কার করতে। আমি আবারও বলছি—বামপন্থীরা বাইরে থেকে বা আমেরিকান চক্রান্তে এটি করেছে বলে আমি মনে করি না; বরং তারা তাদের তাত্ত্বিক ‘হোমওয়ার্ক’ ঠিকমতো করেনি। তারা চরম প্রতিক্রিয়াশীল এবং গণঅভ্যুত্থান বিরোধী অবস্থানে ছিল।
স্ট্রিম: শিবিরের সঙ্গে এনসিপির ঐক্য কি সঠিক ছিল?
ফরহাদ মজহার: অবশ্যই। কারণ তখন যদি আমরা সেক্যুলার ও ধর্মপন্থীর মধ্যকার কৃত্রিম বিভাজনটি না ভাঙতাম, তবে এই গণঅভ্যুত্থান কখনোই সফল হতো না। তবে পরবর্তীকালে মাহফুজরা শিবিরের সঙ্গে যে বিরোধটি তৈরি করেছে, আমি তাকে সঠিক কৌশল মনে করি না।
স্ট্রিম: কিন্তু শিবিরের কি এনসিপির রাজনীতি গ্রহণ করা জরুরি ছিল না?
ফরহাদ মজহার: শিবিরের রাজনীতি শিবিরের মতো চলবে। তবে আপনি যদি শিবিরের রাজনীতিকে তাত্ত্বিকভাবে মোকাবিলা করতে চান, তবে আপনাকে মওদুদি রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ করতে হবে। যেমনটা আমি আগে বললাম—ইসলামের দৃষ্টিতে জগতের সবকিছুর মালিক আল্লাহ, তবে জমিনের ওপর কেন ব্যক্তির নিরঙ্কুশ মালিকানা থাকবে? এই জায়গা থেকে কেন বিপ্লবী সমালোচনা করা হলো না?
স্ট্রিম: ফরহাদ ভাই, দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বলার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ফরহাদ মজহার: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে কথা বলে বেশ ভালো লাগল।

স্ট্রিম: আপনার ‘নয়া কৃষি’ তো আসলে পৃথিবীকে ‘আমানত’ হিসেবেই গণ্য করে। পৃথিবী যাতে ধ্বংস না হয় এবং এটি যেন একটি নবায়নযোগ্য শক্তি হিসেবে টিকে থাকে—সেটিই নয়া কৃষির মূল দর্শন। কিন্তু সেই জায়গা থেকে আমরা বিচ্যুত হলাম কেন?
ফরহাদ মজহার: আমি মনে করি, যারা এ ধরনের সমালোচনা করেন তারা চরম মূর্খতার পরিচয় দিচ্ছেন। এটি আসলে আলোচনার বিষয়ই হতে পারে না। কেউ কেউ হয়তো বলবেন আমি ‘ইসলামপন্থী’। কিন্তু আমার লেখার মধ্যে তথাকথিত ইসলামপন্থা কোথায়? আমি ইসলামের যে দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছি, তা কি কোনো ইসলামি চিন্তাবিদ বা তাত্ত্বিকের লেখায় আছে? নেই। এই যে ‘আমানত’ শব্দটা, এটি আমি আমার নিজের মতো করে ব্যবহার করেছি এবং নিজের ভাষায় আত্মস্থ করেছি।
আমি মনে করি, সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ এবং সেক্যুলার ফ্যাসিজমের পতনের পর ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উত্থান একটি স্বাভাবিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। আমি নিজেই সেই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করছি, অন্যরা নয়। তারা যদি এটি মোকাবিলা করতে পারত বা গুরুত্বপূর্ণ হতো, তবে ইসলামিস্টরা কেন আমাকে আক্রমণ করার জন্য মরিয়া হয়ে থাকে? আসলে সমাজে তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। আমার কাছে ইসলামের গুরুত্ব অনেক, কারণ ইসলামের একটি গভীর দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে।
ইসলামে ফিলোসফি বা দর্শনকে সব সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। এর কারণ হলো, দর্শন যুক্তির ওপর ভিত্তি করে কথা বলে। কিন্তু ইসলাম মনে করে, শুধু যুক্তির দ্বারা আল্লাহকে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। ইসলামে আল্লাহর কোনো ‘প্রমাণ’ দেওয়া হয় না, বরং সেখানে ‘শাহাদাহ’ বা সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি প্রধান। আপনি আল্লাহ যে আছেন, তার সাক্ষ্য দিতে পারেন।
কিন্তু কীভাবে সাক্ষ্য দেবেন? মানুষের অস্তিত্বই সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ আছেন। এটি অত্যন্ত গভীর একটি দার্শনিক অবস্থান। সাক্ষ্য দেওয়ার সামর্থ্য কেবল মানুষেরই আছে, কারণ মানুষই তা উপলব্ধি করতে পারে। যখন আদমকে সৃষ্টি করা হলো, তখন তার ‘দেহ’ সৃষ্টি করা হলো। এর আগে ফেরেশতারা ছিল ‘পিওর স্পিরিট’ বা বিশুদ্ধ আত্মা। এই দেহ বা শরীর সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো উপলব্ধি করা। উপলব্ধি ছাড়া আল্লাহকে অনুভব করার আর কোনো পথ নেই বলেই সাক্ষ্য দেওয়ার শর্ত বা ‘শাহাদাহ’ তৈরি হয়েছে। এই শাহাদাহর ধারণা একমাত্র ইসলামেই আছে। তাই দর্শন যখন কেবল যুক্তির মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, ইসলাম তখন তাকে সন্দেহ করে। ইমাম গাজ্জালি থেকে শুরু করে খোদ কোরআনেও দার্শনিক ও কবিদের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ তারা অলংকার বা যুক্তিকে সত্য প্রমাণের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
কোরআনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের দিকে লক্ষ করুন। বলা হচ্ছে, যদি আপনি মুমিন বা রাসুলের উম্মত হতে চান, তবে আপনাকে ‘গায়েবে’ ইমান আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, ‘ইমান’ মানে আত্মসমর্পণ, এটি স্রেফ ‘বিশ্বাস’ নয়। ‘বিশ্বাস’ বা ‘ফেইথ’ ধারণাটি মূলত খ্রিষ্টধর্ম থেকে এসেছে। যেমন যিশুকে আল্লাহর পুত্র হিসেবে বিশ্বাস করা। ইসলামে এই অর্থে বিশ্বাসের কথা নেই। আমরা অনুবাদের ভুলে ‘ইমান’কে ‘বিশ্বাস’ বলি। ইসলাম আপনাকে ‘গায়েব’ বা সেই সত্তার প্রতি আত্মসমর্পণের কথা বলে, যিনি নিত্য অনুপস্থিত। আমাদের সিজদা দেওয়াও এক ধরনের আত্মসমর্পণ। এই যে আমরা এক ‘অদৃশ্য’ সত্তার কাছে মাথা নত করছি, তার মানে হলো—আমরা স্বীকার করছি যে আমরা সেই অনন্ত অসীমের চেয়ে বড় নই। মানুষকে কেন সালাত বা নামাজের মাধ্যমে এটি বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়? কারণ মানুষ মরণশীল। একজন মরণশীল মানুষ কখনো ধ্রুব সত্যের দাবিদার হতে পারে না। আমি যদি মরণশীল হই, তবে কীভাবে দাবি করব যে আমিই পরম সত্য জানি? অর্থাৎ ইসলাম মানুষকে নিরঙ্কুশ সত্যের দাবিদার হওয়া থেকে বিরত রাখে।
এটি আমার ব্যাখ্যা, যা শুনতে কেউ বাধ্য নয়। তবে ইসলাম মূলত কী দিচ্ছে? প্রথমত, ইসলামকে বলা হয় ‘এন্ড অফ রিলিজিয়ন’ বা সব ধর্মের পরিসমাপ্তি। কেন? কারণ এরপর ধর্মের নামে অলৌকিক দাবি করার আর কেউ নেই। আমি ফরহাদ মজহার নবী বা রাসুল হওয়ার দাবি করতে পারব না। ইসলাম আমাকে সেই অধিকার দেয় না। এর মাধ্যমে ইসলাম মানুষকে বহিঃস্থ কোনো অলৌকিক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করে দিয়েছে। ইসলাম মানুষকে জন্মগতভাবেই মুক্ত করে দিয়েছে বলে এখানে আলাদা করে ‘মুক্তির’ কোনো ধারণা নেই। আপনি তো মুক্তই, আপনার কাজ হলো সেই স্বাধীনতা বজায় রাখা।
এ কারণেই জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই বা জিহাদ এত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতি কোত্থেকে আসে? দর্শন থেকেই আসে। আমি যে ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করি, সেটি একটি বিপ্লবী প্রস্তাবনা। সাধারণ মানুষ যে ধর্মচর্চা করে, তার অনেকটাই খ্রিষ্টীয় ধর্মের ধারণার মতো। কিন্তু ‘দীন’ বা ‘ধর্ম’ মানে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ‘রিলিজিয়ন’ নয়। যেমন সনাতন ধর্মে আপনি নাস্তিক বা নিরীশ্বরবাদী হয়েও ‘হিন্দু’ থাকতে পারেন। সেখানে আস্তিকতার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক অপরিহার্য নয়, যা পাশ্চাত্যের ধারণায় ভিন্ন।
স্ট্রিম: কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে কি দেব-দেবীর ওপর বিশ্বাসের বিষয়টি নেই? পূজাটা তো একধরনের বিশ্বাস থেকেই….
ফরহাদ মজহার: সেটি বিশ্বাস নয়, সেটি পূজা। বিশ্বাস আর পূজা এক বিষয় নয়। যেমন সরস্বতী পূজা করা একটি সাংস্কৃতিক চর্চা। হিন্দু ধর্মে দেব-দেবী পূজা করা বা না করা—উভয় পথই খোলা আছে। এটি মূলত একটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও আচরণ। অন্যদিকে সেমেটিক ধর্মগুলোর (ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদি ধর্ম) ভিত্তি হলো একটি কিতাব বা ওহি।
ইসলামকে আপনি সাধারণ ধর্মের কিতাব হিসেবে পড়তে পারেন, কিন্তু কোরআন নিজেকে ‘হুদাল্লিল মুত্তাকিন’ বা মুত্তাকিদের জন্য পথনির্দেশ বলছে। এটি কোনো ধরাবাঁধা আইনের বই নয়, বরং এটি একটি পরামর্শের কিতাব। যখন আমি এটি বলি, তখন আলেমরা হয়তো বলেন যে এর মধ্যে তো আইনও আছে। আমি বলি—আইন আছে, কিন্তু সেগুলো প্রয়োগের চেয়ে পরামর্শ হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। যেমন কোরআনে বহু বিয়ের যে বিধানের কথা বলা হয়েছে, সেটি সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থা। এখন ২০২৪ সালে দাঁড়িয়ে আপনি সেই নিয়ম পালন করবেন কি না, সেটি সমাজ ও সময়ের ওপর নির্ভরশীল। কোরআন আপনাকে সেই পরামর্শ ও বিবেক দেয়।

আবার ধরুন, ইসলামে সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানার স্বীকৃতি নেই। সবকিছুর মালিক আল্লাহ। তাহলে আমরা কেন জমি রেজিস্ট্রি করি? অর্থাৎ মার্ক্সবাদ পড়ে আমি যা শিখেছি, তার সঙ্গে ইসলামের কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। সেক্যুলার বা মার্ক্সবাদীরা অনেক সময় বস্তুবাদের ওপর জোর দিতে গিয়ে ‘রুহানিয়াত’ বা আধ্যাত্মিকতা হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু ইসলাম আমাকে একই সঙ্গে মার্ক্সবাদ এবং রুহানিয়াত—দুটোই দেয়। তাহলে আমি ইসলাম ছাড়ব কেন?
স্ট্রিম: মার্ক্সবাদে কি সবসময়ই আধ্যাত্মিকতা হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে?
ফরহাদ মজহার: থাকে, কারণ মার্ক্সবাদ মূলত খ্রিষ্টধর্মের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিকশিত হয়েছে। খ্রিষ্টধর্মে আধ্যাত্মিকতা হলো ইহজগত থেকে আলাদা কিছু। কিন্তু ইসলামে ইহজগত এবং আধ্যাত্মিক জগত আলাদা নয়। আপনার প্রতিটি পার্থিব কাজই আধ্যাত্মিক হতে পারে।
আমি কেন এই ধর্মের বিরোধিতা করব? এটি তো আমাকে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী লড়াইয়ের শক্তি জোগায়। আমি খ্রিষ্টধর্ম বা ইহুদি ধর্মের বিরোধী নই। আমি জায়নবাদ বিরোধী, কিন্তু ইহুদি দর্শনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। আমরা যদি দেরিদা বা লেভিনাস পড়তে পারি, যারা জুইশ ফিলোসফিকে তাদের দর্শনে ধারণ করেছেন, তবে ফরহাদ মজহার কেন একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে কোরআন থেকে বিপ্লবের ভাষা সংগ্রহ করতে পারবে না? আমি তো কোনো অপরাধ করছি না। একই সঙ্গে যারা ইসলামকে স্রেফ ‘পরিচয়বাদী ফ্যাসিজমে’ রূপান্তর করেছে, আমি তাদের বিরুদ্ধেও লড়াই করছি।
স্ট্রিম: আমরা একটু সাম্প্রতিক প্রসঙ্গে আসি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় এক বছর আগে আপনি ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান কি সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছে?
ফরহাদ মজহার: আমি কোথাও এমন দাবি করিনি। তবে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ‘গঠন’ এবং ‘গণঅভ্যুত্থান’—এই শব্দ দুটি আসবেই। আমার বইটি ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমান সময়ে যারা গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল, সেই তরুণদের এবং সাধারণ মানুষের হাতে বইটি পৌঁছে গেছে। এই তরুণদের যে বিস্ফোরণ, তাদের সঙ্গে আমার চিন্তার একটি ঘনিষ্ঠতা হয়তো আছে। তবে ইতিহাস সচেতন মানুষ হিসেবে আমি মনে করি, গণঅভ্যুত্থানের মূল কর্তা হলো জনগণ। সেই জনগণ গঠনে আমার আদৌ কোনো অবদান আছে কি না, তা মহাকাল বিচার করবে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস আলোচনায় আমাকে আপনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না; সেটি অবশ্যই করতে হবে।
স্ট্রিম: ‘রাজকুমারী হাসিনা’ থেকে ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা’— এই যে এক দীর্ঘ যাত্রা, এটি কি কেবল একজন ব্যক্তির পরিবর্তন নাকি আমাদের সমাজ ও রাজনীতিরও কোনো প্রতিফলন?
ফরহাদ মজহার: আমি যখন ‘রাজকুমারী হাসিনা’ লিখেছিলাম, তখন সেই নামকরণের মধ্যে একটি গভীর শ্লেষ ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, আওয়ামী লীগের ‘মূর্খরা’ সেটি তখনো বোঝেনি, এখনো বোঝে না। সেই রচনায় আমি একটি রূপক গল্পের আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেখানে শেখ হাসিনা নিজেকে রাজকুমারী মনে করতেন—যেহেতু তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। আর সেই গল্পে তিনি খালেদা জিয়াকে ‘দাসী’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, যিনি রাজকুমারের মাথা থেকে শেষ সুঁইটি খুলে রাজকুমারকে জয় করেছেন। এই পুরো বিষয়টিই ছিল শ্লেষাত্মক। তবে হ্যাঁ, তখন আমি কিছু ইতিবাচক ও গঠনমূলক সমালোচনাও করেছিলাম। কারণ আমি ভেবেছিলাম, বাংলাদেশের সেক্যুলার ধারাটি হয়তো একটি ইতিবাচক দিকে বিকশিত হবে। আমি আজও সেই প্রকৃত সেক্যুলারিজম বা ইহলৌকিকতার ধারাটিই বহন করছি। এখন যারা নিজেদের সেক্যুলার দাবি করে, তাদের অনেকে আসলে ইসলাম-বিদ্বেষী। অন্যদিকে, আমরা ইসলামকে একটি ইহলৌকিক বা জাগতিক ধর্ম হিসেবে পাঠ করছি, যা প্রকৃত অর্থে সেক্যুলার চেতনারই অংশ। এখানে আমার কোনো অপরাধ বা বিচ্যুতি নেই।
স্ট্রিম: জুলাই গণঅভ্যুত্থান কি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলো? এটি কি একটি ‘বেহাত হওয়া’ বিপ্লব?
ফরহাদ মজহার: জুলাই গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে—এটি স্রেফ আওয়ামী প্রপাগান্ডা।
স্ট্রিম: তবে এই অভ্যুত্থানের প্রকৃত অর্জন কী?
ফরহাদ মজহার: সবচেয়ে বড় অর্জন হলো শেখ হাসিনার পতন। দ্বিতীয়ত, আমরা ‘গঠন’ শব্দটিকে সামনে নিয়ে আসতে পেরেছি। বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে—এই চেতনা এখন সাধারণ মানুষের মগজে ঢুকে গেছে। এটি একটি বিরাট অর্জন।
স্ট্রিম: কিন্তু রাষ্ট্রের তো কাঠামোগত কোনো রূপান্তর এখনো হয়নি।
ফরহাদ মজহার: চেতনা যখন জাগ্রত হয়, তখন রূপান্তর শুরু হয়ে যায়। এই লড়াই এখন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রূপ নিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই উপমহাদেশে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে জনজোয়ার আমরা নেপাল বা শ্রীলঙ্কায় দেখছি, তা কি আগে ভাবা গিয়েছিল? আমরা তো এগিয়ে যাচ্ছি, পিছিয়ে পড়ছি না।
স্ট্রিম: ইতিহাস তো আসলে সামনের দিকেই এগিয়ে যায়।
ফরহাদ মজহার: অবশ্যই। বাংলাদেশে এখন আর কেউ বলবে না যে আমরা ১৯৭১-এর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাই। জুলাইয়ের প্রত্যাশা হয়তো পুরোপুরি এখনো পূরণ হয়নি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তা হবে না। আমরা তো এখনো লড়ছি, আমরা তো ফুরিয়ে যাইনি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে আছি। দেখুন, আমি কবিতা লিখতে লিখতে আজ বাংলাদেশের রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় তাত্ত্বিক জায়গায় চলে এসেছি—এটি কি আমি নিজে কখনো ভেবেছিলাম? না। আমাকে যে একদিন ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ লিখতে হবে, তা আমার ভাবনার অতীত ছিল। কিন্তু ইতিহাস আমাকে দিয়ে এটি লিখিয়ে নিয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই আসলে ইতিহাসের সন্তান।
স্ট্রিম: আপনার বর্তমান অবস্থান নিয়ে আমি একটি প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম...
ফরহাদ মজহার: আমি তো বললামই, আমরা সবাই ইতিহাসের সন্তান। ১৯৭১ আমাদের বদলে দিয়েছে, ১৯৯০ আমাদের নতুন রূপ দিয়েছে এবং ২০২৪-এর জুলাই আমাদের আমূল বদলে দিচ্ছে। আমরা এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছি। আমাদের কোনো ভুলত্রুটি থাকলে পরবর্তী প্রজন্ম তা বিচার করবে এবং এভাবেই ইতিহাস সামনে এগোবে। কিন্তু আমরা যে একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছি, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা শেখ হাসিনাকে হটিয়েছি এবং বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান সংকটটি চিহ্নিত করতে পেরেছি। এই সংকট স্রেফ সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের ‘গঠন’ বা কাঠামোর সংকট। আমাদের নতুন করে বাংলাদেশ গঠন করতে হবে, নতুন সংবিধান বা গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করতে হবে এবং গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যেতে হবে—এই বিষয়গুলো এখন সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
স্ট্রিম: কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে আমরা তো দেখছি যে গণপরিষদ নির্বাচন তো বহুদূর, এমনকি সংবিধান সংস্কার কমিশনের কার্যক্রমও তো সেভাবে বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে না।
ফরহাদ মজহার: কিন্তু এই যে আপনি আজ কথাটি বলতে পারছেন, এটি সম্ভব হয়েছে কারণ ‘গঠন’ ধারণাটি এখন আমাদের রাজনৈতিক চেতনায় আছে। আমি আপনার সঙ্গে একমত যে প্রক্রিয়াটি এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি, তবে আগামীতে এটি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
একটি বিষয় খেয়াল করুন—আমাদের রাজনীতির বা আমার সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মূল লক্ষ্য কী ছিল? আমাদের দাবি ছিল নতুন সংবিধান। আমরা কেবল ‘সরকার বদল’ বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ চাইনি।
রেজিম চেঞ্জ হলো মার্কিনদের প্রেসক্রিপশন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল চেতনা কিন্তু স্রেফ সরকার পরিবর্তন ছিল না। এমনকি নাহিদ ইসলামও বলেছিল ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ’। তাহলে বাংলাদেশে এই ‘রেজিম চেঞ্জে’র রাজনীতিটা কারা করল? তারা হলো বামপন্থীরা। বামপন্থীরা যে মার্কিন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে এটি করেছে তা নয়, বরং তাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা বা বুদ্ধিবৃত্তিক ত্রুটির কারণে এমনটি হয়েছে।
স্ট্রিম: আপনি এর আগে একটি আলোচনায় বলেছিলেন যে, ২ আগস্টের সেই ‘দ্রোহযাত্রা’ ছিল মূলত আনু মুহাম্মদদের এক ধরনের ‘সাবোটাজ’ এবং তড়িঘড়ি এক দফা ঘোষণা করা।
ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, সেই এক দফা ঘোষণা ছিল ছাত্রদের এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে এক ধরনের অন্তর্ঘাত বা সাবোটাজ। আপনারা আন্দোলনের নেতৃত্ব কুক্ষিগত করতে চেয়েছিলেন। এর কারণ হলো—আপনারা ধরে নিয়েছেন যে তোমরাই সমাজের একমাত্র বুদ্ধিজীবী এবং তোমরাই ঠিক করবে ইতিহাস কোন দিকে যাবে। অথচ মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের এই তরুণরা আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তায় আপনাদের চেয়েও অগ্রসর ছিল। তারা সামগ্রিক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ চেয়েছিল।
স্ট্রিম: কিন্তু ২ আগস্ট তারা যে কর্মসূচি দিল, সেটি তো ছাত্রদের আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা ছিল...
ফরহাদ মজহার: না, এটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। তাহলে আপনাদের আলাদা করে নতুন কর্মসূচি দেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? ৩ আগস্ট ছাত্ররা যখন নতুন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলছে, তখন আপনারা এসে বললেন ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ চাই। আমরা তো শুরু থেকেই তর্কের খাতিরে বলছিলাম যে—‘এক দফা এক দাবি, এরশাদ/হাসিনা তুই কবে যাবি’—এই পুরোনো সস্তা রাজনীতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে চাইছিল, তাই তারা এই গাঠনিক মুহূর্তটিকে নস্যাৎ করার জন্য ‘রেজিম চেঞ্জে’র দিকেই ধাবিত হবে—এটাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ ব্যবস্থা একই থাকবে, শুধু ব্যক্তি হাসিনা চলে যাবে। আমি বামদের জিজ্ঞাসা করি, আপনারা কেন এই ফাঁদে পা দিলেন? আপনাদের তো বলা উচিত ছিল যে আমরা নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে চাই। কিন্তু তারা তা বলেনি, কারণ তারা আজও ১৯৭২-এর সংবিধানকে ‘পবিত্র’ মনে করে এবং মনে করে এর মধ্যেই একাত্তরের চেতনা নিহিত। ফলে বামদের এই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মার্কিনদের ‘রেজিম চেঞ্জ’ প্রক্রিয়াকেই সহায়তা করেছে।

স্ট্রিম: এটি কি তাদের অবচেতন মনের প্রতিফলন ছিল?
ফরহাদ মজহার: এটিই তাদের প্রকৃত চরিত্র। বাংলাদেশের বামপন্থীদের চিন্তার ধরনই এমন।
স্ট্রিম: কিন্তু এই বামরাই তো সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলন বা তেল-গ্যাস রক্ষা আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল।
ফরহাদ মজহার: সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। তেল-গ্যাস বা সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনের ইতিবাচক দিকগুলোকে আমি সমর্থন করি। কিন্তু তারা এই আন্দোলনগুলোকে ক্ষুদ্র দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। তারা এই লড়াইয়ে বিএনপি, অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা ইসলামপন্থীদের যুক্ত করেনি। তাদের মধ্যে এক ধরণের ‘ইসলাম-বিদ্বেষ’ কাজ করে। তারা টুপি-দাড়িওয়ালা বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে ব্র্যাকেটবন্দি করে বাইরে রেখেছে। জনগণের সঙ্গে চিন্তার পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তা তো আন্দোলনের ময়দানে মোকাবিলা করতে হবে।
ইসলামকে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, তার ব্যাখ্যা আমি আমার ‘মোকাবিলা’ বইতে দিয়েছি। আমি সবসময়ই নিজের অবস্থানে অটল। যদি ‘মোকাবিলা’ বা ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ বইগুলোর মধ্য দিয়ে আমি সেক্যুলার ও ইসলামের এই কৃত্রিম বিভাজন না ভাঙতাম, তবে এই গণঅভ্যুত্থান সম্ভব হতো না। বামদের প্রতি আমার অভিযোগ হলো—তোমরা কিসের ভিত্তিতে এক দফা দাবি দিলে? তখন তো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও একই দাবি তুলছিল। আমাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল যেন আমরা কেবল ‘এক দফা’র দাবি মেনে নিই।
স্ট্রিম: কিন্তু সেই ‘রেজিম চেঞ্জ’ তো শেষ পর্যন্ত ছাত্রদের আকাঙ্ক্ষার মতোই হয়েছে বলে মনে হয়।
ফরহাদ মজহার: না, বামরা এরই মধ্যে বড় ক্ষতি করে ফেলেছে। তারা যদি ২ আগস্ট ওই অবস্থান না নিত, তবে নাহিদদের ‘ব্যবস্থার বিলোপ’ বা সংবিধান উৎখাতের কথাটি আরও জোরালো হতো। ছাত্ররা চেয়েছিল আন্দোলনে যেন সবাই থাকে এবং কোনো বড় বিভেদ তৈরি না হয়। নাহিদ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে; সে বলেছে আমরা ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার’ বিলোপ চাই। সে শুধু হাসিনার পদত্যাগ চায়নি, আবার বামদের এক দফাকেও পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। সেই ‘দ্রোহযাত্রা’ যদি না হতো, তবে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস আজ ভিন্ন হতো। হয়তো ডক্টর ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হতো না, হয়তো আনু মুহাম্মদ হতো।
স্ট্রিম: কিন্তু ফ্যাসিবাদ বিলোপের দাবি তুলেও ড. ইউনূসের সরকার শেষ পর্যন্ত সেই মার্কিন প্রভাবের মধ্যেই পড়ে গেল কি না?
ফরহাদ মজহার: বিষয়টি এভাবে দেখা ঠিক হবে না। আপনি চুক্তির কথা বলছেন, কিন্তু চুক্তি মানেই মার্কিন দাসে পরিণত হওয়া নয়। আপনার যদি নিজস্ব রাজনৈতিক প্রজ্ঞা না থাকে, তবে ইউনূস সাহেব একাই বা কী করবেন? এখানে ব্যক্তিকে আক্রমণ না করে আমাদের ‘রাষ্ট্র’ নিয়ে ভাবা উচিত।
গণঅভ্যুত্থানের পর একটি ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ তৈরি হয়েছিল। বামপন্থীদের উচিত ছিল তাদের হোমওয়ার্ক ঠিকঠাক করা। তারা তা না করে উল্টো ছাত্রদের ‘মব’ বা ‘ইসলামিস্ট’ বলে গালি দিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা প্রকৃতপক্ষে মার্কিন স্বার্থেরই সেবা করেছে। কারণ পরাশক্তিগুলো চেয়েছিল শেখ হাসিনা চলে যাক এবং ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন না করে নতুন কেউ ক্ষমতায় বসুক। সেই পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বামপন্থীরাই পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। এখন ইউনূস সরকারের সমালোচনা করে লাভ নেই, কারণ এই পরিস্থিতি তৈরিতে তাদেরও ভূমিকা ছিল। ক্ষমতা কেবল ব্যক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির তৎপরতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করে।
স্ট্রিম: সেই প্রেক্ষাপট থেকেই আমার প্রশ্ন—৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর আমরা যা দেখলাম...
ফরহাদ মজহার: ৮ আগস্টের কথা যখন তুললেন, তখন আমি কী বলেছিলাম সেটি একটু খেয়াল করুন। আমি একে বলেছিলাম ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’। তারা সংবিধানকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। কাদের সংবিধান? যে সংবিধানকে বামপন্থীরা ‘পবিত্র’ বলে জ্ঞান করে। বামপন্থীরা এর কী ব্যাখ্যা দেবে? ড. ইউনূস তো আসলে তাদের পক্ষেই কাজ করেছেন। তাহলে তারা আবার কেন ইউনূস সাহেবের ওপর চড়াও হচ্ছে? ইউনূসের সঙ্গে আমাদের বিরোধের জায়গা তো এখানেই—কেন তিনি শেখ হাসিনার সেই পুরোনো সংবিধানকে বহাল রাখলেন? এমনকি তার গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটিতে তো অধিকাংশ বাম ঘরানার ব্যক্তিরাই ছিলেন।
স্ট্রিম: সবাই হয়তো নন, তবে অনেকেই ছিলেন।
ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, অধিকাংশই বাম ব্যাকগ্রাউন্ডের। সেখানে কি আপনারা আমাকে দেখেছেন? দেখেননি। কারণ আমি সেই প্রক্রিয়াটি গ্রহণই করিনি। ততক্ষণে তো সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব ঘটে গেছে। আমি যখন এই প্রতিবিপ্লবের কথা বললাম, তখন কোনো বামপন্থী কি আমার সঙ্গে একমত হয়েছিল? তারা তা না করে ব্যক্তি ইউনূসকে আক্রমণ শুরু করল। বাংলাদেশের বামপন্থীরা এতটাই অসততা ও অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে যে, ড. ইউনূস যে সরকার গঠন করেছেন, তা তো মূলত তাদেরই আদর্শিক পথ অনুসরণ করেছে। ছাত্ররা তো ৭২-এর সংবিধানকে ধারণ করেনি, কিন্তু ড. ইউনূস তো সেটিই বহাল রেখেছেন।
স্ট্রিম: আপনি হাসছেন, কিন্তু এটি ১৭ কোটি মানুষের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
ফরহাদ মজহার: আমি হাসছি তাদের দ্বিমুখী আচরণ দেখে। ড. ইউনূস তো শেষ পর্যন্ত তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পুরোনো সংবিধানই রক্ষা করলেন। সেই হিসেবে তিনি তো তাদেরই নেতা হলেন, আমাদের তো নয়।
স্ট্রিম: কিন্তু ৮ আগস্ট সরকার গঠনের পর সমাজে যে ধরনের ‘মব’ জাস্টিস বা আক্রমণ আমরা দেখলাম—কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানো বা মাজার ভাঙা—এগুলো তো নিশ্চয়ই বামপন্থীরা করেনি।
ফরহাদ মজহার: দয়া করে বামপন্থীদের রক্ষা করার তত্ত্ব দেবেন না। আমরা সবাই এ ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা করি। আমার কথা হচ্ছে—আমরা রাষ্ট্র ও এর গঠন নিয়ে আলোচনা করছি। সমাজ তো আগে থেকেই সেক্যুলার ফ্যাসিবাদের পাশাপাশি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের কবলে ছিল। এখন যারা মাজার আক্রমণ করছে, তারা ভারতীয় এজেন্ট কি না বা অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থার লোক কি না—তা তো আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে বামপন্থীদের নেতৃত্বে কেন একটি বৃহৎ ঐক্য গড়ে উঠল না? তারা সেটি করেনি। আমরা যখন আন্দোলন শুরু করলাম, তারা আমাদের প্ল্যাটফর্মেও এল না।
তারা বরং আন্দোলনকারীদের ‘মব’ বলে গালি দিতে শুরু করল। তাদের ফেসবুক পোস্টগুলো পড়লে দেখবেন—তারা প্রমাণ করতে চাইছে যে এই তরুণ ছাত্ররা সবাই ‘মব’ বা ‘ইসলামিস্ট’। তারা প্রচার করছে যে মাদরাসার ছাত্ররাই মাজার ভাঙছে। তারা মাহফুজ বা নাহিদদের মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
স্ট্রিম: নাহিদ তো মাদরাসা থেকে আসেনি।
ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, কিন্তু প্রোপাগান্ডা তো থামেনি। বামদের এই ‘ইসলামিস্ট’ প্রচারণাই তো দিল্লি লুফে নিয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বামপন্থীরা আগাগোড়া এই গণঅভ্যুত্থান বিরোধী ভূমিকা পালন করেছে। তারা মূলত প্রতিবিপ্লবের পক্ষেই কাজ করেছে। আমি প্রমাণ দিয়ে বলছি—যখন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন এল, আপনারা রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে চাইলেন কেবল হাসিনাকে বাদ দিয়ে।
বামপন্থীদের বোঝা উচিত তাদের রাজনীতি কতটা ন্যক্কারজনক ছিল। এমনকি এখন এনসিপির ওপর যে হামলা হচ্ছে, তার পেছনেও বামদের প্ররোচনা আছে। অথচ এই ছেলেরাই তো হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছে। আমি বলছি না যে এই ছেলেদের সব কাজ নির্ভুল, কিন্তু আমি তাদের ‘কালেক্টিভ পাওয়ার’ বা সম্মিলিত শক্তির কথা বলছি। জনগণ তাদের পেছনেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

স্ট্রিম: এনসিপির বিরুদ্ধে এখন যে আক্রমণগুলো হচ্ছে, এর ভেতরের রাজনীতিটা কী?
ফরহাদ মজহার: শিবিরের সঙ্গে এনসিপির এই বিচ্ছেদকে আমি কৌশলগত ভুল বলে মনে করি। কারণ সেই সময় এই ঐক্যটি জরুরি ছিল। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীকে বাধ্য করা উচিত ছিল তাদের পুরোনো নাম ও রাজনীতি সংস্কার করতে। আমি আবারও বলছি—বামপন্থীরা বাইরে থেকে বা আমেরিকান চক্রান্তে এটি করেছে বলে আমি মনে করি না; বরং তারা তাদের তাত্ত্বিক ‘হোমওয়ার্ক’ ঠিকমতো করেনি। তারা চরম প্রতিক্রিয়াশীল এবং গণঅভ্যুত্থান বিরোধী অবস্থানে ছিল।
স্ট্রিম: শিবিরের সঙ্গে এনসিপির ঐক্য কি সঠিক ছিল?
ফরহাদ মজহার: অবশ্যই। কারণ তখন যদি আমরা সেক্যুলার ও ধর্মপন্থীর মধ্যকার কৃত্রিম বিভাজনটি না ভাঙতাম, তবে এই গণঅভ্যুত্থান কখনোই সফল হতো না। তবে পরবর্তীকালে মাহফুজরা শিবিরের সঙ্গে যে বিরোধটি তৈরি করেছে, আমি তাকে সঠিক কৌশল মনে করি না।
স্ট্রিম: কিন্তু শিবিরের কি এনসিপির রাজনীতি গ্রহণ করা জরুরি ছিল না?
ফরহাদ মজহার: শিবিরের রাজনীতি শিবিরের মতো চলবে। তবে আপনি যদি শিবিরের রাজনীতিকে তাত্ত্বিকভাবে মোকাবিলা করতে চান, তবে আপনাকে মওদুদি রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ করতে হবে। যেমনটা আমি আগে বললাম—ইসলামের দৃষ্টিতে জগতের সবকিছুর মালিক আল্লাহ, তবে জমিনের ওপর কেন ব্যক্তির নিরঙ্কুশ মালিকানা থাকবে? এই জায়গা থেকে কেন বিপ্লবী সমালোচনা করা হলো না?
স্ট্রিম: ফরহাদ ভাই, দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বলার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ফরহাদ মজহার: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে কথা বলে বেশ ভালো লাগল।
.png)

ফরহাদ মজহার কবি, দার্শনিক, রাজনীতি বিশ্লেষকসহ বহুবিধ পরিচয়ে পরিচিত। যাপন থেকে শুরু করে চিন্তা ও তৎপরতায় রাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন, কাব্য ও কৃষির উদ্যোগে প্রতিনিয়ত নিজেকেই নিজে অতিক্রম করছেন তিনি। ‘আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে’, ‘অকস্মাৎ রপ্তানিমুখী নারীমেশিন’, ‘এবাদতনামা’ প্রভৃতি তাঁর উল
০৮ আগস্ট ২০২৬
১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি। জিব্রাল্টার প্রণালির পাশ ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালা। এরই পাদদেশের শহর গ্রানাডার আকাশেই অস্ত যায় মুসলিম আন্দালুসের আট শতকের গৌরবময় ইতিহাসের শেষ সূর্য।
০৭ আগস্ট ২০২৬
স্ট্রিম: ‘চিহ্ন’ পত্রিকার ২৫ বছরের যাত্রায় ফিরে তাকালে আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন কী বলে মনে হয়? শহীদ ইকবাল: অর্জন তো কোট-আনকোট (‘’)। আমরা কাজের নেশা থেকে কাজ করে যাচ্ছি। নিশ্চয়ই ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের জার্নিটা একটা প্রভাবশালী শক্তি। সামগ্রিক অবদান তো সেভাবে দেখা যাবে না। তবে বড় অর্জনের
০৭ আগস্ট ২০২৬
‘গতকল্য বৃহস্পতিবার বেলা ১২.১৩ মিঃ সময় বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলিকাতা জোড়াসাঁকোস্থিত বাসভবনে মহাপ্রয়াণ করিয়াছেন। মৃত্যুকালে তাঁহার বয়স ৮০ বৎসর ৩ মাস হইয়াছিল।
০৬ আগস্ট ২০২৬