দুই বছর পর জুলাই আন্দোলন নিয়ে মানুষের ভাবনা কী

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ২৩: ১১
জুলাই গণঅভ্যুত্থান। স্ট্রিম গ্রাফিক

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের তা তীব্র রূপ নেয়। পরের কয়েক সপ্তাহে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। শুরুতে যে ঐক্য ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা তা অনেক ক্ষেত্রেই হতাশায় পরিণত হয়েছে। আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রভাব এখনো মানুষের কাছে অটুট বলে মনে করেন অনেকে।

এ বিষয়ে স্ট্রিম বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের কথায় একটি বিষয় স্পষ্ট—মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়েছে। বাস্তবতার নিরিখেই মূল্যায়নে এসেছে পরিবর্তন। কোথাও রয়েছে হতাশা, কোথাও গর্ব, আবার কোথাও সতর্ক আশাবাদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর কথায় আশাবাদের পাশাপাশি হতাশার চিত্র উঠে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সের দুই শিক্ষার্থী জানান, তারা জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট নন। তারা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলসহ ক্যাম্পাস পরিস্থিতির উন্নতি হলেও জাতীয় পর্যায়ে এর প্রতিফলন ঘটেনি। তাদের মতে, শিক্ষার্থী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দলগুলো জুলাইকে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কেউ আর তাদের ডাকে রাজপথে নামবে না।

অর্থনীতি বিভাগ থেকে সদ্য মাস্টার্স শেষ করা আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘যে চাকরির জন্য আমরা আন্দোলন করেছিলাম, সেই চাকরিই তো পাচ্ছি না। কোটা, রাজনৈতিক বিবেচনা, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদির বদলে আমরা মেধার ভিত্তিতে চাকরির দাবি করেছিলাম। কিন্তু এখন এমন পরিস্থিতি যে, চাকরিতে নিয়োগই নেই।

বেসরকারি চাকরিজীবি ফয়সাল বলেন, বিএনপি সরকার দুই থেকে তিন বছর সময়ে যদি দেশকে সঠিক পথে চালনা করতে না পারে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও জনগণ ফুঁসে উঠবে। তিনি বলেন, জনগণ এখনো জুলাইকে ভুলে যায়নি।

ছোট ব্যবসায়ী ও নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আফরিদি ইসলাম বলেন, ‘আমরা দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ, ভারতীয় আধিপত্য ও সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি দূর করার জন্য জুলাই আন্দোলন করেছিলাম। এসবই ছিল মূল চেতনা। কিন্তু সেসব এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ সবাই জুলাইকে ব্যবহার করে আখের গোছাতে ব্যস্ত।’

পান্থপথের চা দোকানদার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের ফলেই মানুষ কথা বলার স্বাধীনতা পেয়েছে। আগে গুম-খুনের ভয় ছিল। এখন তা নেই। আমার ব্যক্তিগতভাবে কোনও লাভ না হলেও আমি খুশি।’

ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহরিন বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু বিবেকের তাড়নায় এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল। আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সমাজকে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু পরে তাদের সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

রিকশাচালক নুরুল আমিন বলেন, আমাদের জীবনে কোনো উন্নতি হয় না। আগের মতোই কষ্ট করতে হয়।

আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ শিক্ষক বলেন, মানুষ তো শুধু হাসিনাকে তাড়ানোর জন্য জুলাই আন্দোলন করেনি। সিস্টেমের সংস্কার করার জন্যও করেছে। কিন্তু তেমন কিছু তো সংস্কার হয়নি। তাই মাঝে মাঝে হতাশ লাগে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে মানুষ যে শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন ও সংস্কার চেয়েছিল, তা হয়নি। সেই সম্ভাবনাও আর নেই। ফলে মানুষের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। তরুণরা মেধার ভিত্তিতে চাকরির যে দাবি করেছিল, তারও বাস্তবায়ন হয়নি। দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এখনো শোনা যাচ্ছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত