কক্সবাজারের প্যারাসেইলিং এখন পর্যটকদের নতুন ‘মরণফাঁদ’

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
কক্সবাজার

দুর্বল তদারকি ও নিয়মভঙ্গের কারণে কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং পর্যটকদের জন্য 'মরণফাঁদে' পরিণত হচ্ছে। সংগৃহীত ছবি

দুনিয়াজুড়ে পর্যটকদের কাছে রোমাঞ্চকর ওয়াটার স্পোর্টস হিসেবে পরিচিত প্যারাসেইলিং। তবে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়া দুর্বল তদারকি ও নিয়মভঙ্গের কারণে এটি পর্যটকদের কাছে ধীরে ধীরে 'মরণফাঁদে' পরিণত হচ্ছে।

গত এক বছরে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে অন্তত সাতজন পর্যটক গুরুতর আহত হয়েছেন। সর্বশেষ শনিবার (১ আগস্ট) রাইড চলার সময় ছিটকে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন খুলনার পর্যটক অক্ষর শৌভিক রায় (৩০)। বারবার দুর্ঘটনার পরও কীভাবে এই ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চলছে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চলছিল প্যারাসেইলিং

শনিবার দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করার সময় নিরাপত্তা হার্নেস থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে গুরুতর আহত হন পর্যটক অক্ষর শৌভিক রায়। পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

খুলনা সদরের বানিয়াখামার এলাকার বাসিন্দা শৌভিক শনিবার সকালে আট বন্ধুর সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন। দুপুরে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করার সময় হার্নেস থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে যান তিনি। পরে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তগীন মোহাম্মদ সোহেল বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পানিতে পড়ে ডুবে যাওয়ায় মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এই দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের বক্তব্যে আরও তথ্য সামনে আসে। জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে দুর্ঘটনার তিন দিন আগেই কক্সবাজারের সব প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপরও প্রশাসনের অগোচরে দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং চালিয়ে যায় 'ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস' নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

জেলা প্রশাসক বলেন, 'প্যারাসেইলিংয়ের কোনো অনুমোদন জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হয়নি। পর্যটনের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচ কর্মীরা গত সোমবারও ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েকটি প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন।'

তিনি আরও বলেন, 'বর্ষাকালে সাধারণত সমুদ্র উত্তাল থাকে, আবহাওয়া খারাপ থাকে। খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা তৈরি হয়। আমরা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তারপরও আমাদের অগোচরে যে প্রতিষ্ঠান পর্যটক তুলেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

তবে প্রশাসনের এই বক্তব্য নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে পর্যটক নিয়ে কীভাবে প্যারাসেইলিং পরিচালিত হলো এবং তদারকিতে তা কেন ধরা পড়ল না—এমন প্রশ্ন তুলেছেন পর্যটকরা।

দুর্ঘটনা নতুন নয়

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দরিয়ানগর ও হিমছড়ি সৈকতে প্যারাসেইলিং ঘিরে দুর্ঘটনা প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগর এলাকায় প্যারাসেইলিংয়ের সময় এক পর্যটক ছিটকে ঝাউগাছের সঙ্গে আটকে যান। পরে তাকে উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় 'স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টস' পরিচালিত রাইডের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পরদিন জেলা প্রশাসন সৈকতের সব ধরনের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।

এরও আগে গত বছরের ২০ মে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করার সময় এক নারী পর্যটক সমুদ্রে পড়ে আহত হন। ওই ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট 'ফ্লাই এয়ার সি' নামের প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু কিছুদিন পরই আবার সব কার্যক্রম আগের মতোই শুরু হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক বছরে দরিয়ানগর ও হিমছড়িতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে অন্তত সাতজন পর্যটক গুরুতর আহত হয়েছেন।

নিরাপত্তা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্যারাসেইলিং করানো অনেক প্রতিষ্ঠানেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল নেই। পুরোনো লাইফ জ্যাকেট ও মানহীন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার করার মতো প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলও নেই এসব প্রতিষ্ঠানের।

দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী 'ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং'-এর মালিক মোহাম্মদ ফরিদ বলেন, তাদের চারটি প্যারাসেইলিং, দুটি জেট স্কি ও পাঁচটি স্পিডবোট রয়েছে। শনিবার তার প্রতিষ্ঠানের রাইডেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান পর্যটক অক্ষর শৌভিক।

অভিযোগ রয়েছে, প্যারাসেইলিংয়ের আগে পর্যটকদের দিয়ে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করিয়ে নেয় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। যেখানে দুর্ঘটনা ঘটলে প্রতিষ্ঠান দায় নেবে না—এমন শর্ত রাখা হয়। ফলে নিজেদের নিরাপত্তার দায় কার্যত পর্যটকদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

অবশ্য স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টসের ব্যবস্থাপক নুর মোহাম্মদ দাবি করেন, প্যারাসেইলিং পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম রয়েছে। আকাশে ওড়ার আগে পর্যটকদের সেসব নিয়ম বুঝিয়ে দেওয়া হয়। নিচ থেকেও হ্যান্ডমাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। অনেক সময় পর্যটকেরা নির্দেশনা অনুসরণ না করলে দুর্ঘটনা ঘটে।

১১৫ কিলোমিটার সৈকতে নেই উদ্ধারব্যবস্থা

কক্সবাজার সৈকতের ১১৫ কিলোমিটার এলাকায় বড় উদ্বেগের বিষয় উদ্ধারব্যবস্থার ঘাটতি। জনাকীর্ণ কয়েকটি পয়েন্টে লাইফগার্ড হিসেবে কিছু উদ্ধারকর্মী দায়িত্ব পালন করলেও বাকি প্রায় পুরো সৈকতেই নেই কোনো উদ্ধারকারী দল।

সৈকতে নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত বেসরকারি সি-সেফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহ বলেন, 'কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে ২৭ জন লাইফগার্ড দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কলাতলী থেকে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ১১৫ কিলোমিটার সৈকতে কোনো লাইফগার্ড বা ডুবুরি নেই। ফলে প্যারাসেইলিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমে দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।'

জবাবদিহি নিশ্চিত ও কঠোর তদারকির দাবি

কক্সবাজার জেলা সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে পর্যটকদের বিমা সুবিধার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

বারবার দুর্ঘটনা, সাময়িক নিষেধাজ্ঞা, আবার কার্যক্রম চালু—দরিয়ানগর ও হিমছড়ির প্যারাসেইলিং ঘিরে গত কয়েক বছর ধরে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকার মধ্যেও পর্যটক নিয়ে প্যারাসেইলিং চলেছে। ফলে কেবল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নয়, প্রশাসনের নজরদারি ও তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

পর্যটননির্ভর কক্সবাজারে নিরাপদ বিনোদন নিশ্চিত করতে প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, সরঞ্জামের মান, প্রশিক্ষিত জনবল, আবহাওয়ার পূর্বাভাস মেনে চলা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে নিয়ম ভঙ্গ করে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন পর্যটক ও স্থানীয়রা।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত