হাসান মামুন

কত গরু-ছাগল কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে এবং কী পরিমাণ কোরবানি হতে পারে, সে বিষয়ে একটা ধারণা দেওয়া হয়েছিল– এবারও। কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে। কোরবানির চাহিদা অত বেশি কিনা, সেটাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। চাহিদা বলতে ‘কার্যকর চাহিদা’ই বুঝতে হবে। একান্ত ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই তো কোরবানি দিতে সক্ষম হয় না অর্থসংকটে থাকলে। অনেকে কোরবানি দিলেও হয়তো ‘ভাগে’ দিচ্ছেন। হয়তো গরুর বদলে ছাগল কোরবানি দিচ্ছেন। অপেক্ষাকৃত ছোট গরু কোরবানির প্রবণতা বেশি কিনা, সেটাও দেখতে হবে। অর্থাৎ চাহিদার প্যাটার্ন হয়তো বদলাচ্ছে।
নিবন্ধটি লেখা পর্যন্ত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পেলে সেটা ধরে আলোচনা করা যাবে। তার আগে আলোচনা করা যায় ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন ও ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ধরে। এসব উৎস থেকে সাধারণ ধারণা মিলেছে– এবার পশু কোরবানি হয়েছে কম। গতবারের চাইতেও কম। গতবার গরু-ছাগল মিলিয়ে কোরবানি হয়েছিল ৯১ লাখের মতো। এবার হয়তো আরও ১০ লাখ কম হয়েছে। মাঝে পশু কোরবানি নাকি ছাড়িয়েছিল এক কোটি। এগুলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর পরিবেশিত তথ্য।
যখন এক কোটির বেশি কোরবানি হয়েছে; তখনও হাটে আসা পশুসম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল অবিক্রীত। গরু-ছাগলের একাংশ কোরবানির হাটের বাইরেও থেকে যায়। বাজারে মাংসের নিয়মিত সরবরাহের জন্য তো কিছু মজুত থাকতে হবে। মাথাপিছু মাংস পরিভোগ আমাদের অনেক কম। সে কারণে কোরবানির পর কম পশুসম্পদ হাতে থাকলেও সংকট দেখা দেয় না। গরু-ছাগলের মাংস পরিভোগ বেড়ে গেলে সেটা দেখা দিত বৈকি। ভারত, মিয়ানমার থেকে গরু-ছাগল আর তেমন আসে না বলে সে পরিস্থিতিতে হয়তো যেতে হতো মাংস আমদানিতে। এরই মধ্যে কিছু মাংস আমদানি যে হয় না, তা নয়। বিশেষ শ্রেণির ভোক্তার জন্য কিছু গরু-মহিষের মাংস দেশে আসছে। দেশের ভেতর থেকেই এর জোগান দেওয়া সম্ভব কিনা, সে আলোচনা অবশ্য কম।
এ মুহূর্তে প্রশ্ন হলো, প্রধানত মূল্যস্ফীতির চাপে এবার কম পশু কোরবানি হয়েছে কিনা। আর সে কারণে অন্যবারের চাইতে বেশি গরু-ছাগল উৎসে ফেরত গেছে কিনা। প্রতিবারই অবশ্য বিশেষ করে কিছু গরু কোরবানির হাট থেকে ফেরত যায়। কিছুসংখ্যক বেপারি ও খামারি প্রতিবছরই সংকটে পড়ে। এটা সব ব্যবসার ক্ষেত্রেই কমবেশি প্রযোজ্য। সারাবছর জবাই হওয়া গরু-ছাগলের প্রায় অর্ধেক অল্প ক’দিনে হাতবদল হয় বলে ঈদের বাজারে অস্থিরতাও থাকে অনেক বেশি। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেও দামের অনেক ওঠানামা হয়ে থাকে। এতে কোরবানিদাতারা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেটা না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু বেপারি কিংবা খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা তাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই হয় বিপর্যয়কর। লোকসান সামলে তাদের একাংশ আর ব্যবসায় টিকে থাকতে পারে না। বছরের পর বছর বাজারে এমন প্রবণতা বহাল থাকাটা গোসম্পদ খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। এ অবস্থায় কমে যেতে পারে গরু-ছাগলের উৎপাদন।
করোনার সময় থেকে গরু-ছাগলের উৎপাদন নাকি বাড়ছে না। সেই সময় থেকে পশু কোরবানির প্রবণতাও নাকি স্থির কিংবা কমতির দিকে। করোনোর সময় কোরবানি কেন কমেছিল, সেটা সবার জানা। তারপর ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে গোখাদ্যের দাম বাড়ায় পশুপালন ব্যাহত হয়। সার্বিকভাবে এটা হয়ে ওঠে আরও ব্যয়বহুল। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় কিংবা উচ্চ পর্যায়ে থেকে যাওয়ায় পশু কোরবানির কার্যকর চাহিদাও কমে। অন্য সময়ে মাংসের বিক্রিও কমে যায়। গরু-ছাগলের মাংসের দাম আবার বাড়তির দিকে। মাংসের দাম বাড়লে কোরবানির হাটে গরু-ছাগলের দাম বাড়বে, এটাও স্বাভাবিক। হালে বাণিজ্যিক খামারে কোরবানির পশু তো ওজন করেও বিক্রি হচ্ছে।
হাট থেকে এবার বেশিসংখ্যক পশু ফেরত গেলে সে ঘটনাকে এই প্রেক্ষাপটে দেখাই সঙ্গত হবে। এটা তো আকস্মিক নয়। ক’বছর ধরেই বিশেষত বাণিজ্যিক খামারগুলো বড় গরু তৈরিতে উৎসাহী হলেও সেগুলো লাভজনক দামে বিক্রি হচ্ছে কম। ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদাই বেশি। দেশি জাতের কোরবানির পশুতেও ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। ভালো যে, এগুলো বেশি উৎপাদিত হয় পারিবারিক উদ্যোগে পরিচালিত খামারে। অন্যান্য কাজের পাশাপাশি একটা-দুটো গরু পুষে কোরবানির সময় ভালো দাম পেলেই তারা বেপারির হাতে তুলে দেয় কিংবা স্থানীয় হাটে বিক্রি করে। চাহিদা বেশি বলে শহরের মূল হাটেও সেগুলো দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।
সহজে বিক্রি হয় না অনেক বিনিয়োগে উৎপাদিত কিংবা হাতবদল হওয়া বড় কোরবানির পশু। একশ্রেণির বিক্রেতা সেগুলো ঈদের রাত পর্যন্ত ধরে রাখে ‘ভালো দাম’ পাওয়ার আশায়। কিন্তু বড় গরুর চাহিদা কম আর সরবরাহ বেশি থাকায় শেষতক এমনকি লোকসানে সেগুলো বেচতে হয়। কিছু ফিরিয়েও নিতে হয়। এবার নাকি এসব অনেক বেশি ঘটেছে মূলত রাজধানীর কয়েকটি হাটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গরু জবাই করে হাটেই কেজি দরে বেচে লোকসান সামলাতে চেয়েছে বিক্রেতারা। ঘটনা হিসেবে এটা নতুন।
এদিকে অবিক্রীত গরু যারা ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের একাধিক দিক দিয়ে সংকটে পড়তে হবে। কোরবানির হাটে বিক্রি না হওয়া গরু কসাইয়ের কাছে লাভজনক দামে বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব। পরবর্তী ঈদ পর্যন্ত পেলেপুষে রাখতে হলে আবার নতুন করে জোগাতে হবে অর্থ। যে উৎস থেকেই ঋণ করা হোক; সেগুলোর চাপ বাড়বে এ অবস্থায়। কারও কারও লোকসান এত বেশি হতে পারে যে, তিনি ব্যবসা ধরে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়েও আসতে পারেন। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর সংখ্যা হালে বেড়েছে কিনা, সেটা অনুসন্ধান করে দেখা প্রয়োজন।
ছাগলসহ অন্যান্য পশু ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে কিনা, সে বিষয়ে পৃথক প্রতিবেদন অবশ্য চোখে পড়েনি। আজকাল তো বড় বড় ছাগলও কোরবানির হাটে তোলা হয়। তবে উচ্চবিত্তদের মধ্যে হাঁকডাক করে পশু কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা কমেছে ‘ছাগলকাণ্ডে’ এনবিআরের এক কর্মকর্তা বিপাকে পড়ার পর। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা কমে এলেও বড় গরু-ছাগল কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা বাড়েনি, এটা লক্ষণীয়। অনেকে ছোট গরু কোরবানি দেওয়ার বদলে কয়েকজন মিলে বড় গরু কিনছে, এটাও লক্ষণীয়। তাতে মোট পশু কোরবানি কমে এলেও অন্যদিকে বড় গরুর চাহিদা বাড়ার কথা। তাহলে কি বড় গরু অনেক বেশি উৎপাদিত হচ্ছে?
ছোট কিংবা বড়– বাণিজ্যিক খামারে কোরবানির জন্য পশু তৈরি করা হলে তাতে খরচ বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। গোখাদ্য, চিকিৎসা, পরিচর্যা ইত্যাদির খরচ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এসব পশু হাটে তুলে ফেরত নিয়ে যেতে হলে সে ক্ষেত্রেও খরচ বিরাট। হালে ডিজেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোরবানি ঈদের সময় চাহিদার চাপে এটা আরও বেশি হারে বাড়ে। এক পরিবহন ব্যয়ই লোকসানি খামারি ও বেপারিদের উৎসাহ নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
গরু-ছাগল, বিশেষত কোরবানির পশু উৎপাদনে আমরা ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ হয়েছিলাম। ভারতে বিজেপির ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে গরু পাঠানোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ হওয়ার ক’বছরের মধ্যেই আমরা এ খাতে অগ্রগতি লাভ করি। সেজন্য ছোট-বড় খামারিদের উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি নীতি সহায়তারও প্রশংসা করা হয়। কিন্তু তৃণভূমির অভাবে খামারে গরু-ছাগল উৎপাদন তো ব্যয়বহুল। গোখাদ্যের উপকরণ উৎপাদনেও আমরা পিছিয়ে। এর একটা বড় অংশই আমদানিকৃত। খামারে ব্যয়বহুল বিদ্যুতের ব্যবহারও কম নয়।
এ অবস্থায় উৎপাদিত গরু-ছাগল এবং এর মাংসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলের শেষদিকে অপেক্ষাকৃত কম দামে গোমাংস আমদানির প্রশ্ন উঠেছিল এ প্রেক্ষাপটেই। মূলত খামারি ও তাদের পক্ষাবলম্বনকারী মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে অপেক্ষাকৃত কম দামে গোমাংস, এমনকি মহিষের মাংস কিনতে ইচ্ছুকদের অনেকে নড়েচড়ে বসেছিল। সেই অংশটিই মূলত সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পশু কোরবানি দেওয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে কিনা, এ প্রশ্ন উঠতে পারে। গরু থেকে অনেকে ছোট ছাগল কোরবানির দিকে ঝুঁকছেন বলেও মনে হয়। সেজন্য হয়তো ছাগল অবিক্রীত থাকার ঘটনা কম কিংবা এ সংক্রান্ত অভিযোগ বেশি নেই। এদিকে মহিষের মাংস ক্রমে আকর্ষণীয় হয়েছে। কোরবানির হাটেও বেড়েছে এর চাহিদা। মহিষ অবিক্রীত থাকার ঘটনাও সম্ভবত কম।
যেভাবে আমরা গরু-ছাগলের উৎপাদন বাড়িয়েছি, সেই মডেলটির টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে তার আগে কোরবানির জন্য বিশেষত বড় সাইজের পশু উৎপাদন করে যারা বিপদগ্রস্ত হয়েছে, তাদের কিছু সরকারি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। এদের সংখ্যা বেশি না হলে এ ধরনের সহায়তা জোগানো কঠিন হবে না। এজন্য সঠিক তথ্য-উপাত্ত অবশ্য প্রয়োজন।
পশু কোরবানি এবং সারা বছরের মাংসের চাহিদা পূরণে আমাদের কোন্ মডেলে যাওয়া উচিত, সেটা এখন ভাবতে হবে। ছোট ও মাঝারি শুধু নয়; যথাসম্ভব কম খরচে গরু-ছাগল উৎপাদন করে পরিবর্তিত চাহিদা পূরণে এগিয়ে আসাটাই জরুরি। দেশের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে কম খরচে মহিষের উৎপাদন বাড়ানো যায় কিনা, সেটাও দেখতে হবে। নইলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এলেও গরু-ছাগলের অব্যাহত দাম বৃদ্ধিতে কোরবানির প্রবণতা হয়তো আরও কমবে। বছরব্যাপী মাংস পরিভোগও আরও কমবে হয়তো। তখন দেশীয় খামারিরা সহনীয় দামে গরু-ছাগল জোগাতে পারছে না বলে অভিযোগ তুলে অপেক্ষাকৃত কম দামে মাংস আমদানির দাবি হয়তো জোরদার হয়ে উঠবে। হয়তো বলা হবে– কোরবানির বাজারটা কেবল ‘আবদ্ধ’ থাকুক!
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

কত গরু-ছাগল কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে এবং কী পরিমাণ কোরবানি হতে পারে, সে বিষয়ে একটা ধারণা দেওয়া হয়েছিল– এবারও। কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে। কোরবানির চাহিদা অত বেশি কিনা, সেটাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। চাহিদা বলতে ‘কার্যকর চাহিদা’ই বুঝতে হবে। একান্ত ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই তো কোরবানি দিতে সক্ষম হয় না অর্থসংকটে থাকলে। অনেকে কোরবানি দিলেও হয়তো ‘ভাগে’ দিচ্ছেন। হয়তো গরুর বদলে ছাগল কোরবানি দিচ্ছেন। অপেক্ষাকৃত ছোট গরু কোরবানির প্রবণতা বেশি কিনা, সেটাও দেখতে হবে। অর্থাৎ চাহিদার প্যাটার্ন হয়তো বদলাচ্ছে।
নিবন্ধটি লেখা পর্যন্ত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পেলে সেটা ধরে আলোচনা করা যাবে। তার আগে আলোচনা করা যায় ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন ও ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ধরে। এসব উৎস থেকে সাধারণ ধারণা মিলেছে– এবার পশু কোরবানি হয়েছে কম। গতবারের চাইতেও কম। গতবার গরু-ছাগল মিলিয়ে কোরবানি হয়েছিল ৯১ লাখের মতো। এবার হয়তো আরও ১০ লাখ কম হয়েছে। মাঝে পশু কোরবানি নাকি ছাড়িয়েছিল এক কোটি। এগুলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর পরিবেশিত তথ্য।
যখন এক কোটির বেশি কোরবানি হয়েছে; তখনও হাটে আসা পশুসম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল অবিক্রীত। গরু-ছাগলের একাংশ কোরবানির হাটের বাইরেও থেকে যায়। বাজারে মাংসের নিয়মিত সরবরাহের জন্য তো কিছু মজুত থাকতে হবে। মাথাপিছু মাংস পরিভোগ আমাদের অনেক কম। সে কারণে কোরবানির পর কম পশুসম্পদ হাতে থাকলেও সংকট দেখা দেয় না। গরু-ছাগলের মাংস পরিভোগ বেড়ে গেলে সেটা দেখা দিত বৈকি। ভারত, মিয়ানমার থেকে গরু-ছাগল আর তেমন আসে না বলে সে পরিস্থিতিতে হয়তো যেতে হতো মাংস আমদানিতে। এরই মধ্যে কিছু মাংস আমদানি যে হয় না, তা নয়। বিশেষ শ্রেণির ভোক্তার জন্য কিছু গরু-মহিষের মাংস দেশে আসছে। দেশের ভেতর থেকেই এর জোগান দেওয়া সম্ভব কিনা, সে আলোচনা অবশ্য কম।
এ মুহূর্তে প্রশ্ন হলো, প্রধানত মূল্যস্ফীতির চাপে এবার কম পশু কোরবানি হয়েছে কিনা। আর সে কারণে অন্যবারের চাইতে বেশি গরু-ছাগল উৎসে ফেরত গেছে কিনা। প্রতিবারই অবশ্য বিশেষ করে কিছু গরু কোরবানির হাট থেকে ফেরত যায়। কিছুসংখ্যক বেপারি ও খামারি প্রতিবছরই সংকটে পড়ে। এটা সব ব্যবসার ক্ষেত্রেই কমবেশি প্রযোজ্য। সারাবছর জবাই হওয়া গরু-ছাগলের প্রায় অর্ধেক অল্প ক’দিনে হাতবদল হয় বলে ঈদের বাজারে অস্থিরতাও থাকে অনেক বেশি। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেও দামের অনেক ওঠানামা হয়ে থাকে। এতে কোরবানিদাতারা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেটা না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু বেপারি কিংবা খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা তাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই হয় বিপর্যয়কর। লোকসান সামলে তাদের একাংশ আর ব্যবসায় টিকে থাকতে পারে না। বছরের পর বছর বাজারে এমন প্রবণতা বহাল থাকাটা গোসম্পদ খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। এ অবস্থায় কমে যেতে পারে গরু-ছাগলের উৎপাদন।
করোনার সময় থেকে গরু-ছাগলের উৎপাদন নাকি বাড়ছে না। সেই সময় থেকে পশু কোরবানির প্রবণতাও নাকি স্থির কিংবা কমতির দিকে। করোনোর সময় কোরবানি কেন কমেছিল, সেটা সবার জানা। তারপর ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে গোখাদ্যের দাম বাড়ায় পশুপালন ব্যাহত হয়। সার্বিকভাবে এটা হয়ে ওঠে আরও ব্যয়বহুল। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় কিংবা উচ্চ পর্যায়ে থেকে যাওয়ায় পশু কোরবানির কার্যকর চাহিদাও কমে। অন্য সময়ে মাংসের বিক্রিও কমে যায়। গরু-ছাগলের মাংসের দাম আবার বাড়তির দিকে। মাংসের দাম বাড়লে কোরবানির হাটে গরু-ছাগলের দাম বাড়বে, এটাও স্বাভাবিক। হালে বাণিজ্যিক খামারে কোরবানির পশু তো ওজন করেও বিক্রি হচ্ছে।
হাট থেকে এবার বেশিসংখ্যক পশু ফেরত গেলে সে ঘটনাকে এই প্রেক্ষাপটে দেখাই সঙ্গত হবে। এটা তো আকস্মিক নয়। ক’বছর ধরেই বিশেষত বাণিজ্যিক খামারগুলো বড় গরু তৈরিতে উৎসাহী হলেও সেগুলো লাভজনক দামে বিক্রি হচ্ছে কম। ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদাই বেশি। দেশি জাতের কোরবানির পশুতেও ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। ভালো যে, এগুলো বেশি উৎপাদিত হয় পারিবারিক উদ্যোগে পরিচালিত খামারে। অন্যান্য কাজের পাশাপাশি একটা-দুটো গরু পুষে কোরবানির সময় ভালো দাম পেলেই তারা বেপারির হাতে তুলে দেয় কিংবা স্থানীয় হাটে বিক্রি করে। চাহিদা বেশি বলে শহরের মূল হাটেও সেগুলো দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।
সহজে বিক্রি হয় না অনেক বিনিয়োগে উৎপাদিত কিংবা হাতবদল হওয়া বড় কোরবানির পশু। একশ্রেণির বিক্রেতা সেগুলো ঈদের রাত পর্যন্ত ধরে রাখে ‘ভালো দাম’ পাওয়ার আশায়। কিন্তু বড় গরুর চাহিদা কম আর সরবরাহ বেশি থাকায় শেষতক এমনকি লোকসানে সেগুলো বেচতে হয়। কিছু ফিরিয়েও নিতে হয়। এবার নাকি এসব অনেক বেশি ঘটেছে মূলত রাজধানীর কয়েকটি হাটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গরু জবাই করে হাটেই কেজি দরে বেচে লোকসান সামলাতে চেয়েছে বিক্রেতারা। ঘটনা হিসেবে এটা নতুন।
এদিকে অবিক্রীত গরু যারা ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের একাধিক দিক দিয়ে সংকটে পড়তে হবে। কোরবানির হাটে বিক্রি না হওয়া গরু কসাইয়ের কাছে লাভজনক দামে বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব। পরবর্তী ঈদ পর্যন্ত পেলেপুষে রাখতে হলে আবার নতুন করে জোগাতে হবে অর্থ। যে উৎস থেকেই ঋণ করা হোক; সেগুলোর চাপ বাড়বে এ অবস্থায়। কারও কারও লোকসান এত বেশি হতে পারে যে, তিনি ব্যবসা ধরে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়েও আসতে পারেন। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর সংখ্যা হালে বেড়েছে কিনা, সেটা অনুসন্ধান করে দেখা প্রয়োজন।
ছাগলসহ অন্যান্য পশু ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে কিনা, সে বিষয়ে পৃথক প্রতিবেদন অবশ্য চোখে পড়েনি। আজকাল তো বড় বড় ছাগলও কোরবানির হাটে তোলা হয়। তবে উচ্চবিত্তদের মধ্যে হাঁকডাক করে পশু কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা কমেছে ‘ছাগলকাণ্ডে’ এনবিআরের এক কর্মকর্তা বিপাকে পড়ার পর। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা কমে এলেও বড় গরু-ছাগল কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা বাড়েনি, এটা লক্ষণীয়। অনেকে ছোট গরু কোরবানি দেওয়ার বদলে কয়েকজন মিলে বড় গরু কিনছে, এটাও লক্ষণীয়। তাতে মোট পশু কোরবানি কমে এলেও অন্যদিকে বড় গরুর চাহিদা বাড়ার কথা। তাহলে কি বড় গরু অনেক বেশি উৎপাদিত হচ্ছে?
ছোট কিংবা বড়– বাণিজ্যিক খামারে কোরবানির জন্য পশু তৈরি করা হলে তাতে খরচ বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। গোখাদ্য, চিকিৎসা, পরিচর্যা ইত্যাদির খরচ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এসব পশু হাটে তুলে ফেরত নিয়ে যেতে হলে সে ক্ষেত্রেও খরচ বিরাট। হালে ডিজেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোরবানি ঈদের সময় চাহিদার চাপে এটা আরও বেশি হারে বাড়ে। এক পরিবহন ব্যয়ই লোকসানি খামারি ও বেপারিদের উৎসাহ নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
গরু-ছাগল, বিশেষত কোরবানির পশু উৎপাদনে আমরা ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ হয়েছিলাম। ভারতে বিজেপির ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে গরু পাঠানোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ হওয়ার ক’বছরের মধ্যেই আমরা এ খাতে অগ্রগতি লাভ করি। সেজন্য ছোট-বড় খামারিদের উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি নীতি সহায়তারও প্রশংসা করা হয়। কিন্তু তৃণভূমির অভাবে খামারে গরু-ছাগল উৎপাদন তো ব্যয়বহুল। গোখাদ্যের উপকরণ উৎপাদনেও আমরা পিছিয়ে। এর একটা বড় অংশই আমদানিকৃত। খামারে ব্যয়বহুল বিদ্যুতের ব্যবহারও কম নয়।
এ অবস্থায় উৎপাদিত গরু-ছাগল এবং এর মাংসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলের শেষদিকে অপেক্ষাকৃত কম দামে গোমাংস আমদানির প্রশ্ন উঠেছিল এ প্রেক্ষাপটেই। মূলত খামারি ও তাদের পক্ষাবলম্বনকারী মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে অপেক্ষাকৃত কম দামে গোমাংস, এমনকি মহিষের মাংস কিনতে ইচ্ছুকদের অনেকে নড়েচড়ে বসেছিল। সেই অংশটিই মূলত সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পশু কোরবানি দেওয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে কিনা, এ প্রশ্ন উঠতে পারে। গরু থেকে অনেকে ছোট ছাগল কোরবানির দিকে ঝুঁকছেন বলেও মনে হয়। সেজন্য হয়তো ছাগল অবিক্রীত থাকার ঘটনা কম কিংবা এ সংক্রান্ত অভিযোগ বেশি নেই। এদিকে মহিষের মাংস ক্রমে আকর্ষণীয় হয়েছে। কোরবানির হাটেও বেড়েছে এর চাহিদা। মহিষ অবিক্রীত থাকার ঘটনাও সম্ভবত কম।
যেভাবে আমরা গরু-ছাগলের উৎপাদন বাড়িয়েছি, সেই মডেলটির টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে তার আগে কোরবানির জন্য বিশেষত বড় সাইজের পশু উৎপাদন করে যারা বিপদগ্রস্ত হয়েছে, তাদের কিছু সরকারি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। এদের সংখ্যা বেশি না হলে এ ধরনের সহায়তা জোগানো কঠিন হবে না। এজন্য সঠিক তথ্য-উপাত্ত অবশ্য প্রয়োজন।
পশু কোরবানি এবং সারা বছরের মাংসের চাহিদা পূরণে আমাদের কোন্ মডেলে যাওয়া উচিত, সেটা এখন ভাবতে হবে। ছোট ও মাঝারি শুধু নয়; যথাসম্ভব কম খরচে গরু-ছাগল উৎপাদন করে পরিবর্তিত চাহিদা পূরণে এগিয়ে আসাটাই জরুরি। দেশের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে কম খরচে মহিষের উৎপাদন বাড়ানো যায় কিনা, সেটাও দেখতে হবে। নইলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এলেও গরু-ছাগলের অব্যাহত দাম বৃদ্ধিতে কোরবানির প্রবণতা হয়তো আরও কমবে। বছরব্যাপী মাংস পরিভোগও আরও কমবে হয়তো। তখন দেশীয় খামারিরা সহনীয় দামে গরু-ছাগল জোগাতে পারছে না বলে অভিযোগ তুলে অপেক্ষাকৃত কম দামে মাংস আমদানির দাবি হয়তো জোরদার হয়ে উঠবে। হয়তো বলা হবে– কোরবানির বাজারটা কেবল ‘আবদ্ধ’ থাকুক!
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন জেলার খবরে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে স্তূপ করা চামড়া, ক্লান্ত মুখের ব্যবসায়ী, আর লোকসানের হিসাব মেলাতে গিয়ে মাথায় হাত দেওয়া মৌসুমি বিক্রেতা। এই দৃশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়, প্রতি বছরের। কিন্তু একটি সম্ভাবনাময় খাতের কেন এই বেহাল অবস্থা, এর জন্য দায়ী কারা?
২১ ঘণ্টা আগে
‘পদ্মা ব্যারেজ’ মেগা প্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে গঙ্গার পানি বিষয়ক বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি দুর্বল হতে পারে—এমন যুক্তি গ্রহণ করা কঠিন। আন্তর্জাতিক আন্তঃসীমান্ত নদীনীতি এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের বৈধ অধিকার সম্পূর্ণভাবে বহাল থাকবে।
১ দিন আগে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম শুধু ব্যক্তি নয়, একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই ধরনেরই একজন নেতা। তাঁর জীবন ছিল ঘটনাবহুল। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ছিল এক অর্থে অস্বাভাবিক। তাঁর মৃত্যু মর্মান্তিক।
১ দিন আগে
মানুষের স্মৃতিতে জিয়াউর রহমান এমন এক শাসক, যিনি উন্নয়নের ভাষাকে শহরের মসনদ থেকে নামিয়ে খাল, মাঠ ও ইউনিয়ন পরিষদের উঠোনে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। খাল কাটা কর্মসূচি, স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও গ্রাম সরকার; এসব ধারণা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর সেই উন্নয়ন-দর্শন আজকের
১ দিন আগে