জানুন সিএনএনের গল্প
রাজীব নন্দী

সিএনএন (ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক) প্রতিষ্ঠাতা টেড টার্নার একবার বলেছিলেন, ‘পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা সম্প্রচার চালিয়ে যাব।’ সাংবাদিকতার ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বিখ্যাত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ঘোষণাগুলোর একটি। কথাটির মধ্যে যেমন আছে আত্মবিশ্বাস, তেমনি আছে এক ধরনের বিরোধাভাসও। কারণ পৃথিবী যদি সত্যিই ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সেই খবর জানার জন্য কি কোনো দর্শক অবশিষ্ট থাকবে? দর্শকই যদি না থাকে, তবে সংবাদমাধ্যমের অস্তিত্বের অর্থ কী? আর পৃথিবী ধ্বংসের সেই মহাদুর্যোগে সিএনএন নিজেই বা কীভাবে অক্ষত থাকবে? নগর পুড়লে কি দেবালয় রক্ষা পায়?
১৯৮০ সালের পহেলা জুন যখন মিডিয়া মোগল টেড টার্নার আটলান্টা শহর থেকে বিশ্বের প্রথম ২৪ ঘণ্টার সংবাদচ্যানেল সিএনএন চালু করলেন। চার দশকেরও বেশি সময় পর এসে দেখা গেল, টার্নারের সেই ‘নেটওয়ার্ক’ বিশ্ব সংবাদব্যবস্থার ডিএনএ বদলে দিয়েছে। বাড়িয়ে বলা হবে না, যদি বলা হয় যে- আজকের স্মার্টফোন-নির্ভর, লাইভ আপডেটের, নোটিফিকেশন-আক্রান্ত পৃথিবীতে আমরা আসলে সিএনএন-এর তৈরি করা সময়ের মধ্যেই বাস করছি। যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা শাস্ত্রের চোখে সিএনএন কেবল একটি টিভি চ্যানেল নয়; এটি একটি যুগের নাম।
সেই টেড টার্নার মারা গেলেন একমাসও হয়নি (৬ই মে ২০২৬)। টার্নার নেই, তার উক্তিটি থেকে গিয়েছে। আছে বৈশ্বিক দাপুটে সংবাদ সংস্থা সিএনএন। টার্নারের উক্তিটির শক্তি অন্যত্র। তিনি আসলে সংবাদমাধ্যমের একটি মৌলিক অঙ্গীকারের কথা বলছিলেন—যে কোনো পরিস্থিতিতে, যে কোনো সংকটের মুখে, তথ্যপ্রবাহ থামবে না। এই অঙ্গীকারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে সিএনএন, যে প্রতিষ্ঠান ২৪ ঘণ্টার সংবাদপ্রবাহের ধারণাকেই বদলে দিয়েছিল এবং বিশ্বসংবাদকে নিয়ে গিয়েছিল এক নতুন যুগে।
যোগাযোগবিদ্যার তত্ত্বে ‘সিএনএন’ ইফেক্ট এখন প্রতিষ্ঠিত একটি টার্ম। যার মূল কথা হলো— রিয়েল-টাইম সংবাদ সম্প্রচার কেবল ঘটনা দেখায় না, অনেক সময় ঘটনাকে প্রভাবিতও করে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে পৃথিবী প্রথমবারের মতো টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি যুদ্ধ দেখতে শুরু করে। বাগদাদে বোমা পড়ছে, আর বিশ্বের কোটি মানুষ তা লাইভ দেখছে। এর আগে যুদ্ধের খবর মানুষ পেত পরদিনের কাগজে বা রাতের বুলেটিনে। সিএনএন সময়ের ব্যবধানটাই ভেঙে দেয়। ফলে যুদ্ধ আর কেবল সামরিক বা কূটনৈতিক বিষয় থাকল না; সেটি হয়ে উঠল ‘মিডিয়া ইভেন্ট’। নীতিনির্ধারকেরাও বুঝতে পারলেন—জনমত এখন যুদ্ধক্ষেত্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। টিভির পর্দায় কী দেখা যাচ্ছে, সেটিও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। যোগাযোগ তত্ত্বে এটিকে বলা হয়- রিয়েল টাইম ডিপ্লোমেসি। অর্থাৎ, খবর তখন আর শুধু ঘটনার বিবরণ নয়; খবর নিজেই একটি শক্তি।
সুনাম দুর্নাম দুইই কুড়িয়েছে সিএনএন। গণমাধ্যম গবেষণার ফ্রেমিং তত্ত্বে বলা হয়- মিডিয়া বাস্তবতার সবটুকু দেখায় না; বরং বাস্তবতার নির্দিষ্ট অংশ বেছে নিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে দর্শক একটি নির্দিষ্ট অর্থ খুঁজে পায়। সিএনএন-এর যুদ্ধ কাভারেজ সেই তত্ত্বের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি। উপসাগরীয় যুদ্ধে দর্শক বেশি দেখেছে “স্মার্ট বোমা”, “নাইট ভিশন ক্যামেরা”, “প্রিসিশন স্ট্রাইক”—অর্থাৎ যুদ্ধের প্রযুক্তিগত সৌন্দর্য। তবে কম দেখেছে নিহত শিশু, বিধ্বস্ত পরিবার কিংবা যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়। ফলে যুদ্ধকে অনেক সময় মনে হয়েছে ভিডিও গেমের মতো—পরিষ্কার, প্রযুক্তিনির্ভর, প্রায় রক্তহীন। এটিই ফ্রেমিং এর খেলা। ক্যামেরা কোথায় তাকাবে, কোন শব্দ ব্যবহার হবে, কোন ফুটেজ বারবার দেখানো হবে—এসবই দর্শকের রাজনৈতিক অনুভূতি তৈরি করে।
সিএনএন-এর সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে এখানেই। বিশেষ করে নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যানের প্রচারণা তত্ত্ব দিয়ে অনেক গবেষক সিএনএন-কে বিশ্লেষণ করেছেন। চমস্কির ভাষায়, করপোরেট মালিকানা, বিজ্ঞাপননির্ভর অর্থনীতি এবং সরকারি সূত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে মূলধারার সংবাদমাধ্যম প্রায়ই অজান্তেই ক্ষমতার ভাষা পুনরুৎপাদন করে। ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ কাভারেজে সিএনএন-এর ভাষা, গ্রাফিক্স, বিশেষজ্ঞ নির্বাচন এবং আলোচনার কাঠামো নিয়ে বহু সমালোচনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—মিডিয়া কি তখন কেবল সংবাদ দিচ্ছিল, নাকি রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভকে আরও শক্তিশালী করছিল? অবশ্য সিএনএন-এর সমর্থকেরা বলবেন, সংকটময় মুহূর্তে জাতীয় আবেগ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকা কোনো সংবাদমাধ্যমের পক্ষেই সম্ভব নয়।
আজকের ডিজিটাল পৃথিবীতে সংবাদ প্রথমে আসে ফেসবুক বা এক্সে (টুইটার), তারপর টিকটকে, তারপর ইউটিউবে—সবশেষে হয়তো টিভিতে। এখন আমরা টিভির প্রোগ্রাম দেখি কিন্তু টিভি দেখি না। একজন মোবাইল জার্নালিস্ট স্মার্টফোন বা সহজে বহনযোগ্য কোনো ডিভাইস হাতে দাঁড়িয়ে যেকোনো মুহূর্তে “লাইভ” হয়ে যেতে পারেন। সেখানে বিশাল ওবি ভ্যান, স্যাটেলাইট লিংক আর স্টুডিও সেটআপ অনেকের কাছেই ডাইনোসরের মতো মনে হয়। কিন্তু এখানেই সিএনএন-এর অভিযোজন ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তারা বুঝেছে—“টেলিভিশন” আর শুধু টিভি স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে সিএনএন এখন নিজেকে কেবল ব্রডকাস্টার হিসেবে নয়, বরং একটি মাল্টি প্ল্যাটফর্ম নিউজ ইকোসিস্টেম হিসেবে পুনর্গঠন করছে। টিভি, ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ইউটিউব, পডকাস্ট, শর্ট ভিডিও, স্ট্রিমিং—সবখানেই উপস্থিত থাকার চেষ্টা করছে তারা। কারণ আধুনিক দর্শক আর “নিউজ দেখতে বসে” না; নিউজ তার কাছে নিজে থেকেই পৌঁছে যায়। নতুন মিডিয়ার দাপটে সিএনএন এখন বুঝে গেছে—শুধু টেলিভিশনের রিমোট কন্ট্রোল ধরে বসে থাকলে আর চলবে না। কারণ আজকের দর্শক আর রাত ৯টার বুলেটিনের জন্য অপেক্ষা করে না; সে স্ক্রল করতে করতে খবর খায়। তাই সিএনএন নিজেদেরকে ধীরে ধীরে “টিভি চ্যানেল” থেকে “ডিজিটাল নিউজ ব্র্যান্ড”-এ রূপান্তর করছে। তারা এখন ইউটিউব শর্টস, টিকটক ভিডিও, পডকাস্ট, মোবাইল অ্যাপ, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম—সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। আগে যেখানে একটি বড় রিপোর্ট মানেই ছিল দশ মিনিটের টেলিভিশন প্যাকেজ, এখন সেটিকে ৩০ সেকেন্ডের মোবাইল ভিডিও, ইনস্টাগ্রাম রিল, লাইভ ব্লগ, পডকাস্ট এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ গ্রাফিক্সে ভেঙে নতুনভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে। মিডিয়া কনভারজেন্স তত্ত্বের সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ এখন সম্ভবত সিএনএন নিজেই।
আরও মজার বিষয় হলো, সিএনএন এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে দর্শকের আচরণ বুঝতে শিখছে। কোন খবর মানুষ কতক্ষণ দেখছে, কোথায় ভিডিও থামিয়ে দিচ্ছে, কোন শিরোনামে বেশি ক্লিক পড়ছে—এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তারা কনটেন্ট ডিজাইন করছে। অর্থাৎ সংবাদ এখন শুধু সাংবাদিকতার পণ্য নয়; এটি একইসঙ্গে “অ্যালগরিদমিক প্রোডাক্ট”। ফলে সিএনএন-এর নিউজরুমেও এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এসেছে। পুরোনো যুগের ‘অ্যাঙ্কর-সেন্ট্রিক’ টিভি সাংবাদিকতার জায়গায় এখন ‘মাল্টি-প্ল্যাটফর্ম স্টোরিটেলিং’ গুরুত্ব পাচ্ছে। একসময় যারা ভাবত টেলিভিশনই সংবাদ দুনিয়ার শেষ কথা, তাদের এখন টিকে থাকতে শিখতে হচ্ছে টিকটকের গতিতে, ইউটিউবের ভাষায় এবং অ্যালগরিদমের মর্জি বুঝে।
সিএনএনের মালিকানার ইতিহাসও আধুনিক গণমাধ্যম শিল্পের করপোরেট রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ১৯৮০ সালে টেড টার্নারের হাতে প্রতিষ্ঠিত এই সংবাদমাধ্যমটি প্রথমে টার্নার ব্রডকাস্টিং সিস্টেমের অধীনে পরিচালিত হতো। পরে একাধিক করপোরেট একীভবন ও অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে সিএনএন টাইম ওয়ার্নার, এরপর ওয়ার্নারমিডিয়া এবং সর্বশেষ ২০২২ সালে ওয়ার্নারমিডিয়া ও ডিসকভারি ইনকের একীভবনের ফলে গঠিত Warner Bros. Discovery–এর মালিকানায় আসে। বর্তমানে সিএনএন এই বহুজাতিক মিডিয়া কনগ্লোমারেটের একটি প্রধান সংবাদ ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্ট্রিমিং অর্থনীতি, করপোরেট পুনর্গঠন এবং মিডিয়া শিল্পের প্রতিযোগিতার কারণে এর মালিকানা কাঠামো আবারও পরিবর্তনের আলোচনায় রয়েছে। ২০২৫ সালে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি তাদের ব্যবসাকে পৃথক কোম্পানিতে বিভক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে, যেখানে সিএনএনকে ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্কস’ ইউনিটের অধীনে রাখার কথা বলা হয়। ফলে সিএনএনের মালিকানা কেবল একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক মিডিয়া পুঁজির পুনর্গঠন, করপোরেট ক্ষমতা এবং সংবাদ অর্থনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতারও প্রতিফলন।
সিএনএন ২৪ ঘণ্টার সংবাদপ্রবাহ এমন এক পৃথিবী তৈরি করেছে, যেখানে আমরা কখনো পুরোপুরি অফলাইনে যাই না। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের বিস্ফোরণ, নির্বাচন, অভ্যুত্থান কিংবা ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমাদের ড্রইংরুমে হাজির হয়। হ্যাঁ, সিএনএন নিয়ে বিতর্ক আছে। পক্ষপাতের অভিযোগ আছে। করপোরেট প্রভাবের প্রশ্ন আছে। যুদ্ধকে চমকপ্রদ দৃশ্য-প্রদর্শনী (spectacle) হিসেবে নির্মাণ করার সমালোচনাও রয়েছে। তবু এটাও সত্য—বিশ্ব সাংবাদিকতার ইতিহাসে সিএনএন এমন এক মোড় ঘুরিয়েছে, যার পর সংবাদ আর কখনো আগের জায়গায় ফিরে যায়নি। আমরা এখন এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে খবর শুধু পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করে না; অনেক সময় পৃথিবীকেই চালিত করে।
সিএনএন-কে তাই অনেক সময় গ্রিক পুরাণের “নার্সিসাস”-এর সঙ্গেও তুলনা করা যায়। নার্সিসাস জলের ভেতর নিজের প্রতিবিম্বে এত মুগ্ধ হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা ভুলে গিয়েছিল। সিএনএন-ও অনেক সময় ঠিক তেমন—নিজেকে ‘গ্লোবাল নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম’ হিসেবে দেখতে দেখতে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের ক্ষমতার প্রতিবিম্বেই আটকে যায়। বিশেষ করে যুদ্ধ, পররাষ্ট্রনীতি বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে চ্যানেলটির ভাষা, ভিজ্যুয়াল এবং আলোচনার কাঠামো প্রায়ই মার্কিন রাষ্ট্রনীতির সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলে। ফলে দর্শক অনেক সময় মনে করে, তারা যেন খবর নয়, বরং আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির ‘লাইভ ট্রেলার’ দেখছে।
এটিকে জর্জ অরওয়েলের এনিম্যাল ফার্ম-এর রূপক দিয়েও বোঝানো যায়। উপন্যাসে প্রাণীরা বিপ্লব করেছিল সমতার জন্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শূকররাই নতুন ক্ষমতাবাদী শাসকে পরিণত হয়। সিএনএন-ও একসময় নিজেকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তথ্যব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘স্বাধীন বৈশ্বিক সংবাদ’ হিসেবে হাজির করেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে করপোরেট মালিকানা, বিজ্ঞাপননির্ভরতা এবং সরকারি সূত্রের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে সেটিও অনেক সময় ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি চলে গেছে। ফলে দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগে—সিএনএন কি সত্যিই বিশ্বের চোখ, নাকি ওয়াশিংটনের চোখ দিয়ে বিশ্বকে দেখার আরেকটি জানালা?
সিএনএন চালুর আগে টেড টার্নার বিখ্যাতভাবে বলেছিলেন, “পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমরা সম্প্রচার বন্ধ করব না। আমরা সম্প্রচারে থাকব এবং পৃথিবীর শেষ মুহূর্তটিও সরাসরি সম্প্রচার করব—সেটাই হবে আমাদের শেষ ঘটনা… আমরা জাতীয় সঙ্গীত কেবল একবারই বাজাব—১৯৮০ সালের ১ জুন, নেটওয়ার্কের উদ্বোধনের দিন—আর পৃথিবীর শেষ মুহূর্ত এলে সম্প্রচার বন্ধ করার আগে ‘Nearer, My God, to Thee’ বাজানো হবে (সূত্র- Sean O’Neal, “CNN’s doomsday video leaks to the Internet,” The A.V. Club, ৫ জানুয়ারি ২০১৫; লিঙ্ক- https://www.avclub.com/cnn-s-doomsday-video-leaks-to-the-internet-1798275220 (প্রবেশ: ৩১ মে ২০২৬)।
এই প্রতিশ্রুতিকে ঘিরে টার্নারের একটি প্রতীকী প্রস্তুতির কথাও শোনা যায়। তিনি একটি ভিডিও নির্মাণ করিয়েছিলেন, যেখানে একটি সামরিক ব্যান্ড ওই স্তোত্রটি বাজাচ্ছে—যেন পৃথিবীর অন্তিম সম্প্রচারের পূর্বাভাস। তিনি কখনো কখনো সেই ভিডিও সাংবাদিকদের দেখাতেন এবং এর নান্দনিক-প্রতীকী উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে সিএনএনের আর্কাইভে সেই ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায় এবং ফাঁস হয়। আর্কাইভে সেটি চিহ্নিত ছিল “[Hold for release] till end of world confirmed”—অর্থাৎ, “পৃথিবীর শেষ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশের জন্য সংরক্ষিত।”
এই গল্প যতটা বাস্তবতার, তার চেয়েও বেশি প্রতীকের—যেখানে সংবাদমাধ্যম নিজেই পৃথিবীর শেষ সংবাদ প্রচারের আকাঙ্ক্ষায় এক ধরনের আধুনিক পুরাণ নির্মাণ করে।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সিএনএন শুধু সংবাদ পরিবেশন করেনি; বিশ্বকে দেখার এবং বোঝার ধরনও বদলে দিয়েছে। প্রযুক্তি, মালিকানা ও দর্শকের অভ্যাস বদলেছে, কিন্তু তাৎক্ষণিক বৈশ্বিক সংবাদপ্রবাহের যে সংস্কৃতি সিএনএন গড়ে তুলেছিল, তার প্রভাব আজও অমলিন। হয়তো পৃথিবী ধ্বংসের সেই কাল্পনিক মুহূর্ত পর্যন্ত সম্প্রচার চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন কখনোই হবে না। কিন্তু টেড টার্নারের ঘোষণার অন্তর্নিহিত বার্তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক—মানুষ যতদিন পৃথিবীকে জানতে ও বুঝতে চাইবে, ততদিন সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন ফুরাবে না। আর সেই দীর্ঘ ইতিহাসে সিএনএন শুধু একটি সংবাদমাধ্যম নয়, আধুনিক সাংবাদিকতার এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।
পহেলা জুন তাই শুধু সিএনএনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি ২৪ ঘণ্টার সংবাদচেতনার এক অবিরাম অঙ্গীকারের স্মারক। সংবাদ থামে না—থামে শুধু পৃথিবীর আলো। কারণ যে প্রতিষ্ঠান একদিন ঘোষণা করেছিল পৃথিবীর শেষ মুহূর্তও সম্প্রচার করার, তার কাছে প্রতিটি মুহূর্তই ইতিহাস। তাই পহেলা জুন আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয়—সংবাদ শেষ হয় না, শেষ হয় কেবল সময়ের পর্দা।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক।

সিএনএন (ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক) প্রতিষ্ঠাতা টেড টার্নার একবার বলেছিলেন, ‘পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা সম্প্রচার চালিয়ে যাব।’ সাংবাদিকতার ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বিখ্যাত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ঘোষণাগুলোর একটি। কথাটির মধ্যে যেমন আছে আত্মবিশ্বাস, তেমনি আছে এক ধরনের বিরোধাভাসও। কারণ পৃথিবী যদি সত্যিই ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সেই খবর জানার জন্য কি কোনো দর্শক অবশিষ্ট থাকবে? দর্শকই যদি না থাকে, তবে সংবাদমাধ্যমের অস্তিত্বের অর্থ কী? আর পৃথিবী ধ্বংসের সেই মহাদুর্যোগে সিএনএন নিজেই বা কীভাবে অক্ষত থাকবে? নগর পুড়লে কি দেবালয় রক্ষা পায়?
১৯৮০ সালের পহেলা জুন যখন মিডিয়া মোগল টেড টার্নার আটলান্টা শহর থেকে বিশ্বের প্রথম ২৪ ঘণ্টার সংবাদচ্যানেল সিএনএন চালু করলেন। চার দশকেরও বেশি সময় পর এসে দেখা গেল, টার্নারের সেই ‘নেটওয়ার্ক’ বিশ্ব সংবাদব্যবস্থার ডিএনএ বদলে দিয়েছে। বাড়িয়ে বলা হবে না, যদি বলা হয় যে- আজকের স্মার্টফোন-নির্ভর, লাইভ আপডেটের, নোটিফিকেশন-আক্রান্ত পৃথিবীতে আমরা আসলে সিএনএন-এর তৈরি করা সময়ের মধ্যেই বাস করছি। যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা শাস্ত্রের চোখে সিএনএন কেবল একটি টিভি চ্যানেল নয়; এটি একটি যুগের নাম।
সেই টেড টার্নার মারা গেলেন একমাসও হয়নি (৬ই মে ২০২৬)। টার্নার নেই, তার উক্তিটি থেকে গিয়েছে। আছে বৈশ্বিক দাপুটে সংবাদ সংস্থা সিএনএন। টার্নারের উক্তিটির শক্তি অন্যত্র। তিনি আসলে সংবাদমাধ্যমের একটি মৌলিক অঙ্গীকারের কথা বলছিলেন—যে কোনো পরিস্থিতিতে, যে কোনো সংকটের মুখে, তথ্যপ্রবাহ থামবে না। এই অঙ্গীকারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে সিএনএন, যে প্রতিষ্ঠান ২৪ ঘণ্টার সংবাদপ্রবাহের ধারণাকেই বদলে দিয়েছিল এবং বিশ্বসংবাদকে নিয়ে গিয়েছিল এক নতুন যুগে।
যোগাযোগবিদ্যার তত্ত্বে ‘সিএনএন’ ইফেক্ট এখন প্রতিষ্ঠিত একটি টার্ম। যার মূল কথা হলো— রিয়েল-টাইম সংবাদ সম্প্রচার কেবল ঘটনা দেখায় না, অনেক সময় ঘটনাকে প্রভাবিতও করে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে পৃথিবী প্রথমবারের মতো টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি যুদ্ধ দেখতে শুরু করে। বাগদাদে বোমা পড়ছে, আর বিশ্বের কোটি মানুষ তা লাইভ দেখছে। এর আগে যুদ্ধের খবর মানুষ পেত পরদিনের কাগজে বা রাতের বুলেটিনে। সিএনএন সময়ের ব্যবধানটাই ভেঙে দেয়। ফলে যুদ্ধ আর কেবল সামরিক বা কূটনৈতিক বিষয় থাকল না; সেটি হয়ে উঠল ‘মিডিয়া ইভেন্ট’। নীতিনির্ধারকেরাও বুঝতে পারলেন—জনমত এখন যুদ্ধক্ষেত্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। টিভির পর্দায় কী দেখা যাচ্ছে, সেটিও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। যোগাযোগ তত্ত্বে এটিকে বলা হয়- রিয়েল টাইম ডিপ্লোমেসি। অর্থাৎ, খবর তখন আর শুধু ঘটনার বিবরণ নয়; খবর নিজেই একটি শক্তি।
সুনাম দুর্নাম দুইই কুড়িয়েছে সিএনএন। গণমাধ্যম গবেষণার ফ্রেমিং তত্ত্বে বলা হয়- মিডিয়া বাস্তবতার সবটুকু দেখায় না; বরং বাস্তবতার নির্দিষ্ট অংশ বেছে নিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে দর্শক একটি নির্দিষ্ট অর্থ খুঁজে পায়। সিএনএন-এর যুদ্ধ কাভারেজ সেই তত্ত্বের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি। উপসাগরীয় যুদ্ধে দর্শক বেশি দেখেছে “স্মার্ট বোমা”, “নাইট ভিশন ক্যামেরা”, “প্রিসিশন স্ট্রাইক”—অর্থাৎ যুদ্ধের প্রযুক্তিগত সৌন্দর্য। তবে কম দেখেছে নিহত শিশু, বিধ্বস্ত পরিবার কিংবা যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়। ফলে যুদ্ধকে অনেক সময় মনে হয়েছে ভিডিও গেমের মতো—পরিষ্কার, প্রযুক্তিনির্ভর, প্রায় রক্তহীন। এটিই ফ্রেমিং এর খেলা। ক্যামেরা কোথায় তাকাবে, কোন শব্দ ব্যবহার হবে, কোন ফুটেজ বারবার দেখানো হবে—এসবই দর্শকের রাজনৈতিক অনুভূতি তৈরি করে।
সিএনএন-এর সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে এখানেই। বিশেষ করে নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যানের প্রচারণা তত্ত্ব দিয়ে অনেক গবেষক সিএনএন-কে বিশ্লেষণ করেছেন। চমস্কির ভাষায়, করপোরেট মালিকানা, বিজ্ঞাপননির্ভর অর্থনীতি এবং সরকারি সূত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে মূলধারার সংবাদমাধ্যম প্রায়ই অজান্তেই ক্ষমতার ভাষা পুনরুৎপাদন করে। ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ কাভারেজে সিএনএন-এর ভাষা, গ্রাফিক্স, বিশেষজ্ঞ নির্বাচন এবং আলোচনার কাঠামো নিয়ে বহু সমালোচনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—মিডিয়া কি তখন কেবল সংবাদ দিচ্ছিল, নাকি রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভকে আরও শক্তিশালী করছিল? অবশ্য সিএনএন-এর সমর্থকেরা বলবেন, সংকটময় মুহূর্তে জাতীয় আবেগ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকা কোনো সংবাদমাধ্যমের পক্ষেই সম্ভব নয়।
আজকের ডিজিটাল পৃথিবীতে সংবাদ প্রথমে আসে ফেসবুক বা এক্সে (টুইটার), তারপর টিকটকে, তারপর ইউটিউবে—সবশেষে হয়তো টিভিতে। এখন আমরা টিভির প্রোগ্রাম দেখি কিন্তু টিভি দেখি না। একজন মোবাইল জার্নালিস্ট স্মার্টফোন বা সহজে বহনযোগ্য কোনো ডিভাইস হাতে দাঁড়িয়ে যেকোনো মুহূর্তে “লাইভ” হয়ে যেতে পারেন। সেখানে বিশাল ওবি ভ্যান, স্যাটেলাইট লিংক আর স্টুডিও সেটআপ অনেকের কাছেই ডাইনোসরের মতো মনে হয়। কিন্তু এখানেই সিএনএন-এর অভিযোজন ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তারা বুঝেছে—“টেলিভিশন” আর শুধু টিভি স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে সিএনএন এখন নিজেকে কেবল ব্রডকাস্টার হিসেবে নয়, বরং একটি মাল্টি প্ল্যাটফর্ম নিউজ ইকোসিস্টেম হিসেবে পুনর্গঠন করছে। টিভি, ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ইউটিউব, পডকাস্ট, শর্ট ভিডিও, স্ট্রিমিং—সবখানেই উপস্থিত থাকার চেষ্টা করছে তারা। কারণ আধুনিক দর্শক আর “নিউজ দেখতে বসে” না; নিউজ তার কাছে নিজে থেকেই পৌঁছে যায়। নতুন মিডিয়ার দাপটে সিএনএন এখন বুঝে গেছে—শুধু টেলিভিশনের রিমোট কন্ট্রোল ধরে বসে থাকলে আর চলবে না। কারণ আজকের দর্শক আর রাত ৯টার বুলেটিনের জন্য অপেক্ষা করে না; সে স্ক্রল করতে করতে খবর খায়। তাই সিএনএন নিজেদেরকে ধীরে ধীরে “টিভি চ্যানেল” থেকে “ডিজিটাল নিউজ ব্র্যান্ড”-এ রূপান্তর করছে। তারা এখন ইউটিউব শর্টস, টিকটক ভিডিও, পডকাস্ট, মোবাইল অ্যাপ, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম—সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। আগে যেখানে একটি বড় রিপোর্ট মানেই ছিল দশ মিনিটের টেলিভিশন প্যাকেজ, এখন সেটিকে ৩০ সেকেন্ডের মোবাইল ভিডিও, ইনস্টাগ্রাম রিল, লাইভ ব্লগ, পডকাস্ট এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ গ্রাফিক্সে ভেঙে নতুনভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে। মিডিয়া কনভারজেন্স তত্ত্বের সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ এখন সম্ভবত সিএনএন নিজেই।
আরও মজার বিষয় হলো, সিএনএন এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে দর্শকের আচরণ বুঝতে শিখছে। কোন খবর মানুষ কতক্ষণ দেখছে, কোথায় ভিডিও থামিয়ে দিচ্ছে, কোন শিরোনামে বেশি ক্লিক পড়ছে—এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তারা কনটেন্ট ডিজাইন করছে। অর্থাৎ সংবাদ এখন শুধু সাংবাদিকতার পণ্য নয়; এটি একইসঙ্গে “অ্যালগরিদমিক প্রোডাক্ট”। ফলে সিএনএন-এর নিউজরুমেও এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এসেছে। পুরোনো যুগের ‘অ্যাঙ্কর-সেন্ট্রিক’ টিভি সাংবাদিকতার জায়গায় এখন ‘মাল্টি-প্ল্যাটফর্ম স্টোরিটেলিং’ গুরুত্ব পাচ্ছে। একসময় যারা ভাবত টেলিভিশনই সংবাদ দুনিয়ার শেষ কথা, তাদের এখন টিকে থাকতে শিখতে হচ্ছে টিকটকের গতিতে, ইউটিউবের ভাষায় এবং অ্যালগরিদমের মর্জি বুঝে।
সিএনএনের মালিকানার ইতিহাসও আধুনিক গণমাধ্যম শিল্পের করপোরেট রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ১৯৮০ সালে টেড টার্নারের হাতে প্রতিষ্ঠিত এই সংবাদমাধ্যমটি প্রথমে টার্নার ব্রডকাস্টিং সিস্টেমের অধীনে পরিচালিত হতো। পরে একাধিক করপোরেট একীভবন ও অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে সিএনএন টাইম ওয়ার্নার, এরপর ওয়ার্নারমিডিয়া এবং সর্বশেষ ২০২২ সালে ওয়ার্নারমিডিয়া ও ডিসকভারি ইনকের একীভবনের ফলে গঠিত Warner Bros. Discovery–এর মালিকানায় আসে। বর্তমানে সিএনএন এই বহুজাতিক মিডিয়া কনগ্লোমারেটের একটি প্রধান সংবাদ ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্ট্রিমিং অর্থনীতি, করপোরেট পুনর্গঠন এবং মিডিয়া শিল্পের প্রতিযোগিতার কারণে এর মালিকানা কাঠামো আবারও পরিবর্তনের আলোচনায় রয়েছে। ২০২৫ সালে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি তাদের ব্যবসাকে পৃথক কোম্পানিতে বিভক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে, যেখানে সিএনএনকে ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্কস’ ইউনিটের অধীনে রাখার কথা বলা হয়। ফলে সিএনএনের মালিকানা কেবল একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক মিডিয়া পুঁজির পুনর্গঠন, করপোরেট ক্ষমতা এবং সংবাদ অর্থনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতারও প্রতিফলন।
সিএনএন ২৪ ঘণ্টার সংবাদপ্রবাহ এমন এক পৃথিবী তৈরি করেছে, যেখানে আমরা কখনো পুরোপুরি অফলাইনে যাই না। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের বিস্ফোরণ, নির্বাচন, অভ্যুত্থান কিংবা ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমাদের ড্রইংরুমে হাজির হয়। হ্যাঁ, সিএনএন নিয়ে বিতর্ক আছে। পক্ষপাতের অভিযোগ আছে। করপোরেট প্রভাবের প্রশ্ন আছে। যুদ্ধকে চমকপ্রদ দৃশ্য-প্রদর্শনী (spectacle) হিসেবে নির্মাণ করার সমালোচনাও রয়েছে। তবু এটাও সত্য—বিশ্ব সাংবাদিকতার ইতিহাসে সিএনএন এমন এক মোড় ঘুরিয়েছে, যার পর সংবাদ আর কখনো আগের জায়গায় ফিরে যায়নি। আমরা এখন এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে খবর শুধু পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করে না; অনেক সময় পৃথিবীকেই চালিত করে।
সিএনএন-কে তাই অনেক সময় গ্রিক পুরাণের “নার্সিসাস”-এর সঙ্গেও তুলনা করা যায়। নার্সিসাস জলের ভেতর নিজের প্রতিবিম্বে এত মুগ্ধ হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা ভুলে গিয়েছিল। সিএনএন-ও অনেক সময় ঠিক তেমন—নিজেকে ‘গ্লোবাল নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম’ হিসেবে দেখতে দেখতে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের ক্ষমতার প্রতিবিম্বেই আটকে যায়। বিশেষ করে যুদ্ধ, পররাষ্ট্রনীতি বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে চ্যানেলটির ভাষা, ভিজ্যুয়াল এবং আলোচনার কাঠামো প্রায়ই মার্কিন রাষ্ট্রনীতির সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলে। ফলে দর্শক অনেক সময় মনে করে, তারা যেন খবর নয়, বরং আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির ‘লাইভ ট্রেলার’ দেখছে।
এটিকে জর্জ অরওয়েলের এনিম্যাল ফার্ম-এর রূপক দিয়েও বোঝানো যায়। উপন্যাসে প্রাণীরা বিপ্লব করেছিল সমতার জন্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শূকররাই নতুন ক্ষমতাবাদী শাসকে পরিণত হয়। সিএনএন-ও একসময় নিজেকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তথ্যব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘স্বাধীন বৈশ্বিক সংবাদ’ হিসেবে হাজির করেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে করপোরেট মালিকানা, বিজ্ঞাপননির্ভরতা এবং সরকারি সূত্রের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে সেটিও অনেক সময় ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি চলে গেছে। ফলে দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগে—সিএনএন কি সত্যিই বিশ্বের চোখ, নাকি ওয়াশিংটনের চোখ দিয়ে বিশ্বকে দেখার আরেকটি জানালা?
সিএনএন চালুর আগে টেড টার্নার বিখ্যাতভাবে বলেছিলেন, “পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমরা সম্প্রচার বন্ধ করব না। আমরা সম্প্রচারে থাকব এবং পৃথিবীর শেষ মুহূর্তটিও সরাসরি সম্প্রচার করব—সেটাই হবে আমাদের শেষ ঘটনা… আমরা জাতীয় সঙ্গীত কেবল একবারই বাজাব—১৯৮০ সালের ১ জুন, নেটওয়ার্কের উদ্বোধনের দিন—আর পৃথিবীর শেষ মুহূর্ত এলে সম্প্রচার বন্ধ করার আগে ‘Nearer, My God, to Thee’ বাজানো হবে (সূত্র- Sean O’Neal, “CNN’s doomsday video leaks to the Internet,” The A.V. Club, ৫ জানুয়ারি ২০১৫; লিঙ্ক- https://www.avclub.com/cnn-s-doomsday-video-leaks-to-the-internet-1798275220 (প্রবেশ: ৩১ মে ২০২৬)।
এই প্রতিশ্রুতিকে ঘিরে টার্নারের একটি প্রতীকী প্রস্তুতির কথাও শোনা যায়। তিনি একটি ভিডিও নির্মাণ করিয়েছিলেন, যেখানে একটি সামরিক ব্যান্ড ওই স্তোত্রটি বাজাচ্ছে—যেন পৃথিবীর অন্তিম সম্প্রচারের পূর্বাভাস। তিনি কখনো কখনো সেই ভিডিও সাংবাদিকদের দেখাতেন এবং এর নান্দনিক-প্রতীকী উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে সিএনএনের আর্কাইভে সেই ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায় এবং ফাঁস হয়। আর্কাইভে সেটি চিহ্নিত ছিল “[Hold for release] till end of world confirmed”—অর্থাৎ, “পৃথিবীর শেষ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশের জন্য সংরক্ষিত।”
এই গল্প যতটা বাস্তবতার, তার চেয়েও বেশি প্রতীকের—যেখানে সংবাদমাধ্যম নিজেই পৃথিবীর শেষ সংবাদ প্রচারের আকাঙ্ক্ষায় এক ধরনের আধুনিক পুরাণ নির্মাণ করে।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সিএনএন শুধু সংবাদ পরিবেশন করেনি; বিশ্বকে দেখার এবং বোঝার ধরনও বদলে দিয়েছে। প্রযুক্তি, মালিকানা ও দর্শকের অভ্যাস বদলেছে, কিন্তু তাৎক্ষণিক বৈশ্বিক সংবাদপ্রবাহের যে সংস্কৃতি সিএনএন গড়ে তুলেছিল, তার প্রভাব আজও অমলিন। হয়তো পৃথিবী ধ্বংসের সেই কাল্পনিক মুহূর্ত পর্যন্ত সম্প্রচার চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন কখনোই হবে না। কিন্তু টেড টার্নারের ঘোষণার অন্তর্নিহিত বার্তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক—মানুষ যতদিন পৃথিবীকে জানতে ও বুঝতে চাইবে, ততদিন সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন ফুরাবে না। আর সেই দীর্ঘ ইতিহাসে সিএনএন শুধু একটি সংবাদমাধ্যম নয়, আধুনিক সাংবাদিকতার এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।
পহেলা জুন তাই শুধু সিএনএনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি ২৪ ঘণ্টার সংবাদচেতনার এক অবিরাম অঙ্গীকারের স্মারক। সংবাদ থামে না—থামে শুধু পৃথিবীর আলো। কারণ যে প্রতিষ্ঠান একদিন ঘোষণা করেছিল পৃথিবীর শেষ মুহূর্তও সম্প্রচার করার, তার কাছে প্রতিটি মুহূর্তই ইতিহাস। তাই পহেলা জুন আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয়—সংবাদ শেষ হয় না, শেষ হয় কেবল সময়ের পর্দা।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক।

কামরুদ্দীন আবসার ভাই কেবল একজন সাধারণ সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এদেশের গণসাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন নিবেদিতপ্রাণ মহীরুহ। একাধারে তিনি ছিলেন গণসংগীতের অসাধারণ এক কণ্ঠশিল্পী, তীক্ষ্ণ লেখনীর অধিকারী, গুণী সুরকার এবং সর্বোপরি গণসংগীতের একজন প্রকৃত ওস্তাদ।
১৪ ঘণ্টা আগে
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। কিন্তু তাদের বড় একটি অংশই চাকরির বাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছেন না। ফলে উচ্চশিক্ষা কেবল একটি 'সার্টিফিকেট-নির্ভর' ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
পদ্মা ব্যারেজ হয়তো আঞ্চলিক পানি সংকট মেটানোর সুযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং, এটি উপমহাদেশে একতরফা আধিপত্য বিস্তার বা অপরিকল্পিত বাঁধ বানানোর অশুভ প্রতিযোগিতাকে আরও উসকে দিতে পারে। সঠিক কোনো চুক্তির অভাব থাকায় দক্ষিণ এশিয়া এখন বাঁধ নির্মাণের এক বিপজ্জনক যুগে ঢুকছে।
১৬ ঘণ্টা আগে
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে বিবেচনা করতে হবে। সন্ত্রাসীদের হাতে এমন অনেক আধুনিক অস্ত্র রয়েছে, যা আমাদের পুলিশের কাছে নেই। অপরদিকে সেনাবাহিনীর আছে লিথাল উইপেন। তাছাড়াও অত্যাধুনিক মেশিনগান আছে, যা দিয়ে অতি অল্প সময়ে অধিকসংখ্যক গুলি করা যায়।
১৮ ঘণ্টা আগে