ইসরায়েল যেভাবে মার্কিন সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ২০: ৪০
স্ট্রিম গ্রাফিক

মার্কিন সরকারকে শাসন করছে ইসরায়েল। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ কীভাবে বিশ্বের বৃহত্তম পরাশক্তির ওপর এমন নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে? কেন প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ইসরায়েলকে পাঠায়। অথচ সাধারণ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং শিক্ষাঋণের বোঝা নিয়ে লড়াই করছে! কেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দুই দলের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইসরায়েলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন? কেন গাজায় হাজার হাজার শিশুর মৃত্যুর পরেও ওয়াশিংটন থেকে ‘মেড ইন ইউএসএ’ সিল মারা বোমা পাঠানো থামে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থ, ধর্ম এবং ক্ষমতার গভীরে।

সংখ্যাতত্ত্ব ও অর্থের প্রবাহ

শুরু করা যাক পরিসংখ্যান দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। এত সহায়তা যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো দেশকে দেয়নি। একে কেবল সাধারণ সাহায্য ভাবলে ভুল হবে। এটি একটি পাইপলাইন। এই সাহায্যের পেছনে আছে মার্কিন করদাতাদের অর্থের গ্যারান্টি। আর তা সরাসরি প্রবাহিত হয় ইসরায়েলের সামরিক যন্ত্রের দিকে।

প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পাঠায়। যার অর্থ হলো প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ডলার। এই বিশাল অর্থ কোথায় যায়? এটি খরচ হয় যুদ্ধবিমান, বোমা, ট্যাংক এবং আয়রন ডোমের মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায়। যার পুরোটাই অর্থায়ন করেন যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারা। উদাহরণস্বরূপ ২০১৬ সালের কথা ধরুন, প্রেসিডেন্ট ওবামার অধীনে আমেরিকা ইতিহাসের বৃহত্তম সামরিক সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষর করে—১০ বছরে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের এক প্যাকেজ। হোয়াইট হাউসে কে বসে আছে, তাতে কিছু যায় আসে না। এই সাহায্য ঠিকই ইসরাইলে যাবে। একদিকে আমেরিকানরা যখন স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার খরচ নিয়ে তর্ক করছে, ইসরায়েলকে তখন চিন্তাই করতে হয় না যে তাদের পরবর্তী যুদ্ধবিমানটি কোথা থেকে আসবে।

একটি এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার জেটের দাম প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এমন ডজন ডজন বিমান সরবরাহ করেছে। অথচ একই সময়ে ডেট্রয়েটের শিক্ষকেরা নিজের পকেটের টাকা খরচ করে স্কুলের সরঞ্জাম কেনেন।

অর্থের লুকানো মারপ্যাঁচ

এখানে একটি বিশেষ শর্ত আছে। এই অর্থের বড় অংশই আসলে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে বাইরে যায় না। আইন অনুযায়ী, এই সহায়তার একটি বিশাল অংশ লকহিড মার্টিন, বোয়িং এবং রেথিয়নের মতো মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো থেকে অস্ত্র কিনতে ব্যয় করতে হয়। ফলাফল হলো ইসরায়েল পায় অস্ত্র, বড় বড় করপোরেশনগুলো পায় মুনাফা, আর সাধারণ মার্কিনিরা পায় সেই খরচের বিল।

একটি এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার জেটের দাম প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এমন ডজন ডজন বিমান সরবরাহ করেছে। অথচ একই সময়ে ডেট্রয়েটের শিক্ষকেরা নিজের পকেটের টাকা খরচ করে স্কুলের সরঞ্জাম কেনেন। অথবা ইসরায়েলের আয়রন ডোম-ব্যবস্থার কথা ভাবুন। ২০১১ সাল থেকে এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জরাজীর্ণ অবকাঠামো, ব্রিজ, রাস্তা বা পানির ব্যবস্থা মেরামত করা যেত। এসব ঠিক করতে বিশেষজ্ঞদের মতে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি প্রয়োজন। যখন ইসরায়েল তার সামরিক অস্ত্রাগার বাড়াচ্ছে, তখন ৫ লাখের বেশি মার্কিন নাগরিক গৃহহীন। যখন ইসরায়েলি শহরগুলো মার্কিন অর্থায়নে সুরক্ষিত, তখন কোটি কোটি মার্কিনি কোনো স্বাস্থ্য বিমা নেই।

তাহলে কেন ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ মার্কিন ট্যাক্সের সীমাহীন টাকা পায়? অপর দিকে ৩৩০ মিলিয়ন মার্কিনিকে বলা হয় যে তাদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য রাষ্ট্রের কাছে টাকা নেই? এটি উদারতা নয়, এটি দানও নয়। এটি হলো যুদ্ধের বিনিয়োগ। এমন একটি সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের বিনিয়োগ যা অবিরাম যুদ্ধ লাগিয়ে মুনাফা করে। আর প্রতিটি ডলার এবং চুক্তির পেছনে রয়েছে রাজনীতি, লবিং এবং প্রভাবের একটি নেটওয়ার্ক। এসব সত্যিই কৌশলগত কোনো বিষয়? নাকি এর গভীরে আরও কিছু আছে? ঠিক কী কারণে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এমন নিঃশর্ত সমর্থন?

শুধু ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনেই প্রো-ইসরায়েল গ্রুপগুলো প্রচারণার অনুদান হিসেবে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ঢেলেছে। এআইপিএসির ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ সেইসব প্রার্থীদের হারানোর জন্য লাখ লাখ ডলার খরচ করেছে যারা ইসরায়েলের সমালোচনা করেছিলেন।

এআইপিএসি: ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু

একটি সংস্থা ঠিক এই কেন্দ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার নাম এআইপিএসি, বা আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি। কয়েক দশক ধরে এআইপিএসিকে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে শক্তিশালী বিদেশি লবি বলা হয়। তাদের বার্ষিক সম্মেলনগুলোতে হাজার হাজার রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং দাতা উপস্থিত হন। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট উভয় দলের প্রেসিডেন্টরা সেখানে গিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন।

এটি হলো টাকার খেলা। শুধু ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনেই প্রো-ইসরায়েল গ্রুপগুলো প্রচারণার অনুদান হিসেবে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ঢেলেছে। এআইপিএসির ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ সেইসব প্রার্থীদের হারানোর জন্য লাখ লাখ ডলার খরচ করেছে যারা ইসরায়েলের সমালোচনা করেছিলেন। মেরিল্যান্ডের ডোনা এডওয়ার্ডস বা মিশিগানের অ্যান্ডি লেভিনের মতো ডেমোক্র্যাটরাও ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সাহায্য দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে পরাজিত হয়েছেন। বার্তা পরিষ্কার, আপনি যদি লাইনের বাইরে পা রাখেন, তবে শেষ।

সাবেক কংগ্রেস সদস্য পল ফিনলে একবার বলেছিলেন, ইসরায়েলের স্বার্থের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া মানে রাজনৈতিক আত্মহত্যা। কংগ্রেসে ২২ বছর দায়িত্ব পালন করার পর তিনি এটি হাতেনাতে বুঝেছিলেন। ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। শুধু এআইপিএসি নয়, জন হ্যাগির নেতৃত্বাধীন ‘ক্রিশ্চিয়ান ইউনাইটেড ফর ইসরায়েল’ লাখ লাখ খ্রিষ্টান জায়নিস্টদের সংগঠিত করে কংগ্রেসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। আবার অ্যান্টি-ডিফামেশন লিগ নিজেদের মানবাধিকার সংস্থা হিসেবে দাবি করলেও প্রায়ই ইসরায়েলের সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করার জন্য লবিং করে। এই হচ্ছে ‘ইসরায়েল লবি’ যা ওয়াশিংটনের অন্যতম শক্তি।

৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ ৩৩০ মিলিয়নের একটি পরাশক্তিকে নীতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এটি আর কতদিন স্থায়ী হবে?

বয়ান ও ধর্মের প্রভাব

এই প্রভাব কেবল আর্থিক নয়। এই লবি মিডিয়া এবং একাডেমির গভীরে প্রবেশ করেছে। মেমরি বা উইয়াপ-এর মতো সংস্থাগুলো নিয়মিত রিপোর্ট এবং প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য মিত্র হিসেবে তুলে ধরে। এই যন্ত্রটি নীরবে কিন্তু কার্যকরভাবে কাজ করে। ক্লিনটন থেকে বুশ, ওবামা থেকে বাইডেন—সবাই একই পথ অনুসরণ করেছেন। মানে ইসরায়েলের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ও নিঃশর্ত সমর্থন।

এর পেছনে আরও গভীরে একটি সুপরিকল্পিত বয়ান আছে। দশক ধরে মার্কিন জনগণের কাছে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতন্ত্র হিসেবে জাহির করা হয়েছে। হলিউড মুভি থেকে শুরু করে স্কুলের পাঠ্যবই পর্যন্ত সবখানে ইসরায়েলকে শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি সাহসী ছোট দেশ হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করা হয়। কারণ নিজ ভূমিতেই তারা নাকি আক্রমণকারী!

আরেকটি দিক হলো ধর্ম। লাখো মার্কিন ইভানজেলিকাল বিশ্বাস করেন যে বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ করতে ইসরায়েলের টিকে থাকা দরকার। যাজক জন হ্যাগির মতো নেতারা প্রচার করেন যে ইসরায়েলকে সমর্থন করা ঈশ্বরের ইচ্ছা। এরকম অনেক ভোট ধর্মের সঙ্গে যুক্ত। কোনো প্রেসিডেন্টই তা হারাতে চান না। ২০১৮ সালে ট্রাম্প কেবল ইসরায়েলের জন্য মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নেননি। এটা ছিল ইভানজেলিকালদের জন্য একটি উপহার।

পরিণতি ও ভবিষ্যৎ

টাকা, লবিং, ধর্ম সবই আছে। কিন্তু এর পরিণতি কী? যখন মার্কিন নেতারা যে কোনো মূল্যে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যান, তখন একটি বড় বৈপরীত্য তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে তারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষা করে। অথচ তারা ইসরাইল নামের বর্ণবাদ, অবৈধ বসতি এবং অন্তহীন বোমা হামলার ব্যবস্থায় অর্থ জোগান দেয়। গাজায় আঘাত হানা প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন ট্যাক্সের টাকায় কেনা। প্রতিটি হাসপাতাল ধ্বংস হওয়ার সঙ্গে ওয়াশিংটন যুক্ত।

এ কারণেই অনেকে প্রশ্ন করেন, কে কাকে শাসন করছে? আমেরিকা কি ইসরায়েলকে পথ দেখায়? নাকি ইসরায়েল আমেরিকাকে? জেনারেল ডেভিড পেট্রেয়াসের মতো সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে ইসরায়েলের প্রতি এই অন্ধ সমর্থন বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী মনোভাব তৈরি করছে। অন্য কথায়, এটি কেবল ফিলিস্তিন নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

ইসরায়েল কি মার্কিন সরকারকে শাসন করছে? এর প্রমাণগুলো চারপাশেই আছে—বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সাহায্য, লবিং মেশিন, বয়ান নিয়ন্ত্রণ এবং ধর্মীয় প্রভাব। ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ ৩৩০ মিলিয়নের একটি পরাশক্তিকে নীতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এটি আর কতদিন স্থায়ী হবে।

কোয়াইট পাওয়ার-এর তথ্যচিত্র অবলম্বনে

সম্পর্কিত