‘মিষ্টি সাজ’ তৈরির গ্রাম ভাটারা: বৈশাখে ব্যস্ততা বাড়লেও স্বস্তি নেই

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মানিকগঞ্জ

ভাটারা গ্রামে হাতে তৈরি হচ্ছে চিনির বাতাস। স্ট্রিম ছবি

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ভাটারা গ্রামে শত বছরে ধরে কাঠের ছাঁচে চিনি দিয়ে তৈরি হয় শৌখিন খাবার ‘মিষ্টি সাজ’। এ জন্য গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে মিষ্টির গ্রাম হিসেবে। বৈশাখে গ্রামীণ মেলা কেন্দ্রে করে এবার প্রায় ৩০০ মণ মিষ্টি সাজের ফরমায়েশ পেয়েছেন তাঁরা। এ জন্য কারিগরদের ব্যস্ততা বাড়লেও, স্বস্তি ফেরেনি তাঁদের ঘরে।

উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের মধ্য ভাটারা গ্রামের কারিগরেরা বলছেন, পূজা-পার্বণকেন্দ্রিক গ্রামীণ মেলা, বিভিন্ন আড়ম্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন কমে গেছে। এখন যান্ত্রিক উপায়ে তৈরি হচ্ছে এসব মিষ্টি। আর্থিক অনিশ্চয়তা পড়ে পৈতৃক পেশা বিদায় জানিয়েছেন অনেকেই। যাঁরা আছেন, তাঁদেরও সারা বছর সচ্ছলতা থাকে না।

ভাটারা গ্রামে কাঠের ছাঁচ চিনি দিয়ে তৈরি হাতি, ঘোড়া, মোরগ, পাখি, মোটরযান ‘মিষ্টি সাজ’ নামে পরিচিত। এর পাশাপাশি এখানে গুড়ের বাতাসা, চিনির কদমা ও বাতাসা তৈরি হয়। গ্রামীণ মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল এই লোকজ মিষ্টান্নগুলো।

সাজ থেকে মিষ্টি আলাদা করছেন এক নারী কারিগর। স্ট্রিম ছবি
সাজ থেকে মিষ্টি আলাদা করছেন এক নারী কারিগর। স্ট্রিম ছবি

মিষ্টির কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের শিমুলিয়া, পশ্চিম ভাটারা ও মধ্য ভাটারা গ্রামের কয়েকশ পরিবার ‘মিষ্টি সাজ’ তৈরিতে জড়িত ছিল। এখন মধ্য ভাটারা দেড় পরিবারের মধ্যে কেবল ৫০-৬০টি পরিবার এটি তৈরি করে। বৈশাখ ও রথের মেলা উপলক্ষে কাজের চাপ বেড়ে গেলে অন্যপাড়ার সাবেক কারিগরেরা এসে তাঁদের সঙ্গে কাজ করে যান।

ভাটারা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রঞ্জিত বণিক বলেন, 'আমরা ‘মিষ্টি সাজ’ তৈরি করে জীবন অতিবাহিত করলাম। আমাদের সময় সারা বছরই পাড়ায় পাড়ায় চিনির গলানোর কড়াইয়ের সুঘ্রান ছড়িয়ে পড়ত। সারা বছরই নারী-পুরুষ দল বেঁধে এই মিষ্টি তৈরি করেছি। এখন আর সেই বাস্তবতা নেই। সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।’

গ্রাম ঘুরে জানা গেছে, আগে বৈশাখের শুরু থেকেই মিষ্টি পল্লিতে বাহারি খাবার তৈরির ধুম পড়ে যেত। চলতি বছর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ভাটারা গ্রামে কারিগরদের ব্যস্ততা বেড়েছে। তবে এই ব্যস্ততা বছরের নির্দিষ্ট সময়কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। মিষ্টি তৈরিতে দীর্ঘদিনের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

চলতি বৈশাখে গ্রামে প্রায় ৩০০ মণ মিষ্টি সাজের ফরমায়েশ এসেছে জানিয়ে সুদেব বণিক বলেন, এক কেজি ‘মিষ্টি সাজ’ তৈরিতে চিনি ও নানা কাঁচামালসহ তাঁদের খরচ হয় ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। তবে গুড়ের বাতাসা তৈরিতে ব্যয় একটু বেশি। প্রতি কেজিতে ১০টা লাভেই বিক্রি করেন। তাকে পরিবারের তিন-চারজনের পরিশ্রম যোগ করলে তেমন লাভ থাকে না। তার ওপর বছরের দুটি সময় বাদে কাজের চাপ না থাকায় আর্থিক অসচ্ছলতায় পড়তে হয় তাঁদের।

চিনির বাতাসা তৈরি করছেন এক কারিগর। স্ট্রিম ছবি
চিনির বাতাসা তৈরি করছেন এক কারিগর। স্ট্রিম ছবি

ভাটারা গ্রামের শ্যামল বণিক বলেন, আদি পেশায় কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ভালোবাসার জন্য অনেকেই এখনো একে আঁকড়ে ধরে আছে। সারা বছর তেমন কোনো ফরমায়েশ, চাহিদা নেই। শুধু বৈশাখে কাজের কিছুটা চাপ বাড়ে।

গৃহবধূ মনীষা বণিক বলেন, বৈশাখে বিভিন্ন স্থানে মেলা, খেলার আয়োজন হয়। সে অনুযায়ি ‘মিষ্টি সাজ’ তৈরি কিছুটা বাড়ে। সাংসারিক ব্যস্ততার পাশাপাশি যেটুকু সময় পান পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য কাজ করেন।

রঞ্জিত বণিক জানান, কারিগরদের আর্থিক অসচ্ছলতা ও মিষ্টি তৈরিতে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারাতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি। কাঁচামালেরও দাম বেড়ে গেছে। এখন গ্রামীণ মেলা, খেলা, লোক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি কারিগরদের সহজ শর্তে সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা হলে এর সঙ্গে জড়িতরা বেঁচে থাকতে পারবে।

জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, গ্রামীণ মেলা, খেলা ও লোকজ সংগীত অনুষ্ঠান এলাকায় অন্যতম আকর্ষণীয় খাবার চিনির তৈরি 'মিষ্টি সাজ'। জেলার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত