জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ঈদ ছুটিতে ‘মরণফাঁদ’ সড়ক, ১০ দিনেই গেল ২১৬ প্রাণ

ঈদের দিন, আগে ও পরের সাত দিন করে ১৫ দিনকে ঈদযাত্রা ধরা হয়। এই হিসাবে গত ২১ মার্চ ঈদুল ফিতর উদযাপন হওয়ায় এবারের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো আসেনি। তবে ১০ দিনেই ভয়াবহ তথ্য মিলেছে।

প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০২৬, ২৩: ৪৭
সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ঈদের আনন্দযাত্রা অনেকের জীবন বিষাদে পরিণত করছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সড়ক-মহাসড়ক যেন হয়ে উঠেছে ‘মরণফাঁদ’। গত ১০ দিনে সারা দেশে ২০১টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে ২১৬ জন নিহত ও অন্তত ৪২১ ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যেই ভয়াবহ এই চিত্র উঠে এসেছে। এর বাইরে ঈদের রাতে (২১ মার্চ) কুমিল্লায় ট্রেন লাইনে বাস উঠে গেলে ধাক্কা লেগে ১২ যাত্রী নিহত ও ২৩ জন আহত হয়েছেন।

ঈদে ঘরমুখী হন কর্মব্যস্ত মানুষ। ঈদের আগে ও পরের কয়েক দিনে যাতায়াত করেন কয়েক কোটি মানুষ। তবে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ঈদের আনন্দযাত্রা অনেকের জীবন শোকে পরিণত হয়। গত এক দশকের পরিসংখ্যান বলছে, ঈদযাত্রায় সড়ক-মহাসড়ক ছিল কার্যত মরণফাঁদ।

ঈদের দিন, আগে ও পরের সাত দিন করে ১৫ দিনকে ঈদযাত্রা ধরা হয়। এই হিসাবে গত ২১ মার্চ ঈদুল ফিতর উদযাপন হওয়ায় এবারের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো আসেনি। তবে সড়কে অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা রোধ ও যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রাথমিক তথ্য স্ট্রিমের হাতে এসেছে। এতে গত ১৪ মার্চ থেকে মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) পর্যন্ত ১০ দিনে ২০১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৬ জন নিহত ও ৪২১ জন আহত হয়েছেন।

বিগত ১০ বছরে সড়কে প্রাণহানির চিত্র। স্ট্রিম গ্রাফিক
বিগত ১০ বছরে সড়কে প্রাণহানির চিত্র। স্ট্রিম গ্রাফিক

এ ব্যাপারে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্ট্রিমকে বলেছেন, ঈদের পরে টাকার অভাবে মানুষের মন-মানসিকতা ভালো থাকে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে অবনতি ঘটে। স্বল্পসময়ে কর্মস্থলে ফিরতে অনেকে তাড়াহুড়ো করেন। ফলে ফিরতি যাত্রায় দুর্ঘটনা বাড়ে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। বাকি দিনগুলোতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি আরও বাড়বে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সড়কের মৃত্যুগুলোকে ‘হত্যাকাণ্ড’ দাবি করেন। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘সড়কের অব্যাহত হত্যাকাণ্ডকে আমরা দুর্ঘটনা বলে ঘটনাগুলোকেই ছোট করে ফেলছি। এটি প্রকৃত অর্থে হত্যাকাণ্ড। কারণ সড়কে দুর্ঘটনার বিভিন্ন উপাদান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কেউই এগুলো অপসারণের প্রয়োজন অনুভব করছি না।’

মোজাম্মেল হক আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে দুর্ঘটনা কমে না। বৈজ্ঞানিক ব্যর্থতার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ে। ফলে বন্ধও করতে হবে বৈজ্ঞানিক পন্থায়। এজন্য অতীতের সরকারগুলোর গতানুগতিক কাজ থেকে বেরিয়ে আসতে ও ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। যেসব দেশ দুর্ঘটনা কমিয়েছে, তাদের প্রযুক্তি সড়ক নিরাপত্তায় ব্যবহার করতে হবে।’

ছুটিতে বেপরোয়া যান, বাড়ে প্রাণহানি

যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে, ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের ১৫ দিনের যাত্রায় ৩১৫টি দুর্ঘটনা ঘটে, যাতে ৩২২ জন নিহত ও ৮২৬ জন আহত হন। ২০২৪ সালে ৩৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৭ জন নিহত ও এক হাজার ৩৯৮ জন আহত হন। আর ২০২৩ সালে সড়কে ৩০৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গিয়েছিল ৩২৮ জনের। আহত হয়েছিলেন ৫৬৫ জন।

বিগত ১০ বছরে সড়কে মোট দুর্ঘটনার চিত্র। স্ট্রিম গ্রাফিক
বিগত ১০ বছরে সড়কে মোট দুর্ঘটনার চিত্র। স্ট্রিম গ্রাফিক

যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল– ১০ বছরে শুধু ঈদুল ফিতরের যাত্রায় সারা দেশে সড়কে ২ হাজার ৬৯২টি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৩৬ জন নিহত ও ৮ হাজার ২৪৬ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল আরোহীর।

২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ ও কৌশল নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের সহায়তায় একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে পুলিশ সদর দপ্তর।

‘রিচার্জ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ইনোভেশন’ শিরোনামের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদের সময় সড়কে বাড়তি চাপ দুর্ঘটনা বাড়িয়ে তোলে। দুই ঈদেই দুর্ঘটনা এবং হতাহতের হার প্রায় একই থাকে।

প্রধানত পাঁচ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। সড়কের নাজুক অবস্থার কারণে ২৯, জেব্রা ক্রসিং না থাকায় ১৯, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ৫, চালক নেশাগ্রস্ত থাকায় ৩ ও ২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বিভ্রান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে।

ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৮ শতাংশ পথচারীকে চাপা দেওয়া। এরপরেই রয়েছে গাড়ির পেছনে ধাক্কা দেওয়া, যা মোট সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার ২৪ শতাংশ। দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ১৭, চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর জন্য ১২, থেমে থাকা গাড়িতে ধাক্কা দেওয়া ৭ এবং চলন্ত দুটি গাড়ির পাশাপাশি সংঘর্ষে ১১ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

কেন থামছে না মৃত্যুর মিছিল

গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়না, চালকের ক্লান্তি, অতিরিক্ত যাত্রী এবং অদক্ষ চালকের কারণে ঈদ ঘিরে দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অপরিকল্পিত মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা।

হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজি দেলোয়ার হোসেন মিঞা স্ট্রিমকে বলেন, হাইওয়ের প্রতিটি থানায় ডিজিটাল মিটার রয়েছে, পুলিশ মোতায়েন থাকে। তারা মামলাও দেন। কিন্তু দেখা যায়, অনেকে বেশি গতিতে গাড়ি চালান; লেন ভঙ্গ করেন। সব মিলেই দুর্ঘটনা বাড়ছে। সবার সচেতনতা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

বিগত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতের চিত্র। স্ট্রিম গ্রাফিক
বিগত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতের চিত্র। স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ স্ট্রিমকে বলেন, প্রতি বছরই ঈদযাত্রায় মানুষের যাতায়াত যেমন বাড়ে, তেমনি বৃদ্ধি পায় দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা কমানোর জন্য ২০১৯ সালে ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলে’ সুপারিশ দেওয়া হয়। পরে টাস্কফোর্স গঠন করলেও সুপারিশ কার্যকর করেনি তৎকালীন সরকার। এগুলো বাস্তবায়ন করলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে।

সুপারিশের বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের মধ্যে ছিল– প্রথমত, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি করা। অর্থাৎ বাসে বাসে প্রতিযোগিতা থামানো। দ্বিতীয়ত, দক্ষ চালক তৈরি, তাদের বেতন কাঠামো ও ক্লান্তি নিরসনে আবাসনের ব্যবস্থা। কারণ ঈদযাত্রায় গাড়ি উল্টে যাওয়ার অন্যতম কারণ চালকের ঘুমঘুম ভাব। তৃতীয়, বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল মনিটরিং ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। চতুর্থত, প্রত্যেক সড়কের সেফটি অডিট ও টার্মিনালে নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। পঞ্চমত, বাসের মালিকানা একটি ‘আম্ব্রেলা’ বা কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসতে হবে। কারণ, এখন একটি বাস নিয়েও একজন মালিক বনে যাচ্ছেন। অন্যজনের বাস শতাধিক। এভাবে ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে। বড় ৫-১০টি কোম্পানি হবে এবং তাদের অধীনে সব মালিক কাজ করবেন। তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে মনে করেন কাজী সাইফুন নেওয়াজ।

সম্পর্কিত