ভারত থেকে কেন চীনের হাতে মোংলা, বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতি কি বদলে যাচ্ছে

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ১৫: ০৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

মোংলা বন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পের পর এবার মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের দায়িত্বও গেছে চীনের হাতে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং দ্বিতীয় ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর মোংলার পাশে ১১০ একর জমিতে গড়ে উঠছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। সম্প্রতি এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় বিনিয়োগ প্রকল্প থেকে রূপ নিয়েছে ‘চীন-বাংলাদেশ মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চলে’।

ভারতীয় ডেভেলপারের দীর্ঘসূত্রতা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটির দায়িত্ব দেওয়া হয় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনকে (সিসিইসিসি)। গত মাসে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের কাজও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান থেকে সিসিইসিসির হাতে যায়।

প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও সিসিইসিসি। এতে বাংলাদেশ জমি দেবে, আর চীনা প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বাংলাদেশের আরও কয়েকটি বড় প্রকল্পের মতো এটিকেও চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) ঘিরে অর্থনৈতিক ও শিল্প সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে বিষয়টি শুধু একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিনিয়োগ বদলের ঘটনা নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে। কারণ মোংলা এখন শুধু একটি সমুদ্রবন্দর নয়; এটি আঞ্চলিক বাণিজ্য, সংযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর একটি।

ভারতের জন্য মোংলা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে সহজ যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। অন্যদিকে চীনের জন্য এটি বঙ্গোপসাগরে অর্থনৈতিক উপস্থিতি জোরদার, বিকল্প বাণিজ্যপথ গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাময় কেন্দ্র। ফলে মোংলার অর্থনৈতিক অঞ্চল চীনের হাতে যাওয়ার ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক কেবল একটি বিনিয়োগ প্রকল্পের পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না; বরং দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে মূল্যায়ন করছেন।

ভারতীয় প্রকল্প থেকে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল

মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৫ সালে। সে সময় শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশ ও ভারত মোংলা এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দুটি ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। ভারতের লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভারতীয় অর্থায়নে মোংলা বন্দর থেকে খুলনা পর্যন্ত নতুন রেলপথও নির্মাণ করা হয়।

পরে ২০১৮ সালে ভারত হিরানান্দানি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইভিটা কনস্ট্রাকশনসকে প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবে নির্বাচন করে। ২০২২ সালের মার্চে বেজা ও ইভিটার মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, দুই বছরের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরু করতে পারেনি। ফলে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন স্থবির হয়ে পড়ে।

এরই মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার স্থবির বড় প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন শুরু করে। এ সময় দ্রুত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পায়ন এগিয়ে নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুনে ঢাকায় চীনা দূতাবাস মোংলার ১১০ একর জমিতে একটি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়।

ভারতীয় ডেভেলপার নির্ধারিত সময়েও কাজ শুরু করতে ব্যর্থ হওয়ায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভারতীয় প্রকল্পটি বাতিল করে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম অংশীদার খুঁজতেই সরকার চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। একই সময়ে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়, যা এই সিদ্ধান্তের পেছনে অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে।

এর পরের ধাপটি আসে ২০২৬ সালে। গত ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেইজিংয়ে আয়োজিত সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) অনুষ্ঠানে বেজা এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) নতুন সমঝোতা স্মারক সই করে। এর মাধ্যমে প্রকল্পটির নতুন নাম হয় ‘চীন-বাংলাদেশ মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল’।

প্রকল্পটিতে ৫০ থেকে ৬৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সরাসরি ১৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। বেজার নির্বাহী সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম জানান, চীনা বিনিয়োগকারীরা টেলিযোগাযোগ, ইলেকট্রনিকসসহ উচ্চমূল্য সংযোজন শিল্প এবং আধুনিক গুদাম সুবিধা গড়ে তুলতে আগ্রহী। তিনি বলেন, প্রথমে সিসিইসিসি একটি বিস্তারিত মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করবে। সেটি পর্যালোচনার পর প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হবে। জমির মূল্যের বিপরীতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ইক্যুইটি অংশীদারত্বও পরবর্তী আলোচনায় চূড়ান্ত হবে।

মোংলার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

ভারতের পরিবর্তে চীনের হাতে মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নের দায়িত্ব যাওয়াকে বিশ্লেষকেরা বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এর প্রভাব শুধু অর্থনীতি বা বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে ভারত-চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতাতেও এর প্রভাব পড়বে।

বঙ্গোপসাগর এখন শুধু একটি বাণিজ্যপথ নয়, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে মোংলা বন্দর ও এর পাশের অর্থনৈতিক অঞ্চল ভারত ও চীন—উভয় দেশের বাণিজ্য, সংযোগ ও কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এই করিডোরে যুক্ত হলে বড় আকারের চীনা বিনিয়োগ, নতুন শিল্প এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভারতকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার চেয়ে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ভারতের দৃষ্টিতে মোংলার অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। এটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার, কলকাতা থেকে প্রায় ১৮৮ কিলোমিটার এবং সুন্দরবনের খুব কাছাকাছি। দীর্ঘদিন ধরে নয়াদিল্লি বাংলাদেশকে তাদের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্র হিসেবে দেখে এসেছে। সে কারণে এই প্রকল্পে ভারতের জায়গায় চীনের অংশগ্রহণকে দেশটি কূটনৈতিক ও কৌশলগত ধাক্কা হিসেবে বিবেচনা করছে।

ভারতের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, বাণিজ্যিক অবকাঠামো ভবিষ্যতে দ্বৈত ব্যবহার (ডুয়াল-ইউজ) সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, উপকূলের এত কাছে চীনের শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক উপস্থিতি ভবিষ্যতে সামুদ্রিক নজরদারি, জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ কিংবা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সহায়ক হতে পারে। বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রিও মোংলা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততাকে ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন বলে উল্লেখ করেছেন।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, মোংলা প্রকল্প ভারত মহাসাগরে চীনের তথাকথিত ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা ‘মুক্তার মালা’ কৌশলকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। পাকিস্তানের গওয়াদর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা, মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ এবং জিবুতিসহ যেসব গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও অবকাঠামোতে চীন ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছে, মোংলাকেও সেই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে বঙ্গোপসাগরে বেইজিংয়ের কৌশলগত উপস্থিতি আরও জোরালো হতে পারে, যা ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে তার প্রভাবের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

চীনের দৃষ্টিতেও মোংলার গুরুত্ব কম নয়। এটি ভবিষ্যতে বিকল্প নৌ-বাণিজ্য রুট গড়ে তোলা এবং মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমানে চীনের প্রায় ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মালাক্কা প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। পাশাপাশি প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (সিএমবিইসি) বাস্তবায়িত হলে ইউনান প্রদেশকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সহযোগিতার ঘোষণার পর ভারতের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তবে এসব উদ্বেগের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা কোনো তৃতীয় দেশকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপমুক্ত থাকা উচিত।

বাংলাদেশের সামনে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের এই পরিবর্তন বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার নতুন পরীক্ষাও। একদিকে চীনের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং শিল্পায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ভারত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে না পারায় মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের দায়িত্ব চীনের হাতে গেছে। এটিকে ঘিরে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে বলে আমি মনে করি না। কারণ এটি কোনো সামরিক প্রকল্প নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ। ভারত চাইলে ভবিষ্যতেও এই বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ব্যবহার করতে পারবে। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর চীন অর্থায়ন করেছিল। এখন সেই সেতু সবাই ব্যবহার করছে। এ ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত সবারই লাভ হয়। তাই ভারতীয় মহলে যে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে, সেটিকে আমি মূলত রাজনৈতিক অবস্থান প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই দেখি।’

বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ ভারতের হাতছাড়া হওয়ায় তাদের কিছুটা উদ্বেগ থাকতেই পারে। তবে বন্দরের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের কাছেই থাকবে এবং ভারতসহ অন্য দেশও এটি ব্যবহার করতে পারবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলটিও সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা সম্ভব। ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে সিঙ্গাপুরের মতো উন্মুক্ত ব্যবহারের নীতি অনুসরণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশকে ‘‘ওপেন রিজিওনালিজম’’-এর কৌশল গ্রহণ করতে হবে। তাহলে অপ্রয়োজনীয় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এড়ানো সম্ভব হবে, একই সঙ্গে দেশ অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হবে।’

বিশ্লেষকদের মতে, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল ভারতের পরিবর্তে চীনের হাতে যাওয়ার ঘটনাকে শুধু একটি বিনিয়োগ প্রকল্পের পরিবর্তন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এটি বঙ্গোপসাগরে ভারত-চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতারও প্রতিফলন। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যাতে দেশ কোনো পরাশক্তির প্রতিযোগিতার ঘুঁটিতে পরিণত না হয়।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে একটি বাস্তব সুযোগও। চীনা বিনিয়োগ শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন গতি আনতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখাও জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোংলার মতো কৌশলগত প্রকল্পে অর্থনৈতিক লাভ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত