এল নিনোর কবলে দেশ

তাপপ্রবাহে নাভিশ্বাস, বাড়ছে হিট স্ট্রোক

এল নিনোর প্রভাবে দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় গরমের তীব্রতা ও অস্বস্তি আরও বেড়েছে। ফলে শ্রমজীবী ও শিক্ষার্থীদের দৈনিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে, পাশাপাশি হাসপাতালে বাড়ছে হিট স্ট্রোক ও পানিবাহিত রোগী। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী ১৪-১৫ জুনের আগে বৃষ্টি ও স্বস্তির সম্ভাবনা নেই।

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ২৩: ৪৭
দেশের কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে বইছে মৃদু তাপপ্রবাহ। সংগৃহীত ছবি

প্রখর রোদ ও অস্বাভাবিক গরমে সারা দেশে নাভিশ্বাস অবস্থা। সহসা তাপপ্রবাহ কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। উল্টো ভ্যাপসা গরম ও অস্বস্তি বাড়তে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, যেসব জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, সেসব জেলায় অব্যাহত থাকারই শঙ্কা রয়েছে। এই গরমে বেড়েছে হিট স্ট্রোকসহ নানা পানিবাহিত রোগ।

চাঁদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলাসহ রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।

এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ মো. শাহিনুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এই তাপমাত্রা অস্বাভাবিক নয়। রাজশাহীতে ৪০ বা ঢাকায় ৩৬-৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা হওয়াটা স্বাভাবিক। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এই গরম কমবে না। আগামী দুই-তিন দিনও একই অবস্থা থাকতে পারে।’

তবে এই অস্বাভাবিক গরমের জন্য প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট ‘এল নিনো’কে দায়ী করছেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও আবহাওয়াবিদ মমিনুল ইসলাম। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘এই গরমের পেছনে অন্যতম কারণ এল নিনোর প্রভাব। কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি না থাকায় এবং বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় গরমের তীব্রতা বেশি অনুভূত হচ্ছে। আমাদের মডেল অনুযায়ী, এল নিনো বর্তমানে সক্রিয়। এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং তাপমাত্রা বাড়ে। তবে এল নিনোর কারণে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও গরমের অনুভব অনেক বেশি হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ১৪-১৫ জুনের দিকে দেশে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হতে পারে। এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত শুরু হলে গরমের তীব্রতা কমবে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরবে।’

জনজীবনে অস্বস্তি

তীব্র রোদ ও গরমে বিপাকে পড়ে গেছেন শ্রমজীবী থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ। ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার বাসিন্দা হাফিজ আহমেদ। ৮ বছর ধরে ঢাকার রাস্তায় রিকশা চালান। কিন্তু এখন প্রখর রোদ ও অস্বাভাবিক গরমের কারণে বেশি সময় ধরে রিকশা চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাফিজ আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘আগে দুপুরেও রিকশা চালাতাম। এখন সকাল ১০টার পর রোদে বের হওয়া যাচ্ছে না। ২-৩ ঘণ্টা চালালেই শরীর কুলাচ্ছে না, ঘরে ফিরে যেতে হচ্ছে।’
বেসরকারি চাকরিজীবী আসাদ আবেদিন স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত গরমে যেমন রাতে ঘুম হয় না, তেমন অফিসে গিয়েও কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না। এতে আমার দৈনন্দিন জীবন প্রায় উল্টাপাল্টা হয়ে যাচ্ছে।’

একই পরিস্থিতির কথা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাইয়ান আহমেদ বলেন, ‘রাতে ঘুমানোর সময় ফ্যান ঘুরে কিন্তু বাতাস গায়ে লাগে না। শরীর সারক্ষণই ঘামে ভিজে আর পুড়তে থাকে। মাঝেমধ্যে এমন মাথাব্যথা শুরু হয় যে বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। ঘুমের অভাবে চোখ জ্বালাপোড়া করে, আর শরীরের ক্লান্তি তো আছেই।’

বাড়ছে হিট স্ট্রোক ও পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা

প্রখর রোদ ও অস্বাভাবিক গরম যে শুধু জনজীবনে অস্বস্তি তৈরি করেছে তা কিন্তু নয়, এর ফলে যেমন বাড়ছে হিট স্ট্রোক তেমন পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা। বুধবার রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে এ চিত্র দেখা গেছে। সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা প্রায় বেশিরভাগ রোগী হিট স্ট্রোক কিংবা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত।

গত সোমবার অতিরিক্ত গরমে হিট স্ট্রোক করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি হন আমির হোসেন। তাঁর ভাগ্নেজামাই জামাল উদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের বাড়ি লাকসাম। আমার মামাশ্বশুর পরশুদিন রাতে কাঁঠাল খেয়ে হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়ে যান। পরে আমরা তাকে কুমিল্লা নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তার বললো উনি হিট স্ট্রোক করেছেন। তারপর আমরা তাঁকে এখানে নিয়ে আসি। এখন এখানে চিকিৎসা চলছে।’

এ বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক আশিকুর রহমান খান স্ট্রিমকে বলেন, ‘প্রথমত গরমে আমাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি বাসা বাঁধে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সরাসরি হিট স্ট্রোক। এটা সাধারণত ডিহাইড্রেশন এবং বা পানিশূন্যতার কারণে হয়ে থাকে। এ ছাড়া এবারের গরমের সিজনে পানিবাহিত রোগের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এর জন্য হাসপাতালের বহির্বিভাগ এবং অন্তর্বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে মানুষ সাধারণত রাস্তায় শরবত, বিভিন্ন ধরনের ড্রিংকস কিংবা খাবার খেয়ে অভ্যস্ত। এই খাবারগুলো থেকে পেটের পীড়া থেকে শুরু করে টাইফয়েড পর্যন্ত হতে পারে এবং এই টাইফয়েডের কারণে হাসপাতালে একটা বিশাল অংশ জ্বর নিয়ে ভর্তি হন।

করনীয় জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এই রোগগুলো প্রতিরোধ করার জন্য আসলে সচেতনতার চেয়ে বড় বিকল্প আর কিছু নেই। এটা শুধু চিকিৎসকরাই করবে তা না, এটি একটি সামাজিক সচেতনতা। যেমন একটি শিশু তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার—এগুলো তার পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিখবে। এর সামাজিক প্রতিফলন স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা বিভিন্ন জায়গায় হওয়া উচিত। মানুষকে সুস্থ রাখার জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার, গরমের দিনে ঠান্ডা জায়গায় থাকা, অতিরিক্ত রোদে না বের হওয়া, বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার বা পানীয় থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন।’

সম্পর্কিত