জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

যুদ্ধের নির্দেশনা মানছেন না প্রবাসীরা, বাড়ছে ঝুঁকি

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ২১: ৫৯
চলমান সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে ৬০ লাখের বেশি বাংলাদেশি নানামুখী ঝুঁকিতে পড়েছেন। স্ট্রিম গ্রাফিক

চলমান সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে ৬০ লাখের বেশি বাংলাদেশি নানামুখী ঝুঁকিতে পড়েছেন। এই ঝুঁকি তারা নিজেরা বাড়িয়ে তুলছেন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর যুদ্ধপরিস্থিতির নির্দেশনা অমান্য করার মাধ্যমে।

গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হন। এরপর প্রতিরোধ হামলা জোরদার করে তেহরান। তারা মার্কিন মিত্র সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আরব আমিরাত, ওমান ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পাল্টা হামলা জোরদার করে।

এমন প্রেক্ষাপটে আক্রান্ত দেশগুলো নাগরিকদের জন্য নানা নির্দেশনা দিয়েছে। সৌদি আরবে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনায় গুজব এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো ছবি বা ভিডিও আপলোড, কোনো সংবাদ প্রচার, শেয়ার, লাইক বা কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকতেও বলা হয়েছে। এসব নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে বাংলাদেশ দূতাবাসও অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু দেশটিতে থাকা প্রবাসীদের অনেকে এসব নির্দেশনা মানছেন না। উৎসাহ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমানে ছবি-ভিডিও আপলোড দিচ্ছেন তারা।

দীর্ঘদিন উপসাগরীয় অঞ্চলের গণমাধ্যমে কাজ করা সাংবাদিক তামীম রায়হানের মতে, প্রবাসীদের এসব অসচেতনতা তাদের বহুমুখী ঝুঁকিতে ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এসব ব্যাপারে নজরদারি করে জানিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রবাসীরা আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। এমনকি চাকরিচ্যুত করা হতে পারেন তাদের। অনেকে আরব উপসাগরীয় দেশে থেকে ইরানের পক্ষে লিখছেন, এটাও ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তামীম রায়হান।

দুই বাংলাদেশি নিহত, আহত সাত

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। চলমান এই সংঘাতে আরব উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত সাতজন। সোমবার (২ মার্চ) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এই তথ‌্য জানিয়েছে।

নিহত দুই বাংলাদেশির একজন সিলেটের বড়লেখার বাসিন্দা সালেহ আহমেদ। ইরানি মারণাস্ত্র আকাশে ধ্বংস করে দেওয়ার পরে ওড়ে আসা ধ্বংসাবশেষের আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে থাকা এই প্রবাসী।

অন্যদিকে সোমবার বাহরাইনে নিহত হয়েছেন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের আজিমপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদ তারেক (৪৮)। তিনিও একটি ড্রাইডক শিপইয়ার্ডে কাজের সময় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে মারা গেছেন।

এর বাইরে কুয়েতে ড্রোন হামলায় আহত হয়েছেন চার বাংলাদেশি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত ৬০ লাখের বেশি বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রবাসীরা সতর্ক থাকেন এবং স্থানীয় সরকারের নির্দেশনা মেনে চলেন।

বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

যেসব দেশে হামলা চালাচ্ছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বড় ধরনের যৌথ হামলা চালানোর পর প্রতিশোধ হিসেবে যেসব উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে। ইরানের দাবি, এসব সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা করছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর কোনো কোনোটি ইতোমধ্যে দাবি করেছে, ইরান সামরিক স্থাপনার বাইরে বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে। এতে পুরো অঞ্চলজুড়ে এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সোমবার যুদ্ধের তৃতীয় দিনে সকাল থেকে কুয়েত, দুবাই, কাতারের দোহা জাদিদ, আজিজিয়ায় এবং সৌদি আরবের রাস-তানুরা এলাকায় তেল শোধনাগারে ইরানি হামলা হয়েছে বলে স্ট্রিমকে জানিয়েছেন দেশগুলোতে থাকা কয়েকজন প্রবাসী ও সাংবাদিক।

নির্দেশনা মানছেন না বাংলাদেশিরা

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রতিটি নাগরিক এবং দেশগুলোতে থাকা বিদেশিদের ঘরে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে। বাইরে বের হওয়া, ছবি বা ভিডিও ধারণ, বাজারে ভিড় ও অতিরিক্ত খাবার মজুদ, সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো ইত্যাদি বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশগুলো। টেলিভিশনের খবরে, মোবাইলফোনে বার্তা পাঠিয়ে, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে এসব নির্দেশনা দিচ্ছে সরকার।

দীর্ঘদিন উপসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক তামীম রায়হান স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, আরব দেশগুলোতে সরকারি চাকরিজীবীদের ঘরে থেকে অফিস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদেরও ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে নারীরা বাইরে বের হচ্ছেন না। কাতারে রোববার পর্যন্ত ১৬ জন আহত হয়েছেন। সোমবার সকাল থেকে দেশটির ছয় জায়গায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ওই জায়গাগুলোর কোথাও মিসাইল পড়েছে, কোথাও মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ পড়েছে। মানুষ নির্ঘুম সময় কাটাচ্ছেন।

তিনি বলেন, পুলিশ ভিডিও করতে নিষেধ করছে বারবার। রোববার একটি খাদ্য কারখানায় আগুন লেগেছিল। কিন্তু সেটা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে, তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সংশ্লিষ্ট দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সরকারি নির্দেশনা মানার বিষয়ে প্রবাসীদের সচেতন করছে। কিন্তু অনেক প্রবাসী বাংলাদেশিই এসব নির্দেশনা মানছেন না। সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত সাংবাদিক ইসমাইল মোহাম্মদ স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশনা মেনে যুদ্ধের বিষয়ে আরব আমিরাতে বসবাসরত সাংবাদিকরা কোনো নিউজ বা মতামত দিচ্ছেন না।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সাংবাদিক স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, সচেতন প্রবাসীরা নির্দেশনা মেনে চললেও অনেকে অত্যুৎসাহী হয়ে বাইরে যাচ্ছেন, বিস্ফোরণের ছবি ও ভিডিও ধারণের চেষ্টা করছেন।

ভয়ে প্রবাসীরা

সৌদি আরবের রিয়াদে দীর্ঘদিন ব্যবসা করছেন বাংলাদেশের শাহাদত হোসেন। সোমবার সন্ধায় স্ট্রিমকে তিনি জানান, সৌদি সরকারি তরফে বিশেষ কোনো নির্দেশনা তারা পাননি। তবে বাংলাদেশের দূতাবাসের সঙ্গে তাদের একটা সম্পর্ক রয়েছে। সেখান থেকে সোমবার একটি নির্দেশনা পেয়েছেন।

শাহাদত হোসেন বলেন, প্রবাসীদের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করছে। বিশেষ করে সোমবার যেখানে হামলা হয়েছে, ওই কোম্পানিতে বেশ কয়েক হাজার বাংলাদেশি কাজ করেন। তারা সবাই ভয়ে আছেন। ওইসব জায়গায় বিস্ফোরণ হওয়া তো ভয়ঙ্কর।

ইউনাইটেড নেশনস ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্সের ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেন্ট স্টক-২০২৪ ডাটাবেস অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি আছেন সৌদি আরবে, সাড়ে ২৩ লাখের বেশি। ইউনাইটেড আরব আমিরাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাংলাদেশি, ১০ লাখের বেশি। ওমানে প্রবাসী বাংলাদেশি আছেন ৭ লাখের বেশি।

এছাড়া কুয়েতে ৪ লাখের বেশি, কাতারে প্রায় ৩ লাখ, বাহরাইনে ১ লাখ এবং লেবাননে ৩০ হাজারের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। এর বাইরে ইরান, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও স্বল্পসংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন।

সম্পর্কিত