leadT1ad

কটূক্তি সয়ে হাটে কনকলতা, নোনা মাটিতে সফল কৃষাণি

তানভীর তুষার
তানভীর তুষার

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬, ১৫: ১৪
নিজের বাড়ির উঠানে বোনা সবজিখেতে কনকলতা মন্ডল। সংগৃহীত ছবি

একসময় বাড়ির আঙিনায় সবজি বুনতেন কনকলতা মণ্ডল। কিন্তু নোনা মাটিতে ফলন হতো নামমাত্র। পরিবারের চাহিদাই মিটত না, বিক্রি তো দূরের কথা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর দারিদ্র্যের সঙ্গে এই লড়াইয়ে কনকলতা হয়তো হেরেই যেতেন। কিন্তু তিনি স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেন।

৩৫ বছর বয়সী কনকলতার বাড়ি খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালীর গুনারী গ্রাম। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে এই এলাকার মানুষ। লবণাক্ততার কারণে এখানে কৃষিকাজ করে কনকালতাদের পরিবারের টিকে থাকা কষ্টকর।

নারীদের হাতে আয়ের সুযোগ এলে পুরো পরিবার উপকৃত হয়। কারণ, নারীরা সাধারণত আয়ের বড় অংশটি সন্তান ও পরিবারের পুষ্টির পেছনে ব্যয় করেন। অধ্যাপক মো. রমিজ উদ্দিন, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

তবে কনকালতা হেরে যাননি। ২০২১ সালে তিনি যুক্ত হন ‘জেন্ডার-রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন (জিসিএ)’ প্রকল্পের নারী জীবিকাগোষ্ঠীর সঙ্গে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও ইউএনডিপির সহায়তায় পরিচালিত এই প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ করছে এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ। উপকূলের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোই এর মূল লক্ষ্য।

প্রকল্পের আওতায় কনকলতা উন্নত পদ্ধতিতে সবজি চাষ, ‘অ্যাকুয়াজিওপনিকস’ (মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষ) এবং তিল চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। এরপর বাড়ির আঙিনার পুরোটাজুড়ে শুরু করেন সবজি চাষ। নিজের ছোট পুকুরে শুরু করেন অ্যাকুয়াজিওপনিকস। পাল্টে যায় দৃশ্যপট, নোনা মাটিতে বেড়ে যায় ফলন।

কনকলতার উঠানে ফলা বাঁধাকপি। সংগৃহীত ছবি
কনকলতার উঠানে ফলা বাঁধাকপি। সংগৃহীত ছবি

সবজি বেচতে গিয়ে কটূক্তির শিকার

ফলন তো বাড়ল, কিন্তু ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করবেন কোথায়? আগে নিজের খেতের উদ্বৃত্ত সবজি প্রতিবেশীদের কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতেন। এতে আর্থিক লাভ হতো না বললেই চলে। এবার জিসিএ প্রকল্পের বাজার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম থেকে ধারণা পেয়ে তিনি নিজেই বাজারে যাওয়ার সাহস করেন।

কিন্তু একজন নারীর পক্ষে গ্রামের হাটে গিয়ে সবজি বিক্রি করা মোটেও সহজ ছিল না। শুরুতে শুনতে হয়েছে নানা কটূক্তি, সইতে হয়েছে সমালোচনা। তবে সমাজ কী বলবে, সেই ভয়ে দমে যাননি কনকলতা। তাঁর বাড়ি কালীনগর ও নলিয়ান, এই দুই বাজারের মাঝামাঝি। এখন তিনি সপ্তাহে দুই দিন নিজেই এসব বাজারে গিয়ে নিজের উৎপাদিত সবজি ও মাছ বিক্রি করেন।

পাশাপাশি নিজের ওয়ার্ডে নিরাপদ পানির বিষয়ে কাজ করতে ‘পানি আপা’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। কনকলতার কণ্ঠে এখন আত্মবিশ্বাসের সুর। হাসিমুখে তিনি বলেন, ‘এই কাজের মাধ্যমে আমি শুধু আর্থিকভাবে স্বাবলম্বীই হইনি, নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণও পেয়েছি। এখন আমি স্বাধীন, যেকোনো সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারি।’

নারীদের এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্ব নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রমিজ উদ্দিন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়, স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। বিশেষ করে নারীদের হাতে আয়ের সুযোগ এলে পুরো পরিবার উপকৃত হয়। কারণ, নারীরা সাধারণত আয়ের বড় অংশটি সন্তান ও পরিবারের পুষ্টির পেছনে ব্যয় করেন।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত