রাজশাহী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে হাম, শনাক্তের হার ২৯ শতাংশ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজশাহী

প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৩: ৩৫
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ফাইল ছবি

রাজশাহী অঞ্চলে শিশুদের মাঝে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ ‘হাম’ ছড়িয়ে পড়ছে। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নমুনা পরীক্ষা করে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিভাগের সাতটি সদর হাসপাতাল এবং চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করছে।

রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. হাবিবুর রহমান শনিবার সকালে জানান, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহের মাঝামাঝি সময় থেকে রাজশাহী বিভাগের হাসপাতালগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুরা ভর্তি হচ্ছে। পরে ১৮ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৫৩ জনের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে। এতে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ রিপোর্ট আসে। ছোঁয়াচে এই রোগ শনাক্তের হার প্রায় ২৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, হাম পজিটিভ ও উপসর্গ থাকা শিশুদের হাসপাতালে আলাদা রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে অন্য শিশুদের মাঝে সংক্রমক রোগটি ছড়িয়ে না পড়ে। তবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক দেখা গেছে। শিশুদের ওয়ার্ডে অন্য সব শিশুর মাঝে হামের উপসর্গ থাকা শিশুদেরও চিকিৎসা চলছে।

অথচ চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা কিংবা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ভাইরাসটি দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের জটিলতায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহসহ বিভিন্ন মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এমন রোগীদের আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থায় রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তাদের সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই রাখা হচ্ছে। রাজশাহীতে একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো রোগীকে রামেক হাসপাতাল থেকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়নি।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘হামের উপসর্গ নিয়ে যে সমস্ত রোগী আমাদের এখানে আসে, তাদের সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’ কিন্তু শুক্রবার সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে হামের উপসর্গ থাকা কোনো রোগী পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘তাহলে এখন রোগী নাই।’

তবে রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেই হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুদের ভর্তি থাকতে দেখা গেছে। গুরুত্বর অসুস্থ কোনো কোনো শিশুকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন শিশুকে আইসিইউতে নিয়েও বাঁচানো যায়নি।

সবশেষ বৃহস্পতিবার রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার আট মাস বয়সী জান্নাতুল মাওয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের সাত মাস বয়সী হুমায়রা, একই জেলার শ্রীরামপুর গ্রামের ৯ মাস বয়সী ফারহানা এবং কুষ্টিয়া সদরের পাঁচ মাস বয়সী হিয়াকে আইসিইউতে নিতে বলা হয়। হাসপাতালের রেজিস্টারে সবার রোগ ‘হাম’ উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে হুমায়রা ও ফারহানা শুক্রবার সকালেই মারা যায়। অন্য দুই শিশুকে এখনও সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

শুক্রবার দুপুরে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, জান্নাতুল মাওয়াকে একটি বেডে রাখা হয়েছে, যেখানে পর্যায়ক্রমে অন্য শিশুদেরও এনে ক্যানোলা করা হচ্ছে। শিশুটির নানি ফরিদা বেগম জানান, আইসিইউতে তাদের সিরিয়াল ২৯ নম্বরে। শিশু হিয়ার বাবা রিফাত জানান, তার মেয়ের অবস্থাও সংকটাপন্ন, অথচ আইসিইউতে নেওয়ার জন্য তাদের সিরিয়াল ৩২ নম্বরে। রামেক হাসপাতালের শিশুদের জন্য আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১২টি। এই আইসিইউ সুবিধাও সরকারি নয়। হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত।

এদিকে, হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য রোগ উল্লেখ করা হলেও ‘হাম’ শব্দটি অনুপস্থিত। এতে রোগটির প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আড়াই মাস বয়সী জহির নামের এক শিশুর মৃত্যু সনদে ‘হাম’-এর উল্লেখ পাওয়া গেছে। শিশুটির মা জেসমিন খাতুন জানান, তার সন্তানকেও আলাদা না রেখে সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। ভর্তি হওয়ার তিন দিনের মাথায় গত ১৮ মার্চ সকালে শিশুটি মারা যায়।

রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহিদা ইয়াসমিন বলেন, ডব্লিউএইচও ইতোমধ্যে ১০টি নমুনায় হাম নিশ্চিত করেছে, বাকি নমুনাগুলোতেও একই লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে।

হামের রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসা না দেওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, হাসপাতালে দুটি আইসোলেশন ওয়ার্ড থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নেই। এছাড়া ২০০ শয্যার বিপরীতে ঈদের আগে ৭০০-এর বেশি রোগী ভর্তি থাকায় পরিস্থিতি সামলানো কঠিন।

একই চিত্র দেখা গেছে রাজশাহীর বেসরকারি বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেলাল উদ্দিন জানান, সম্প্রতি একদিনে তাদের হাসপাতালে ৭৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছিল, এদের মধ্যে ৬০ জনের মধ্যে হামের লক্ষণ ছিল। এর আগের দিন ভর্তি হওয়া ২৮ জনের মধ্যে ২০ জনের একই উপসর্গ পাওয়া যায়। তারা শিশুদের লক্ষণ দেখে হাম সন্দেহ করে চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং তাতে রোগীরা সুস্থও হচ্ছে।

রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজশাহী অঞ্চলে হাম রোগ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি জানা যায়। ১৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৪৪ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এরপরে আরও কিছু শিশুর নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এবং আরও নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

তিনি জানান, রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলাতেই শিশুরা হাম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কয়েকদিন আগেও পাবনায় রোগী বাড়ছিল। এখন একটু কমছে। শনিবার সকালে তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পাবনা রওনা হয়েছেন। এর আগে ২৩ মার্চ তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে গিয়েছিলেন। ওই সময় হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৪ জন শিশু হাসপাতালটিতে ভর্তি ছিল। এই জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা আগে কম ছিল, এখন বাড়ছে।

সম্পর্কিত