ফিরে দেখা ’৯১-এর ঘুর্ণিঝড়: উপকূল এখন কতটা নিরাপদ

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম
ঢাকা

প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ২৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ‘ম্যারি অ্যান’ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াল অধ্যায়। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে উপকূলে আঘাত হানে। সাথে ছিল ২০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ভোলা, নোয়াখালী অসংখ্য জনপদ মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

সরকারি হিসাবে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার বা তারও বেশি মানুষের মৃত্যু, অগণিত মানুষ নিখোঁজ, লাখো ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। সেই সময় পর্যাপ্ত পূর্বাভাস, আশ্রয়কেন্দ্র বা উদ্ধার ব্যবস্থার অভাবে মানুষ প্রায় অসহায় অবস্থায় মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। ৯১ এর সেই ঘূর্ণিঝড় শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং দুর্বল প্রস্তুতির নির্মম পরিণতি। প্রশ্ন হলো, তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল কতটা নিরাপদ।

প্রযুক্তির অগ্রগতি: আগাম সতর্কতায় বড় পরিবর্তন

১৯৯১ সালে আবহাওয়া পূর্বাভাস ছিল সীমিত ও অনেকাংশে অপ্রতুল। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আধুনিক ডপলার রাডার, স্যাটেলাইট তথ্য এবং উন্নত মডেলিংয়ের মাধ্যমে এখন ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ, গতি ও শক্তি অনেক আগেই নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এখন কয়েকদিন আগেই সতর্কবার্তা দিতে পারে। পাশাপাশি মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, রেডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে। সাইক্লোন প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) লাখো স্বেচ্ছাসেবক মাঠপর্যায়ে কাজ করে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আশ্রয়কেন্দ্র: সংখ্যা ও মান উন্নয়ন

জার্নাল অব ইন্টারন্যাশনার ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশনের উঠে এসেছে, ১৯৯১ সালে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০০টি অথচ প্রয়োজন ছিল প্রায় ৫০০০ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র। বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলে ১৩ হাজারের বেশি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, যা স্কুল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এসব আশ্রয়কেন্দ্র উঁচু জায়গায় নির্মিত এবং অনেক ক্ষেত্রে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা সুবিধাও রাখা হয়েছে। এ ছাড়া, উপকূলীয় এলাকায় মুজিব কিল্লা প্রকল্পসহ নানা ধরনের টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে মানুষ ও গবাদিপশু নিরাপদে থাকতে পারে। ফলে আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।

প্রাণহানি কমেছে, তবে ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে একটি সফল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ২০০৭ সালের সিডর বা ২০২০ সালের আম্পানের মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়েও প্রাণহানি তুলনামূলক কম হয়েছে, যা উন্নত প্রস্তুতির প্রমাণ।

এ বিষয়ে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সরকারী পরিচালক (পরিকল্পনা) প্রকৌশলী দিলিপ কুমার সেনের বলেন, ‘৯১-এর পরে আমাদের ১৯৯৭ সালে দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি হয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৯ এর সংস্কার হয়েছে এবং বর্তমানে এরও নতুন সংস্করণে কাজ চলছে। আমাদের বিশেষ করে সাইক্লোনের জন্য সিপিপি গঠন, (সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম) আছে। আমাদের ভলান্টিয়ারিজমে উন্নতি হয়েছে, আমাদের আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমে উন্নতি হয়েছে। আমরা বিশেষ করে বাংলাদেশ সাইক্লোন এবং বন্যা দুযোর্গ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাপী রোল মডেল এবং আমাদেরকে অনেক দেশই অনুসরণ করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১২ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন হয়েছে। আর বর্তমানে আমাদের সাইক্লোন শেল্টারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯১ সালে সাইক্লোনে যত লোক মারা যায়, ২০০৭ এর সিডর ক্যাটাগরি ৪ হওয়া সত্ত্বেও তার চেয়ে কম মানুষ মারা গেছে এবং ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। এতে বোঝা যায় আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আপনার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। সিপিপির জন্য আমরা ওয়ার্ল্ডওয়াইড পুরস্কারও পেয়েছি, জাতিসংঘের পুরস্কারও পেয়েছি সিপিপিতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জেন্ডার রেসপন্সিভ ক্যাটাগরিতে আমাদের ৫০% ভলান্টিয়ার তো নারী, সেখানেও আমরা পুরস্কার পেয়েছি ইন্টারন্যাশনালি। বর্তমানে বাংলাদেশ ৯১ সালের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত। প্রযুক্তি, সচেতনতা এবং আশ্রয়কেন্দ্র সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। তবে শতভাগ নিরাপদ বলা যাবে না, কারণ ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে।’

কোথায় রয়ে গেছে ঝুঁকি?

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এখনো বেশ কিছু এলাকা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের উত্তরাংশ, মেঘনা মোহনা অঞ্চল (নোয়াখালী, ভোলা, লক্ষ্মীপুরের চরাঞ্চল) এবং গঙ্গা উপকূলীয় এলাকা (খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট) সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব অঞ্চলে ভৌগোলিক অবস্থান, নদীর মোহনা ও নিম্নভূমির কারণে জলোচ্ছ্বাসের পানি সহজেই প্রবেশ করে এবং দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়।

এই ঝুঁকি থাকার প্রধান কারণগুলো হলো দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ। যেমন খুলনার কয়রা এলাকায় নিয়মিত বাঁধ ধসে পড়ে, ফলে জোয়ারের পানি সহজেই গ্রামে ঢুকে পড়ে এবং মানুষের জীবন ও কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়ে। এ ছাড়া চরাঞ্চল ও দ্বীপগুলো (যেমন হাতিয়া বা সন্দ্বীপ) নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে ক্রমেই বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ছে।

আরেকটি বড় কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও ঘনত্ব বাড়ার ফলে আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগে যে ধরনের বড় ঝড় দীর্ঘ সময় পরপর হতো, এখন তা অনেক কম সময়ের ব্যবধানে ঘটছে এবং নতুন নতুন এলাকাও প্লাবিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র ও পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নতি হলেও ভৌগোলিক দুর্বলতা, দুর্বল অবকাঠামো, নদীভাঙন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখনো অনেক এলাকা ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

কতটুকু নিরাপদ এখন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাংলাদেশ আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ, তবে ঝুঁকিমুক্ত নয়। যদি ১৯৯১ সালের মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আজ আঘাত হানে, তাহলে প্রাণহানি অনেক কম হবে এ বিষয়ে তারা আশাবাদী। তবে সম্পদের ক্ষতি এবং স্থানীয় বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হবে।

ড. আহসান হাবিব বলেন, ‘আমরা এখন দুর্যোগ মোকাবিলায় অনেক এগিয়েছি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে। তাই আমাদের প্রস্তুতিও ক্রমাগত উন্নত করতে হবে।’

করণীয় কী

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের জন্য ছিল এক ভয়াবহ শিক্ষা। সেই শিক্ষা থেকেই দেশ আজ অনেক দূর এগিয়েছে। প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সচেতনতার উন্নয়নে উপকূলীয় মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। তবে,বিশেষজ্ঞরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলছেন। আরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, উপকূলীয় বেড়িবাঁধ শক্তিশালী করা, টেকসই ঘরবাড়ি নির্মাণে সহায়তা, প্রযুক্তিগত পূর্বাভাস আরও উন্নত করা, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো।

তবে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ে শতভাগ নিরাপত্তা কখনোই নিশ্চিত নয়। তাই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টায় হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি যাতে আর কখনো ‘৯১-এর মতো ভয়াল রাত ফিরে না আসে।

বিষয়:

ঘূর্ণিঝড়

সম্পর্কিত