ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার একটি নিভৃত গ্রাম আনন্দবাস। গ্রামটির সবুজ প্রকৃতি আর শান্ত পরিবেশের বুক চিরে প্রতিদিন যে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, তার উৎস প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ‘১০ গম্বুজ মসজিদ’। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছু পাল্টালেও এই স্থাপনাটি আজও মেহেরপুরের ধর্মীয় জাগরণ, সামাজিক ঐক্য এবং ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণ ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারকদের আগমন ঘটে। তৎকালীন জনবিরল এই এলাকায় ইবাদত ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্য একটি স্থায়ী স্থাপনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। জানা যায়, শেখ ফরিদ নামের এক দরবেশের অনুপ্রেরণায় গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। লিখিত কোনো ঐতিহাসিক দলিল না থাকলেও কয়েক প্রজন্মের স্মৃতিতে এই ইতিহাস আজও অম্লান।
১০ গম্বুজ মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী গ্রামীণ পরিমণ্ডলে বিরল। লালচে ইটের গাঁথুনি, পুরু দেয়াল আর প্রশস্ত নামাজ ঘরের ওপর সারিবদ্ধ ১০টি গম্বুজ এর প্রধান আকর্ষণ। মসজিদের বর্তমান ইমাম মাওলানা সালাহ উদ্দীন জানান, ‘বাগেরহাটের বিখ্যাত ষাট গম্বুজ মসজিদের গম্বুজের তুলনায় আমাদের এই মসজিদের একটি গম্বুজ আকারে বেশ বড়, যা এই স্থাপত্যকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।’ বর্তমানে মসজিদটি নিজস্ব সোলার প্যানেল ব্যবস্থার মাধ্যমে আলোকিত থাকে।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইবনে সুয়ায়েজ মামুন জানান, আবুল মাস্টার, মফেম উদ্দীন মণ্ডল ও জিন্দার আলীসহ গ্রামের পূর্বসূরিরা দীর্ঘদিন মসজিদটির দেখাশোনা করেছেন। বর্তমানে তাঁদের উত্তরসূরিরা সেই দায়িত্ব পালন করছেন। তথ্য অনুযায়ী, ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুসল্লিদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় মূল কাঠামোর সামনে একটি দ্বিতল ভবন ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। তবে প্রাচীন ১০ গম্বুজবিশিষ্ট মূল অংশটি ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
এই মসজিদটি কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, বরং পুরো গ্রামের মানুষের কাছে এক গৌরবের প্রতীক। গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের বাসিন্দা জয়দেব শর্মা বলেন, ‘আমার দাদারাও এই মসজিদ দেখেছেন। বহু বছর ধরে এটি আমাদের গ্রামের ইতিহাসের অংশ।’
বর্তমানে গ্রামে আরও ছয়টি নতুন মসজিদ নির্মিত হলেও জুমার দিনে এই প্রাচীন মসজিদেই ভিড় সবচেয়ে বেশি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অন্তত ২ হাজার মানুষ এখানে জুমার নামাজে অংশ নেন। স্থানীয় হাসেল উদ্দিন বিশ্বাস ও আব্দুল করিমের মতে, এটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং গ্রামবাসীদের এক মিলনস্থল।
দেড়শ বছর ধরে স্থানীয়দের নিজস্ব উদ্যোগে টিকে থাকা এই মসজিদটি মেহেরপুর জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন হওয়ার দাবি রাখে। এলাকাবাসীর মতে, সঠিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্বীকৃতি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আনন্দবাসের এই ১০ গম্বুজ মসজিদ পর্যটন ও ঐতিহ্যের মানচিত্রে শক্তিশালী জায়গা করে নিতে পারবে।
ইট-সুরকির এই প্রাচীন স্থাপনাটি আজও আনন্দবাসের মানুষের কাছে এক প্রশান্তির আশ্রয় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অবিনাশী শক্তি।