আইসিজের প্রতিবেদন

সংস্কার নিয়ে সংঘাত এড়ানো উচিত বিএনপি সরকারের

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

সংগৃহীত ছবি

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক পর প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। প্রায় দুই কোটি নতুন ভোটারের অংশগ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ফলে নির্বাচনকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনের ফলে বিএনপি সরকারের সামনে এখন পর্বতসম চ্যালেঞ্জ।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও জ্বালানি সংকট

নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে সচল করা। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেও, অর্থনীতির বড় ক্ষতগুলো রয়ে গেছে। বর্তমানে ৯ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি এবং প্রবৃদ্ধির ধীরগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি তেলের অনিয়মিত সরবরাহ, বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্য এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে না পারলে জনমনে অসন্তোষ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক সংস্কার

সরকার গঠনের পরপরই ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে বিএনপির ভূমিকা এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে প্রণীত এই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের অনেকগুলোই রাজনৈতিকভাবে বিএনপির জন্য স্পর্শকাতর। যদিও অধিকাংশ দল এই সনদে স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু বিএনপি এর কিছু বিধিনিষেধ ও সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি যদি এই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করে বা জুলাই বিপ্লবের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা নতুন করে অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো শরিক দলগুলো গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে নিয়মিত চাপে রাখছে। বিএনপির উচিত হবে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলা।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা বেশ নাজুক। বেশিরভাগ সিনিয়র নেতা বিদেশে থাকায় দলটি এখন কার্যত নিষ্ক্রিয়। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও ভারতসহ আন্তর্জাতিক মিত্রদের পরামর্শ হলো, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপিকে অতি-উগ্র অবস্থান পরিহার করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের নিষিদ্ধ রাখা টেকসই সমাধান হতে পারে না। বিএনপির উচিত হবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করা।

বিএনপির জন্য আরেক বড় পরীক্ষার নাম ‘শাসনব্যবস্থার সংস্কার’। অতীতে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও দুঃশাসনের অভিযোগ থেকে দলটিকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা নতুন ও অভিজ্ঞের সমন্বয়েই তৈরি করা হয়েছে। তবে সচিবালয় ও বিচার বিভাগের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে একটি পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তর করা হবে বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তার মূল মাপকাঠি।

পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক সমীকরণ

২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং গত দেড় বছরের ‘ফ্রস্টি’ বা শীতল সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় সরকার ব্যস্ত। নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছে, নয়াদিল্লি নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। তবে ভারতের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন এবং গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলাও সরকারের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা।

রোহিঙ্গা সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ এবং দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এখন অসম্ভবপ্রায়। বাংলাদেশ সরকারকে এই ১২ লাখ শরণার্থীর বোঝা বহন করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে শরণার্থী শিশুদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া এবং ক্যাম্পের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব কমানো জরুরি।

নতুন সরকার গঠনের পর দেশের জনগণ উচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। সাধারণ মানুষ স্থিতিশীলতা, নিত্যপণ্যের দামের নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র দেখতে চায়। জুলাই বিপ্লবের রক্তঋণ শোধ করতে হলে বিএনপি সরকারকে কেবল অর্থনীতি পুনরুদ্ধার নয়, বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষায় কঠোর হতে হবে।

যদি সরকার অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মেধার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়, তবে জুলাই অভ্যুত্থানের মতো আরও অস্থির পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তাই বর্তমান সরকারের জন্য পরবর্তী কয়েক মাস হবে ‘ফায়ারফাইটিং’ বা জরুরি অবস্থা মোকাবিলার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের ভোটের অধিকার ও নাগরিক মর্যাদা রক্ষা করাই হবে নতুন সরকারের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

সম্পর্কিত